সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

এবার মৌসুমের আগেই ডেঙ্গুর হানা

জুন ১২, ২০১৯ | ১১:৪৬ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ২০১৮ সালে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের হার রেকর্ড ছাড়ানোর কথা বলা হলেও এ বছর মৌসুম শুরুর আগেই হানা দিয়েছে ডেঙ্গু। সাধারণত বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস ‘ডেঙ্গু মৌসুম’ বলে পরিচিত হলেও এবার মধ্য মে থেকেই ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। এ কারণে হাসপাতালগুলোতে ভির করছেন রোগীরা। এরই মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দু’জন।

বিজ্ঞাপন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মৌসুম প্রকৃতপক্ষে জুন মাসে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। তবে জানুয়ারি মাস থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়াতে ওই সময় থেকেই ডেঙ্গু শুরু হয়েছে। তবে কেবল বৃষ্টির পানি না, নিজেদের ঘরে ও ফুলের টব জমে থাকা পানিতেও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা ডিম পারে। সেখান থেকেও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ মে পর্যন্ত ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩৬৩ জন, চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন ৩১৫ জন। আর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুজন।

কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত ৪৬ জন রোগী। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৭ জন।

জানতে চাইলে ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আখতার সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবার ডেঙ্গু বেশি না। গতবছর অনেক জায়গা থেকে সঠিক রির্পোট আমরা পাইনি; অনেক হাসপাতাল আমাদের রিপোর্ট দেয়নি। তবে এবার অধিদফতর থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো সঠিক সময়ে সব রিপোর্ট দিচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

ডা. আয়েশা আখতার জানান, পানি কোথাও খোলা অবস্থায় তিনদিনের বেশি রাখা ঠিক না। পানি ঢেকে রাখতে হবে অথবা তিনদিন পর ফেলে দিতে হবে। কারণ পরিষ্কার পানিতেই এডিস মশা ডিম পারে। এছাড়া ডাবের খোসা ও গাড়ির টায়ারসহ ঘরের কোনো আসবাবপত্রে যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায় ২০০০ সালে। সেবছর রেকর্ড সংখ্যক ৯৩ জন রোগী মারা যান; রোগী ছিলেন ৫ হাজার ৫৫১ জন। ২০০১ সালে মারা যান ৪৪ জন; রোগী ছিলেন দুই হাজার ৪৩০ জন। ২০০২ সালে মৃত্যু হয় ৫৮ জনের। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন ৬ হাজার ২৩২ জন। ২০০৩ সালে মৃত্যুর হার অকেটাই কমে আসে। ওই বছর মারা যান ১০ জন; রোগী ছিলেন ৪৮৬ জন। ২০০৪ সালে মৃত্যু হয় ১৩ জনের; রোগী ছিলেন ৩ হাজার ৪৩৪ জন। ২০০৫ সালে মারা যান ৪ জন; রোগী ছিলেন ১ হাজার ৪৮ জন। ২০০৬ সালে মৃত্যু হয় ১১ জনের। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন দুই হাজার ২শ জন। এদিকে ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা না যায়নি। এই বছরগুলোতে রোগীর সংখ্যা ছিল- যথাক্রমে ৪৬৬ জন, এক হাজার ১৫৩ জন, ৪৭৪ জন এবং ৪০৯ জন।

এর পরের বছর থেকেই অর্থাৎ ২০১১ সাল থেকে আবার ডেঙ্গুতে রোগীর মৃত্যু শুরু হয়। ২০১১ সালে মারা যান ৬ জন; রোগী ছিলেন এক হাজার ৩৫৯ জন। ২০১২ সালে মারা যান একজন; রোগী ছিলেন ৬৭১ জন। ২০১৩ সালে মৃত্যু হয় ২ জনের; রোগী ছিলেন ১ হাজার ৭৪৯ জন। আবার ২০১৪ সালে কেউ মারা না গেলেও রোগী ছিলেন ৩৭৫ জন। ২০১৫ সালে মৃত্যু হয় ৬ জনের; ওই বছর রোগী ছিলেন ৩ হাজার ১৬২ জন। ২০১৬ সালে মারা যান ১৪ জন; রোগী ছিলেন ৬ হাজার ৬০ জন। ২০১৭ সালে মারা যান ৮ জন; রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬৯ জন। এছাড়া গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৮সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৬৩৩ জন।

এ বছর কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে রেকর্ড সংখ্যক রোগী ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. তানভীর আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, আজকে অন্তত ( ১১ মে) তিন থেকে চারজনকে চিকিৎসা দিয়েছি, যারা বাসায় চলে গেছেন। এছাড়া ভর্তিও আছেন কয়েকজন। এরকম প্রতিদিন হচ্ছে। ’

‘কবে থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাচ্ছেন’- জানতে চাইলে ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, ‘গত দু-তিন সপ্তাহ ধরেই রোগী আসা শুরু হয়েছে। যেটা অন্যান্য বছরগুলোতে ছিল না। এবারে মৌসুমের আগেই ডেঙ্গু হচ্ছে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ এ বছরে এপ্রিল থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাচ্ছি। এবার একটু আগেই থেকেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা ডিম পারে। বিক্ষিপ্তভাবে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তায় পড়ে থাকা বিভিন্ন ক্যান, ডাবের খোসা, গাছের কোটর ও পরিত্যাক্ত পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম ছাড়ায় মশার বংশ বৃদ্ধিটা বেশি হয়ে গেছে।’

‘তবে ডেঙ্গু এখনও ভয়াবহ না’- উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ডেঙ্গু কন্ট্রোল করতে হলে মশা মারার ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য এখনই ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে হবে। নিজেদেরকেই যার যার ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করতে হবে। ঘরের কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে নজর দিতে হবে। আর সিটি করপোরেশন ও  প্রশাসনকে মশা মারার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে যেসব জায়গায় পানি জমে আছে সেসব পরিষ্কার করতে হবে। মোট কথা, মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। না হলে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা বাড়তেই থাকবে-এটাই নিয়ম।’

সারাবাংলা/জেএ/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন