শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ২ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ডিআইজি দেয় ঘুষ, ওসি যায় পালিয়ে!

জুন ১২, ২০১৯ | ৬:৩৪ অপরাহ্ণ

প্রভাষ আমিন

দেশটা আসলে মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। এমন সব কাণ্ড-কারখানা হয়, বিশ্বাস করাই কঠিন। পুলিশের একজন ডিআইজি দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচতে ঘুষ দেন। সেই ঘুষ কাকে দেন? দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালককে। কী আশ্চর্য! যারা আইনের রক্ষক, যারা দুর্নীতি দমন করবেন, তারাই ঘুষ চালাচালি করছেন। সাধারণ মানুষ এখানে দর্শকমাত্র।

মিজানুর রহমান নামের আগে যে উপ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদবীটি ব্যবহার করেন, তা পুলিশ বাহিনীর জন্যই বিব্রতকর। মিজানুর রহমানের মত কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়- মনোবল নষ্ট হয়। গত বছর নারী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পরই যদি মিজানকে চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনা হতো, তাহলে আজ গোটা বাহিনীকে এত বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো না। এখনও সময় আছে, যত দ্রুত সম্ভব মিজানকে চাকুরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনা হোক। দ্বিতীয় বিয়ে গোপন রাখতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে ডিআইজি মিজানকে গতবছর ঢাকা মহাগনগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তার মানে এই একবছর তিনি কোনো কাজ না করেই বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে দুদক তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে কী পাওয়া গেছে, সেটা এখনও জানি না। তবে মিজানের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খবর বেরিয়ে আসছে। আর এই দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই দুদক পরিচালক এবং প্রতিষ্ঠানটির তদন্ত কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরকে দুই দফায় অন্তত ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। আবার সেই ঘুষ দেওয়ার কথোপকথন তিনি রেকর্ড করে রেখেছেন এবং নিজেই তা ফাঁস করেছেন। দুদক পরিচালক যদি দুর্নীতি করেন, মানে ঘুষ খান; তাহলে তো আর আস্থা বা বিশ্বাসের জায়গা থাকে না। অভিযোগ ওঠার পর দুদক দ্রুত প্রাথমিক তদন্ত করে অভিযুক্ত পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। দুদককে ধন্যবাদ। দুদক চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। আর দুদকের ৮৭৪ জন কর্মীর সততার নিশ্চয়তা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আমিও মানছি। বাংলাদেশের মত একটা দুর্নীতি প্রবণ দেশে একটি প্রতিষ্ঠানের সবার কাছ থেকে সততা আশা করা যায় না। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনকে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দুদকেই যদি দুর্নীতি ঢুকে পড়ে তাহলে মানুষ আর কোথায় আস্থা রাখবে।

দুদক পরিচালক ঘুষ নিয়ে খুবই অন্যায় করেছেন। তার বিচার হবে। কিন্তু যিনি ঘুষ দিলেন এবং বুক ফুলিয়ে সেটা বলে বেড়াচ্ছেন; সেই মিজান কিন্তু এখনও বহাল তবিয়তেই আছেন। ডিআইজি মিজানের ঘুষ দেওয়া প্রসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন হলো- ডিআইজি মিজান যদি নির্দোষ হন, তাহলে তিনি ঘুষ দিলেন কেন? নিশ্চয়ই নিজের সম্পদের পাহাড় আড়াল করতেই ঘুষ দিয়ে দুদক পরিচালকের মুখ বন্ধ রাখতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো- মিজান কত টাকা আড়াল করতে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন? তারচেয়ে বড় কথা হলো- ঘুষ দেওয়ার জন্য ৪০ লাখ টাকা তিনি পেলেন কোথায়? ঘুষ নেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি দেওয়াও অপরাধ। আমার দাবি হলো- দ্রুত মিজানুর রহমানকে চাকুরিচ্যুত করা হোক; যাতে তার নামের আগে আর ‘ডিআইজি’ লিখতে না পারে। এমন একজন মানুষ যার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ, যিনি নিজের দুর্নীতি ঢাকতে ঘুষ দেন; তার নামের আগে এই পদবীটি থাকলে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিই ক্ষুন্ন হয়।

একদিকে যখন পুলিশের একজন ডিআইজি নিজের সম্পদ আড়াল করতে ঘুষ দিচ্ছেন, তখন পুলিশেরই আরেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফেনীর সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আসলে নুসরাত হত্যা মামলা হওয়াই উচিত ছিল। এখন মোটামুটি নিশ্চিত, হত্যাকারীদের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোয়াজ্জেম। তিনিই প্রথম নুসরাতের হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে দেওয়ার সব চেষ্টাই হয়েছে। বেঁচেও গিয়েছিলন। ওসি মোয়াজ্জেমকে সোনাগাজী থেকে ক্লোজ করে রংপুরে পাঠানো হয়। ক্লোজ করাকে আমার কাছে কখনোই শাস্তি মনে হয় না। ওসি মোয়াজ্জেমের একটা অপরাধ আড়ালেই থেকে যাচ্ছিল। তিনি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল কর্তৃক যৌন হয়রানির পর নুসরাতের সাথে কথা বলেছেন এবং সেটা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ওসি মোয়াজ্জেম আসলে আরেক দফা হয়রানি করেছেন নুসরাতকে। হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইদুল হক সুমন তার বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পেয়ে গত ২৭ মে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ৩১ মে পরোয়ানাটি ফেনীর পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পৌঁছায়। কিন্তু ফেনীর পুলিশ সুপার কাজী মনির-উজ-জামান বারবার পরোয়ানাটি হাতে পাওয়ার কথা অস্বীকার করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ৩ জুন গ্রেফতারি পরোয়ানা পাওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি। তারও দুদিন পর বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে পরোয়ানাটি রংপুর রেঞ্জে পাঠানো হয়। তবে রংপুর রেঞ্জ দাবি করে, পরোয়ানাটি বিধি মোতাবেক পাঠানো হয়নি। ফেনী আর রংপুর পুলিশের এই তালবাহানা দেখেই আমার সন্দেহ হচ্ছিল, তারা ওসি মোয়াজ্জেমকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন না তো? আমার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। এখন আর ওসি মোয়াজ্জেমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজি সবাই মিলে তাকে খুঁজছেন। এমনকি ফেনীর পুলিশ ঢাকায় এসে বিভিন্ন জায়গায় ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের জন্য হানা দিচ্ছে। তারাও ওসির টিকি খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে আশ্বাস মিলছে, খুব শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতদিন তাকে গ্রেফতার করা হয়নি কেন? ওসি মোয়াজ্জেমকে যারা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

বিজ্ঞাপন

আর সবার মত আমি কোনো পেশার মানুষকে ঢালাও গালি দেই না। ভালো-মন্দ সব পেশাতেই আছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। এরপরও পুলিশে অনেক ভালো কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা আমাদের নিরাপদে রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করেন। তাদের অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু এই ডিআইজি মিজান আর ওসি মোয়াজ্জেমের মত দু-একজন কর্মকর্তার কারণে গোটাবাহিনীর ভাবমূর্তি ভূ-লুণ্ঠিত হয়। আমরা সবসময় একটা ভুল করি। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে চাই। বাহিনীর মনোবলের দোহাই দিয়ে অপরাধী কর্মকর্তাদের বাঁচাতে চাই। চট্টগ্রামে মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যার ঘটনায় তার স্বামী আালোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা নিয়ে কানাঘুষার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার তদন্তও ধামাচাপা দিয়ে তাকে বাঁচানোর সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। স্ত্রীকে খুন করার শাস্তি কিন্তু চাকুরিচ্যুতি নয়। বাবুল আক্তারের মত ওসি মোয়াজ্জেমকেও বাঁচানোর চেষ্টা করছেন পুলিশের কেউ কেউ। এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে, ডিআইজি মিজানকেও পালিয়ে যাওয়ার বা বাঁচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হবে। পালিয়ে যাওয়ার পর সবাই তাকে খুঁজতে মাঠে নামবে। কিন্তু আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, অপরাধীকে বাঁচিয়ে দিয়ে কোনো বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় না। প্রকৃত অপরাধীদের সাজা হলে অন্যরাও অপরাধ করতে দশবার ভাববে। অপরাধ কমবে, বাহিনীর মনোবল চাঙা হবে। বাবুল আক্তারকে তার স্ত্রী হত্যা মামলার আসামি করলে, ওসি মোয়াজ্জেম আর ডিআইজি মিজানকে গ্রেফতার করলেই বরং পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। যে বাহিনী নৈতিকভাবে যত শক্তিশালী, তাদের মনোবল তত চাঙ্গা। চাকরিতে থাকা একজন ডিআইজি দুর্নীতি আড়াল করতে ঘুষ দিচ্ছেন, আরেক ওসি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এটা পুলিশ বাহিনীর জন্যই লজ্জা।

প্রভাষ আমিন : বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন