মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৩০ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বাজেট আলোচনায় সংসদ উত্তপ্ত

জুন ১৬, ২০১৯ | ১০:২৭ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

সংসদ ভবন থেকে: জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। বিএনপির এমপিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান সংসদের কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। নির্বাচনে তিনশ’ আসন লুট করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের এমপিরা বলেছেন, নির্বাচনকে বিতর্কিত করার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলী ও উদারনীতির কারণে সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। শপথ নিয়ে, সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে সংসদকে অবৈধ বলা বিএনপির নির্লজ্জতা ও দ্বিচারিতা ছাড়া কিছুই নয়।

বিজ্ঞাপন

রোবাবার (১৬ জুন) সংসদ অধিবেশনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পুরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা এসব বক্তব্য দেন। পরে ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বিএনপির রুমিন ফারহানার সকল অসংসদীয় বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করে দেন।

এদিন সম্পুরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, বিরোধীদল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, গণফোরামের মোকাব্বির খান এবং বিএনপির হারুনুর রশীদ, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও মোশারফ হোসেন ভুঁইয়া।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রম ও নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে। আজ কেউ কেউ উন্নয়ন দেখে না। ওনারা চোখ থাকতেও অন্ধ। তারা পদ্মা সেতু দেখতে পারেন না; শিক্ষার হার, গড় আয়ু, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি- এসব তারা দেখতে পারেন না। তাই এসব জ্ঞানপাপীরা কী বলল, তাতে জনগণের কোনো কিছু যায় আসে না, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে- আর এগিয়ে যাবেই এটিই বাস্তবতা। ’

বিজ্ঞাপন

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব হারুনুর রশীদ বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের রাজনৈতিক হয়রানির শিকার। তাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না। উচ্চ ও নিম্ন আদালত কোনোটাই স্বাধীন নয়। ’

তিনি আরও বলেন, গত ১০ বছরে কত লাখ মেট্রিকটন চাল, গম ও ডাল আমদানি করা হয়েছে আমরা তার হিসাব চাই। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এটি ঠিক নয়। আশা করি, দেশে সুশাসন ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদ নেতা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। ’

বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়ে বেশি খরচ করায় নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বিএনপি দলীয় এই সাংসদ বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশন অযোগ্য এবং ব্যর্থ। এই কমিশনের নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। কাজেই তারা যে টাকা খরচ করেছে সেটা সম্পূর্ণ অপচয়। তাদের দ্রুত পদত্যাগ করা উচিত। ’

এদিকে বিএনপির সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং সংসদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অধিবেশন। নির্ধারিত দশ মিনিটের বক্তৃতায় তিন দফায় বাধার সম্মুখীন হন বিএনপি এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘এই সংসদের কেউ বলতে পারবেন তারা জনগণের প্রত্যেক্ষ ভোটে নির্বাচিত? কেউ বলতে পারবেন না। ’এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের সদস্যরা ‘হই’ ‘হই’ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার তার বক্তব্য থামিয়ে বলেন, ‘আপনি বাজেটের বাইরে এমন কোনো কথা বলবেন না যাতে সংসদ উত্তপ্ত হয়। ’

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই সংসদে আসার আগে সংসদ নেতা বলেছিলেন আমাদের কথা বলতে দেবেন। কিন্তু আমার প্রথম বক্তৃতার দুই মিনিটের এক মিনিটও শান্তিমত কথা বলতে পারিনি। একই ঘটনা আজকেও। আমি দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সংসদ যদি উত্তেজিত হয়ে যায়। তাহলে আমি কিভাবে কথা বলব? ’

পুরো দশ মিনিটের বক্তৃতায় কয়েক সেকেন্ড শুধু সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা করেন রুমিন ফারহানা। পরে ডেপুটি স্পিকার তাকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘আপনি বাজেট ও সংসদীয় ভাষার বাইরে যে কথাগুলো বলেছেন, তার সবকিছু সংসদীয় প্রসিডিউর থেকে এক্সপাঞ্জ করা হল। ’এই কথা বলার পর বিএনপির সবাই অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। পরে অবশ্য আবার অধিবেশনে ফেরেন তারা।

কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘আন্দোলনের নামে অগ্নি-সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপি শত শত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। সারা দেশে ভয়াল নাশকতা চালিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিএনপি নেতারা নানা হুমকি দিয়েছে। বিএনপি নেত্রী দুর্নীতি করেছেন, আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। সেখানে সরকারের কী অপরাধ? বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় রয়েছে। জনগণ থেকে আপনারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। ’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির অনেকে এখনও জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলতে চান। কিন্তু কট্টোর বিএনপি-জামায়াত যারা আছেন, তারা যদি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েন, তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন স্বাধীনতার ঘোষণাসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে রয়েছে একটিমাত্র নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ’

এদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, ‘বাংলাদেশের যেদিকেই তাকাই চারিদিকে শুধু উন্নয়ন ও অগ্রগতি। সারাবিশ্ব প্রতিটি সেক্টরে এই উন্নয়নের কথা স্বীকার করেছেন। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সৎ, কর্মঠ ও পরিশ্রমী ৫ প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শেখ হাসিনা অন্যতম। গত ১০ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দেওয়া বাজেট গোটা দেশের চিত্রই পাল্টে গেছে। প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুতের আলো। জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজ বিএনপি বিশ্বাস করে না বলেই তারা সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হননি। বিএনপির মুখে সমালোচনা মানায় না। কারণ তাদের সময় দেশে কোনো উন্নয়নই হয়নি।

জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও এই খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হলে ঋণখেলাপিরা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না কেন?’

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘সংসদে বিএনপির চরম মিথ্যাচার ও অসংসদীয় উস্কানিমূলক বক্তব্যেই প্রমাণ করে বাজেট নিয়ে তাদের অন্য কোনো কথা নেই। তাদের খুন, দুর্নীতি, অগ্নি-সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের কারণেই গত নির্বাচনে দেশের জনগণ বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বিরোধীদলের আসনেও বসার সুযোগ পায়নি। বাংলাদেশের মানুষ অস্ত্র চোরাকারবারী ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী সন্ত্রাসী তারেক রহমানকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। ’

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘বিএনপির এক নেতা নিজেকে ঈমানদার দাবি করেছেন। যদি তাই হয়, তবে শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করছেন, মেট্টোরেল করছেন, বড় মহাসড়কগুলো ৪ লেনে উন্নীত হচ্ছে- এসব কথা সংসদে বলুন। সত্যকে সত্য বলুন।’

সারাবাংলা/এএইচএইচ/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন