শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নারীর জন্য বিপজ্জনক দেশ: শীর্ষে ভারত, ১০ নম্বরে যুক্তরাষ্ট্র

জুন ২৮, ২০১৯ | ৯:৪১ অপরাহ্ণ

রোকেয়া সরণি ডেস্ক

সম্প্রতি নারীর জন্য বিপদজনক ১০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান থমসন রয়টর্স ফাউন্ডেশন। ছয়টি মানদণ্ড নির্ধারণ করে জাতিসংঘের ১৯৩ দেশে এই জরিপ চালনো হয়। এশিয়ার ছয়টি, আফ্রিকার তিনটি এবং উত্তর আমেরিকার একটি দেশের নাম তালিকায় আসে।

বিজ্ঞাপন

তালিকায় সবার উপরে রয়েছে ভারত এবং সবার শেষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা কিংবা হাজার বছর ধরে পিতৃতন্ত্রের থাবার নিচে থাকা জনপদেই নারীরা সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। এর বাহিরে থেকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠাঁই পেয়েছে এই তালিকায়।

জরিপে এ বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে নারীদের পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা মোট ৫৪৮ জন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অনলাইনে, ফোনে এবং সরাসরি কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

যেসব বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে তারা দীর্ঘ দিন থেকে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং প্রশান্ত এলাকায় নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। এদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, সরকারের নীতি-নির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী, এনজিও কর্মী, উন্নয়ন ও সহায়তাকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।

বিজ্ঞাপন

জরিপে মানদণ্ডগুলো ছিল— স্বাস্থ্যসেবা; অর্থনৈতিক অবস্থান বা সম্পদের পরিমাণ; সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী কাজে অংশগ্রহণ; যৌন সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন; সহিংসতা (যৌন নির্যাতন ছাড়া) ও মানবপাচার।

বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক দেশ ভারত। এখানে নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতন হয়। ক্রীতদাস  হিসেবে নারীর ব্যবহারও এখানে বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নারীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি যৌন সহিংসতা।

ধর্ষণে এগিয়ে ভারত

এর আগে ২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের কথাই মনে করিয়ে দেয় নারীর জন্য কতটা বিপদজনক এই দেশটি। ২৩ বছরের তরুণীকে রাতে বাসে একা পেয়ে চালক এবং অন্যান্য যাত্রীরা ধর্ষণের পর হত্যা করে। নারীর প্রতি অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে দেশটিতে। সরকারি হিসাব অনুয়ায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত নারীর সঙ্গে হওয়া অপরাধের মাত্রা আগের বছরগুলোর তুলনায় শতকরা ৮৩ ভাগেরও বেশি বেড়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায়, এই বছরগুলোতে ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

ভারতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিপক্ষে সচেতনতা বাড়লেও খুব একটা লাভ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারণ হলো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বদ্ধমূল নানা প্রথার চর্চা। এসবের মধ্যে রয়েছে কন্যা শিশুহত্যা, গৌরি দান, যৌনদাসত্ব, পারিবারিক ক্রীতদাসত্ব বা অধীনতা, মানবপাচার এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা।

যুদ্ধবিদ্ধস্ত দুই আরব দেশ

ভারতের পরেই তালিকায় নাম এসেছে আরবীয় দেশ আফগানিস্তান এবং সিরিয়ার। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশগুলোতে সামাজিক কাঠামো এমনিতেই নড়বড়ে। সামাজিক ভঙ্গুর দশার কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে গৃহযুদ্ধে কাহিল দেশগুলোতে।

২০১১ সালে একই ধরনের এক জরিপে আফিগানিস্তান ছিল প্রথম অবস্থানে। এবার দুইয়ে নেমে এসেছে তারা। কিন্তু এখানে স্বাস্থ্যসেবা আর যুদ্ধেসংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনায় আগের তুলনায় খুব একটা বদল আসেনি।

আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তালিবানদের কারণে নারীর সুরক্ষা অরক্ষিতই রয়ে গেছে। এই দেশের নারীরা এখনো শিক্ষা, দারিদ্র্য আর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

অন্যদিকে সিরিয়ায় সাতবছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। নারীরা এখানে স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন (বিশেষত সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়), যৌন ও যৌন বহির্ভূত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন এবং বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে ভয়াবহ মাত্রায়। এসব কারণে নারীর জন্য বিপদজনক দেশের তালিকায় সিরিয়ার অবস্থান তিনে।

সহিংসতাই যেখানে সংস্কৃতি

তালিকার চার এবং পাঁচে রয়েছে আফ্রিকান দেশ সোমালিয়া এবং সৌদি আরব। ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রভাবে এই দেশগুলোতে নারীর অবস্থান অনেকটাই অরক্ষিত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দশকের ওপর দশক ধরে চলা সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে দেশটিতে আইন ও বিচারবিভাগ অনেকটাই নড়বড়ে অবস্থানে রয়েছে। তাই নারীর সঙ্গে ঘটে চলা সহিংসতার কোনো বিচার এখানে হয় না বললেই চলে।

পুরুষতান্ত্রিক শাসনে চলা সৌদি আরবে সম্প্রতি নারীরা গাড়ি চালানোর অনুমতি পেলেও যেসব নারীরা এই অনুমতি পেতে আন্দোলন করছিলেন, তাদের আটক করা হয়েছে। এমনকি এখনো সেদেশে নারীর একজন পুরুষ অভিভাবক থাকা আবশ্যক। নারীর অভিভাবক হতে পারেন তার বাবা, স্বামী, ভাই অথবা ছেলে।

তালিকার ছয় থেকে নয়-এ এসেছে পাকিস্তান, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, ইয়েমেন এবং নাইজেরিয়া। প্রতিটি দেশেই সহিংসতা, দারিদ্র্যতা ও পিতৃতান্ত্রিকতা নারীর নড়বড়ে অবস্থানের প্রধান কারণ।

মানবপাচারে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা

সারাবিশ্বে প্রতিবছর ১৫০ বিলিয়ন ডলার লাভের অর্থ ঘরে তুলছে মানবপাচারকারীরা। তাদের মূল ভুক্তভোগী নারী ও শিশুরা। মানবপাচারে জড়িত প্রথম সারির তিনটি দেশ হচ্ছে ভারত, লিবিয়া ও মিয়ানমার।

তিনটি কেন্দ্রকে ঘিরে জমে উঠেছে এই ব্যবসা। ভারত উপমাহাদেশে ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান ঘিরে চলছে এই ব্যবসা। আরব উপদ্বীপে সিরিয়া, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও সোমালিয়া আর অন্যদিকে আফ্রিকায় নাইজেরিয়া ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো ঘিরে চলছে এই মানবপাচারের রমরমা ব্যবসা।

যুক্তরাষ্ট্রের যৌন সহিংসতা

দক্ষিণ এশিয়া, আরব বা আফ্রিকায় যুদ্ধের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এলাকা অথবা হাজার বছর ধরে চলা পিতৃতন্ত্রের থাবায় এসব জনপদে নারীরা সবচেয়ে অনিরাপদ থাকবে— এটাই যেন স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে সবাই। কিন্তু বিস্ময়করভাবে নারীর জন্য বিপদজনক দেশের তালিকায় ১০ নম্বরে রয়েছে উন্নয়নের শিখরে থাকা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যৌন সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তৃতীয়।

২০১১ সালের জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এই তালিকায় আসেনি। এবার ১০ নম্বরে আসার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে, হ্যাশট্যাগ মিটু ও হ্যাশট্যাগ টাইমসআপ আন্দোলন। এই প্রচারণাগুলো চলার সময় সমাজের উঁচুস্তরে ঘটা নারীর প্রতি সহিংসতার নানা চিত্র সামনে আসে। হাই প্রোফাইল কেইসগুলো সামনে আসার পর একে একে মুখ খোলেন আরও অনেক নারী। এসব ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রকে নারীর জন্য বিপদজনক রাষ্ট্রেকে তালিকায় দশে এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সারাবাংলা/আরএফ/এটি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন