রবিবার ২১ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৬ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

উড়াও শতাবতী (১৯) || মূল: জর্জ অরওয়েল || অনুবাদ: মাহমুদ মেনন

জুন ৩০, ২০১৯ | ৩:৩০ অপরাহ্ণ

<<শুরু থেকে পড়ুন

আগের অংশ>>

গর্ডন সবচেয়ে ভয়ে থাকতো সেই দিনটিকে নিয়ে যেদিন ওর বাবা-মা ওকে দেখতে যেতো। তখনও গর্ডন ইশ্বরে বিশ্বাসী ছিলো, আর সে মনে মনে ইশ্বরের কাছে এই প্রার্থনাই করতো, তার বাবা-মা যেনো না আসেন। বিশেষ করে তার বাবা, যাকে নিয়ে লজ্জিত না হয়ে কোনও উপায় থাকতো না। শবসদৃশ বিমর্ষ, হতাশ, নতজানু এক মানব, অবিন্যস্ত পুরোনো বিশ্রি তার পরিধান। সবকিছু মিলিয়ে একটা ব্যর্থতা, ভয়ার্ততা আর বিরক্তির ছাপই তিনি সারাক্ষণ নিজের সাথে করে বয়ে বেড়াতেন। আর সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হতো যখন তিনি বিদায় নিতেন। বিদায় বেলায় গর্ডনকে বখশিস হিসেবে তিনি একটি আধা ক্রাউন এমনভাবে তুলে দিতেন যে, একটি ছেলেরও তা চোখ এড়াতো না, আর বুঝতে বাকি থাকতো না ওটা স্রেফ একটি আধা ক্রাউন মুদ্রা। আজ এই বিশ বছর পরেও স্কুলের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে গর্ডনের শরীর ঘৃণায় রি রি করে ওঠে। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে প্রথম যে বিষয়টি সে বুঝে নিয়েছিলো তা হচ্ছে অর্থই সব। সেই দিনগুলোতে সে আসলে তার দারিদ্র-পীড়িত পরিবারটিকে ঘৃণা করতেই শিখেছিলো। বাবা-মা-জুলিয়া সবাইকে সে ঘৃণার চোখেই দেখতো। ছোট্ট অবিন্যস্ত ঘর, বিবর্ণ মানুষগুলোর নিরুত্তাপ নিরানন্দ আচরণ, অশেষ ভীতি আর তিনপেন্স-ছয়পেন্সের ঝগড়া এসবই ছিলো তার ঘৃণার কারণ। এটা আমাদের সামর্থের বাইরে- এটিই ছিলো কমস্টক পরিবারের বহুল উচ্চারিত বাক্য। অর্থের জন্য একটি শিশু হিসাবে তাকে যতটা হাহাকার করতে হয়েছে… ততটা বুঝি আর কাউকে করতে হয়নি। কেনো পরার জন্য ভদ্রস্ত কাপড়টুকু থাকবে না, কেনো পর্যাপ্ত মিষ্টিটুকু মিলবে না, কেনো মিলবে না ইচ্ছা হলে একটু ছবি দেখতে যাওয়ার সুযোগ? এসব প্রশ্ন তার মধ্যে ঘুরপাক খেতো আর সে সবের জন্য, এই দরিদ্রদশার জন্য সে তার বাবা-মাকেই দায়ী করতো, যেনো তারা ইচ্ছা করেই নিজেদের দরিদ্র করে রেখেছে। কেনো তারা অন্য ছেলেদের বাবা-মায়ের মতো হলো না? তার মনে হতো, ওরা আসলে দরিদ্রতাই বেছে নিয়েছে। আজ বুঝতে পারে প্রকৃতপক্ষে একটি শিশুর মনে বিষয়গুলো ঠিক এভাবেই খেলা করে।

এরপর যখন সে বড় হলো তখন ঠিক এমন অযৌক্তিক ভাবনাগুলো তার মাঝে ছিলো না বটে, তবে অন্যভাবে অযৌক্তিক ভাবনাই তার মনে প্রগাঢ় স্থান করে নিতে থাকলো। ততদিনে স্কুলে তার মন বসে গেছে। হ্যাঁ স্কুলে খুব সাফল্য সে কখনোই দেখাতে পারে নি- এমনকি বৃত্তিটাও কখনো পায়নি, তবে তার মন আর মস্তিষ্কটিকে ঠিক ঠিক গড়ে নিয়েছিলো। প্রধান শিক্ষক যে বইগুলো পড়তে বারণ করতেন, সেগুলোই সে বেশি বেশি করে পড়তো। এতে করে ইংল্যান্ডের চার্চগুলো নিয়ে, দেশাত্ববোধ নিয়ে, স্কুলের পুরনো বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক নিয়ে তার মধ্যে এমন কিছু মতামত তৈরি হলো, যা প্রচলিত ধ্যান ধারণা থেকে ভিন্ন। পাশাপাশি সে কবিতা লেখাও শুরু করলো। এক দুই বছর পর অ্যাথেনিয়াম, নিউ এজ, উইকলি ওয়েস্টমিন্সটারে একটা-দুইটা কবিতা পাঠানোও শুরু করলো। আর বলাই বাহু্ল্য, তার সবগুলোই যথারীতি বাতিল করে দেওয়া হতো। একই ধরনের ধ্যান-ধারণার আরো কিছু ছেলের সাথে তার খাতির হয়ে গেলো। প্রতিটি সরকারি স্কুলেই কিছু সংখ্যক আত্মসচেতন স্বাধীন চিন্তাশক্তিসম্পন্ন ছেলেপেলে থাকে। আর যুদ্ধপরবর্তী ওই বছরগুলোতে, ইংল্যান্ডে বিপ্লবী মতধারার মানুষের অভাব ছিলো না, সরকারি স্কুলগুলোতেও তার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিলো। তরুণরা, এমনকি যাদের যুদ্ধে যাওয়ার বয়সও হয়নি সেই বয়সী ছোটরা, তাদের চেয়ে বড়দের সাথে অসদাচরণ করতো। বাস্তবিক অর্থে যাদের মাথায় ঘিলু বলতে কিছু ছিলো তারা সে সময়ে বিপ্লবী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। অন্যদিকে বুড়োরা- যাদের বয়স ততদিনে ষাটের কোটায় পড়েছে তারা মুরগীর মতো আপন পরিধিতে চক্কর খেতো আর বিল্পবীদের গালমন্দ করতো। অন্যদিকে বিল্পবী মনোভাবাপন্ন গর্ডন ও তার বন্ধুরা তখন বেশ উত্তেজনার সময় পার করছিলো। একটি গোটা বছর তারা একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক মাসিক সংবাদপত্র প্রকাশ করছিলো- নাম ছিলো বলশেভিক। জেলিগ্রাফ পদ্ধতিতে কপি করা হতো সে সংবাদপত্র। এটি সমাজতন্ত্রের কথা বলতো, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র ভেঙ্গে দেওয়ার পক্ষে, সেনা, নৌ বাহিনী বিলুপ্তির পক্ষে জোর অবস্থান তুলে ধরা হতো। আর বলা হতো অবাধ প্রেমের কথা। মহা কৌতুক অনুভব করতো তারা এসব করতে। ষোলো বছর বয়সী প্রতিটি বুদ্ধিমান তরুণই একজন সমাজবাদী, এমনটাই মনে হতো তাদের। এটা এমন এক বয়স যখন শুধু আদারটাই দেখা যায়, ছনের কাঁটাওয়ালা বড়শিটা চোখে পড়ে না। অর্থ বা অর্থ থেকে উৎসারিত বিষয়গুলোতে একটা নিতান্তই বালসুলভভাবে বুঝতো সে। জীবনের সেই প্রথমদিকেই, অধিকাংশের চেয়ে স্বল্প বয়সে সে বুঝে নিয়েছিলো এই আধুনিক বাণিজ্যব্যবস্থা নিতান্তই ধান্ধাবাজি বৈ কিছু নয়। পাতাল স্টেশনগুলোতে ঝুলিয়ে রাখা বিজ্ঞাপণগুলোই তার ভেতরে এই ভাবনা পাকাপোক্ত করে তোলে। জীবনীকাররা যেমনটা বলেন, তেমন করেই সেও কি তখন জানতো একদিন এমন এক বিজ্ঞাপনী সংস্থাতেই তাকে কাজ করতে হবে। তবে বিষয়টি ওই ধাপ্পাবাজি ছাড়াও যে আরও কিছু, তা তাকে বুঝতে ওই কাজটাই সহায়তা করেছে। কারণ এরই মধ্য দিয়ে সে বুঝে নিয়েছে জীবনে অর্থ-পুজো করাটাই এখন সেরা ধর্মপালন। অর্থই ধর্ম, সবচেয়ে সেরা বাস্তব অনুভূত ধর্ম। অর্থই ইশ্বর। ভালো কিংবা মন্দের সকল অর্থই এখন সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে নিহিত। যা কিছু হচ্ছে তা নাকি সেই বহুল উচ্চারিত কথা ‘ভালোর জন্য’ হচ্ছে। মুসা নবীর দশ আদেশনামা এখন দুইয়ে নেমে এসেছে। একটি মালিকপক্ষের জন্য- অর্থপুজারিদের জন্য- ‘তুমি অর্থ বানাও’। অপরটি শ্রমিকের কিংবা নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য- যারা কৃতদাস ও অধঃস্তন- তুমি তোমার কাজটি হারিয়ো না।

বিজ্ঞাপন

এমনই একটি সময়ে তার হাতে পড়লো রবার্ট ট্রেসেলের সেই বিখ্যাত উপন্যাস দ্য র‌্যাগড ট্রাউজারড ফিলানথ্রোপিস্ট। এক ক্ষুধাপীড়িত কাঠমিস্ত্রির গল্প যার সবই গেছে ঋণে কিন্তু শতাবতী ফুলের গাছটিকে হারাতে চাননি কখনো। সেই থেকেই এই শতাবতী গর্ডনের জন্য একটি প্রতীক হয়ে রয়েছে। শতাবতী (অ্যাসপিডিস্ট্রা) ইংল্যান্ডের একটি ফুলের নাম। গর্ডনের ধারণা- তাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক সিংহের পরিবর্তে এই শতাবতী হলেই যথার্থ হতো। আর তার এও ধারণা যে ইংল্যান্ডের বাড়িগুলোর জানালাপথ দিয়ে যতদিন এই শতাবতীর লম্বা লম্বা পাতাগুলো ঝুলে থাকবে ততদিন বিপ্লব বলতে কিছু হবে না।

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন