বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ২ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘তরুণরা অনেক সাড়া দিচ্ছে কিন্তু এদেশে কোনও ভেন্যু নেই’

জুলাই ১, ২০১৯ | ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

জাহিদ-ই-হাসান, স্পোর্টস করেসপন্ডেন্ট

ভারতের মাটিতে আন্তর্জাতিক মোটরস্পোর্টসইভেন্ট ‘ভক্সওয়াগেন অ্যামিও কাপের ২০১৯: রেস টু’ জিতে দেশের প্রথম রেসিং ক্রীড়াবিদ হিসেবে বাংলাদেশকে শিরোপা এনে দিয়েছেন আভীক আনোয়ার। দেশের র‌্যালি চ্যাম্পিয়নশিপের হ্যাটট্রিক শিরোপাজয়ী এই রেসার এমন অর্জনে ভাসছেন প্রশংসায়। দেশের ক্রিকেটার থেকে ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন মহল থেকে পাচ্ছেন শুভেচ্ছা বার্তা।

বিজ্ঞাপন

রেসিং জীবনে প্রবেশের কাহিনী, দেশের রেসিং পরিবেশ, তরুণদের স্বপ্নসহ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের ভবিষ্যতসহ নানা বিষয় নিয়ে সারাবাংলাডটনেটকে একান্ত সাক্ষাৎকারে খুলে বলেছেন নারায়ণগঞ্জের এই সন্তান। 

সারাবাংলা: ভারতের জার্নিটা কেমন ছিল?
আভিক আনোয়ার: ভারতের জার্নিটা অনেক কঠিন ছিল। নতুন ট্র্যাক। একেবারে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে আমি শুরু করেছি। প্রথম রেসে (২০১৭ সাল) আমি ফোর্থ। অলমোস্ট থার্ড। একজন ভারতীয় আমাকে বারি দিয়ে থার্ড হতে দেয়নি। কিন্তু প্রথম রেসটা আমি ফোর্থ হিসেবে শেষ করি। তখন আমি বুঝতে পারি আমার প্রটেনশিয়াল আছে। প্রথম বছরে আমি ওভারল সপ্তম হিসেবে শেষ করি। দুই বছরে আমি কোনও পজিশনে যেতে পারিনি। এ বছর আমি চিন্তা করেছি কেন হয়নি। ফ্যাক্টরগুলো হচ্ছে আমার ড্রাইভিং কোচিং দরকার ছিল। আমি ড্রাইভার কোচিং নেই। সেকেন্ড ছিল ডিসট্রাকশন ফ্যাক্টরগুলো। কারণ ওখানে যাওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে ম্যাসেজ আসতো। চারটা বিজনেস তো আমার। নানান ধরনের ম্যাসেজ আসতে থাকে। রেসিং এমন একটা স্পোর্টস আপনার পুরো মনযোগ দরকার। ফুটবল বা ক্রিকেটে একটা পজিশনে অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ হঠাৎ দৌড়াতে হয়। কিন্তু রেসিংয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ফোকাস রাখতে হয়।

সারাবাংলা: পূর্ণ মনযোগ ধরে রাখলেন কীভাবে?
আভীক: আমি গিয়েই এবার মোবাইল অফ করে রেখেছিলাম। বাসায় মা-বাবা আর স্ত্রী ছিল। বলে দিয়েছিলাম- ইমার্জেন্সিতে হোটেলে ফোন দিবা। এবার সম্পূর্ণ ফোকাস ছিল। আমার টার্গেট ছিল। আমার জিততে হবে। আমার প্রমাণ করতে হবে। বাংলাদেশের মানচিত্রটা দুনিয়ার সামনে তুলে আনবো। লড়াইটা খুবই রিয়েল ছিল। কারণ গত বছরে আমার একটা এক্সিডেন্ট ছিল। তারপর আমার হাত ভেঙে গেছে। এই ইন্ডিয়ার রেসেই। তারপর আমি চশমা পড়ি। চশমাও খুবই হাই পাওয়ারের। মাইনাস ১১। এর মধ্যেও আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। যদি আমি পারি তাহলে সবাই পারবে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: রেসিং বাংলাদেশে সেভাবে জনপ্রিয় নয়। ক্রিকেট-ফুটবলের যুগে এ দেশে রেসিংকে বেছে নেয়ার কারণ বা কিভাবে আসা?

আভীক: জন্মের তিন-চার বছর থেকে আমি গাড়ি দেখেই বড় হচ্ছি। কারণ বাবার গাড়ির ব্যবসা। গাড়ি দেখেই যাচ্ছি। আসতে আসতে আগ্রহ বেড়েছে। ছেলে মানুষেরতো গাড়ির আগ্রহ আরও বেশি। ছোটবেলা থেকে চুরি করে করে গাড়ি চালানো শিখলাম। খুব অল্প বয়সেই গাড়ি চালানো শিখেছি। যখন আমার বয়স নয় বছর ছিল। তখন থেকে আগ্রহ আরও বেশি বাড়ে। মানুষ নরমাল রেসিং গেম খেলে। এনএফএস (নিড ফর স্পিড)। আমি খেলতাম গ্রান টুরিসমো স্পোর্ট। একদম প্রকৃত মোটর্স রেসিংয়ের মতোই। গেমটা খুবই কঠিন। গেমটা খেলতাম। খেলে খেলে ওখান থেকে দক্ষতা বাড়িয়ে স্কুলে যেতাম গাড়ি চালিয়ে আসতাম গাড়ি চালিয়ে। তারপর কানাডায় যাওয়ার পর নিজের টাকায় গাড়ি কিনে এই জগতে ঢুকি। ২০০৬ আমি কানাডায় যাই। অর্থনীতির উপরে আন্ডারগ্রেড মাস্টার্স করতে যাই। পড়তে চেয়েছিল মেকানিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং। গাড়ির উপর। কিন্তু আব্বু নিষেধ করলেন যে এ দেশে এটার ভবিষ্যত নেই। তারপর পড়ার সময় আমি টাকা জমিয়ে গাড়ি কিনি। তারপর দক্ষতা বাড়াতাম গাড়ি চালানোর। এভাবেই।

সারাবাংলা: আপনি টানা তিনবার বাংলাদেশে র‌্যালি চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছেন। দেশে এসে রেসিং প্রতিযোগিতায় ঢুকলেন কিভাবে?

আভীক: পড়াশুনা শেষ করে বাংলাদেশে চলে আসলাম ২০১২ সালের শেষের দিকে। তারপর গাড়ির বিজনেস শুরু করলাম। একটা ক্লাব শুরু করলাম আর থ্রি বি। তারপর বাংলাদেশে প্রথম র‌্যালি চ্যাম্পিয়নশিপ হলো। জিতলাম। ২০১৪ সালে। ২০১৪ সালে জেতাটা টাফ ছিল। কয়েক মিলি সেকেন্ডের জন্য জিতেছি। ২০১৫ সালে আরও হার্ড ছিল। স্পন্সর ছিল আরও বেশি। প্রেশার ছিল। ঠিক রেসের আগের দিন আমার পা ভেঙে যায়। আমার মা হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসককে বলেছেন, কালকে ওর রেস। আমি জানিনা কীভাবে করবেন। ও যাতে রেস করতে পারে। আমি এতোগুলো পেইনকিলার খেয়ে যখন রেস শেষ করি, মানুষ যখন অভিনন্দন দেয়ার জন্য তালুমর্দন করছিল আমার হাতে কোনও ফিলিংস ছিল না। ওইটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রেস জেতা ছিল। তৃতীয় বছরে কোনও কম্পিটিশন ছিল না। ২০১৬ সালে। ফাঁকা মাঠে মোটামুটি রেস জিতলাম। তারপর চিন্তা করলাম ইন্ডিয়ায় যাই। সেখানে গিয়ে বুঝলাম আমরা কত পিছিয়ে। ইন্ডিয়া অনেক এগিয়ে। ইন্ডিয়ায় কিন্তু ফরমুলা ওয়ানেও অংশ নেয় অনেক আগে থেকে। ২০০৭ সাল থেকে। সেখানে প্রমাণ করার দরকার ছিল যে বাংলাদেশ পিছিয়ে না। অবশেষে জিতি। এবং দেশের হয়ে প্রথম শিরোপা। আমার সমালোচকরা তখন চুপ হয়ে যায়। কারণ একটা কথা আছে- অ্যাকশন স্পিক লাউডার দ্যান ওয়ার্ডস।

সারাবাংলা: এই রেসে খেলতে নিশ্চয়ই ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়?
আভীক: কানাডার মন্ট্রিলে এফআই থেকে রেসিং ড্রাইভিং লাইসেন্স করেছি। ইন্ডিয়াতেও একটা করেছি। দুটা লাইসেন্স আছে আমার।

সারাবাংলা: এই রেসে আসার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কে দিয়েছিলেন?
আভীক: রেসিং অনুপ্রেরণা আসলে নিজের থেকেই। ফরমুলা ওয়ান দেখতাম প্রচুর। সেখান থেকে অনুপ্রেরণা পাই। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম লিজেন্ডদের রেস দেখে দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

সারাবাংলা: নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
আভীক: এ বছর আমার আরও আটটা রেস বাকী। সেগুলা প্রাথমিকভাবে শেষ করতে চাই। এ বছর রেসিং আছে মালয়শিয়ায়। ওটাতে অংশ নিতে চাই। মালয়শিয়ার মজার একটা রেস হয়। সেদেশে ১ হাজার কিলোমিটার রেস বলে। এক টানা এক হাজার কি.মি রেস করতে হয়। তিনটা ড্রাইভার দরকার। ভারতের তিনজন আমার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

সারাবাংলা: এতো বড় রেসের জন্য নিশ্চয়ই অনেক বেশি পরিশ্রম আর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন-
আভীক: অনেক বেশি পরিশ্রমের প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সেখানে ভালো কিছু করতে পারলে আসলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও একটা অনুপ্রেরণা হতে পারে। তারা ঝুঁকবে আরও বেশি। দেশের মানুষ আর প্রধানমন্ত্রী অনেক গর্ববোধ করবেন।

সারাবাংলা: দেশের তরুণদের জন্য রেসিংয়ে আসাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
আভীক: যদি তরুণদের স্টার্টিং হয়। তাহলে তারা ভালো সেট আর সিমুলেটর নিয়ে শুরু করতে পারে। সিমুলেটরই কিন্তু প্রথম ধাপ। তারপর বাকীটা। সিমুলেটর দিয়ে ভালো সুযোগ আছে অর্থ উপার্জনের। অনলাইনে অংশ নিয়ে ভালো উপার্জন করার ও শেখার সুযোগ আছে। কয়েকদিন আগে অনলাইনে প্রথম হয়ে বাস্তব জীবনে একজন রেস করেছে। পাকিস্তান থেকে নিয়ে গেছে।

সারাবাংলা: অনলাইনে না হয় খেলার সুযোগ হচ্ছে। দেশের প্রেক্ষাপটে কোনও ভেন্যু না থাকায় তরুণ রেসারদের জন্য খেলাটাকে বেছে নেয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং?
আভীক: বাংলাদেশে আসলে অনুশীলন করার কোনও জায়গা নেই। আশা করছি এমন অবকাঠামো তৈরি হবে। আশা করছি আমার এমন মাইলফলকের পর এটা হবে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করবো। আমার বন্ধুরা যারা স্কুলে আমরা একসাথে পড়েছি। তারা বিভিন্ন কোম্পানিতে সিইও হিসেবে আছে। তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারাও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে আগ্রহী। ভেন্যু নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহী যেখানে তরুণরা অনুশীলন করতে পারবে।

আভীক আনোয়ার

সারাবাংলা: ভেন্যু সংকটতো আছেই। তাছাড়া মোটর্স রেসিং খুবই ব্যয়বহুল খেলা। দেশের তরুণদের জন্য অর্থায়ন ছাড়া কীভাবে এই খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?
আভীক: প্রথম দুই বছর আমার স্পন্সর ছিল। এ বছর আমি ইচ্ছা করেই স্পন্সর নেই নাই। কারণ আমার নিজের প্রমাণ করার অনেক ইচ্ছা ছিল। এখন আমাকে স্পন্সরা রেসপন্স করছে। দেশের জন্য আসলে স্থানীয় একটা অবকাঠামো দরকার। তখন পৃষ্ঠপোষকরা আগ্রহী হবে। মানুষ এখন অনেক সচেতন। তরুণরা অনেক বেশি গাড়ি ফ্যাসিনেটেড। মেইন্টেন করে অনেক। আশা করি সচেতনতা বাড়বে।

সারাবাংলা: অনেক বছর ধরেই রেসিংয়ে আছেন। দেশের তরুণদের মাঝে কেমন সাড়া দেখতে পান?
ভাল সাড়াই দেখি। আসলে এই স্পোর্টসটা এমন ব্যয়বহুল যে গাড়ির পেছনেই অনেক টাকা ব্যয় করতে হবে। নেশা করার কোনও টাকা থাকবে না। অর্থাৎ মাদকমুক্ত থাকবে না। কারণ গাড়ির পেছনে সব টাকা ব্যয় করতে হবে।

সারাবাংলা: দেশে ভেন্যু স্থাপনসহ খেলাটাকে ছড়িয়ে দিয়ে সামনে কি প্রদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন মনে করছেন?
আভীক:সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারসহ দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আমিও এটা নিয়ে কাজ করছি। করতে চাই।

সারাবাংলা: এ দেশে রেসিংয়ের কোনও ফেডারেশনও নেই। পুরো দেশের তরুণদের কীভাবে ঐক্যতে আনবেন?
আভীক: হবে সবই হবে একসময়। আমরা চেষ্টা করলেই হবে।

সারাবাংলা: দেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আপনার সখ্য দেখা যায়। তারা কিভাবে আপনাকে অনুপ্রেরণা দেয়?
আভীক: ওরা অনেকটা প্রতিবেশির মতোই। গাড়ির ব্যবসা থেকেই পরিচয়। তামিম মাঝেমধ্যেই বলতো- জিতোস না খালি রেস করোস! আমি ইতিবাচক হিসেবেই নিতাম। আমি যখন রেস জিতি ইংল্যান্ড থেকে তামিম আমাকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছে। সব ক্রিকেটারদের বলেছে সে।

সারাবাংলা: শুভ কামনা রইলো। ধন্যবাদ

আভীক: আপনাকেও ধন্যবাদ

সারাবাংলা/জেএইচ

আরও পড়ুন

ভারতের বুকে বাংলাদেশের ঝাণ্ডা উড়ালেন আভীক

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন