সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ২৯ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘ছেলেডা ভাতের থালা রাইখে গেল, আজ চারদিন সে ভাত খায় না’

জুলাই ১, ২০১৯ | ৯:৩৪ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সকাল সাতটার মতো বাজে, শাহীন আমারে কইলো আম্মু ভাত দাও। কইলাম, তরকারি হয় নাই, একটু দেরি কর, ভাত দিচ্ছি। রাতে খাওয়ার পর কলপাড়ে থালা-চামুচ রাইখে এয়েছিলাম। ছেলেডা নিজেই কলপাড়ে গিয়ে একটা থালা আর চামুচ মাজিছে। মাজি এনে বলে, আম্মু। ভাতের হাড়ি সিদা করে দাও, ভাত নেব।

বিজ্ঞাপন

ছেলেডারে কইলাম, তরকরি তো নাই, কী দিয়ে খাবা? আগের দিনের তরকারিও তার পছন্দ আছিল না। পরে নিজেই শুকনা মরিচ কাঠিতে গাঁইথা নিল। সেই মরিচ চুলার আগুনে পোড়াইল। তারপর চুলার পরে থাকা ভাতের হাড়ি থেকে নিজেই ভাত নিলো, পোড়া মরিচ আর হলুদ গুঁড়া দিয়ে ভাত মাখাইলো। কিন্তু সেই ভাত এক লোকমা, কি দুই লোকমা মুখে দিছে ছেলেডা আমার। আর খাইতে পারে নাই, আর আইজ চারদিন ধইর‌্যা সে ভাত খায় না, কোনোদিন খেতে পারবে কি না জানি না। আপনাদের কই- ভ্যান, মোবাইল কিচ্ছু চাই না, কেবল আমার ছেলেডারে চাই, আল্লা যেন ওরে আমার বুকে ফেরাইয়া দেয়- বলেই কাঁদতে থাকেন খাদিজা।

গত ২৮ জুন বিকেলে যাত্রীবেশে কয়েকজন ছিনতাইকারী সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানার ধানদিয়ায় যাওয়ার কথা বলে কিশোর শাহীনের ভ্যানে ওঠে। শাহীন তাদের নিয়ে ধানদিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। এরপর ধানদিয়া গ্রামে পৌঁছালে এক পাটক্ষেতের পাশে দুর্বৃত্তরা শাহীনের মাথা কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। ছিনতাইকারী ভ্যানটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
পরে জ্ঞান ফিরে শাহীন কান্নাকাটি শুরু করলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে পাটকেলঘাটা থানায় খবর দেয়। এরপর পুলিশের সহায়তায় শাহীনকে খুলনার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

টানা ৩০ ঘণ্টা খুলনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরও অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় শনিবার তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. অসিত চন্দ্র সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘শাহীনের লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়েছে। আগের থেকে সে ভালো আছে। তবে তাকে আইসিইউতে আরও কয়েকদিন রাখা হবে।’

তিনি বলেন, ‘শাহীনের কিছুটা জ্ঞান ফিরেছে। সে আব্বা, আম্মা, আল্লাহ এই শব্দগুলো উচ্চারণ করছে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনতলার একটি ভিআইপি কেবিনে কথা হচ্ছিল শাহীনের মায়ের সঙ্গে। এতদিন তার দিন কেটেছে হাসপাতালের চারতলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনের জায়গায়। ছেলে ভেতরে আর তিনি বাইরে। কেবলই দুই হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন ছেলের যেন জ্ঞান ফেরে, ছেলে যেন তাকে মা বলে ডাকে, মাকে যেন জড়িয়ে ধরে।

কিন্তু সেখান থেকে তারা ভিআইপি কেবিনে এসেছেন রোববার (৩০ জুন) সন্ধ্যার দিকে। বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য এ ব্যবস্থা করেছেন। অনেক মানুষ আইছিল সবারে তো চিনি না। তাদের শতায়ু হোক- বলেই হাত তুললেন, মোনাজাত করলেন। মোনাজাত শেষে এ মায়ের আবার কান্নার দমক আসে, তিনি কাঁদেন, কাঁদেন তার সঙ্গে থাকা অন্য আত্মীয়রাও।

একসময় শান্ত হন খাদিজা। জানালেন তিন ছেলে- মেয়ে তার। ১৭ বছরের শাহীনরা তিন ভাই বোন। শাহীন বড়, তারপরেই ছোট দুই বোন। বাবা-মায়ের অভাবের সংসার। অন্যের দেওয়া পাঁচটি ছাগল, কয়েকটা মুরগি পেলে আর অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীরা কাজ করেন তিনি, এভাবেই চলে সংসার। আর ছিল ওই একটা ভ্যান-তা ভ্যানটারে তো নিয়াই নিল, ছেলেটা এখনও কথা কইতেছে না...। আবার থামে খাদিজা বেগমের কথা।

মা খাদিজা জানালেন, কেশবপুরের গোলাঘাটা দাখিল মাদরাসায় শাহীন সেভেনে পড়ে। এমনিতে কাজ করে না, ইচ্ছা হইলে যায়, না হইলে না যায়। কিন্তু সেদিন ভোর থেকেই ফোন দিচ্ছিল। এতবার ফোন দেওয়াতে ছেলেডা গেল, সকাল সাতটার দিকে, তারপর দুপুর বারোটার দিকে খবর পাই তারে নাকি কারা কোপাইছে। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কথা বলেন খাদিজা বেগম।

শাহীনের খালু রবিউল বাশার জানান, ছয়মাস আগে সমিতি থেকে টাকা তুলে এই ভ্যানের জন্য ব্যাটারি আর একটা মোবাইল কেনা হয়েছে শাহীনের জন্য। আর তখনি খাদিজা বেগম বলেন, ‘পোলাডা কেবল বলত, সবার ফোন আছে, আমার নাই। সমিতি থেকে টাকা তুলে এই ভ্যানের ব্যাটারির টাকা আর ওর ফোনটা কিনে দিছে ওর আব্বা।’

সেদিন কখন ছেলেকে দেখলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমারে তো প্রথমে দেখতে দেয় নাই, পরে দেখছি। প্রথমে কেশবপুর হাসপাতাল, পরে সাতক্ষীরা তারওপরে খুলনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় শাহীনকে। সেদিন শুক্রবার সময়মতো চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ করেন শাহীনের মা খাদিজা।’

তিনি বলেন, ‘সেদিন ছিল শুক্রবার, ডাক্তাররাও নাই। পরের দিন মাথা পরীক্ষা কইরে ওরে এখানে পাঠায়ে দেয়।’

রাস্তায় আপনার সঙ্গে কোনো কথা হয়েছিল কী না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তেমন কথা হয়নি, কেবল আবোল তাবোল বকতেছিল।’

কেবল বলল, ‘ওদেরকে আমি কইছি, আমারে মারিস নে, আমার সব নিয়ে নে, তবুও আমারে মারিস নে। ওরা কইছিল, তোর নিস্তার নেই, তোরে মাইরেই ফেলব।’

‘কিন্তু ভালো না হইলে তো কিছু বলা যাবি না। তবে আমার ছেলের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা নেই।’

খাদিজা আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটা সুস্থ হয়ে যাক। খাই আর না খাই সে পরের কথা আমার ছেলেডারে চাই। আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই।’

সারাবাংলা/জেএ/একে

আরও পড়ুন

লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়েছে, শাহীন ভালো আছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
শাহীনের পাশে দাঁড়ালেন ইসমাত আরা সাদেক
ভ্যানচালক শাহীনের অবস্থা উন্নতির দিকে: বিপ্লব বড়ুয়া
অস্ত্রোপচার শেষে নিবিড় পর্যবেক্ষণে অটোরিকশাচালক শাহীন
শাহীনের জন্য সব করল ছাত্রলীগ

 

বিজ্ঞাপন
যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে সরকারি কর্মকর্তাদের আহ্বান রাষ্ট্রপতিরভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হচ্ছেন গাঙ্গুলি!নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে নব্য জেএমবির দুই সদস্য আটকরাবি ভিসি-প্রো ভিসি’র পদত্যাগের দাবিতে আচার্যকে খোলা চিঠিবঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী: উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে বৈঠক‘বিভাজন ভুলে দেশের জন্য এক হয়ে কাজ করার শপথ নিন’বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হলেন শফিউল আলমচট্টগ্রামে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যুবলীগ নেতার মৃত্যু১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ২৩ নভেম্বর যুবলীগের সম্মেলনস্ত্রীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় মারধর-মামলা, জামিন পেলেন রহিম সব খবর...
বিজ্ঞাপন