সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ১ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

একটি গরুর রচনা

জুলাই ৬, ২০১৯ | ১২:০৯ অপরাহ্ণ

কিযী তাহনিন

সব কিছুতে ফার্স্ট, এক্কেবারে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। এমনই তার ধরণ, এই যেমন দৌড়ানোতে ফার্স্ট, খাওয়া দাওয়ায় ফার্স্ট, বিয়ে-শাদী, বাচ্চা-কাচ্চা, গাড়ি-বাড়িতে এক্কেবারে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। মানে আসলে যে ফার্স্ট হয় তা নয় ব্যাপারটা। ফার্স্ট হতে মন চায়, অনেক ফার্স্ট হতে, একেবারে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতে মন চায়। চেষ্টা-চরিত্রও করে অনেক তিনি।

বিজ্ঞাপন

তার নাম কুদ্দুস আলী। এই মহল্লার বিখ্যাত লোক। সবাই চেনে। রিকশা করে আশেপাশের বাড়িতে বা দক্ষিণ দিকের বাজারে যেতে চাইলে, কুদ্দুস আলীর বাড়ির ঐখানে বললেই হবে। রিকশাওয়ালা ঠিক ঠিক নিয়ে যাবে।

কুদ্দুস আলীর বাসার একটি বাসা পরে আমরা থাকি। মাঝের বাসা সুলতানা আপাদের। উনি গানের শিক্ষক। সকালে উঠে যে কি সুন্দর রেওয়াজ করে, রাগ তাল লয় তো বুঝিনা। কিন্তু বুঝি কাঁচভাঙা এক ঝনঝনে সুর, টুকরো ঝকঝকে কাঁচের টুকরোর মতন কিছু শব্দ ভেসে ভেসে আসে ‘জাগো মোহন পেয়ারে ... সুন্দর লাল হামারে।’

তো কুদ্দুস আলী কি আর থেমে থাকে। জিততে হবেনা? আমরা 'জাগো মোহন' এর মাঝে হঠাৎ শুনি 'আঁখ মারে'র' দাপাদাপি। কুদ্দুস আলী ভলিউম বাড়িয়ে গান ছাড়ে, 'আঁখ মারে ও আঁখ মারে'। সুলতানা আপার 'সুন্দর লাল হামারে', 'আঁখ মারের' ভারে চাপা পরে যায়। এমনি খিচুড়ি সুরের আমাদের সকাল। এমনই আমাদের কুদ্দুস আলী, প্রথম হতে যার অনেক ভালো লাগে।

সামনে ঈদ। কুরবানী ঈদ। যে যার সামর্থ অনুযায়ী আয়োজন করছে। কুদ্দুস আলী আছে মহা দাপটে। এবার সে সবচেয়ে বড় গরু কিনবেই। কিনবে কিনবেই। জিততে হবে। আর চারপাশে অতো আহামরি কোনো মানুষ বাসও করেনা যে তার সাথে টেক্কা দিতে পারে। কুদ্দুস আলী এই বাড়ি যায় ও বাড়ি যায়। হাসাহাসি করে। ‘কিরে তোরা কি ছাগল না গরু?’

বিজ্ঞাপন

‘কিরে তোদের গরু দেখি তোর মতনই হার জিরজিরে। অপেক্ষা কর আমারটা আসতেছে।’

মানুষজন একটু কষ্ট পায় কটু কথায়, কেউ বিরক্ত হয়। তাদের অতো সামর্থ্য নেই। তাই বলে এমন কটু কথা কেউ বলে? কিন্তু কি আর করা। ওসবে পাত্তা দেয়ার মানুষ কুদ্দুস আলী না। জিততে তাকে হবেই। তার গরু নাকি আসছে। আসছে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। পৌঁছাবে শিগগিরই। এমন গরু যা কেউ দেখেনি কখনো।

তো গরু এসে পৌঁছায় ঈদ এর দু'দিন আগে। বিদেশী অন্য রঙের মানুষ দেখতে আমাদের যেমন আগ্রহ, বিদেশী গরু দেখতে আগ্রহ তার চেয়ে কম নয় কিছু। ইয়া বড় ধবধবে সাদা উঁচু শিঙওয়ালা গরু দেখে তো আমরা তাজ্জব, মুগ্ধ। ছোট ছোট বাচ্চারা ঘাস, খড় সামনে নিয়ে খাওয়াতে যায়। কুদ্দুস আলী মাছি তাড়ানোর মতো করে তাদের সরিয়ে দেয়, ‘সর সর, ধারে কাছে আসবিনা আমার গরুর।’

তাই আমরা দূর থেকে দেখি। পরদিন যখন কুদ্দুস আলী বিদেশি গরুকে ঘাস খাওয়াতে মাঠে নিয়ে যায়। আমরা পিছে পিছে হাঁটি। গরু ঘাস খায়। কুদ্দুস আলী মুগ্ধ হয়ে দেখে। পেছনে দাঁড়িয়ে। আমরা তারও পিছনে দাঁড়িয়ে দেখি। দেখি যে, বিদেশ গরু হঠাৎ ঘাস খাওয়া বাদ দিয়ে ছুটে ছুটে সামনে দৌঁড়ায়। আচমকা আকস্মিকতায় তাজ্জব হয়ে, হালকা দম নিয়ে কুদ্দুস আলী তার পেছনে ছোটে। ছোটে ছোটে। পেছনে পেছনে আমরাও। হাত বাঁড়িয়ে লেজ ধরে। লেজ ধরে দেয় টান। গরু পালিয়ে যায়। হাতে থেকে যায় লেজ। গরুর লেজ।

গরুর লেজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বেচারা কুদ্দুস আলী। গরু হাওয়া। দাঁড়িয়েই থাকে কুদ্দুস আলী। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকি আমরা।

আর এদিকে পাশের গ্রামের বদ মহাজন তার লেজকাটা গরুর লেজকে শক্ত আঠা দিয়ে জুড়ে, কুদ্দুস আলীর কাছে চড়া দামে বেচে, শহরে গা ঢাকা দিয়েছে।

সেই ঘটনার পর, কুদ্দুস আলীর প্রথম হওয়ার তীব্র ইচ্ছেটা ফিকে হয়ে এসেছে। আর তার দরুন, আমাদের মহল্লায় বিনোদন খানিকটা কমে গেলেও, স্বস্তি ফিরে এসেছে।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন