শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বিকৃতি বাড়ছে কেন- সেটি আগে চিহ্নিত করুন!

জুলাই ৭, ২০১৯ | ৬:৪২ অপরাহ্ণ

দেশে যখন শিশু ধর্ষণ বেড়ে যায়, তখন আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে নানা কথা বলতে থাকি। এই যেমন, ধর্ষক কতটা নিষ্ঠুর, তাদের শাস্তি দিতে হবে, ক্রসফায়ারে মারতে হবে ইত্যাদি। আমরা আস্ফালন করি, যা স্বাভাবিক। কারণ, আমরা কেউই এই বিকৃতিকে মানতে পারি না।

বিজ্ঞাপন

এখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা সকলেই তো দেখছি শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে এতটা সোচ্চার, এতটা ঘৃণা করছি! তাহলে শিশুদের যারা ধর্ষণ করছে, তারা আসলে কারা?

এখন আমি যা বলবো, তা আপনাদের পছন্দ না হলেও এটিই সত্য যে, এইসব সোচ্চার, প্রতিবাদী লোকের ভেতরেও ধর্ষক এবং শিশু ধর্ষক লুকিয়ে আছে। হয়তো আপনার বাড়িতেই আছে। আপনি চিনতে পারছেন না।

পিডোফিলিয়া এক ধরণের বিকৃতি। উন্নত দেশে ধর্ষক এবং বিশেষ করে পিডোফাইলদের কঠিন শাস্তি দেয়া হয়। এবং শাস্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাবার পরও আজীবন তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির আওতায় থাকতে হয়। কারণ, পিডোফাইলদের বিশ্বাস নেই। এরা শাস্তি পাবার পরও জীবনের যেকোন সময় আবার একই কাজ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

যে লোকটি একজন শিশুর প্রতি যৌনকামনা বোধ করে এবং তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কামনা চরিতার্থ করে, তাকে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ভাবার কোন কারণ নেই। সে অস্বাভাবিক এবং একই সাথে ভয়ংকর রকম অপরাধী। যে কোন সভ্য রাষ্ট্রে তাদেরকে চিহ্নিত ও পৃথক করে ফেলা হয়। অথচ আমাদের দেশে প্রকাশ্যে পিডোফাইলরা ঘুরে বেড়ায়। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি।

পিডোফাইলদের রুখতে বাবা-মাকে সচেতন হতে বলা হয়। হ্যাঁ, সচেতন হতে হবে বৈকি। কিন্তু একজন শিশুকে পিডোফাইলের ভয়ে ঘরে আটকে রাখবোই বা কেন? তার মনে শৈশবেই যে চিন্তার বোঝা আমরা চাপিয়ে দিতে বাধ্য হই, সেটি কি আমাদের শিশুদের প্রাপ্য?

জানি, এসব বলে লাভ নাই। পিডোফাইলদের হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বহু কিছুই করতে হবে। সন্তানকে ব্যাড টাচ, গুড টাচ শেখাতে হবে। চোখের আড়াল করা যাবে না। পাশের বাড়িতে খেলতে পাঠানো যাবে না। লিফট বা সিঁড়ি দিয়ে একা উঠতে দেয়া যাবে না। নিজের বাড়িতেও শিশু থাকবে বন্দী, খাঁচার ভেতরে। তার শৈশব আমরা চুরি করে নেবো বিকৃত কিছু লোকের ভয়ে। আমাদের তো আর কিছু করার নাই।

ধর্ষণ নিয়ে এটা আমার কততম লেখা, কে জানে! সম্ভবত ধর্ষণ নিয়েই আমাকে সবচেয়ে বেশি লিখতে হয়েছে। তবু ধর্ষণ কি কমেছে?

ধর্ষণ কমে নাই।

বাবা মায়েরা এখন আগের চেয়ে সচেতন। বাচ্চাকে আগলে রাখে। তাহলে?

ধর্ষণ কমেছে?

না, কমে নাই। বরং দিন দিন ধর্ষণ বাড়ছে। শিশু ধর্ষণ বাড়ছে আরো বেশি। কারণ শিশুদের ধরে নিয়ে যাওয়া সহজ। ওদের মুখ চেপে ধরে ধর্ষণ করা সহজ। ওদের ধর্ষণের পর মেরে ফেলতে সময় কম লাগে।

ছয় মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণের শিকার, ১৬ জনের মৃত্যু

রাষ্ট্র ধর্ষকদের নিয়ে কী চিন্তাভাবনা করছে, আমি জানি না। সারা দেশে কয়টা ধর্ষণের মামলার দ্রুত তদন্ত ও বিচার শেষে ধর্ষকের উপযুক্ত শাস্তি হয়, সেই হিসাব দেখলে বিবমিষা জাগবে। এখন শুধু মেয়ে শিশু না, ছেলে শিশুদেরও ধর্ষণ করা হচ্ছে, প্রকাশ্যে, মাদ্রাসায়। অথচ মুখে কুলুপ এঁটে আছে সব!

সমাজে ধর্ষণ ঠেকাতে উপযুক্ত আইন ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে তো বটেই। তার চেয়ে বেশি জরুরি সমাজের বিকৃতির জায়গাটিকে চিহ্নিত করা। যৌন বিকৃতি কেন এমন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে, তার কারণ অনুসন্ধান। অনেক দ্রুত কাজগুলো করতে হবে। সমাজের এই অসুস্থ কামার্ত মনস্তত্বের মূল কারণ নির্দিষ্ট করে এর পেছনের গলদটা আবিষ্কার করতে হবে। এটি সবচেয়ে জরুরি। এটি না করে শুধু শাস্তি দিয়ে, ক্রসফায়ার করে, কিংবা শিশুদের বন্দী করে রেখে কোন লাভ হবে না।

আমরা অত্যন্ত জটিল একটা সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। পুরুষের ভেতরের বিকৃতি বাড়ছে। ঘরে বাইরে অনলাইনে রাস্তাঘাটে যেখানে পারছে এক শ্রেণির পুরুষ সেখানেই বিকৃত আচরণ করছে।

আমাদের সমস্যাটা আসলে কোথায়? শিক্ষা ব্যবস্থায়? নৈতিকতা নির্মানে? ধর্মীয় কুসংস্কারে? ভারসাম্যহীন উন্নয়নে, সামাজিক অস্থিরতায়? মাদকদ্রব্যের বিস্তারে? নাকি স্রেফ আইনের শাসনের অভাবেই এসব ঘটছে? নাকি এর সবগুলোই নিয়ামক হিসেবে সমান হারে কাজ করছে!

ভাবতে হবে। চিহ্নিত করতে হবে। এবং অবশ্যই খুব দ্রুততার সাথে। সময় নষ্ট করবার সময়ও আর আমাদের হাতে নেই।

 

সারাবাংলা/আরএফ

 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন