রবিবার ২১ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৬ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

স্টপ রেপিজম

জুলাই ৭, ২০১৯ | ৮:০৩ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

টেলিভিশন বুলেটিনে ৩০ মিনিটের চাংকে এখন প্রায় প্রথম দশ মিনিটই ধর্ষণ সংস্কৃতির খবর। পত্রিকার প্রথম পাতা আজ রক্তাক্ত। শুধু ধর্ষণ নয়, ধর্ষণের পর বিভৎস কায়দায় খুনেরও খবর। নারী নয়, শিশুরাই হচ্ছে বেশি ধর্ষণের শিকার। পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে গত ছয় মাসে শুধু শিশু ধর্ষিত হয়েছে ৪০০।

রিয়া মারুফ নামের এক নারী ফেসবুকে তার ছোট বেলার কথা লিখতে গিয়ে বলেছেন, খেলতে খেলতে বাড়ি থেকে কত দূরে চলে যেতেন তারা। জঙ্গলে সাপের ভয় ছিল, কিন্তু কখনও পুরুষের ভয় করেনি। এখন পুরুষ সাপের চেয়েও বড় এক আতঙ্কের নাম। পুরুষের কারণে নারী, শিশু ঘরে, বাইরে কেউ কোথাও নিরাপদ নয়।

ধর্ষণে আমরা কি এখন বিশ্বে এক নম্বরে? পরিসংখ্যান দিয়ে না হলেও আতঙ্কের মানদণ্ডেতো বটেই। অনেকেই বলবেন ধর্ষণ-সহ নির্যাতনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে কি না, সে প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে হবে, কারণ ধর্ষণ সবসময়ই ছিল, এখন আগের চেয়ে প্রকাশিত হচ্ছে বেশি। সেই তর্ক চলবে, কিন্তু আমাদের শাসক সমাজ, আমাদের সমাজ চিন্তকরা বলুক, আমাদের সমাজে হঠাৎ কি এমন খামতি দেখা দিল যা নারী ও শিশুদের বিপদ বাড়াচ্ছে?

দুই বছর, আড়াই বছর, ছয় বা আট বছরের শিশু কেউ বাদ যাচ্ছেনা ধর্ষণ থেকে। মাদ্রাসায় ছেলেরাও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। এখন যারা ধর্ষণ করে তারা ধর্ষণ করাটা অন্যায় জেনেই ধর্ষণ করে। তারা ধরে নেয় কিছুই হবেনা তাদের। বিক্ষুব্ধ মানুষ বলছে ধর্ষণের সমাধান দুটো – হয় মৃত্যুদণ্ড, নয় পুরুষাঙ্গ-কর্তন। কি ধরণের শাস্তির বিধান হলে ধর্ষণ কমবে জানা নেই, তবে এটুকু বলা যায় এই সমাজে শিশু বা প্রাপ্ত বয়স্ক সব ধর্ষণই বহাল তবিয়তে চলে, কারণ এই দেশের বেশির ভাগ পুরুষ মেয়েদের ভোগের বস্তু বা নিচু জীব হিসেবে বিচার করে।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ পুরুষের জোর, তার পেশির জোর, তার পুরুষাঙ্গের জোর। তাহলে ধর্ষণ বন্ধ হবে কবে? উত্তর খুব সোজা – যে দিন পুরুষ ধর্ষণ করা বন্ধ করবে সেদিন বন্ধ হবে ধর্ষণ। কিন্তু দু:খনজনক হলো পুরুষতো সম্মিলিত ভাবে এই সিদ্ধান্ত কখনও নিবেনা।

রেপিজম বা ধর্ষণবাদ বা ধর্ষণ সংস্কৃতি বন্ধের তাহলে উপায় কী? পিডোফাইল রোগের কথা আমরা জানি। শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ। বাল্য বিবাহ হলো সেই রোগ। শত চেষ্টায়ও দেশজুড়ে বন্ধ করা যাচ্ছেনা বাল্য বিবাহ। শিশু-ধর্ষক মানসিক রোগী। এদের মানসিক দিকটা জানার চেষ্টা করা হোক। শিশু-পর্নো বন্ধ করা প্রয়োজন, কারণ এ সব পর্নো অনেককে শিশু-ধর্ষণে উৎসাহিত করে।

ভাবতে হবে আমাদের নগর সংস্কৃতি নিয়ে। রাস্তাঘাটে মেয়েদের যৌন হয়রানি করা এক স্বাভাবিক সংস্কৃতি এই দেশে। এটা বন্ধের জন্য নাগরিকদের আচরণে কি ধরণের পরিবর্তন আনা যায় ভেবে দেখা দরকার।

অফিসে, আদালতে দোকানপাটে নারীদের যৌন হয়রানি বন্ধ করার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হল বেশি করে নারীদের শিক্ষিত করা, বড় বড় পদে তাদের জায়গা নিশ্চিত করা। মেয়েদের যত বেশি শিক্ষিত হবে, স্বনির্ভর হবে ততই কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে সভ্যতার পথে এগুবে সমাজ।

বড় একটি জায়গা আমাদের পাঠ্যপুস্তক। করো। স্কুলের শুরু থেকেই নারীপুরুষের সমানাধিকারের শিক্ষা পাঠ্যপুস্তকে থাকতে হবে। সাম্প্রদায়িক শিক্ষার পরিবর্তে উদারনৈতিক শিক্ষা পেলে শিশুরা মানুষকে মর্যাদা দিতে শিখবে। শিশুরা ভাল শিক্ষা আর ভাল পরিবেশ পেলে মানুষ ভাল হয়।

সমাজ থেকে সহিংসতা, ঘৃণা দূর করা না গেলে তারও প্রভাব পড়ে মানুষের আচরণে। দেখা যায় বেশিরভাগ ধর্ষকরেই শৈশব ভাল ছিলনা। ভাল শিক্ষাদীক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। হিংসা, মারামারি দেখতে দেখতে, ঘৃণা দেখতে দেখতে, পৌরুষিক পাষণ্ডতাকে ক্ষমতা বলে মনে করতে শুরু করে এরা।

সরকারের ভূমিকা আছে, তবে রাজনীতির ভূমিকা তার চেয়েও বড়। রাজনীতির মদত না থাকলে নারীপাচার, পণহত্যা, ধর্ষণ চলতে পারে না এত ব্যাপক হারে। রাজনীতির সেই মুখ বদলাতে রাজনীতিকদের ভূমিকা কোথায়? নারী নির্যাতনকারী হিসেবে বা ধর্ষণের সামান্যতম অভিযোগও যার বিরুদ্ধে আছে সে যেন কোন দলে স্থান না পায়। আমরা বরং উল্টোটা দেখি। কেন্দ্র বা প্রান্ত, সব জায়গায় অন্যসব অপরাধীর মত নারী নির্যাতনকারী ও ধর্ষকরাও রাজনৈতিক দল, ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী থেকে আশ্রয়, প্রশ্রয় পায়।

দেশকে ধর্ষণমুক্ত করতে গেলে সরকারকে প্রচুর কাজ করতে হয়। ধর্ষককে ক্রস ফায়ারে মেরে ফেলার মতো সহজ কাজ আর কিছু নেই। জনগণও খুশি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে একটা সমস্যাকে ভাল করে ধামাচাপা দেয়া যায়। কিন্তু এতে করে অপরাধীর পেছনের ইন্ধনদাতারা বেঁচে যায়। ধর্ষকের শাস্তি চাই, কঠিন শাস্তি চাই। কিন্তু সমাজকে সবার জন্য নিরাপদ করার কাজটা কিভাবে করা যাবে সেই কাজটি চাই সরকার থেকে। নারী ও শিশুরা যে নিজেদের ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে পারে না, সেই ক্ষমতাহীনতার উপর বাংলাদেশের সমাজ-সংসার দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘরে-বাইরে নির্যাতন সেই সমাজব্যবস্থা ক্ষমতা-কাঠামোর বুনিয়াদ কিনা সরকার ভেবে দেখুক। ধর্ষণের আইন বদলে, প্রশাসনের নিয়ম-কানুনে মেয়েদের জায়গা করে দিয়ে, পুলিশের আচরণবিধিতে রদবদল এনে আমাদের প্রমাণ করতে হবে এই দেশ নারী ও শিশুদেরও দেশ।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, এডিটর ইন চিফ, সারাবাংলা ও জিটিভি

সারাবাংলা/এমএম

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন