মঙ্গলবার ২৩ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৮ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আপনি কি একজন ধর্ষক?

জুলাই ৯, ২০১৯ | ৪:০৮ অপরাহ্ণ

সেটি ১৯৭৬ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেয়ারমন্ট গ্রাজুয়েট ইউনিভার্সিটির এক পিএইচডি গবেষক সংবাদপত্রে একটি ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন ছাপালেন। বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিলো এমন:

আপনি কি একজন ধর্ষক? তাহলে একজন গবেষক আপনার নাম পরিচয় গোপন রেখে সাক্ষাৎকার নিতে চায়। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যেকোনও সময় কল করুন ২১৩ নম্বরে।

ফোন বাজবে এমন দুরাশাটুকুও মনে স্থান না দিয়ে পরের দিন গবেষক বসলেন ফোন সেটের সামনে। কিন্তু বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে অন্তত শ’ দুয়েক ফোন কল পেয়েছিলেন গবেষক স্যামুয়েল ডি স্মিথিম্যান।
২০১৭’র অক্টোবরে স্মিথিম্যানের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ধর্ষকদের সঙ্গে কথা বলার যে অভিজ্ঞতা গবেষকের হয়েছিলো সেগুলো উঠে আসে ওই নিবন্ধে।

বলছিলেন, ‘একজন ফোন করলেন, পেশায় কম্পিউটার প্রোগ্রামার। তিনি ধর্ষণ করেছেন গার্লফ্রেন্ডকে। একজন পেইন্টার ধর্ষণ করেছেন তার এক পরিচিতের স্ত্রীকে। স্কুলের এক নিরপত্তা রক্ষী জানিয়েছিলেন তার শিকারে পরিণত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন নারী। বয়সভেদের সে তালিকায় নাকি বেভারলি হিলসের ধনী তরুণীরাও ছিলো।’

বিজ্ঞাপন

এভাবে একে একে ৫০ জন ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নিলেন ড. স্মিথিম্যান। যা ছিলো তার পিএইচডি গবেষণাপত্রের মূল অংশ। তবে এই সাক্ষাৎকারগুলো নিতে গিয়ে তিনি জানলেন, এই ধর্ষকরা ভোগে না এতটুকু মনঃপীড়ায়। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে তারা তাদের কুকর্মের বর্ণনা দিয়ে যায়। আর এই ধর্ষকদের তালিকায় রয়েছে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণ সামনে আনেন এই গবেষক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্ষণ নামের যে ভয়াবহ সামাজিক অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাতে ধর্ষকদের এই চেহারাটিই ফুটে ওঠে। তবে ড. স্মিথিম্যানের গবেষণায় শিশু ধর্ষণের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এদেশে পাঁচ বছরের শিশু থেকে শুরু করে সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধাকেও শিকার হতে হচ্ছে এই নির্মম পাশবিকতার।

আর প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার পর যেগুলো জানাজানি হয়ে যায়, এবং ধর্ষক ধৃত হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ যে বয়ান সামনে আনে তাতে ধর্ষকদের একই চেহারা দেখা যায়। তাদের নেই কোনও অনুতাপ, নেই অপরাধবোধ। এরা ধর্ষক, স্রেফ ধর্ষক। ঘরে আটকে রেখে বছরের পর বছর ধর্ষণ করা, কোনও শিশুকে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করা, স্কুল কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ, এমনকি বাবার ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মেয়ে, অপরাধবোধ কাজ করলে এমনটা কখনোই ঘটতে পারে না।

অতি সম্প্রতি হ্যাশট্যাগ #মিটু নামে যে আন্দোলন গোটা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো তাতে মেয়েরা তাদের জীবনের নানা সময়ে কোনও না কোনও পুরুষের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তা প্রকাশ করছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এসময়ও যাদের মুখোশ খুলে যাচ্ছিলো তাদের সাথে ড. স্মিথিম্যানের গবেষণায় উঠে আসা ধর্ষকদের খুব মিল পাওয়া যায়। এই ধর্ষকেরাও সমাজে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়ান। #মিটু তাদের ধর্ষকামী চেহারাগুলো সামনে আনে। তবে আগে ধর্ষকদের কিছুটা হলেও বর্ণ, শ্রেণি ও বৈবাহিক অবস্থা দিয়ে আলাদা করা যেতো। এখন শিক্ষক, চিকিৎসক, ভাই, বাবা, বন্ধু, প্রতিবেশি, আত্মীয় সকলেরই ধর্ষকের চেহারা উন্মোচিত।

কে ধর্ষকামী তা তাদের চেহারা দেখে বুঝে নেওয়া যাবে এমন কোনও পথ এখনো জানা যায়নি। সে কারণে ধর্ষকরা আমাদের মাঝেই বসবাস করে, ঘোরে ফেরে খায় দায়, স্ত্রী সঙ্গম করে। আর সুযোগ বুঝে নিজের মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। অথবা পাশের বাসার ছোট্ট শিশুটিকে শিকারে পরিণত করে।

গবেষকরা তাই ধর্ষকামীকে চিহ্নিত করার ওপরই জোর দিচ্ছেন। তারা বলছেন, এ ধরণের সহিংসতার মনস্তত্ত্বটি বুঝে নিতে পারলে হয়তো কিছুটা সমাধান মিলবে।

কীভাবে চেনা যাবে? নুসরাত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার সময় আমরা এক মাদ্রাসা প্রিন্সিপ্যালকে হয়তো চিনেছি, কিন্তু আমরা কী আদৌ জানতে পারতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীটির কথা, যে নুসরাতের সুন্দর চেহারার ছবিটি দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, এমন সুন্দর মেয়েকে দেখে ধর্ষণ করতে ইচ্ছা করে!!!

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সমাজ ধর্ষণকে স্রেফ মেয়েদের ইস্যু হিসেবেই দেখতেই অভ্যস্ত। অথচ ধর্ষণকারী একজন পুরুষ। সুতরাং একে সমাজের ইস্যু হিসেবে, নারী-পুরুষ সকলের ইস্যু হিসেবে দেখতে হবে। সোমবার (০৮ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে যখন একটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন বলছিলেন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে পুরুষদের আওয়াজ তুলতে হবে। সেটাই বোধ হয় সবচেয়ে কার্যকর পথ।

পুরুষ ধর্ষণকে কতটা নিজের ইস্যু হিসেবে দেখবে- সেটা ব্যক্তি পুরুষের ওপর নির্ভর করে। সার্বিকভাবে সমাজ এ ব্যাপারে যে প্রস্তুত নয়, তা আমরা যে কোনও ধর্ষণের ঘটনার পরপরই টের পাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে কিছুটা আওয়াজ ওঠে বটে, তবে সেই একই মিডিয়ার কল্যাণে আমরা কিছু ভিন্ন ন্যাক্কারজনক চিত্রও দেখতে পাই। সুন্দরীকে ধর্ষণ করাই যায়, এমন কথা সামাজিক মাধ্যমে লেখার মতো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমাদের যেমনি রয়েছে, তেমনি ধর্ষণের ঘটনায় মেয়েটির কতটা দোষ, তার পোশাক কতটা কারণ হিসেবে কাজ করেছে, মেয়েটি কেনো এটা করলো, কেনো সে ওটা করলো, কেনো সে লেখাপড়া করতে গেলো, কেনো সে ঘরের বাইরে গেলো এসব অবান্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসার জন্য তৎপর থাকে এই সমাজের একটি অংশ। আর গবেষণালব্দ সত্য না হলেও- বলাই যায় এই অংশটি এখনো সমাজের বৃহদাংশ।

বাংলাদেশে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা কি হয়েছে তা খুব জানা নেই, এখানে ধর্ষণের হিসাব রাখা হয় সংবাদমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে আর ছয় মাস বছরে তার একটি যোগফল প্রকাশ করা হয়, সেটুকুই গবেষণা কিংবা জরিপ। তবে আন্তর্জাতিকভাবে যেসব গবেষণা হয়, তাতেও ধর্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনে ওই সব কথাই সামনে আনতে দেখা যায়। মেয়েটির পোশাক খারাপ ছিলো, মেয়েটিই আমাকে উৎসাহিত করেছে এমনটা করতে- এমন সব কথা অনেকেই বলেন কিংবা বলার চেষ্টা করেন। কেউ কেউতো এমনটাও বলে ফেলে- সে ধর্ষণ করেছে কারণ মেয়েটিই ধর্ষিত হতে চেয়েছে।

ধর্ষকামীতা কারো অন্তর্গত আচরণেরই প্রকাশ নাকি স্রেফ পরিবেশ পরিস্থিতিগত সুযোগ নেয়া সে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে গবেষকদের মধ্যে। একজন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি ড. স্মিথিম্যানের খুঁজে পাওয়া সেই নিরাপত্তা কর্মীর মতো দশ পনেরোটি ধর্ষণ করে গর্বভরে তার ঘোষণা দেয়। আবার কেউ কেউ হয়তো সুযোগ পেয়ে গোটা জীবনে একটি কিংবা দুটি ধর্ষণেই ক্ষান্ত থাকে। অধিকাংশ গবেষকের মতে, ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর দুইয়ের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করা যায় না। দুজনই ধর্ষকামী, কিংবা ধর্ষণকারী। তবে এই দ্বিতীয় শ্রেণির অর্থাৎ সুযোগ বুঝে কোনও মেয়েকে শিকারে পরিণত করা আর এক দু’বার ধর্ষণের ঘটনা ঘটানো পুরুষের সংখ্যা এখন বাড়ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা সিরিয়াল ধর্ষক না হলেও ধর্ষক। আর এমন ধর্ষকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

আরেকটি কথা মদ্যপান, মাদক সেবন, পর্নোগ্রাফি, এসবকে ধর্ষণের কারণ হিসেবে দেখে আসা হয়েছে সবসময়। গবেষকরা একে ‘রেপ মিথ’ বলেই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা এখন কতটা সত্য সে প্রশ্ন সামনে আসে- যখন আমরা দেখি মাদ্রাসা প্রিন্সিপ্যাল, যিনি হারাম জ্ঞান করে জীবনে কখনো মদ চেখে দেখা তো দূরের কথা, ছুঁয়েও হয়তো দেখেন নি, অথচ হাত-পা টেপানোর নাম করে ছাত্রীদের ডেকে ধর্ষণ করেছেন দিনের পর দিন।

সুতরাং ধর্ষক কে? তা চেনা দায়। একমাত্র ধর্ষক বা একজন ধর্ষকামী নিজে যদি তা স্বীকার না করেন। তাহলে স্যামুয়েল ডি স্মিথিম্যানের মতো একটি ঘোষণা এখনো দেওয়া যায়-

আপনি কি একজন ধর্ষক? তাহলে আপনার নাম পরিচয় গোপন রেখে আমরা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যেকোনও সময় কল করুন ০১৭৬৬৬৮৮১১০ এই নম্বরে।

– মাহমুদ মেনন, নির্বাহী সম্পাদক, সারাবাংলা.নেট

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন