সোমবার ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

শিক্ষক লাঞ্ছনা: ‘অপরাধ’ ২১ জনের, শাস্তি পেল ৪ জন

জুলাই ১১, ২০১৯ | ২:৩৮ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: প্রবীণ অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদকে কেরোসিন ঢেলে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ২১ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও মাত্র চারজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে দায় সেরেছে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চারজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা কমিটি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চারজনের অপরাধ পেলেও পুলিশ এখনো ঘটনার পর গ্রেফতার হওয়া একজনের মধ্যেই আটকে আছে। এতে শিক্ষকের গায়ে কেরোসিন ঢেলে হত্যাচেষ্টার মতো একটি গুরুতর অপরাধের তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ ইউএসটিসি’র অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও চার ছাত্রের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা প্রত্যাখান করেছেন। তিনি বলেছেন, এই তদন্ত অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ‘খুশি করার’ তদন্ত। পুলিশের ভূমিকায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই শিক্ষক।

গত ২ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে নগরীর খুলশীতে ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) ইংরেজি বিভাগের উপদেষ্টা অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদকে অফিস থেকে টেনে বের করে রাস্তায় নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে লাঞ্ছিত করে একদল শিক্ষার্থী। এরপর ওই শিক্ষার্থীরাই আবার নগরীর খুলশীতে ইউএসটিসি ক্যাম্পাসের সামনে প্রায় একঘন্টা ধরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনার পর পুলিশ ইউএসটিসি’র ক্যাম্পাস থেকে মাহমুদুল হাসানকে আটক করে। রাতে ইউএসটিসি’র ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দিলীপ কুমার বড়ুয়া বাদি হয়ে নগরীর খুলশী থানায় ‘কেরোসিন ঢেলে শিক্ষককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে’ মামলা দায়ের করেন। মামলায় শুধুমাত্র মাহমুদুলকে আসামি করা হয়।

এছাড়া ঘটনা তদন্তে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত ৮ জুলাই ইউএসটিসি’র উপাচার্যের কাছে ঘটনায় চারজন জড়িত মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করে। ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির সভায় চার ছাত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএসটিসি’র প্রক্টর কাজী নুর-ই-আলম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গ্রেফতার হওয়া মাহমুদুল হাসানকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। মো. শেখ রাসেল শাহেন শাহ, মো. মইনুল আলম এবং মোহাম্মদ আলী হোসাইন নামে তিন ছাত্রকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ও দিয়েছে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ।

এদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণী, শেখ রাসেল একই বিভাগের সপ্তম সেমিস্টার এবং মইনুল ও আলী স্নাতকোত্তর শ্রেণীর দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র।

অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ শুধুমাত্র চার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ইউএসটিসি প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে এই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি ঘটনার শিকার হিসেবে আমার বক্তব্য নিয়েছিল। আমি সুনির্দিষ্টভাবে ২১ জনের নাম তাদের বলেছিলাম, যারা অতীতে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছিল। যেসব মেয়েরা আমার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মতো অসত্য অভিযোগ এনেছিল, যারা কোনোদিন আমার ক্লাসও করেনি, সেই মেয়েগুলোর বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হল না। তারাই তো পরে আমাকে অপমান করেছে। ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হল না। এই তদন্ত আমি প্রত্যাখান করছি। এটা আমাকে অপমান করার সঙ্গে জড়িত ছাত্রছাত্রীদের খুশি করার তদন্ত।’

২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চারজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর সিদ্দিকী বলেন, ‘চারজনের বাইরে কারও বিরুদ্ধে সেভাবে ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটি চারজনকেই শনাক্ত করেছে। ছাত্রছাত্রীরা তো এদেশের নাগরিক। তারা তো মত প্রকাশের অধিকার রাখেন। সুনির্দিষ্ট তথ্য না পেলে, মতপ্রকাশের জন্য তো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এছাড়া পুলিশ তদন্ত করছে। প্রমাণ পেলে তারা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে।’

ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও হতাশা আছে মাসুদ মাহমুদের মধ্যে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভিকটিম হিসেবে গত ৯ দিনে পুলিশ আমার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য নেয়নি। আমি নিজ থেকে তাদের বলেছি- ঘটনার সঙ্গে ২১ জন জড়িত। তাদের নামও বলেছি। কিন্তু পুলিশ একজনকে গ্রেফতারের পর আর কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

ঘটনার ৯ দিন পরও মাত্র একজন গ্রেফতার নিয়ে জানতে চাইলে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রনব চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘একজনকে আমরা তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ইউএসটিসি’র ভিসি’র সামনে থেকে গ্রেফতার করেছি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে- ঘটনা সে একাই ঘটিয়েছে। তবে আন্দোলনে তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। আমরা তার দেওয়া তথ্য যাচাইবাছাই করছি। আর ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ তাদের তদন্তে আরও কেউ যদি জড়িত থাকার তথ্য পায়, সেটা আমাদের জানানো উচিৎ। আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে লাঞ্ছনার পর ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষের ভূমিকার ক্ষোভ প্রকাশ করে অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ জানিয়েছেন, তিনি আর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিচ্ছেন না।

‘আমি একজন শিক্ষক। পড়ানোই আমার একমাত্র কাজ। আমার কাছে সম্মান অনেক বড় বিষয়। যাদের কাছে শিক্ষকের সম্মানের গুরুত্ব নেই, তাদের প্রতিষ্ঠানে আমি যেতে পারি না। ঘটনার পর থেকে ভিসি, বোর্ড অব ট্রাস্টের চেয়ারম্যান, রেজিস্ট্রার- কেউই ঘটনার পর আমার সঙ্গে একবারও যোগাযোগ করেননি। আমাকে সামান্যতম সহানুভূতি দেখানোর সৌজন্যতাটুকুও উনারা দেখাতে পারলেন না। সেই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমি আর কী করব ?’ বলেন মাসুদ মাহমুদ

ইউএসটিসি’র প্রক্টর কাজী সিদ্দিকী অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের এই সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত উল্লেখ করে এই বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই বলে জানিয়েছেন।

টানা ৪০ বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ তিনবছর আগে ইউএসটিসিতে যোগ দেন।

ইংরেজি সাহিত্যের কোর্স কারিকুলামের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি কবিতা পড়াতে গিয়ে নারী-পুরুষের জৈবিক সম্পর্ক, বিভিন্ন শারীরিক প্রক্রিয়া, পোশাক নিয়ে ক্লাসে নিয়মিত আলোচনা করেন শিক্ষক মাসুদ মাহমুদ। সেসব বিষয়কে যৌন হয়রানি হিসেবে অভিযোগ তুলে ইউএসটিসি’র একদল শিক্ষার্থী গত এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী- যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারীরাই মাসুদ মাহমুদকে হেনস্থা করেছেন।

শুরু থেকেই মাসুদ মাহমুদ দাবি করে আসছেন- ইংরেজি বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কয়েকজন শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করেন। এরপর তাদের ইন্ধনে শিক্ষার্থীদের একাংশ একের পর এক অভিযোগ তুলতে থাকেন।

সারাবাংলা/আরডি/জেএএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন