বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

পাঁচদিন ধরে সাগরে ভেসে থাকার গল্প শোনালেন রবীন্দ্রনাথ

জুলাই ১২, ২০১৯ | ৯:০২ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ঝড়ে ট্রলারডুবির পর সাগরে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশের সীমানায় এসে আশ্রয় পান ভারতীয় জেলে রবীন্দ্রনাথ দাস কানু। তাকে উদ্ধার করে কেএসআরএম গ্রুপের বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি জাওয়াদ। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শুক্রবার (১২ জুলাই) কানুকে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিন বিকেলে রবীন্দ্রনাথ কানু সাংবাদিকদের শোনালেন টানা পাঁচদিন ধরে সাগরে ভেসে থাকার ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা! বলেছেন, কিভাবে চোখের সামনে তার সঙ্গে ভেসে থাকা ভাইপো স্বপন দাশ (২২) সাগরে তলিয়ে গেল!

রবীন্দ্রনাথ জানান, গত শুক্রবার (০৫ জুলাই) রাতে ভারতের দক্ষিণ চব্বিশপরগণা জেলার গেদুয়া থানার নারায়ণপুর গ্রাম থেকে মাছ ধরার ট্রলারে তারা সাগরে রওনা দেন। ট্রলারে মোট ১০ জন ছিল। তারা যখন রওনা দিচ্ছিলেন তখন আবহাওয়ার কোনো সতর্ক সংকেত ছিল না। কিন্তু শনিবার রাতে যখন বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সতর্ক সংকেত জারি করা হয়, তখন তাদের ফেরার কোনো উপায় ছিল না।

‘আমি ছিলাম ট্রলারের মাঝি। শনিবার রাতে সাগরে ট্রলারটি ডুবে যায়। তখন আমার সঙ্গীরা সবাই সাগরে ভেসেছিল। আমার কাছে একটি লাইফ জ্যাকেট ছিল। সেটি আমি আমার ভাইপো স্বপনকে দিয়ে দিই। সে লাইফ জ্যাকেটটি ধরে ভেসেছিল। আমি একটি কাঠ ধরে ভেসেছিলাম। আমার সঙ্গীরা দুর্বল, অবশ হয়ে একে একে সাগরে তলিয়ে যান। আমার যখন উদ্ধার করা হয়, তার ঘণ্টা তিনেক আগে আমার ভাইপোও তলিয়ে যায়।’ বলেন রবীন্দ্রনাথ

বিজ্ঞাপন

উদ্ধারকারী জাহাজের নাবিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কিভাবে সাগরে ভেসেছিলাম, সেটা ভগবান ছাড়া কেউ জানে না। এমভি জাওয়াদের লোকজন আমাকে যে কষ্ট করে উদ্ধার করেছেন, আমার কৃতজ্ঞতা জানানো ভাষা নেই। শুধু বলব, ভগবান যেন উনাদের আরও বড় করেন। আমাকে তারা মা-বাবা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। এখন আমি দেশে ফিরতে চাই, মা-বাবাকে দেখতে চাই।’

এমভি জাওয়াদের ক্যাপ্টেন এস এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ইন্ডিয়া থেকে জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে আসছিলাম। বন্দর সীমানার বাইরে সাগরে দেখলাম একজন মানুষের মাথা একবার ভেসে উঠছে, আরেকবার নিচে নামছে। আমরা চিৎকার করে উঠলাম। সবাই একবাক্যে বলল- যেভাবে হোক, মানুষটাকে বাঁচাতে হবে। তখন একজন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চিন্তাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় মনে হল। আমরা প্রায় পৌনে ২ ঘণ্টা চেষ্টা করে উনাকে উদ্ধার করি। উনার আয়ু আছে আর আল্লাহর রহমত আছে বলে আমরা একজন মানুষকে বাঁচাতে পেরেছি।’

এর আগে, গত বুধবার (১০ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে জেলে রবীন্দ্রনাথ দাসকে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেল থেকে উদ্ধার করে কেএসআরএম’র প্রতিষ্ঠান এস আর শিপিং লাইনসের জাহাজ এমভি জাওয়াদের নাবিকেরা। রবীন্দ্রনাথ দাস কানু নামে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশপরগণা জেলার গেদুয়া থানার নারায়ণপুর গ্রামের মধুরঞ্জন দাসের ছেলে।

কেএসআরএম’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেরুল করিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এমভি জাওয়াদ চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে আসার পর আজ (শুক্রবার) সকালে একটি লাইটারেজ জাহাজে করে আমরা ওই জেলেকে মেরিন একাডেমির জেটিতে নিয়ে যায়। এরপর মেরিন একাডেমির নৌকায় করে কোস্টগার্ডের স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। সন্ধ্যায় কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারাসহ তাকে পতেঙ্গা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আমরা তাকে ভারতের সহকারী হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের কাছে দিয়েছি।’

কোস্টগার্ড স্টেশনে রবীন্দ্রনাথকে যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি করা হয়, সেখানে নৌবাণিজ্য দফতরের প্রধান কর্মকর্তা ড. সাজিদ হোসেন, কেএসআরএম’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম, এমভি জাওয়াদের ক্যাপ্টেন এসএম নাসির উদ্দিন, মাস্টার পুলক কুমার ভাস্কর, মেরিন সুপার ওসমান গনি, ডিপিএ-সিএসএ ফয়েজ আহমদ, চিকিৎসক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ এবং কেএসআরএম’র মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্র্যান্ড ম্যানেজার মনিরুজ্জামান রিয়াদ উপস্থিত ছিলেন।

সারাবাংলা/ আরডি/এনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন