সোমবার ২৬ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ১১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বোদ্ধারা সব ভাই ভাই, জিতলে আছি হারলে নাই

জুলাই ১৫, ২০১৯ | ৭:০০ অপরাহ্ণ

শরীফ শহীদুল্লাহ্

‘রহিমুদ্দির ভাইয়ের বেটা’ নামে পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের একটা হাসির গল্প আছে। গল্পের ভাইয়ের বেটা যখনই অন্যের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয় কিংবা পুলিশের প্যাদানি খায় তখন রহিমুদ্দি বলেন, ‘ঠিকই আছে, যত বড় মুখ না তত বড় কথা।’ আর শেষে ভাইয়ের ব্যাটাকে যখন পুলিশ ছেড়ে দেয় তখন রহিমুদ্দি গর্ব করে বলে, ‘দেখতে হবে না তুমি কার ভাইয়ের বেটা।’
এই গল্পের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম আর তার ভক্তকূলের একটা দারুন মিল আছে। যখন টিম খারাপ করে তখন ভক্তরা বলে, ঠিকই তো আছে, এমন বাজে টিম দিয়া আর কি-ইবা হবে। শুরু হয় ক্রিকেটের দৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার। কোন ক্রিকেটার কবে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করেছে, কোন ক্রিকেটার কয়টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, কিছুই বাদ পড়ে না। আবার যখন ক্রিকেট টিম বড় দলকে হারায় তখন সাকি-ই-ই-ব, তামি-ই-ই-ম বলে চিৎকার করে গলা ফাটায়। গলা এতটাই ফাটে যে, কয়েকদিন আর মুখ থেকে শব্দ নির্গত হয় না, তারা পুরুষ হাসের মতো ফ্যাস ফ্যাস করে।

এ-তো গেল ব্যক্তিশ্রেণীর কথা। ম্যাচ হার-জিতের পর মিডিয়াও পুরোদস্তুর রহিমুদ্দির ভূকিায় অবতীর্ণ হয়। জিতলে টিভির লিড নিউজ হয় বাংলাদেশের জয়ের খবর, পত্রিকা ক্রিকেটারদের উপাধি দেয় ‘বঙ্গ-শার্দূল’। জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে শিরোনাম হয়, ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব।’ আর হারলে বিশ্বকাপ শেষে জাতীয় ক্রিকেট টিমের দেশে ফেরার খবরও পত্রিকার ভেতরের পাতায় খুঁজে বের করতে হয়।
বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে। যখন জিতেছে তখন বাংলাদেশের টিমের উপর আর টিম নাই। সেই জেতার পর ম্যাককালামের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে ফেসবুকে তুলকালাম হয়, এনডিটিভি কেন ‘আপসেট’ বলল তারও গুষ্টি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু শেষের দুটি ম্যাচে হারার পর ভক্তরা এমন পর্যায় পৌছেছে যে, ‘বাংলাদেশ এমনই!’

দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দারুন শুরু করেছিল বাংলাদেশ। তবে শুরুটা ভালো হলেও প্রবাদ বলে অন্য কথা- শেষ ভালো যার সব ভালো তার। শুরু ভালো করলে ভালো নয়, শেষটা ভালো হতে হবে। এ জগতে হায়, ভালো করতে কে-না চায়! শেষ ম্যাচে ভালো করার লক্ষ নিয়ে খেলতে নেমে পাকিস্তানের কাছে বিপুল ব্যবধানে হারের মালা পড়তে হয়েছে। হারু পার্টির সঙ্গে কেউ থাকে না, ভক্তকূলও নাই। সুতরাং প্রবাদ গেছে উল্টে – শেষ খারাপ যার সব খারাপ তার।

বাংলাদেশের শেষ ম্যাচের শেষ ভরসা সাকিব আউট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক ভক্ত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন, ‘ম্যাচ আর ম্যাচ নাই, দিয়াশলাই হয়ে গেছে। বাকি বলগুলো দিয়াশলাইয়ের কাঠির মতো ফস ফস করে আগুন ধরিয়ে কেবল হৃদয় পোড়াবে, ফল আসবে না।’ কথাখানা সত্যি, ফল আসেনি, পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিং বিপর্যয়ের আগুন এখনও পোড়াচ্ছে ভক্তদের।
ক্রিকেট ভালোবাসে বলেই এদেশের চা-দোকানে, অফিস-আদালতে, যানবাহনে ক্রিকেট আলোচনা হয়। এ দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ক্রিকেট বোঝে। অবশ্য শুধু বোঝে বললে ভুল হবে, সবাই একেকজন বোদ্ধা। আর মন্তব্য করতে পয়সা লাগে না বলে বোদ্ধারা যে যার মতো মন্তব্যও করে। মাঠে খেলে আমাদের এগারজন, কিন্তু ষোল কোটি ভক্ত সমালোচনা করে, ভুল ধরে। এক কথায়, জাতীয় ক্রিকেট দলের সামনের সারিতে এগার জন যোদ্ধা আর পেছনে ষোল কোটি বোদ্ধা।

বিজ্ঞাপন

যেখানে কথা বেশি সেখানে কাজ কম। দেশে ক্রিকেট বোদ্ধা বেশি হওয়ায় যোদ্ধাদের কাজ কম হয়েছে। ফলাফল যা হওয়ার তাই -দশের মধ্যে অষ্টম। বিশ্বকাপে রওনা হওয়ার আগের গ্রুপ ছবিতে সাকিব কেন নাই সে নিয়ে যে বোদ্ধারা সাকিবকে তুলোধুনো করেছেন তারাই আবার সেরা পারফর্মার হওয়ার পর সাকিবের দেশে জন্ম হয়েছে বলে গর্বিত হয়েছেন। আবার, একের পর এক ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হতে থাকলে ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে বসে এ দেশের বোদ্ধারা আইসিসির দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল, ‘বৃষ্টি-বাদলের দিনে বিশ্বকাপ আয়োজনের কী-ইবা দরকার ছিল?’

বাংলাদেশের খেলা চলছে। রাস্তায় হাটার সময় হঠাৎ একটি মন্তব্য কানে এলো, ‘এমন বলে শট নেওয়ার কোনো দরকার ছিল না।’পেছনে ফিরে তাকালাম ‘ভুল শট’ দেখার জন্য। বল তখন আকাশে আর সেটাকে লক্ষ করে দৌড়াচ্ছেন প্রতিপক্ষের ফিল্ডার। সীমানা-দড়ি তো দড়ি ফিল্ডারের মাথার উপর দিয়ে বল মাঠের বাইরে। ফিল্ডার যখন দুই হাত উচু করে বলের টুটি ধরতে ব্যর্থ হলেন সেই সময় আম্পায়ার দুই হাত উচু করে জানিয়ে দিলেন, ‘ছক্কা’।
ওই বোদ্ধা একটু আগে যার শট নিয়ে জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য করেছেন, তিনি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাবিক আল-হাসান। আর যে শটটিকে ভুল শট বলে মন্তব্য করেছিলেন সেটি ছিল ওভার বাউন্ডারি। তবু বোদ্ধাদের বোদ্ধাগিরি থামে না।
এক সময় রেডিও ছিল ভরসা। ধারাভাষ্যে শোনা যেত, ‘চমৎকার শট, দেখার মতো শট, কিন্তু নাহ্, হলো না। বাউন্ডারী সীমানার কাছে দাড়িয়ে থাকা ফিল্ডারের হাতে সরাসরি বল। আরেক উইকেটের পতন’। বলটা বাতাসে উড়িয়ে দেয়ার সময় যে ভাষ্যকার প্রশংসা শুরু করেছিলেন তিনিই ক্যাচ হওয়ার পর বলা শুরু করলেন, ‘ঠিক এই সময় এমন শট নেওয়া উচিত হয়নি। আরও দেখেশুনে খেলতে হবে।’ সবাই রহিমুদ্দি, ভালো হলে আছি আর খারাপ হলে নাই।

টসে জিতে দল ব্যটিং নেবে না ফিল্ডিং নেবে তাতেও বোদ্ধাদের মতের শেষ নেই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফিল্ডিং নেয়া নিয়ে বিপুল সমালোচনা হয়েছে। জাকারবার্গের কল্যাণে প্রাপ্ত ফ্রি পেজে যার যেমন খুশি ষ্ট্যাটাস লিখেছে। কোনটা উচিত ছিল আর কোনটা উচিত হয়নি সব বলেছেন তারা। অথচ ওয়েষ্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ জেতার পর ফিল্ডিং নেওয়াটাই ঠিক ছিল বলে ব্যপক প্রশংসা করেছে বোদ্ধারা।

মাশরাফি ভালো না। এটা নিয়েও কথা আছে। সেদিন একজন বলল, ‘মাশরাফির ওপর ডাক্তারের অভিশাপ লেগেছে। সে বিশ্বকাপ মিশনে যাওয়ার আগে ডাক্তারকে বকঝকা করে গেছে। শুভ কাজে যাওয়ার আগে এটা করা ঠিক হয়নি।’ আরেকজনকে বলতে শুনলাম, ‘রাজনীতি আর ক্রিকেট এক সঙ্গে চলে না।’ অথচ ভালো পারফর্ম করলে হয়তোবা এই বোদ্ধার দলই বলত, ‘যে রাধে সে চুলও বাঁধে।’

বোদ্ধাগিরি কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কী কী সেটা বিসিবি প্রমাণ পেয়েছে টাইগারদের জার্সি বদল নিয়ে। জার্সিতে জাতীয় পতাকার প্রতিফলন না থাকায় বিসিবির গুষ্টি উদ্ধার করেছে ভক্তকূল। ফলে একরাতের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সবুজরে মধ্যে লাল যোগ হয়েছে। বোদ্ধাদের অভিযোগ ছিল, জার্সিতে লাল না থাকায় ওটা পাকিস্তান-পাকিস্তান লাগছে। আবার উদ্বোধনী ম্যাচে ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার টিমের জার্সিতে সে দেশদুটির পতাকার প্রতিফলন না থাকতে দেখে এই বোদ্ধাদের কেউ কেউ বলেছে, ‘আহা, কী দরকার ছিল বাংলাদেশ দলের জার্সি চেঞ্জ করার?’

তাসকিন স্কোয়াডে নাই, সে কান্নাকাটি করেছে। সেই কান্নাকাটিতে মন গলে বোদ্ধাদের অনেকেই বলেছেন, আহা, তাসকিন ছাড়া কি চলে? রুবেল ও সাব্বিরকে কেন বসিয়ে রাখা হচ্ছে সে নিয়ে জ্ঞান-গর্ভ আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। বাধ্য হয়ে রুবেল-সাব্কিরকে তাদের নামানো হলো। তবে জাতি কিছু পায়নি, শুধু বোদ্ধাদের আবদারের ফল বোদ্ধারা খেয়ে তেষ্টা মিটিয়েছেন।
প্রথম ম্যাচে জেতার পর অনেকের মুখেই ভবিষ্যদ্বাণী শোনা গেল বাংলাদেশ বিশ্বকাপ নিয়ে ঘরে ফিরবে। কিন্তু পর পর দুই ম্যাচ হারার পর খেলোয়াড়দের ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা শুরু হলো। মুশফিকের রান আউট মিস, তামিম-সাব্বিরের ক্যাচ মিস তো আছেই, কার বয়স বেড়েছে, কে ভাতিজা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মুশফিক জীবনে কত যে গুরুত্বপূর্ণ রান আউট করছে কিংবা তামিম-সাব্বিররা কতশত ক্যাচ ধরেছে, সে কথা ভক্তরা বেমালুম ভুলে গেছে।
আবার আফগানিস্তানকে হারানোর পরই বোদ্ধারা খাতা-কলম গিয়ে বসে গেল। শুরু হলো হিসাব-নিকাশ। কোন টিম হারলে আমাদের কত কম ম্যাচ জিতেও সেমি ফাইনালে যাওয়া যায়। মোটকথা আশার আর শেষ নেই। বাঙালি ওঠাতেও পারে আবার নামাতেও পারে।

শুধু ব্যক্তি উদ্যোগে বোদ্ধারা নয়, সেমি ফাইনালে যাওয়ার নানা রকম সমীকরণ দাড় করেছিল বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো। সেই সমীকরণগুলো ছিল যদি-কিন্তুতে ঠাসা।
আর সেই সমীকরণ নিয়েও এক বোদ্ধা ফেসবুকে ঠাট্টাও করেছেন। সেই ঠাট্টা ছিল এরকম: রহিম যদি চিরতরে স্কুল ত্যাগ করে, করিম যদি ইচ্ছা করে পরীক্ষা অংশ না নেয়, আলীম স্যার যদি যদুকে প্রতিহিংসাবশত ফেল করায় এবং পরীক্ষার আগের রাতে মধুর গায়ে ভীষণ জ্বর ওঠে তবে ক্লাশের পঞ্চম স্থানে থাকা রাম এবার পরীক্ষায় ফার্ষ্ট হলেও হতে পারে।
মাগনা দুধে যেমন পোলা বাঁচে না তেমনি সমীকরণ দিয়ে সেমিফাইনাল হয় না। ভারতের বিপক্ষে হারার সঙ্গে সঙ্গে সকল সমীকরণ গঙ্গার জলে মিশে একাকার হয়ে গেল।

বিশ্বকাপ মিশনে রওনা হওয়ার সময় যাদের ফুলেল বিদায় জানিয়েছিল ভক্তরা, যাদের তিনটি দারুন জয়ে দেশবাসি আনন্দে ভেসেছে, সেই ক্রিকেট টিমের ফেরার সময় ফুল তো দূরের কথা, কোন ভক্তের দেখা মেলেনি বিমানবন্দরে। টিম-টাইগারের দেশে ফেরার ছবি বড় করে প্রথম পাতায় ছাপেনি কোনো পত্রিকা। মোটকথা, বোদ্ধারা সব ভাই ভাই-জিতলে আছি, হারলে নাই।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন