বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নেরুদার সঙ্গে নির্বাসিত জীবন (পর্ব-২)

জুলাই ১৬, ২০১৯ | ৩:৩০ অপরাহ্ণ

মাতিলদে উরুটিয়া || অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

[ বিশ শতকের সর্বাধিক পঠিত কবি চিলির পাবলো নেরুদা (জন্ম ১২ জুলাই ১৯০৪, মৃত্যু ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩।
মাতিলদে উরুটিয়া (জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯১২, মৃত্যু ৫ জানুয়ারি ১৯৮৫) পাবলো নেরুদার তৃতীয় স্ত্রী, দাপ্তরিকভাবে তাদের দাম্পত্যকাল ১৯৬৬ থেকে নেরুদার মৃত্যু পর্যন্ত।
১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ জেনারেল অগাস্তো পিনোশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দের সরকারকে উৎখাত করলেন। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে আগুন জ্বলল, চলল অবিরাম গুলিবর্ষণ। নেরুদার প্রিয় বন্ধু প্রিয় প্রেসিডেন্ট আয়েন্দে নিহত হলেন।
তাঁকে নিয়ে মাতিলদে উরুটিয়ার স্মৃতিগ্রন্থ মাই লাইফ উইথ পাবলো নেরুদা। দু’জনের জেনেভায় নির্বাসিত জীবন কাহিনী অনূদিত হলো। আজ থাকছে ২য় কিস্তি]

কান শহরে এসে জাহাজ অফিসের কাছে একটি হোটেলে উঠি। পাবলো বলল, ‘কান শহরে আমাদের মাত্র একটি রাত। আমি পিকাসোর গ্রাম ভ্যালরিতে ডিনার করতে চাই। প্রথমবার নির্বাসিত হয়ে যখন এখানে আসি পিকাসো তখন আমার কাছে ভাই। জায়গাটার অনেক মধুর স্মৃতি আমার কাছে জমা।’
আমি ক্লান্ত কিন্তু প্রকৃতির যে শক্তি তা প্রতিরোধ করব কেমন করে আমার সেই প্রকৃতি হচ্ছে পাবলো।

আমরা ভ্যালরির ছোট্ট রেস্তোরাঁয় গেলাম। আমি পাবলোকে বললাম, পল এলুয়ায় প্যারিসে আমাকে বলেছেন এমন দুটি কাহিনি এখানে এসে মনে পড়ে গেল।
‘তুমি আর পিকাসো এখানে ভ্যালরিতে ছিলে কোনো একটি বেনেফিট ডিনারে। তোমাদের অটোগ্রাফের জন্য আসা মানুষের চাপে দুজনই বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। তুমি পিকাসোকে বললে, তুমি সই কর নেরুদা, আমি করব পিকাসো। আমি নিশ্চিত এ পার্থক্যটি কেউই লক্ষ্য করবে না। তারপর তোমরা দুজন স্কুলের দুষ্ট ছেলের মতন হাসতে শুরু করলে। সইয়ের অদলবদল কেউই ধরতে পারেনি। পল এলুয়ার আর একটা কাহিনি বলেছেন, তুমি আর পিকাসো সবার চোখ এড়িয়ে গোপনে একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়েছ। ওয়েটার যখন এক প্লেট মুরগি নিয়ে তোমাদের টেবিলে এলো কোত্থেকে এক ফটোগ্রাফার এসে দ্রুত তোমাদের ছবি তুলে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। ক্ষুব্ধ হয়ে পিকাসো দাঁড়িয়ে গেল। পিকাসোকে বসানোর জন্য তুমি হাত ধরে টেনে বললে, বসে পড়, ও শুধু মুরগির ছবি তুলতে চেয়েছিল।’ আমরা একচোট হেসে নিলাম।

বিজ্ঞাপন

পাবলো শিল্পী পিকাসোর বর্ণনা দিতে শুরু করল। সে খুবই সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু সবাই ভাবে পিকাসো একটা দানব, সে কেবল শান্তিতে থাকতে চায়। আমরা দুজন যখন একত্রে থাকতাম আমরা শুধু হাসতাম। গঞ্জালেস ভিডেলার নিপীড়নে আমি যখন ইউরোপে পালিয়ে আসি পিকাসো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে (ডিক্টর গঞ্জালেস ভিডেলা ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত চিলির প্রেসিডেন্ট)। ‘আমাকে তার স্টুডিওর চাবি দিয়ে বলেছে যখন ইচ্ছা আসতে পারি যখন ইচ্ছা যেতে পারি। একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে স্টুডিওতে ঢুকে দেখি পিকাসো শান্তির ঘুঘু ডোভ অব পিস নিয়ে কাজ করছে। এ কাজটির কথা মানুষ তাকে বলে আসছিল। এ কাজটির শত শত ভ্যারিয়েশন পিকাসো করেছে এবং আমি তা দেখেছি। শেষ পর্যন্ত সে তার সবচেয়ে পছন্দেরটার কাজ শেষ করেছে। অবিশ্রান্তভাবে কাজ করে গেছে। আমি গভীরভাবে তার প্রশংসা করি।’

আমরা এতই উৎফুল্ল ছিলাম যে খাবার শেষে আমরা রাস্তায় নেমে গান গাইতে থাকি। আমরা কী করছি এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিলনা। ভাগ্য ভালো যে, আমরা এতটুকুও সন্দেহ করিনি যে আগামীকালই আমাদের জন্য বড় সমস্যা বয়ে আনবে।
বেশ সকাল সকাল আমরা জাহাজের অফিসে গেলাম। দূর থেকে আমি দেখলাম, লম্বা সুদর্শন একজন মানুষ পাবলোর দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি পল এলুয়ার। আমাদের এই ট্রিপের ব্যাপারটি জানতেন মাত্র একজন এলিস গাসকার, পাবলোর বন্ধু এবং অনুবাদক। শেষ পর্যন্ত বোঝা গেল এ মহিলাই পল এলুয়ার, তার স্ত্রী ডোমিনিক, নেমেসিও আন্তনেজ এবং তার স্ত্রীসহ পাবলোর বন্ধুদের জানিয়েছেন। আর তারা পাবলোর জন্য বিদায়ী মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছেন, সেখানে পিকাসোও আমন্ত্রিত।
যখন পাবলোর দিকে এগিয়ে আসতে থাকা লোকটিকে আমি চিনতে পারলাম, স্বাভাবিকভাবেই আমি লুকিয়ে পড়লাম। আমি চাইনি পল আমাকে দেখুক। তাহলে পাবলোর বন্ধুরা সবাই আমাদের গোপন চিলি সফরের খবর জেনে যাবে। পাবলো পলকে বলল, তার লাগেজ পাঠিয়ে মধ্যাহ্নভোজে এসে সবার সঙ্গে দেখা করবে। পাবলো যখন আমাকে খুঁজে পেল, জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা এখন তাহলে কী করব? তুমিও আমার সঙ্গে থেকো। আমরা ওদের বলব যে তুমি এই শহর হয়ে যাচ্ছিলে, দেখা হয়ে গেছে।’
তার এ সরল পরিকল্পনা শুনে আমি অনেকক্ষণ ধরে হাসলাম, এ কথা কেউই বিশ্বাস করবে না।
আমি বললাম, এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে তুমি একা মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ কর। আমাদের হাতে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় আছে, কারণ বোর্ডিং শুরু হতে বিকাল ৪টা, ততক্ষণে আমি ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত থাকব, কাস্টমস কাউন্টারে আমাদের দেখা হতে পারে।
পাবলো আমার পরিকল্পনা তেমন পছন্দ করল না, তবে কয়েক মিনিট ধরে আলোচনার পর আমরা সম্মত হলাম যে আমি মধ্যাহ্নভোজে যাচ্ছি না। পিকাসোকে দিয়ে পাবলো সবাইকে রেস্তোরাঁয় আটকে রাখার ব্যবস্থা করবে। তাকে বিদায় জানানোর জন্য কেউ যেন ডক পর্যন্ত না আসে, কারণ ওদের সবাই আমাকে চেনে এবং সেখানে আমাকে দেখে ফেলবে।
পাবলো এ পরিকল্পনা বেশ উপভোগ করল। ‘পিকাসো আমার এই গোপনীয়তাটুকু পছন্দ করবে। আমি যখন তাকে বলব হো হো করে অনেক হাসবে কারণ আমি বলব আমার প্রেমিকা কোইহুইকো থেকে আসা গায়ের মেয়ে।’ যখন বলছে তার চাউনিতে ঝিলিক; এ ধরনের দুর্লভ পরিকল্পনা যখন করে থাকে তার চোখে ঝিলিক দেখা যায়।
টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোবার সময় আমাদের পরিকল্পনার আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে আমরা হাসাহাসি করলাম। যেহেতু পাবলো উরুগুয়ে যাচ্ছে বিনা ঝক্কিতে তার টিকিট চূড়ান্ত হয়ে গেল, কিন্তু আমার টিকিট দেখার পর কর্মকর্তা আমার আর্জেন্টিনার ভিসা দেখতে চাইল, কারণ আমি বুয়েন্স আইরেসে অবতরণ করব। আমি তাকে বোঝালাম চিলির নাগরিকদের আর্জেন্টিনা যেতে ভিসা লাগে না। কিন্তু আমিই ভুল করেছি। ইউরোপ থেকে প্রবেশের সময় আমার ভিসা লাগবে, আমার হতভম্ব অবস্থা আরও তিক্ত হয়ে উঠল যখন জানলাম কান শহরে আর্জেন্টিনার কোনো কনস্যুলার অফিস নেই। জাহাজের এজেন্ট আমাকে পরামর্শ দিল আমি যেন স্থানীয় উরুগুয়ে কনস্যুলেটে গিয়ে সেখানকার ভিসা নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করি আর সেখান থেকে খুব সহজেই আর্জেন্টিনায় প্রবেশের ভিসা সংগ্রহ করতে পারব।

দিনটা শনিবার। আমরা কনস্যুলেটে ছুটে যাই। পাবলোকে বললাম, ভিতরে আমার একা যাওয়াটাই ভালো হবে। উরুগুয়ের কর্মকর্তা প্রতিক্রিয়াশীল ধাঁচের মানুষ হতে পারেন। যদি পাবলোকে চিনে ফেলেন তাহলে আমাকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বেন। আমি একাই সম্ভবত সবকিছু ঠিকঠাক করিয়ে আনতে পারব। পাবলো রাস্তার এক কোনায় অপেক্ষা করতে রাজি হলো।
আমি ডোরবেল বাজালাম। হাফপ্যান্ট ও অনানুষ্ঠানিক শার্ট পরা একজন সাড়া দিলেন। আমি তাকে উরুগুয়ের কনসালের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, আমি তার কাছে এসেছি। তিনি সানুগ্রহ হাসি দিয়ে বললেন, ‘সে তো আমিই।’
আমি তাকে আমার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলাম। তিনি বললেন, ‘দেখি কী করা যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমি আপনাকে ওয়ার্কিং ভিসা দিই।’ তার এ প্রস্তাবে আমার মনে খটকা লাগল, তবু সম্মতি দিয়ে বললাম, ‘যেমন আপনার ইচ্ছা। আমি উরুগুয়েতে নামব না, সরাসরি বুয়েন্স আইরেস চলে যাব। সে ক্ষেত্রে আমাকে ট্যুরিস্ট ভিসা দিলেই কি ভালো হয় না? যে ভিসাই হোক আমি তো আপনাকে সে টাকা দেবই।’
তিনি আমার পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ‘পেশা! সংগীতশিল্পী’। সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা দ্যুতিময় হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘আমিও তো সংগীতশিল্পী, অপেরাতে গাই। কয়েকদিনের মধ্যেই আমি মাদাম বাটারফ্লাইয়ের পিংকারটনের রোলটা করব।’ আমি খুব নার্ভাস হয়ে পড়লেও তার দিকে তাকিয়ে হাসিটা অব্যাহত রাখি।
তিনি বললেন, ‘তাহলে জাহাজে যাওয়ার দরকার কী? এখানে কদিন কাটান খুব ভালো সময় কাটবে।’
আমি বললাম, ‘আমাকে বুয়েন্স আইরেসে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা ছাড়া অনেক বেশি ভ্রমণ করে আমি খুব ক্লান্ত। এখানকার সৈকতেও আমি বেশ কদিন কাটিয়েছি।’
আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম এই মানুষটি যদি আমাকে ভিসা না দেন তাহলে আমার সফরটি হচ্ছে না। আমি তার দয়ার ওপর নির্ভর করে আছি। আমাকে দোরগোড়ায় দণ্ডায়মান রেখে তিনি কনস্যুলেটের ভিতর প্রবেশ করলেন। তিনি আবার যখন ফিরে এলেন বললেন, ‘যাবেন না। এত তাড়াহুড়ো কীসের।’
তারপর আমার জন্য বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো, তিনি বললেন, ‘এখন আমাকে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষা করার জন্য যেতে হবে। আমি এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব। ফিরে এসে আপনার ভিসার কাজ করতে বসব। কিন্তু সেজন্য আমাকে বাড়তি টাকা দিতে হবে কারণ আজ শনিবার।’
আমি বললাম, ‘আপনার কথা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে।’
‘বেশ তাহলে আমাকে আমার বসের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং দেখব আপনাকে আজ ভিসা দিতে পারব কিনা। আমাকে এই ফোনের খরচও আপনার দিতে হবে।’ (তার বস অন্য এক শহরে)।
আমি বললাম, ‘সমস্যা নেই।’
আমি যে ফ্রেঞ্চ বলতে পারি এটা বিবেচনায় না নিয়েই তিনি ফোন করলেন। তিনি সপ্তাহান্তের পার্টির কথা বললেন, এর-ওর বদনাম করলেন, হাসলেন, কৌতুক বললেন। তার কোনো তাড়া নেই। কারণ ফোনের বিল তো আমি শোধ করব। শেষদিকে আমার ভিসা নিয়েও কথা বললেন। তারপর তার যে কথা আমাকে বিস্মিত করল, তিনি তার বসকে বললেন, ‘কমিউনিস্ট পাবলো নেরুদা জাহাজে মন্টেভিডিও যাচ্ছেন। আমরা তার জাহাজে ওঠা আটকে দিতে পারি। আপনি কী মনে করেন?’
হা ঈশ্বর এ কী দুর্যোগ! তার বস তাকে কী জবাব দিয়েছে আমার কোনো ধারণা নেই।

বুলবুলির মতো শিস দিতে দিতে তিনি তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষার পোশাক পরতে চলে গেলেন। আমাকে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। লোকটার গাড়ি যখন বেরিয়ে যেতে দেখলাম, আমি এ কী শুনলাম তা বলার জন্য রাস্তার কোণে পাবলোর কাছে ছুটলাম। পাবলো বলল, ‘কোনো ধরনের ওজর-আপত্তি না করে লোকটা যা চায় তা-ই দাও কারণ সে টাকাই চায়।’
আমার পার্সে ছিল ২০০ ডলার। সে সময়ের জন্য অনেক টাকা। আমি কাতর হয়ে পাবলোকে বললাম, ‘তুমি মধ্যাহ্নভোজে চলে যাও এবং এই দুঃস্বপ্নের কথা ভুলে যেতে চেষ্টা কর। আমাদের ফেরেশতা আমাদের বাঁচাবেন।’ আমার ফেরেশতার কথা শুনে হেসে উঠল এবং পাবলো চলে গেল।
আমি আবার কনস্যুলেটে ফিরে যাই। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করি। শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে এলেন এবং আমার জন্য অনেক প্রশংসাসূচক বাক্য ব্যয় করলেন। আমি তার প্রতিবন্ধুসুলভ এবং হাসিমুখ করে থাকলাম। কিন্তু শিগগিরই তিনি বুঝতে পারলেন যে উদ্দেশে তিনি আমার প্রশংসা ও তোষামোদ করলেন তাতে তিনি তেমন এগোতে পারেননি।
তিনি আমার ভিসার কাজ ধরলেন এবং আমাকে বিল দিলেন। ভিসার জন্য ১০০ ডলার। তার সময় ও ফোনের বিল আলাদা হিসাব করে মোট দাঁড়াল ১৫০ ডলার। এখানেই ভোগান্তির শেষ নয়, তিনি বললেন, ডলার গ্রহণ করতে পারবেন না, তাকে ফ্রেঞ্চ মুদ্রায় দিতে হবে। আমি হাত উঠিয়ে ট্যাক্সি ডেকে মানি-এক্সচেঞ্জে ছুটলাম। যখন ফিরলাম আমার প্রাপ্য সবকিছু একটা খামে ভরে আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এই নিন আপনার সব কাগজ।’
আমি যখন জাহাজের অফিসে পৌঁছি তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে। আমার ব্যাগ নিয়ে চেক-ইন করা এবং টার্মিনালে পাবলোর জন্য অপেক্ষা করার মতো সময়টুকুই হাতে ছিল।
এ ঘটনাটি নিয়ে পাবলো তার স্মৃতিকথায় লিখেছে, ‘আমি ততক্ষণে ভাবতে শুরু করেছি মাতিলদের আর জাহাজ ধরা হচ্ছে না, যদি তা না-ই হয় আমিও জাহাজে উঠব না। বহু বছর ধরে আমি ওই দিনটাকে আমার জীবনের তিক্ততম দিনগুলোর একটি বিবেচনা করে আসছি।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাবলো ডকে ফিরে এলো, সম্পূর্ণ একা। বলল, ‘সবাই আমার সঙ্গে আসতে চেয়েছে। কিন্তু পিকাসো একটা গল্প ফাঁদল, তার স্টুডিওতে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, আমার সঙ্গে একটা গোপন কাজ আছে, তার পরই রেস্তোরাঁয় ফিরে আসবে।’

পিকাসো আমার সম্পর্কে শুনতে অবশ্যই মজা পাচ্ছিল, কারণ সে পাবলোকে বলে যাচ্ছিল, ‘বল আমাকে আরও বল।’ পাবলো আমার চুল ও চোখের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের দুজনের কেমন যাচ্ছে সে কাহিনি শোনাচ্ছে। পিকাসো সিরিয়াস হয়ে উঠেছে এবং পাবলোকে বলেছে, ‘তোমার মতো করে অনুভব করতে হলে আমাকে কী দিতে হবে এক্ষুনি বল।’
আমরা পুলিশ চেক পয়েন্টের ভিতর দিয়ে গেলাম, আমাদের কাগজপত্র গোছগাছ করা। জাহাজে ওঠার জন্য আমরা যখন ছোট লঞ্চের দিকে এগোচ্ছি এমন সময় উঁচু স্বরে কেউ বলছে, ‘মিস্টার পাবলো নেরুদা, আপনি কি অনুগ্রহ করে ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অফিসে আসবেন?’
আমরা পরস্পরের দিকে এগোই। মনে হচ্ছে সারা দিনের জন্য বরাদ্দ আমাদের দুঃখের কোটা এখনো শেষ হয়নি। আমি নির্বাক বরফ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি দেখলাম মুখে হাসি নিয়ে পাবলো সেদিকে মাথা ঘোরাল। হইচইয়ের মধ্যেও একজন মহিলা উচ্চৈঃস্বরে বলতে চেষ্টা করলেন তার কথা যেন অন্যদের কানে পৌঁছে, বললেন, ‘সে তো কমিউনিস্ট, উত্তেজনা সৃষ্টিকারী, আমি জানি কারণ আমি চিলির মানুষ।’
তার চেয়েও অধিকতর উঁচু স্বরে অন্য এক নারী বলে উঠলেন, ‘চিলির নাগরিক হিসেবে আপনার লজ্জা পাওয়া উচিত, স্প্যানিশ ভাষায় সবচেয়ে ভালো লেখককে আপনারা আক্রমণ করবেন। আমি উরুগুয়ের, আপনারা যাকে বলছেন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী, আমরা তাকে ভালোবাসি।’
আমি নিশ্চুপ থাকি, আমার কুকুর নিয়ে লাইন ধরে এগোই। আমরা নাম-পরিচয়হীনভাবে সফর করতে চেয়েছিলাম এই তার পরিণতি। যাত্রীদের মধ্যে কথোপকথন চলতে থাকে, প্রায় সবাই প্রথম নারীকে বকাঝকা করেন। বেচারী নিশ্চয়ই তখন খুব খারাপ বোধ করছে। আমি তাকে তার জাহাজে দেখিনি, তিনি ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করছেন।
বেশ কয়েক মিনিট কেটে গেল, কিন্তু আমার কাছে মনে হলো অনন্তকাল। আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত এই ভ্রমণ কি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যাবে? সবাই জাহাজে উঠে গেছে। এক তরুণ পাবলোর কাছ থেকে আমার জন্য বার্তা নিয়ে এসেছে বলে জানাল। সে অনুনয় করে বলল, ‘আপনি এগোন এবং জাহাজে উঠে পড়ুন।’ আমি এই তরুণকে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি বললাম, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি পাবলোকে দেখব আমি জাহাজে উঠব না।’
বোর্ডিংয়ের শেষ আহ্বান শোনা যাচ্ছে। জাহাজের এক কর্মচারী আমি যাত্রী কিনা জানতে চাইলে আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।’
এবার চিৎকার ভেসে আসে যাত্রীদের জন্য ‘লাস্ট কল’। আমি ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়েছি এবং কী করব বুঝতে পারছি না। আমি ক্রুদের সঙ্গে কথা বলার জন্য মূল বোর্ডিং লঞ্চের দিকে এগোই। কোত্থেকে যেন একটি ছোট লঞ্চ এসে হাজির, তাতে একজন পুরুষ মানুষ সাদা রুমাল নাড়ছে। এটাই তো পাবলো আমার পাবলো। পুলিশ তার নিজের লঞ্চে পাবলোকে স্টিমারে উঠিয়ে দিতে নিয়ে এসেছে।
আমি তখনই লঞ্চে উঠে পড়ি। মূল যাত্রীবাহী জাহাজ ছাড়ছে। আমাদের দুটো লঞ্চ খুব কাছাকাছি, আমি এবং পাবলো ইঙ্গিতে শত শত ভাব বিনিময় করি এবং অনিয়ন্ত্রিত খুশিতে মেতে উঠি। কত তিক্ত ছিল আজকের দিনটি।
পাবলো আগে জাহাজে ওঠে এবং আমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পুলিশ কিংবা অন্য যারা আমাদের লক্ষ্য করছে তাদের কাউকে পাত্তা না দিয়ে আমরা নিজেদের আলিঙ্গনে বেঁধে রাখি। আবার আমরা আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে ফিরে এসেছি।

চলবে...
সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন