বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৭ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন লেংঙি ম্রো

জুলাই ২১, ২০১৯ | ২:৫১ পূর্বাহ্ণ

চলন্ত চাকমা, চবি করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: দুর্গম পাহাড়ে বান্দরবানের ছেলে লেংঙি ম্রো। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন শিক্ষা যোদ্ধা। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কলেজ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টার একাই চালিয়ে যাচ্ছেন।

শনিবার (২০জুলাই) বিকেলে এই বিষয়ে কথা হলো সেই শিক্ষাযোদ্ধা লেংঙি ম্রোর সঙ্গে।

লেংঙি ম্রোর জন্ম বান্দরবানের টংকাবতী ইউনিয়নের বাইট্যা পাড়া গ্রামে। বাবা-মা দিনভর জুম চাষে ব্যাস্ত থাকেন। যে গ্রামে বেড়ে উঠেছেন সে গ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী খুবই অপ্রতুল। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া নিয়ে তেমন কিছু ধারণা ছিল না। লেংঙি ম্রোর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয় কোয়ান্টাম কসমো স্কুল এন্ড কলেজ ৮ম শেণীতে পড়ার সময়। তার স্কুলের শিক্ষক মতিন সরকার তাকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন।তার আগ্রহ ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয় নিয়ে পড়া।

১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পড়ার সুযোগও পান। কিন্তু তার আন্তার্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়ার প্রবল আগ্রহ। তাই ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। এটা তার পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল।

বিজ্ঞাপন

লেংঙি ম্রো সারাবাংলাকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মাসুদ স্যারের সঙ্গে তাদের ম্রো জনগোষ্ঠির সংখ্যা, শিক্ষার হার, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কতজন শিক্ষার্থী ইত্যাদি বিষয়ে কথা হয়। সেসময় মাসুদ স্যার আমাকে বলেন, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে থাকা ম্রো জনগোষ্ঠি নিয়ে কাজ করা যায় কিনা? মূলত সেখান থেকে আমার পাহাড়ে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে থাকা আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় বিনামূল্যে ভর্তি কোচিং করানোর চিন্তা ভাবনা শুরু করি।

এই ভাবনা থেকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে লেংঙি ম্রো এই কার্যক্রম শুরু করেছিল। বান্দরবানে অনেককে জোগাড় করে ফেলে। উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে অন্ধপ্রায় ছেলে-মেয়েদের জন্য তারা ডেডিকেশন, সৎ প্রচেষ্টা আর কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

এই ধারাবাহিকতায় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে লেংঙির কোচিং থেকে ৭ জনের মধ্যে ৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৮ -১৯ শিক্ষাবর্ষে ১৪ জনের মধ্যে ১০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। যেটা ছিল ম্রোদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ইতিহাসে রীতিমতো একটা রেকর্ড। যার মধ্যে ৫ জন ছেলে ও ২ জন মেয়ে। লামা ও আলিকদমের দুইজন চাকমা ও একজন মারমা ছেলেও চান্স পেয়েছিল একই শিক্ষাবর্ষে।

বর্তমানে চাকমা রাণী ইয়েন ইয়েনের অর্থায়নে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পাশে জোবরা গ্রামে ৫-৬টি কক্ষ কটেজ ভাড়া নিয়ে কোচিং সেন্টারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৩০ জন। তবে এই শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা তার।

লেংঙি আরো বলেন, আমাদের পার্বত্য অঞ্চল খুবই দুর্গম। যার ফলে শিক্ষার আলো এখনো পৌঁছায়নি। আমি সেই পিছিয়ে পড়ে থাকা আদিবাসী শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে চাই। আমার কোচিং সেন্টার থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পাওয়া শিক্ষার্থীদের কাছে আশা করি যেন, তারা বিভিন্ন জায়গাতে ভালো অবস্থানে যােতে পারে এবং দেশ, সমাজ ও জাতির জন্য এগিয়ে আসে।

আধুনিক চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত হতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা। পশ্চাৎপদ ও পিছিয়ে পড়ে থাকা আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন লেংঙি ম্রো। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যোও তাতে অবশ্য দমে যাননি। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আলো ছড়ানোর।

সারাবাংলা/সিসি/টিএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন