রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ক্যারিয়ারের শেষ দিনটিই যার মাইলফলক ছোঁয়ার দিন

জুলাই ২২, ২০১৯ | ১:৪১ অপরাহ্ণ

মুশফিক পিয়াল, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

অদ্ভূত অ্যাকশনের একজন বোলার এসেছেন ক্রিকেট বিশ্বে। সবার কৌতুহলী চোখ যখন সেই বোলারের দিকে, টিভির ক্যামেরাও যখন সেই অফস্পিনারকে খুঁজে নিচ্ছিল তখন একাধিকবার ভিন্ন ভিন্ন আম্পায়ার চাকিংয়ের অভিযোগ তুলেছিলেন তার বিরুদ্ধে। হতাশা থেকে একজন বোলারের ক্যারিয়ার সেখানেই থমকে যাওয়ার কথা। ক্যারিয়ারের শুরুতেই এত বড় বিতর্ক উঠে আসলে আত্মবিশ্বাস তলানিতে চলে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। অকালে ঝরে যাননি, সমস্ত বিতর্ককে মিথ্যা প্রমাণিত করে বারবার তিনি ফিরে এসেছেন স্বরূপে, ক্যারিয়ার শেষে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা অফস্পিনার হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক- ১৯৯২, কলম্বো, অস্ট্রেলিয়া বনাম শ্রীলঙ্কা, ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক- ১৯৯৩, কলম্বো, শ্রীলঙ্কা বনাম ভারত, টি-টোয়েন্টি অভিষেক- ২০০৬, ওয়েলিংটন, নিউজিল্যান্ড বনাম শ্রীলঙ্কা। টেস্ট ক্রিকেটে বোলিং ক্যারিয়ার- ১৩৩ ম্যাচ, ২৩০ ইনিংস, ৮০০ উইকেট। ওয়ানডে ক্রিকেটে বোলিং ক্যারিয়ার- ৩৫০ ম্যাচ, ৩৪১ ইনিংস, ৫৩৪ উইকেট, টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়া- ১২ ম্যাচ, ১৩ উইকেট। টেস্টে সর্বোচ্চ ২২ বার ১০ বা তার বেশি উইকেট, ৬৭ বার ৫ বা তার বেশি উইকেট। ওয়ানডেতে ১০ বার ৫ বা তার বেশি উইকেট।

শর্ট প্রোফাইল অব মুত্তিয়া মুরালিধরন। নামটা না বললেও বুঝে নিতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। টেস্ট আর ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ২০১০ সালে টেস্টকে যিনি বিদায় জানিয়েছেন। সে বছরের ১৮ জুলাই ভারতের বিপক্ষে গল টেস্টে নেমেছিল শ্রীলঙ্কা। ম্যাচের আগে মুরালিধরন সাদা পোশাকের বিদায় বার্তা জানিয়ে দেন। তখনও ৮০০ উইকেট থেকে সর্বকালের সেরা এই অফস্পিনার ৮ উইকেট দূরে। হয়তো নিজের মধ্যে বাড়তি কোনো আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল শেষ ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে ৮০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেই সেটি ছুঁয়েছেন মুরালি। ক্যারিয়ার শেষের আগে ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম রিস্ট-স্পিনিং অফ স্পিনার। তাছাড়া মুরালির অস্ত্রভান্ডার ছিল দারুণ বৈচিত্র্যময়, অফ ব্রেক ছাড়াও টপ স্পিন ও দুসরার মাস্টার ছিলেন এই রহস্যময়ী স্পিনার।

মুরালির বিদায়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তার বিদায়ী টেষ্টে শ্রীলঙ্কা ভারতকে ১০ উইকেটে হারায়। ম্যাচের পুরো সম্মানটাই তাকে দিয়েছে সতীর্থরা। ২২ জুলাই ছিল টেস্টের শেষ দিন। আর এদিনই মুরালি স্পর্শ করেন জাদুকরী ৮০০ উইকেটের মাইলফলক। মুরালির বিদায়টা এক কথায় রোমান্টিক। গল টেস্টে মুরালিধরন শুরু করেছিলেন ৭৯২ উইকেট নিয়ে। প্রথম ইনিংসে পান ৫ উইকেট। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট। তাতেই লক্ষ্যে পৌঁছে যান এই অফস্পিনার। টেস্টে তার শেষ শিকার ভারতের বাঁহাতি স্পিনার প্রজ্ঞান ওঝা। মুরালিধরনের বলে স্লিপে মাহেলা জয়াবর্ধনে ক্যাচ লুফতেই হয়ে যায় ইতিহাস। ওঝাকে জয়াবর্ধনের তালুবন্দি করে এই মাইলফলকে নাম লেখান টেস্ট ও ওয়ানডেতে সর্বকালের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি।

বিজ্ঞাপন

গল টেস্টে প্রথম ইনিংসে লঙ্কানরা ৮ উইকেটে ৫২০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। ওপেনার পারানাভিতানা ১১১, দলপতি কুমার সাঙ্গাকারা ১০৩, জয়াবর্ধনে ৪৮, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস ৪১, লাসিথ মালিঙ্গা ৬৪ আর রঙ্গনা হেরাথ অপরাজিত ৮০ রান করেন। ভারত প্রথম ইনিংস অলআউট হওয়ার আগে তোলে ২৭৬ রান। বিরেন্দ্রর শেওয়াগ ১০৯, গৌতম গম্ভীর ২, রাহুল দ্রাবিড় ১৮, শচীন টেন্ডুলকার ৮, ভিভিএস লক্ষন ২২, যুবরাজ সিং ৫২, দলপতি মহেন্দ্র সিং ধোনি ৩৩ রান করেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল মুরালি প্রথম ইনিংসে ১৭ ওভারে ৬৩ রান দিয়ে তুলে নেন ৫টি উইকেট।

ফলোঅনে ব্যাটিংয়ে নেমে শচীন ৮৪, দ্রাবিড় ৪৪, শেওয়াগ ৩১, লক্ষন ৬৯ রান করলে ভারত অলআউট হয় ৩৩৮ রানের মাথায়। ৪৪.৪ ওভারে ১২৮ রান দিয়ে মুরালি তুলে নেন ঠিক তিনটি উইকেট, স্পর্শ করেন ৮০০ উইকেট। ৯৫ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে পারানাভিতানা ২৩ এবং দিলশান ৬৮ রানে অপরাজিত থেকে দলকে ১০ উইকেটের জয় পাইয়ে দেন।

আটটি উইকেট নিয়ে মুরালি ৮০০ উইকেটের মাইলফলক পূর্ণ করতে পারবেন কি না—সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল ক্রিকেট বিশ্ব। অবশেষে সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ৮০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন শ্রীলঙ্কার এই স্পিন জাদুকর। অথচ ম্যাচের প্রথম দিন বৃষ্টির কারণে ২২ ওভার খেলা কম হয়। আর দ্বিতীয় দিন তো বৃষ্টির কারণে একটি বলও মাঠে গড়ায়নি। ভাগ্যবিধাতা মুরালির পাশে নেই ভেবে যারা খেলা দেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাদের জন্য চমক হয়ে আসে ম্যাচের তৃতীয় দিনটি। তৃতীয় দিনে বল হাতে মাঠে নেমে শচীন টেন্ডুলকারকে আউট করে স্বপ্নপূরণের পথে প্রথম ধাপে পা রাখেন মুরালি। চতুর্থ দিনে তিনি চারটি উইকেট নিলে ফলোঅনে পড়ে ভারত।

ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে আরও একটা উইকেট নিয়ে ৭৯৮ উইকেট নিয়ে চতুর্থ দিন শেষ করেন মুরালি। ম্যাচের শেষ দিনে তার দরকার ছিল মাত্র দুটি উইকেট। পঞ্চম দিনে হরভজন সিং আর প্রজ্ঞান ওঝাকে আউট করে শেষ পর্যন্ত স্পর্শ করেন ৮০০ উইকেটের মাইলফলক। এমন একটা জায়গায় পৌঁছে টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ করেছেন এই শ্রীলঙ্কার স্পিন জাদুকর, যেখানে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এর আগে আর কারো পা পড়েনি। বিশ্বের প্রথম বোলার হিসেবে টেস্টে ৮০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েই দীর্ঘ ১৮ বছরের টেস্ট জীবন শেষ করেন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের এই লিজেন্ড।

১৩৩ টেস্টে সর্বোচ্চ ৮০০ উইকেটের পাশাপাশি ওয়ানডেতেও সর্বোচ্চ ৫৩৪ উইকেট দখলের রেকর্ড মুরালিধরনেরই। টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক অস্ট্রেলিয়ার লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন (৭০৮)। ওয়ানডেতে ৫০২ উইকেট নিয়ে মুরালির পেছনে পাকিস্তানের কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম। মুরালির রেকর্ড অদূর ভবিষ্যতে কেউ ছুঁতে পারবে এমন বোলার এখন দূরবীন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না।

সারাবাংলা/এমআরপি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন