সোমবার ২৬ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ১১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

কলঙ্ক বাড়ছে: চাঁদের পিঠে বমি-পায়খানা, শত আবর্জনা

জুলাই ২৩, ২০১৯ | ৪:১৮ অপরাহ্ণ

আড়চোখে ডেস্ক

মানুষ যেখানেই যায়, হাতে-পায়ে এটা সেটা এদিক ওদিক ছুঁড়ে ফেলে। এ অভ্যাস যেনো মজ্জাগত! আর সে অভ্যাসের নমুনা মিলেছে সুদুরের চাঁদেও। চাঁদের কলঙ্ক আছে সে কথা বলা হয়, কিন্তু সেখানে ময়লা, বর্জ্য আর ব্যবহার্য জিনিষাদি ফেলে কলঙ্ক বাড়ানোর কীই মানে আছে। কিন্তু সে কাজটিই হয়েছে।

আচ্ছা চাঁদে আর কটি মানুষই এ পর্যন্ত পা ফেলেছে? কিন্তু সেই চাঁদের দেশে এই কটি মানুষ এ পর্যন্ত অন্তত ৭৯৬টি বস্ত-সামগ্রী ফেলে এসেছেন। হ্যাঁ যেই দেশের নভোচারীরা যাবেন তারা নিজ দেশের পতাকা নিশ্চয়ই উড়িয়ে আসবেন। কিন্তু তাই বলে পকেটের ডলার, পায়ের জুতো এগুলো কেনো ফেলে আসতে হবে। তবে এই সব সামগ্রীর মধ্যে অধিকাংশই নাকি ফেলে এসেছেন আমেরিকান মিশনসমূহের নভোচারীরা।

নাসার অফিসিয়াল ক্যাটালোগে প্রকাশিত তালিকামতে এ পর্যন্ত ৭৯৬টি বস্তু চাঁদের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যার মধ্যে ৭৬৫টিই ফেলে আসা হয়েছে আমেরিকান বিভিন্ন মিশনের সময়। এর মধ্যে ছোট্ট এক জোড়া নোখের ক্লিপ যেমন রয়েছে তেমনি একটি গোটা লুনার রোভারও রয়েছে। যা অভিযানে গিয়ে চাঁদের দেশে আছড়ে পড়ে অকেজো পড়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

এ সবের কারণে চাঁদের পৃষ্ঠদেশ এখন আর আগের মতো নেই। নতুন ম্যাপ এসব বস্তু-সামগ্রীর চিহ্ন দেখাচ্ছে বলেই জানাচ্ছে নাসা।

ছবির ম্যাপটিতে দেখুন যেসব ডট একটু স্পষ্ট চোখে পড়ছে সেগুলো অপেক্ষাকৃত বড় বড় সামগ্রী। যার মধ্যে নভোযানও রয়েছে বেশ কয়েকটি। সেগুলো নভোচারীবিহীন ভ্রমণে চাঁদের দেশে পাড়ি জমিয়ে আর ফিরে আসেনি। ১৯৬০ এর দশকে এই নভোযানগুলো চাঁদের ছবি তোলার মিশনে গিয়েছিলো। নাসা জানে এর মধ্যে অন্তত তিনটি নভোযান চাঁদের পিঠে আছড়ে পড়ে আর ফিরতে পারেনি।

সেগুলোতো ছিলো মনুষ্যবিহীন অভিযান। কিন্তু মানুষ নভোচারী নিয়ে যখন চন্দ্রাভিযান হলো তখন তারাও কিন্তু মিশন শেষ করে যখন ফিরলেন, এটা সেটা ওটা ফেলে আসলেন চাঁদের পিঠে।

ছবিতে দক্ষিণ মেরুর দিকের যে ডটগুলো দেখা যাচ্ছে ওগুলো মুলত রোবোটিক নভোযান এলসিরস (লুনার ক্র্যাটার অবজারভেশন অ্যান্ড সেন্সিং স্যাটেলাইট) এর ধ্বংসাবশেষ। এটি ছিলো ২০০৯ সালের একটি অভিযান। চাঁদের উভয় মেরুতে বরফের অস্তিত্ব আছে কি না তা দেখতেই ছিলো এই অভিযান। নভোযানটি ইচ্ছাকৃতভাবেই চাঁদের পিঠে বিধ্বস্ত হয়, যাতে পৃষ্ঠদেশ থেকে ধুলোগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে আসে। ওই ধুলোর রাজ্য থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে তা পৃথিবীতে পাঠাতে পারে। সেবার সেই তথ্যের ভিত্তিতেই জানা গেলো চাঁদে পানি আছে। কিন্তু নভোযানের ধ্বংসাবশেষ থেকে গেলো চাঁদের পিঠেই।

এটা হয়তো এড়ানো যেতো না। কিন্তু অ্যাপোলোর ছয়টি মিশনে নভোচারীরা চাঁদে নেমে যে ময়লা-আবর্জনা ফেলে এসেছেন তার কী হবে? সেসব কিছুর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে এই ম্যাপ।

ম্যাপের প্রতিটি ডটই একটি বস্তু বা সামগ্রীর অবস্থান নিশ্চিত করছে। এ থেকেই বুঝা যায়, কত্ত কিছু আমরা ফেলে এসেছি চাঁদের পিঠে। একটি বিষয় প্রায় সব মিশনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নভোচারীরা তাদের বহনযোগ্য লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম (পিএলএসএস) গুলো ফেলে এসেছেন। এসব পিএলএসএস-এ ছিলো ব্যাটারি, রিমোট কন্ট্রোল, ভাল্ভ। এছাড়াও রয়েছে ক্যামেরা (স্টিল ও ভিডিও), সেগুলোর প্রতিটির সাথে ছিলো লেন্স, কেবল, মাউন্ট, ট্রিগার ও হ্যান্ডল। যা সব রয়ে গেছে চাঁদে।

প্রতিটি মিশনেরই বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাদি হয়। তার মানে হচ্ছে নভোচারীরা সঙ্গে নিয়েছিলেন ম্যাগনেটোমিটার, সিসমিক এক্সপেরিমেন্ট, সাপ্রাথারমাল আয়ন ডিটেক্টর এবং আরও অনেক কিছু। ড্যাটা সংগ্রহের পর সেগুলো সাথে করে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন বোধ করেননি কোনও নভোচারীই।


এরপর রয়েছে শারীরিক কিছু সমস্যা। এটা সত্য নভোচারীরা চেষ্টা করেছেন পায়খানা-প্রশ্রাব না করে থাকার। কিন্তু কেউ কেউ প্রকৃতির ডাকে শেষ পর্যন্ত সাড়া না দিয়ে পারেননি। তখন তারা এই পায়খানা প্রশ্রাব হয়তো চাঁদের মাটিতে করেননি, কিন্তু কিছু পট বা ডিভাইস ব্যবহার করেছেন, সেগুলো ফেলে আসা হয়েছে চাঁদের পিঠে। অভিযানে নভোচারীরা বমি করবেন, সেটা ধরেই নেওয়া হয়। আর সেজন্য বমি করার বিশেষ ব্যাগ সাথেই থাকে। সেগুলো পূর্ণ করে তাও ফেলে আসা হয়েছে চাঁদের দেশে।

এগুলো যে সরাসরি চাঁদের মাটিতে ফেলা হয়েছে তা নয়। নভোচারীরা হয়তো প্রথমে তা নভোযানের ভেতরে কোনও গার্বেজ মডিউলের ভেতরেই ফেলেছিলেন। কিন্তু ফেরার পথে নভোযানটিকে আরেকটু হালকা করে নিতে সেসব মডিউল ধরে ধরে ফিকে মেরেছেন চাঁদের পিঠে।

আরও কিছু বস্তু চোখে পড়ছে জরিপকারীদের। যেমন হাতুরি একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। এমনকি চাঁদেও তার প্রয়োজন ছিলো, স্বল্প আপেক্ষিকতায় ওজনদার হাতুরি অনেকটা উপযোগী। ফলে অভিযানে হাতুরি থাকলেও ফেরার সময় তা হাতে করে আনার প্রয়োজন বোধ করেননি অধিকাংশ নভোচারীই। এর বাইরেও তারা ফেলে এসেছেন মেমোরি ডিস্ক, লেজার এগুলো। একটি বিশেষ আয়না রয়েছে যার প্রতিবিম্ব ফেলে চন্দ্রাভিযানে বিশেষ পরীক্ষা চালানো হয়। অ্যাপোলো ১১, ১৪, ১৫ তিন অভিযানেই এর ব্যবহার ছিলো, যা ফেরার সময় ফেলে এসেছেন নভোচারীরা। চাঁদে কোনও ইলেক্ট্রিক্যাল আউটলেট নেই, সুতরাং কিছু কিছু গ্যাজেটে বিদ্যুৎশক্তি পেতে নভোচারীরা নিয়ে যান রেডিওআয়সোটোপ থারমাল জেনারেটর। যার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্লুটোনিয়াম। সেগুলোও পড়ে আছে চাঁদের পিঠে।

এসবের বাইরেও পড়ে রয়েছে সেই পরিচিত ফাঁপা গ্লাভস, সাদা কাগজ যা ক্যামেরার কালার অ্যাডজাস্ট করার জন্য খুব প্রয়োজন, পানি পানের বিশেষ ডিভাইস (শুণ্যতার জন্য চাঁদে চুমুক দিয়ে পানি পান করা যায় না তাই)।

আচ্ছা চাঁদ তো কোনও সমুদ্রপাড়ের রিসোর্ট নয়। সেখানে কাপড়ের ঝোলনা (হ্যামোক) কেনো থাকবে? তাও আছে। তবে ওগুলো হয়তো চাঁদের পিঠের জন্য নয়, নভোযানে আরাম করার জন্যই নিয়েছিলেন নভোচারীরা। তবে ফেরার সময় ঠিকই ফেলে এসেছেন।

এর বাইরে গলফ’র বল রয়েছে। চাঁদের দেশে গিয়ে সে চেষ্টাও করে দেখেছেন নভোচারীরা। শুধুই কী কাজ করবেন? সময় কাটাতে তাদের মজাদার কিছুওতো করতে হবে! তবে ফেরার সময় আনতে ভুলে গেছেন। পৃথিবীতে ওগুলো ঢের আছে সে জন্যই হয়তো!

সে না হয় হলো… তাই বলে বর্ষা (জেভলিন) ও! কেউ চাঁদে এই ধারালো লম্বা বস্তুটি নিয়ে যাবেন এমনটা ভাবা যায় না। তবে একজন নভোচারী লম্বাটে এমন একটি বস্তু চাঁদের পিঠে দাঁড়িয়ে ছুড়ে মারার চেষ্টা করেছিলেন এটা দেখতে যে সেটা কতদূর যায়। সেটিই ছিলো চাঁদের পিঠে প্রথম বর্ষা নিক্ষেপ।

কিছু বস্তু রয়েছে যা দেখে ফালতু মনে হবে। যেমন একটি ট্রাউজার। চাঁদের অভিযানে গিয়ে এই কাপড় পরার সুযোগ নেই। তাদের বিশেষ যে কাপড় পড়তে হয় সেটি বিশেষ স্পেসস্যুট। যার ভেতর পানিভর্তি ছোট ছোট ছোট টিউব থাকে যা শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে। তাহলে কোন নভোচারী কোন খেয়ালে তার ট্রাউজারটি নিয়ে গেলেন আর ফেলে এলেন বোধগম্য নয় নাসার জরিপকারীদের।

আরও যা কিছু পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে একটি ফেলে আসা মডিউলের ড্যাশবোর্ডের উপরে রাখা একটি বাইবেল, কিছু ছবি, একটি দুই ডলারের নোট, কিট বক্স, মেডাল, পারিবারিক ছবি, চিত্রকর্ম, প্ল্যাস্টিক সামগ্রি, ব্যক্তিগত আয়না, সাবান, অয়েন্টমেন্ট টিউব ইত্যাদি।

কেনো নভোচারীরা এসব ফেলে এলেন? সে প্রশ্নের কোনও উত্তর নাসার কাছে নেই।

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন