array(4) {
  [0]=>
  string(67) "https://sarabangla.net/wp-content/uploads/2019/07/Inner_1-30x23.jpg"
  [1]=>
  int(30)
  [2]=>
  int(23)
  [3]=>
  bool(true)
}
array(4) {
  [0]=>
  string(67) "https://sarabangla.net/wp-content/uploads/2019/07/Inner_3-30x23.jpg"
  [1]=>
  int(30)
  [2]=>
  int(23)
  [3]=>
  bool(true)
}
array(4) {
  [0]=>
  string(67) "https://sarabangla.net/wp-content/uploads/2019/07/Inner_2-30x23.jpg"
  [1]=>
  int(30)
  [2]=>
  int(23)
  [3]=>
  bool(true)
}
করসেটে বন্দি নারীর সৌন্দর্য

বিজ্ঞাপন

করসেটে বন্দি নারীর সৌন্দর্য

July 26, 2019 | 2:54 pm

 

রাজনীন ফারজানা

নারীর সৌন্দর্য কিসে? ফর্সা নিদাগ ত্বক আর সুডৌল বাঁকযুক্ত শরীরে?

বিজ্ঞাপন

১৮৩৭-১৯০১ সময়কালকে বলা হয় ভিক্টোরিয়ান যুগ। এই সময়ে বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে পাওয়া মুনাফা এবং ব্রিটেনের  শিল্পবিপ্লবের ফলে একটি বড় আর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। অন্যদিকে সমাজে দরিদ্র লোকের সংখ্যাও কম ছিল না, যাদের জীবনধারণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হতো।

কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন না থাকায় ধনী শ্রেণির জীবনযাপনে বিলাসিতা আর কৃতিমতার প্রভাব পড়ে। অভিজাত নারীরা নিজেদের ছবির মত সুন্দর দেখাতে কোমরে পরত চাপা করসেট আর ত্বকে লাগাতো এনামেল পেইন্ট।

বিজ্ঞাপন

এখনকার যুগে টেলিভিশন ও সিনেমার পর্দা ছাড়াও ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে একধরণের তারকা সমাজ গড়ে উঠেছে। এই তারকাদের অনেকেই ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রচলিত কিছু সৌন্দর্যচর্চা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে করসেটের ব্যবহার। করসেট একধরনের তারের তৈরি আঁটসাঁট বেল্ট জাতীয় পোশাক। এর মাধ্যমে বুকের খাঁচা ও কোমরের আকার নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

করসেট

কোমর চিকন আর নিতম্ব ও বুক চওড়া দেখাতে ভিক্টোরিয়ান যুগে এত আঁটসাঁট করে করসেট পরা হত যে অনেক নারীর শরীরের ভেতরের হাড় বেঁকে যেত। সম্প্রতি বিখ্যাত ফ্যাশন মিট আপ মেটগালায় কিম কারদাশিয়ান এমন চাপা করসেট পরে আলোচনায় আসেন। তাছাড়া শরীরের অস্বাভাবিক বাঁক ধরে রাখতে প্রায়ই তাকেসহ অনেক তারকাকেই ভিক্টোরিয়ান নারীদের মত করসেট পরতে দেখা যায়। এটা একজন নারীর স্বাভাবিক চলাফেরা ও জীবনযাপনের জন্য কতটা উপযোগী তা নিয়েও চলছে আলোচনা।

শক্ত ধাতব তারের খাঁচায় বন্দি শরীর আর নানা রঙের প্রলেপের নিচে ঢাকা ত্বকের আসল রঙ- বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় তারকাদের প্রচারিত নারীর আদর্শ সৌন্দর্য। নারীর সৌন্দর্যের সীমারেখা নির্ধারণের এই চেষ্টা কী নতুন কিছু নাকি অতীতের কোনো এক সময়ের প্রচলিত রীতির নতুন করে ফিরে আসা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন লন্ডনে বসবাস করা ফ্রিল্যান্স ফরাসি সাংবাদিক ম্যারি লা কন্তে। সারাবাংলার পাঠকদের জন্য গার্ডিয়ান থেকে সেই উত্তরের ভাষান্তর করেছেন রাজনীন ফারজানা।

পোশাক এতই আঁটসাঁট যে, একজন মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা-ওঠাবসাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে লম্বা নখের জন্য হাত দিয়ে স্বাভাবিক কাজ করতেও বহু কসরত করতে হয়।

কিম কারদাশিয়ান ওয়েস্ট-কিপিং আপ উইথ দ্য কারদাশিয়ান নামক জনপ্রিয় আমেরিকান রিয়েলিটি শো’র তারকা। তিনি একটা চেয়ারে কোনো রকমে বসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। চেয়ারের হাতলে দুই হাতে ভর দিয়ে শরীরের নিম্নাংশ কোনো রকমে চেয়ারের কুশনে রাখার চেষ্টা করছেন। মূর্তির মতো নিখুঁত শরীর তার। অস্বাভাবিক ভারী নিতম্বের ওপর ততোধিক সরু কোমর। কীভাবে সম্ভব সেটা ভেবে অবাক হওয়ার আগে জেনে নিন, পোশাকের নীচে থাকা ত্বকের রঙের সঙ্গে তিনি আসলে মিলিয়ে পরেছেন আঁটসাঁট করসেট।

ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি একজন অ্যানাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘অ্যানা, রাতের খাবারের জন্য বসতে না পারার কারণ দেখতেই পাচ্ছো। আমি হাঁটা-চলা, ঘোরাফেরা সবই করতে পারবো কিন্তু কিছুতেই বসতে পারবো না।’ বলতে বলতে বসার চেষ্টা করলেন কিম, কিন্তু পারলেন না। যেটা পারলেন সেটা অ্যানার উদ্দেশে বলা পরের বাক্যেই প্রকাশ পায়- ‘আমি শুধুমাত্র হাফ সিট বা অর্ধেক বসতে পারবো।’

এই ঘটনা চলতি বছরের মে মাসের মেট-গালা অনুষ্ঠানের। প্রতি বছর নিউইয়র্ক সিটির আর্টস কস্টিউম ইনস্টিটিউটটের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের জন্য বার্ষিক চাঁদা তোলার উৎসবই হচ্ছে মেট গালা। একে আনুষ্ঠানিকভাবে কস্টিউম ইনস্টিটিউট গালা বা মেট বল নামেও ডাকা হয়। এই অনুষ্ঠানেই কিম এসেছিলেন থিয়েরি মাগলারের ডিজাইন করা জলকন্যা থিমের বডিকন গাউন পরে। এই পোশাকে কিমের বসতে না পারার সেই ভিডিও ৭ মে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে ২১ মিলিয়ন বারেরও বেশি।

কিম যেমন অস্বাভাবিক চাপা পোশাক পরে ঠিকমতো বসতে পারছিলেন না, তেমনই একটি ঘটনা ঘটে এর কয়েক সপ্তাহ পর। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিনার পার্টিতে রাতের খাবার খাওয়ার সময় জ্ঞান হারিয়ে চেয়ার থেকে পড়ে যান অভিনেত্রী এল ফ্যানিং। তার পরনে ছিল প্রাডার তৈরি একটি ভিনটেজ গাউন। অস্বাভাবিক আঁটসাঁট এই গাউনের নিচে এলাও পরেছিলেন ততোধিক চাপা করসেট।

বিষয়গুলো শুধুমাত্র নারীর আদর্শ শারীরিক গঠন অথবা নারী শরীরের আকর্ষণীয় গঠনের সীমানা ব্যাপকভাবে সীমিত করাই নয়।

চলতি মাসের শুরুর দিকে কিম কারদাশিয়ানের ছোট বোন কাইলি জেনার ইনস্টাগ্রামে নিজের নখের ছবি পোষ্ট করেন। নখের উপর অ্যাক্রিলিক দিয়ে টাই-ডাই করা। কিন্তু বিষয়টা নখের রঙ বা ডিজাইনের নয়, নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা (অ্যাবসার্ডলি লং)।

তবে, কত লম্বা হলে তাকে অস্বাভাবিক লম্বা বলা যায়? কারণ মানুষের নখ কতটা লম্বা হবে তার আন্তর্জাতিক কোনো মানদণ্ড তো নেই। কিন্তু কারও নখ যদি আঙুলের মাথা থেকে এক ইঞ্চি লম্বা হয়, তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সেই ব্যক্তির পক্ষে দৈন্দন্দিন কাজকর্ম ঠিকভাবে করা সম্ভব না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অসংখ্য মেয়ের লম্বা লম্বা সুদৃশ্য নখের ছবি চোখে পড়বে। এসব দেখতে দেখতে মনে হবে, অসম্ভব চাপা পোশাক (পরিধানকারীর স্বাভাবিক নড়াচড়া করতেও সমস্যা) আর স্বাভাবিক কাজের অযোগ্য লম্বা নখের মধ্যেই যেন নারীত্ব আটকা পড়েছে। ব্যাপারটা শুধু নারী শরীরের আদর্শ মাপের সীমানায় আটকে নেই, এর সঙ্গে শ্রমবিভাজন আর সামাজিক অবস্থানের তারতম্যের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঠিক যেন ভিক্টোরিয়ান যুগের মতোই।

শুধু কারদাশিয়ান আর জেনার বোনেরাই নয়, ইনস্টাগ্রামে কিছুক্ষণ নজর দিলে হুবহু তাদের মতো এমন অসংখ্য নারীর দেখা মিলবে। এদের সবার চেহারার অস্বাভাবিক সাদৃশ্য কিছুটা অস্বস্তিতেই ফেলে। মনে করিয়ে দেয় ভিক্টোরিয়ান যুগের সৌন্দর্যের কথা, যা কয়েকশ বছর আগেই বিলীন হয়েছে। বর্তমানের সঙ্গে পার্থক্য বলতে অতিরিক্ত ফোলা ঠোঁট আর হরিণের মতো চোখের আকার। সেযুগে নারীকে সুন্দর হতে গেলে প্রায় মৃত মানুষের পর্যায়ে পৌঁছানো লাগত। শুধু ছল ছল করা বড় চোখই নয়, দরকার ছিল পাতলা আর সাদা ত্বক, সঙ্গে অসম্ভব চিকন ভঙ্গুর শরীর।

অ্যালেক্সিস কার্লের গবেষণা ভিক্টোরিয়ান যুগের সৌন্দর্য নিয়ে। এই বিষয়ে তার কিছু মজার  বক্তব্য আছে। তিনি বলেন, সেযুগে ফ্যাঁকাসে ত্বককে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হত। এর সঙ্গে ‘পবিত্রতা’, ‘নিষ্পাপতা’, ‘সুস্বাস্থ্য’ আর ‘সৌন্দর্য’ জড়িত ছিল। অভিজাত ও ধনী নারীদের ত্বকের রঙ সাদা হতেই হবে যাতে বোঝা যায় যে তারা কাজের জন্য বাইরে যায় না। সেযুগেও ধনী নারীদের নিজেদের সৌন্দর্য যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক দেখানোর জন্য অনেক কৃত্রিমতার সাহায্য নিতে হতো।

আমেরিকান শিল্পী জন সিঙ্গার সার্জেন্টের আঁকা মাদাম এক্স এ অমর হয়েছেন প্যারিসের অভিজাত নারী ভার্জিনিয়া গত্র। ছবিতে ভার্জিনিয়াকে দেখলেই মনে হয় তিনি কোনোরকমভাবে বেঁচে আছেন।

কার্ল বলেন, নিজেকে ফ্যাঁকাসে দেখাতে কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতেন তিনি। হাতের শিরা উপশিরাগুলো যাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাই সেগুলোতে প্রথমে এনামেল পেইন্ট করতেন তারপর ইন্ডিগো ডাই (নীলের সাহায্যে রঙ করা) করতেন।

কার্ল বলেন, ‘সেযুগের সৌন্দর্যের মাপকাঠি অনুযায়ী সাজগোজে ভীষণ দক্ষ ছিলেন ভার্জিনিয়া। তাকে দেখলে জীবন্ত শিল্পকর্ম বলে ভ্রম হত।’ এনামেল ত্বকে একধরণের ফাউন্ডেশন হিসেবে কাজ করত। এটা দিয়ে ত্বক রাঙানো ভিক্টোরিয়ান যুগের নারীরা মুখে কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন না। তাদের ভাব ছিল এমন যেন, হাসি, কান্না বা অন্য কোনো আবেগের প্রকাশে তাদের চেহারা পুতুলের মত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

এসময়ের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান কিপিংআপ উইথ দ্য কারদাশিয়ানের এক পর্বের একটি দৃশ্যের কথা বললে উপরোক্ত ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্য বোঝা যাবে। এখানে দেখা যায় কিম কারদাশিয়ান বলছেন, ‘দিনের শেষে আমি আজ কাঁদবো যখন আমার মুখে সদ্য লাগানো মেকআপ থাকবে না।’

ভিক্টোরিয়ান যুগের এমন অনেক সৌন্দর্যচর্চার সঙ্গেই এখনকার সময়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তারকাদের সৌন্দর্যচর্চার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। পার্থক্য বলতে, এ যুগের নারীদের সামাজিক অবস্থান ও জনসম্মুখে অবস্থান ধরে রাখার জন্য অর্থ উপার্জন করতে হয়।

ভিক্টোরিয়ান যুগের অভিজাতদের মতোই এখনকার যেসব নারী করসেট পরছেন বা লম্বা নখ রেখে অ্যাক্রিলিক পেইন্ট করছে তারা আসলে নিজেদের সামাজিক অবস্থান কতটা উঁচুতে সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তাদের মত সামাজিক অবস্থানের নারীদের জীবনধারণ ও সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার জন্য কোনরকম শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়না। বা কাজ করতে হলেও সেটা খুব একটা লম্বা সময়ের জন্য নয়। ঠিক ভিক্টোরিয়ান যুগের অভিজাত নারীদের মতোই কথায় কথায় তারা জানায় যে, তারা কত অল্প কাজ করে। কিন্তু নিজেদের নিখুঁত দেখাতে তারা কতটা সময় সাজগোজের পেছনে ব্যয় করে। টাকা উপার্জনের জন্য তাদের কোনো কাজের দরকার নেই কারণ সৌন্দর্যই তাদের পেশা। চেহারা এবং শরীরই তাদের অর্থ উপার্জনের মাধ্যম।

 

করসেট

 

তাও ভালো সেই যুগ পেছনে ফেলে এসেছি, যখন হাড় জিরজিরে শরীরের তারকারা কসমোপলিটন ম্যাগাজিনকে নিজেদের শুকনো থকার রহস্য হিসেবে পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা বলতেন। বলতেন যে, জিনগত কারণেই ইচ্ছামত খাবার খেলেও তারা মোটা হন না। পাঠকরা জানত এগুলো মিথ্যা, তবুও তারকারা এগুলো বলেই যেত। কারণ, নিজেকে নিখুঁত দেখানোর আন্তরিক চেষ্টা প্রশংসাযোগ্য হলেও এর প্রভাব খুব একটা সুখকর নয়। কারও জীবনের লক্ষ্যই যদি হয়, মাদাম এক্সের মত নিখুঁত দেখানো, সেটা অর্জন করতে সেই ব্যক্তি কী কী করবে তার কোনো সীমারেখা নেই।

কাইলির নখের কথা বলতে গিয়ে বলতে হয়, এই কেতাদুরস্ত ব্যক্তিদের অবস্থান বুদবুদের মত ক্ষণস্থায়ী নয়। এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিপুল সংখ্যক নারী, বিশেষত অল্পবয়সী মেয়েরা এদের প্রতিটা পদক্ষেপ অনুসরণ করে। এদের ব্যাপক উপস্থিতি আমাদের অনেকের ওপর নিজেদের শরীরকে বিক্রয়যোগ্য পণ্য বানানোর একটা অবাস্তব চাপে ফেলছে।

আমরা অন্যান্য নিরপরাধ আভিজাত্যের প্রদর্শনের প্রতি বিরক্তি দেখালেও যেসব নারীরা নিজেদের নিখুঁত দেখাতে উদ্ধত পদক্ষেপ নেয় তাদের নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলি না। ভিক্টোরিয়ান যুগের সৌন্দর্যের মাপকাঠি যা সময়ের সঙ্গে বিলীন হয়ে গিয়েছিল, তা এযুগের নারীদের জন্য কতটা উপকারী তা নিয়ে আলোচনার সময় বোধহয় এসেছে।

সারাবাংলা/আরএফ/এসএমএন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন