বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৭ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

দেশের অর্থনীতি বিনির্মাণে কাজ করছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক

আগস্ট ৪, ২০১৯ | ১০:০২ পূর্বাহ্ণ

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড বাংলাদেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। ১৯৯৯ সালের ১১ মে ব্যাংকটির যাত্রা শুরু। শুরু থেকেই ব্যাংকটি আমানত গ্রহণ, ঋণ প্রদান, আমদানি অর্থায়ন, রফতানি এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স সেবাসহ সবধরনের বাণিজ্যিক ব্যাংকিং পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যাংকটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছয়টি এসএমই সার্ভিস সেন্টার চালু করেছে। পাশাপাশি কৃষি ও পল্লী উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে আসছে। এর বাইরেও মার্চেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সহায়তাও করছে তারা। ব্যাংকটি এরই মধ্যে অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম, এটিএম ও ডেবিট কার্ড চালু করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বিভিন্ন দিক নিয়ে সারাবাংলাডটনেটের সঙ্গে কথা বলেছেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মামুন-উর-রশিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা টুটুল রহমান। তাদের কথোপকথনের গুরত্বপূর্ণ অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

সারাবাংলা: স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা কি?

মামুন-উর-রশিদ: বেসরকারিখাতের একটি ব্যাংক হিসেবে আমরা ভালোই এগিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের আমানতের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ঋণ দেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি বিনির্মাণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

সারাবাংলা: বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোন কোন খাতকে আপনারা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

বিজ্ঞাপন

মামুন-উর-রশিদ: আমরা আসলে শিল্পখাতকে গুরুত্ব দিচ্ছি বেশি। এছাড়াও এসএমই, গার্মেন্টস খাত, টেক্সটাইল মিলস এবং স্পিনিং মিলও আছে। এসব খাতে আমরা ভালো সাপোর্ট দিচ্ছি। এছাড়াও বর্তমানে প্রচুর ডেভেলপমেন্ট কাজ হচ্ছে। এই সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করছে। রাস্তা হচ্ছে, ব্রিজ হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে বিশেষ করে ঠিকাদারি অর্থায়নে প্রচুর কাজ হচ্ছে। আমরা সেগুলো করে যাচ্ছি। ঠিকাদারদের ভালো সাপোর্ট দিচ্ছি আমরা। এছাড়াও এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট তো রয়েছেই। এর বাইরে কমোডিটি গুডস ইমপোর্টকে সহযোগিতা করছি। সহযোগিতা করছি ছোট ছোট দোকান ও ইন্ডাস্ট্রি যারা করছে- তাদেরকেও। আমাদের ২০ ভাগ গ্রাহক হচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণের (এসএমই)

সারাবাংলা: ব্যাংকিং সেবার মান বাড়াতে আপনারা কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মামুন-উর-রশিদ: এক্ষেত্রে আমরা বিকল্প ডেলিভারি চ্যানেল এটিএম সার্ভিস ও পশ মেশিন বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছি। এরই মধ্যে আমরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ১২০টি এটিএম বুথ স্থাপন করেছি। এতে গ্রাহকদের এখন আর ব্যাংকে আসতে হয় না। তারা বাসার পাশেই এখন এটিএম সেবা পাচ্ছেন। যাদের কম টাকা প্রয়োজন তারা সেখান থেকে তুলে নিচ্ছেন। এতে গ্রাহকদের সময় সাশ্রয় হচ্ছে। তবে কিছু কাজ আছে, যা ব্যাংকে না আসলে হয় না। এই জন্য হয়তো মাঝে-মধ্যে তাদের আসতে হচ্ছে। তারপরও ব্রাঞ্চগুলোকে আমরা গ্রাহকদের সমানভাবে সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছি। গ্রাহকরা যেন ডিসকমফোর্ট ফিল না করে, সে জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছি। এছাড়াও আমরা বিভিন্ন প্রোডাক্ট মার্কেটে ছেড়েছি। বিভিন্ন ক্যাটাগরির মানুষের জন্য আমাদের প্রায় ১৭টি ডিপোজিট প্রোডাক্ট রয়েছে। এর মধ্যে মহিলাদের জন্য আছে, আছে বয়স্কদের জন্যও। এছাড়া স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্যও আমাদের ডিপোজিট প্রোডাক্ট রয়েছে। আমাদের বিশেষ একটা প্রোডাক্টের নাম হচ্ছে ‘বন্ধন’। যেটা আমরা আন্ডার প্রিভিলেজ বস্তিবাসীদের সঞ্চয়ের জন্য করেছি। এই বন্ধন স্ক্রিমে গরীব মানুষেরা টাকা সঞ্চয় করতে পারবে। এজন্য তাদের কাছ থেকে ধরনের চার্জ নেওয়া হয় না। এতে করে আন্ডার প্রিভিলেজ ও নিম্নআয়ের মানুষ ব্যাংকিংয়ের সুযোগ পাচ্ছে। এতে ভালো সাড়া মিলছে। আমরা চিন্তা করছি এটার প্রচার একটু বাড়াবো। এতে আরও বেশি মানুষ যুক্ত হতে পারবে।

সারাবাংলা: প্রযুক্তির ব্যবহারে আপনারা কতটা আধুনিক বা এগিয়ে?

মামুন-উর-রশিদ: প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা খুবই আধুনিক। বর্তমানে আমরা কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে অ্যানি ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং চালু করেছি। অ্যানি ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং হচ্ছে- ধরুন আপনি চট্টগ্রামের কাস্টমার, এখন যদি চান তেঁতুলিয়া থেকে টাকা তুলবেন- ইউ ক্যান। আবার তেঁতুলিয়া থেকে যে কেউ আপনার একাউন্টে টাকা জমা দিতে পারবে। এতে নমিনাল একটা চার্জ আছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো করেছে যেমন- বিএফটিএন, আরটিজিএস, ইলেক্ট্রনিক্স ফান্ড ট্রান্সফার; সেখানেও আমরা সদস্য। সাইবার সিউিরিটির জন্য আমাদের তো ফায়ার ওয়াল আছে। নিজস্ব সিকিউরিটি সিস্টেম আছে। আমাদের যে কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার, তারও নিজস্ব একটা সিকিউরিটি সিস্টেম আছে। এরপরেও সেকেন্ডারি ফায়ার ওয়াল ও সিকিউরিটি সিস্টেম চালু করেছি। যাতে আমাদের সিস্টেমটা নিরাপদ থাকে।

সারাবাংলা: খেলাপি ঋণের কি অবস্থা? এটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে আপনাদের পদক্ষেপ কি

মামুন-উর-রশিদ: খেলাপিঋণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই সমস্যা শুধুমাত্র ব্যাংকগুলো চাইলেই সমাধান হবে না। এর জন্য যিনি খেলাপি হয়েছেন তারও উদ্যোগ লাগবে- আসলে সে খেলাপি থাকতে চায় কিনা বা এটা থেকে বাঁচতে চায় কিনা। তারপরও আমাদের আইনগত সহায়তায় জটিলতা রয়ে গেছে। এই আইনি জটিলতাগুলো দূর করতে হবে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের মিটিং ও ‘ল কমিশন’-এ দাবি তুলেছি যে, হাইকোর্টে আমাদের জন্য আলাদা একটা বেঞ্চ করা হোক; যাতে চলমান মামলাগুলো দ্রুত নিস্পত্তি হয়। মামলা দ্রুত নিস্পত্তি হলে খেলাপি ঋণের হার অনেক কমবে। মামলা দেরি হওয়ার কারণে গ্রাহকরাও ধানাই-পানাই করে, টাকা ফেরত দিতে চায় না। তার মানে একটা সার্বিক সংস্কার প্রয়োজন। আর এর জন্য প্রয়োজন আলাদা একটা বেঞ্চ। তবে সরকার বর্তমানে ভালো একটা সুবিধা দিয়েছে। ঋণের দুই শতাংশ জমা দিয়ে রি-শিডিউল করা। কিন্তু সেটার যেন অপব্যবহার না হয়।

সারাবাংলা: অনেকেই সমালোচনা করে বলছেন, রি-শিডিউল সুবিধা দেওয়ার কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে আপনারা কি মনে করছেন?

মামুন-উর-রশিদ: ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানে ব্যাংকের ওপর নেতিবাচক একটা প্রভাব পড়বে। আমরা যদি তাকে একটা এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড দিই তাহলে সে কোনো রি-পেমেন্ট করবে না। আমাদের কাছে কোনো টাকা ফেরত আসবে না। টাকা যদি ফেরত করে না আসে তাহলে আমরা পরবর্তী সময়ে ঋণ দেব কিভাবে? কারণ লোন ফেরত আসছে, আমরা আবার ঋণ দিচ্ছি। এভাবে সাইকেল করেই তো আমরা চলছি। রি-শিডিউলের কারণে সেটা ব্যহত হবে। আমাদের ফান্ড ফ্লো আসতে দেরি হবে।

সারাবাংলা: আপনারা এজেন্ট ব্যাংকিং করছেন। আপনারা কিভাবে এগুলো সাজিয়েছেন?

মামুন-উর রশিদ: আমরা বলছি ‘সবার জন্য ব্যাংক’। এটা হচ্ছে আমাদের স্লোগান। এর মানে হচ্ছে- সবাই যেন ব্যাংকে আসতে পারে। যে সমস্ত জায়গায় ব্যাংকের নেটওয়ার্ক নাই সেখানে এজেন্ট ব্যাংক করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় ব্যাংক সংকট সেখানে এজেন্ট ব্যাংক হওয়ায় ওই এলাকার জনসাধারণ ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। আমরা কনভেনশনাল ব্যাংকের পাশাপাশি এটিএম, এজেন্ট ব্যাংকিং ও পশ মেশিন স্থাপন করছি। এভাবে আমরা মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। ব্যাংক এখন আর বিলাসিতার বিষয় নয়। টাকা হাতে এলে নিরাপত্তার জন্য মানুষ তা ব্যাংকে রাখে। আবার লোন পেলে অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন। কারণ ব্যবসায়ীদের তো এত টাকা নাই। তারা হচ্ছেন উদ্যোক্তা। তারা উদ্যোগ নেয়। আর ব্যাংক সেই উদ্যোগে সাপোর্ট করে। উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যাংক খুবই প্রয়োজনীয়। অর্থনীতির একটা প্রধান খাত হচ্ছে ব্যাংক।

সারাবাংলা: ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কি কি উদ্যোগ নিয়েছেন?

মামুন-উর-রশিদ: আমরা তো আসলে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে চলি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইড লাইন অনুযায়ী বোর্ড ও ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত হয়। বোর্ড নীতি নির্ধারণ করে। আর ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন করে। তবে আমাদের সুশাসন আছে ১০০ ভাগ। এজন্য আমরা বিভিন্ন কমিটি করেছি। সুশাসনের জন্য আমরা ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের কমপ্লাইড। আমাদের কোথাও কোনো দুর্বলতা নেই। আমাদের ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন অত্যন্ত সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তিনি এফবিসিসিআয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি সমাজের জন্য ইনফ্লুয়েনশিয়াল ব্যাংকিং সৃষ্টি করেছেন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি কোনো বাধা সৃষ্টি করেন না। অনেক সম্মানিত বোর্ড মেম্বার আছেন। তারা ব্যবসায়ী। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ব্যাংকে ইন্টারফেয়ার করার প্রবণতা তাদের মধ্যে নেই। বলা যায়, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে কোনো ধরনের ইন্টারফেয়ারেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। আমাদের ব্যাংকে সুশাসন স্টাবলিস্ট।

সারাবাংলা: ভবিষ্যতে স্টান্ডার্ড ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান?

মামুন-উর-রশিদ: আমরা জাতির অগ্রগতির সঙ্গেই এগিয়ে যেতে চাই। আমরা চাই ব্যাংক আরও বড় হবে, আরও ভালো হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দেশের সংকটকালে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসবে। সুস্থ, সুন্দর ও প্রোডাক্টিভ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অর্থনীতি বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। কাজ করার মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যাব- এটাই হচ্ছে আমাদের আগামীর প্রত্যাশা।

সারাবাংলা: পাঠক ও সারাবাংলার উদ্দেশে কিছু বলবেন?

মামুন-উর-রশিদ: আপনারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করলে পাঠক উপকৃত হবে। জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। তাদের চাওয়া পূরণ হবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত এভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

সারাবাংলা: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মামুন-উর রশিদ: ধন্যবাদ আপনাদেরকেও।

সারাবাংলা/পিটিএম

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন