শুক্রবার ২৩ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৮ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও

আগস্ট ৪, ২০১৯ | ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

১৯৩৫ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার ‘বিশ্ব বন্ধু দিবস’ উদযাপন করা হচ্ছে। বন্ধুত্বের জন্য যদিও আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না- বন্ধু দিবস হচ্ছে বন্ধুকে বিশেষভাবে স্মরণ করার জন্য। বিশ্ব বন্ধু দিবস একটি সাংস্কৃতিক কৃষ্টি ও আনন্দঘন দিবস হিসেবে বন্ধুত্বের গুরুত্ব বা মূল্যায়নের জন্য এই বিশেষ সম্পর্ককে সম্মান প্রদর্শনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে।

‘বন্ধু’ ছোট্ট একটি শব্দ- এই ‘বন্ধু’ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কতো ছড়া, কতো কবিতা, কতো গল্প, কতো উপন্যাস-উপাখ্যান, কতো গান রচিত হয়েছে যা পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় বা সাহিত্যে রচিত হয়নি। ‘বন্ধু’ বা ‘বন্ধুরে…’ এই প্রিয় শব্দ বা শ্রুতিমধুর ডাকের মধ্যে কতো আন্তরিকতা ও আবেগ রয়েছে সেটা অনুভবের বিষয়- ভাষায় বুঝানো সম্ভব নয়। এই সুন্দর মায়াবী পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্পাপ সম্পর্কের নাম ‘বন্ধুত্ব’- বন্ধুত্ব হলো হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ানো ভালোবাসা এবং মন খুলে অব্যক্ত সুপ্ত জমানো কথা বলা- এ যেন রক্তের সম্পর্কের চেয়েও শক্তিশালী কোনো বাঁধন।

বন্ধুকে ভালোবাসা দিয়ে সখা, সখী (বান্ধবী), সই, প্রিয়া আরো অনেক নামে ডাকা হয়। নজরুল সংগীতে আছে- ‘সই ভালো করে বিনোদ বেণি বাঁধিয়া দে’। অথবা, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানি,/ দেব খোঁপায় তারার ফুল’।রবীন্দ্র সংগীতে- ‘ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে।’

গ্রামবাংলায় মহিলাদের মধ্যে সই পাতা নিয়ে এখনো ঘটা করে কতো অনুষ্ঠান হয়- যেটা বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে আছে কি? এই বন্ধু, সখা, সখী (বান্ধবী) ও সই নিয়ে বাংলা গান ও কবিতার উদাহরণ দিতে গেলে স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়, এটা বর্ণনা করতে গেলে মহাকাব্যকে ছাড়িয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

গ্রাম-বাংলার কবি জসীমউদদীন আহমেদ ‘আমার বাড়ি’ কবিতায় বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেছেন এভাবে- ‘আমার বাড়ি যাইও ভোমর,/ বসতে দেব পিঁড়ে,/ জলপান যে করতে দেব শালি ধানের চিঁড়ে।/ শালি ধানের চিঁড়ে দেব,/ বিন্নি ধানের খই,/ বাড়ির গাছের কবরী কলা/ গামছা বাঁধা দই।”- বন্ধু আসবে বন্ধুর বাড়িতে এর জন্য বাড়িতে সাদাসিধে আয়োজন অথচ এর মধ্যে যে কতো আন্তরিকতা ও আবেগ জড়িত রয়েছে তা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতির মধ্যে আছে কি?

কবি জসীমউদদীন রচিত আব্বাস উদ্দিনের গাওয়া বিখ্যাত জনপ্রিয় গান- ‘ও কী ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে/ কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও কয়া যাও রে।।’

আব্দুল আলিমের গাওয়া ‘বন্ধুর কথা মনে হয়/ বন্ধুর কথা মনে হয়, হয় গো/ বন্ধুর কথা মনে হয়।’ তাই বাঙালি বন্ধুত্বের তুলনাই হয় না- বাঙালি বন্ধুর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা চিরন্তন ও শাশ্বত।

বন্ধু দিবসে বাংলার সেই সব বন্ধুদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি- যাঁরা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাতৃভূমি তথা বাংলা মাকে উদ্ধার করার জন্য হানাদার বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শুধু একদিনেই চোখের সামনে আমার পাঁচজন সহযোদ্ধা বন্ধুকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছি- বন্ধু দিবসে আজ কীভাবে ভুলবো এইসব সহযোদ্ধা বন্ধুদের? বাঙালি বন্ধুর হাত ধরেই বড় হয়- একসঙ্গে ভালোবাসা শেখে- সংগ্রামের বজ্রকঠিন শপথ নেয়- একাত্তরে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর হাত ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে এবং বন্ধুর হাতে হাত রেখেই বাংলা মায়ের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে।

বন্ধুত্বের প্রকৃতপক্ষে কোন বয়সসীমা নেই- বয়সে ছোট-বড় যে কেউ বন্ধু হতে পারে- তবে ছোটদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা আর বড়দের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা থাকতেই হবে তানাহলে বন্ধু কীসের? বন্ধু যে কেউ হতে পারে- এখানে ছেলেবন্ধু হতে পারে আবার মেয়েবন্ধুও হতে পারে- আবার মাতা-পিতা, স্বামী-স্ত্রী-সন্তারাও বন্ধু হতে পারে। এছাড়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নকালে, চাকরির ক্ষেত্রে সবখানেই বন্ধুত্ব হতে পারে- এমনকি শিক্ষার্থী-শিক্ষকও বন্ধু হতে পারে। বন্ধুত্ব ধর্ম ও জাতের বিচার মানেনা, ধনী-গরিব মানেনা- সবচেয়ে বড় পরিচয় সে বন্ধু। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রেও বন্ধুত্ব হতে পারে যাকে আমরা বলে থাকি বন্ধুরাষ্ট্র- বাংলাদেশেরও অনেক বন্ধুরাষ্ট্র আছে। বন্ধুত্ব দেশ-মহাদেশের সীমানা মানেনা- বন্ধুত্ব নদী-সাগর-মহাসাগর-পর্বত-অরণ্য-মরুভূমি এমনকি আকাশসীমানাও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়না- সৃষ্টির শুরুতে বন্ধুত্ব ছিল, এখনও আছে এবং থাকবেও অনন্তকাল।

‘বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু’- তাই বিশ্ব বন্ধু দিবস উপলক্ষে অত্যন্ত গর্ব ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিপদের দিনের প্রকৃত বন্ধু মিত্রবাহিনীকে যারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছিলেন- এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বিদেশি সম্মানিত বন্ধুদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং বিশ্ব বন্ধু দিবসে এই মুহূর্তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া বিখ্যাত আবেগময় গানটির কথা বার বার মনে পড়ে যায়- ‘বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও/ মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও/ ভুলো না তারে ডেকে নিতে তুমি’।

বন্ধুত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে ভালোবাসা। বন্ধুত্ব হচ্ছে ডানা বিহীন ভালোবাসা এবং বন্ধুর বিকল্প বন্ধুই। বন্ধুত্ব হলো হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ানো ভালোবাসা- মন খুলে হৃদয়ের অব্যক্ত সুপ্ত জমানো কথা বলা- বন্ধুকে আজীবন কাছে পেতে হলে প্রেম দিয়ে নয় বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখতে হবে, কারণ প্রেম একদিন হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু বন্ধুত্ব কোনদিন হারায় না যা চিরঅটুট থাকে- তাই বন্ধু নির্বাচনে বেশ সতর্ক থাকতে হয়। তাই শুধু বন্ধু দিবসে বন্ধুকে স্মরণ না করে প্রতিটি দিনই হোক বন্ধু দিবস এবং এই বন্ধুত্বের বাঁধন চির অটুট থাকুক এটাই হোক বিশ্ব বন্ধু দিবসের প্রত্যাশা।

এই ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্ব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সাত সমুদ্র তোরো নদী পেড়িয়ে- সারা পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে- তাই বন্ধুত্বের পরিধি আজ বিশ্বময়- পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে একবন্ধু আরেক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে। বিশ্ব বন্ধু দিবস উপলক্ষে দেশ-বিদেশের সকল শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ী বন্ধুদের প্রতি বিশেষ করে বাঙালি সুহৃদ বন্ধুদের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা- শুভ হোক বন্ধু দিবস।

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন