শুক্রবার ২৩ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৮ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

জাতীয় সংগীত বিতর্ক বনাম রবীন্দ্রবিদ্বেষ 

আগস্ট ৪, ২০১৯ | ৬:৪৫ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ নূরুল হক 

বাংলা ভাষায় ‘কবিতা’ লেখার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিটি হলো, ক্রমাগত তালিকা তৈরি করা। তালিকাপ্রধান রচনা তরতর করে এগিয়ে যায়, আর দৃশ্যের পর দৃশ্য, বিষয়ের পর বিষয় এসে আছড়ে পড়ে পাঠকের সামনে। তাতে পাঠক মোহিত হয়, বিভ্রান্ত হয়, আবেগে মথিতও হয়। এই তালিকাপ্রধান ধারায়ও শিল্পউত্তীর্ণ কবিতা রচনা সম্ভব। এর সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’। আর তালিকাপ্রধান কবিতা যদি শক্তিমান কোনো কবির হাতে না পড়ে, তাহলে সেটি আসলে কোনো বাজার ফর্দ, না কবিতা, বুঝে উঠতে পারে না পাঠক। আর সঙ্গে যদি যোগ হয়, কিছু আকর্ষণীয় চিত্রকল্প-উপমা কিংবা যমক-অনুপ্রাস, তাহলে পাঠক দ্রুত বিষয়টিতে সম্মোহিত হন। বাকচাতুর্যপূর্ণ কবিতা যারা রচনা করেন, তারা বিষয়টি ভালোভাবেই রপ্ত করেন। একইসঙ্গে নিজেদের রচনায় তার প্রয়োগও ঘটান।

এই ধারার একটি গান আছে প্রিন্স মাহমুদের। শিরোনাম ‘আমার সোনার বাংলা’। কিন্তু এই লেখাটিকে কোনোভাবেই মৌলিক গান বলা যাবে না। এটি রচিত হয়েছে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয়-কালজয়ী কবিতা-গানের বিভিন্ন পঙ্ক্তি জোড়া দিয়ে। এছাড়া, পুরো রচনাটি তৈরি হয়েছে শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার আদলে। যা কিছু ঘটনা, ব্যক্তি ও বিষয়ের তালিকা মাত্র। অর্থাৎ এটি একটি তালিকাপ্রধান রচনা। যেমনটি সংসারী মানুষ বাজার করার আগে ফর্দ তৈরি করেন। তবে, বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছি না মোটেও।

কিন্তু অন্য একটি বিষয় আছে, যা কেবল নেতিবাচকই নয়, রীতিমতো অপরাধতুল্য। সেটি হলো এই রচনার দুটি লাইন—‘তুমি বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুনে জ্বলা জ্বালাময়ী সে ভাষণ/তুমি ধানের শীষে মিশে থাকা শহীদ জিয়ার স্বপন।’ এই দুটি লাইনে জাতির জনকের পাশাপাশি জিয়াউর রহমানকেও একই আসনে বসানো হয়েছে। অথচ যেকোনো শিল্পরসপিপাসু, দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জানেন, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা শাসক হিসেবে দুজনকে কখনোই একই পাল্লায় মাপা যাবে না। কারণ বঙ্গবন্ধুর জীবনের সিংহভাগ কেটেছে জাতির মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম করে, কারাবন্দি থেকে। দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব, এনেছেন স্বাধীনতা। বিপরীতে জিয়াউর রহমান সারাজীবনই সুবিধাভোগী ছিলেন। একজন সেনাকর্মকর্তা থেকে অস্ত্রের জোরে রাষ্ট্রক্ষমতাপর্যন্ত দখল করেছিলেন। আদর্শ-চরিত্র-রুচি-মেজাজ, কোনো বিষয়েই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সামরিকজান্তা জিয়ার কোনো মিল নেই। তাহলে কোন যুক্তিতে একটি রচনায় জাতির জনকের পাশাপাশি জিয়ার নাম উচ্চারিত হয়? এছাড়া শহীদজননী জাহানারা ঈমামের নামের পাশেই বা কী করে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারিত হয়?

নোবেল জেনে বুঝে-সজ্ঞানে এমন বক্তব্য দিয়েছেন। একইসঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাবনার প্রসঙ্গ টেনেছেন। বিষয়টি তিনি না বুঝে নিতান্ত কমবয়সজনিত কারণে আবেগের বশবর্তী হয়ে করেননি। কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন মন্তব্য করলে, দেশব্যাপী নিন্দার ঝড়া ওঠার পরপরই তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চাইতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি।

বিজ্ঞাপন

কথাসাহিত্যিক কুলদা রায়সহ কেউ কেউ বলছেন, নোবেলের দাদা একজন মুক্তিযোদ্ধা। সঙ্গতকারণে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী, দেশের সংস্কৃবিরোধী কিংবা রবীন্দ্রবিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে সচেতনভাবে জাতীয় সংগীত নিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করতে পারেন না। অপরিণত বয়সের কারণে আবেগতাড়িত হয়ে কেবল খেয়ালের বশেই তিনি এমন মন্তব্য করে ফেলেছেন। বয়স, রুচি ও অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে তার অপরাধকে গৌণ করে দেখার সুপারিশ করছেনি কেউ কেউ। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, নোবেল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হতেই পারেন, কিন্তু তার মননে মুক্তিযুদ্ধ-দেশপ্রেম-রবীন্দ্রপ্রেম আছে, এমনটি কি জোর দিয়ে বলা যাবে?

একথা বলা অসঙ্গত হবে না যে, রাজাকারের সন্তান মানেই তার রক্তে রাজাকারিই থাকবেই। সেটি রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক-পুরুষ পরম্পরার। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাত্রই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ লালন করবে, বিষয়টি তেমন নয়। কালক্রমে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক কিংবা পেশাগত কারণে সে আদর্শচ্যুত হতেই পারে। তারমধ্যে বাবা-চাচা-দাদার কর্মকাণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নাও থাকতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা যে প্রত্যক্ষ করেনি, যে ভুক্তভোগী ছিল না, সে যেকোনো সময়ই পূর্বপুরুষের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারে। কিন্তু একজন রাজকারের সন্তান চিরকালই রাজাকার। দুটি কারণে সে রাজাকার। প্রথমত, উত্তরাধিকারসূত্রে, দ্বিতীয়ত সামাজিক প্রতিরোধ। সমাজ তাকে তার পূর্বপুরুষের অপরাধের কথা বারবারই মনে করিয়ে দেবে। একইসঙ্গে তাকে দেশপ্রেমিকদের সমাজভুক্ত হতে দেবে না। দূরে ঠেলে দেবে। তাই সে চিরকালেই রাজাকার-রাজাকারের সন্তানই থাকবে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করতে দেখা গেছে সুশীলসমাজকে। কেউ কেউ বলছেন, দেশ এখন ভয়াবহ বন্যাকবলিত, ডেঙ্গু প্রায় মহামারি আকারণ ধারণ করেছে, পাল্লা দিয়ে চলছে ধর্ষণ কিংবা ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মানুষহত্যার মতো ঘটনা। এই শ্রেণীর সুশীলদের অভিযোগ, এতসব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে নোবেলের একটি ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে কেন এত প্রতিবাদ-সমালোচনার ঝড়?

নোবেলের সমালোচনকারীদের তীব্রভাষায় আক্রমণ করেছে তার সমর্থক গোষ্ঠী। তাদের অভিযোগ, নোবেল গান গেয়ে সেলিব্রেটি হয়েছেন। তাই তার জনপ্রিয়তায় অনেকেই ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। মূলত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থরাই তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে সমালোচনা করছেন। নোবেলের সমর্থক গোষ্ঠীর সবশেষ যুক্তি হলো—নোবেল নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছেন। তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। তিনি তার সেই সাংবিধানিক অধিকার বলেই ‘ব্যক্তিগত মত’ প্রকাশ করেছেন।

উপর্যুক্ত যুক্তি-দাবি-বক্তব্যের আলোকে যে প্রশ্নগুলো সামনে হাজির হচ্ছে, সেগুলো হলো:

১। জাতীয় সংগীতের মতো স্পর্শকাতর, প্রাচীন, প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজনীনভাবে গৃহীত বিষয় নিয়ে নোবেল এভাবে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করতে পারেন কি না?
২। নোবেল যদি সেলিব্রেটি হন, তাহলে তার বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত মন্তব্যে’ সীমাবদ্ধ থাকে কি না?
৩। নোবেলের ‘ব্যক্তিগত মত’ আপত্তিজনক কি না?
৪। নিজের মন্তব্যের জন্য নোবেল অনুশোচনা প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন কি না?

আলোচ্য বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুবিধার্থে উপর্যুক্ত চারটি বিষয়ের আলোচনা একসঙ্গে করা হচ্ছে। সবার আগে মত-প্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক প্রসঙ্গে মীমাংসা করা জরুরি। এর আগে বলে নেওয়া ভালো—চিন্তার স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত। কিন্তু বাক-স্বাধীনতা স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হতে বাধ্য। সবাই সব ধরনের চিন্তা করলেও তা প্রকাশে কাউকে হতে হয় সংযমী, কাউকে বজ্রকণ্ঠ আবার কাউকে-কাউকে বিনয়ী। যে কথা সবিনয়ে বলার, তা বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলে বক্তব্যের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। একজনের তথাস্বাধীন বাক্যবাণে অন্যের সম্মানহানি ঘটলে তাকে বাক-স্বাধীনতা বলা যায় না। তাতে মানুষের এই মৌলিক অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় মাত্র। ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা’প্রসঙ্গে সংবিধানের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে—(১) ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।’এবং (২) ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চয়তাদান করা হইল।’

এখানে আসা যাক, নোবেলের বক্তব্যে। ইউটিউব-ভিত্তিক ছোট্ট একটি সাক্ষাৎকারে নোবেল বলেন, ‘‘আমি মনে করি যে, আমাদের জাতীয় সংগীত, ‘আমার সোনার বাংলা’আমাদের দেশটাকে যতটা এক্সপ্লেইন করে, তার থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি এক্সপ্লেইন করে প্রিন্স মাহমুদ স্যারের এই গানটা। আমাদের জাতীয় সংগীত যেটা আছে, সেটা হয়তো অনেক রূপক অর্থে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়, বাট এটা কিন্তু (অস্পষ্ট) আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের আবেগের স্থানটা, সবকিছু কিন্তু প্রপারলি আমাদের কাছে তুলে ধরে।’’

জাতীয় সংগীতের প্রসঙ্গ টেনে নোবেল আরও বলেছেন, ‘‘ঢাকা ভার্সিটির অনেকে কিন্তু মিছিলও করেছিল এই গানটাকে জাতীয় সংগীত হিসেবে ইয়ে করা হোক।’’ এরপর তিনি আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে যত গান হয়েছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ গানগুলোর মধ্যে একটা।’

সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশে একটা বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। সেটি হলো—চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার সঙ্গে বিবেকের স্বাধীনতাও যুক্ত করা। অর্থাৎ ব্যক্তিমনে যা কিছু উদয় হবে, যেমন করে মন চাইবে, ঠিক তেমন করে কোনও বিষয় প্রকাশ করার নাম স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে সংযম, বিবেচনা ও ন্যায়বোধও সম্পৃক্ত।

এবার দেখা যাক, নোবেল কী বলছেন? তিনি বলছেন, বিষয়টি তার ব্যক্তিগত মত। সেই ব্যক্তিগত মত অনুসারে রবীন্দ্রনাথ রচিত জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’র চেয়ে দেশকে কয়েকহাজার গুণ বেশি এক্সপ্লেইন করে প্রিন্স মাহমুদ রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনাটি। একইসঙ্গে বলেছেন, এই গানে নাকি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। পক্ষান্তরে রবীন্দ্ররচিত জাতীয় সংগীতে সেভাবে বাংলাদেশ আসেনি। অথচ শিল্পরসবোদ্ধা মাত্রই স্বীকার করবেন, জাতীয় সংগীতে দেশের প্রতি যেমন আবেগ, প্রেম, ভালোবাসা, ভক্তি, শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি দেশের ভূ-প্রকৃতি, মাতৃরূপও চিত্রিত হয়েছে। এছাড়া এই সংগীতের সুরের যে কমনীয়তা, তাতে শ্রোতার মনে রসসঞ্চারের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় অলক্ষ্যেই দেশের প্রতি ভক্তি জেগে ওঠে। রক্তের কণিকায় নাড়া দিয়ে যায় প্রতিটি চিত্রকল্প। অথচ নোবেল এই জাতীয় সংগীতে এর কিছুই দেখলেন না। এমনকি রবীন্দ্রনাতের নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করলেন না। আর বিদ্যমান জাতীয় সংগীতের প্রসঙ্গটি প্রচ্ছন্ন বিরক্তির সঙ্গে উচ্চারণ করে, প্রিন্স মাহমুদের প্রতি ভক্তিতে গদগদ হয়ে উঠলেন। তার নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ‘স্যার’ শব্দটিও যোগ করতে হলো তাকে। নোবেলের বক্তব্যে শোনামাত্র কোনও বিষয়ে ‘সব বুঝে ফেলার ভান’ প্রকাশিত হয়েছে। তার এই বক্তব্যে সমাজে-রাষ্ট্রে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, আশঙ্কা আছে তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত হওয়ার। তার এই ধরনের মন্তব্যকে এককথায় ‘অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য’ বলেই স্বীকার করতে হয়। আর এ ধরনের ‘অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য’ জনগণকে হটকারীমূলক কূটতর্কের উসকানি দেয়।

একথা ভুলে গেলে চলবে না, কোনো একটি বিষয়ে মনের ভেতর চিন্তার উদয় হওয়ামাত্রই তা প্রকাশ না করে, সেই চিন্তায় শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করলে তা থেকে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এক্ষেত্রে নোবেল সেটি করেননি। বিদ্যমান জাতীয় সংগীতের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, মাহাত্ম্য নিয়ে তাবত শিল্পবোদ্ধারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন না। পরন্তু সংগীতটির তাৎপর্য, প্রেক্ষাপট ও অলঙ্কার নিয়ে প্রশংসাসূচক আলোচনা এসেছে বরবার। অথচ, নোবেলের মনে হয়েছে দেশকে ‘এক্সপ্লেইন করতে’ প্রিন্স মাহমুদের গানের চেয়ে কয়েকহাজার গুণ নিচে অবস্থান করছে রবীন্দ্ররচিত জাতীয় সংগীতটি। বিষয়টি অনেকটা সাঁতার না জেনে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার মতো দাঁড়ালো। সংবিধান প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক ধারা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, একটি শিল্পমানঋদ্ধ জাতীয় সংগীতের সঙ্গে আরেকটি তালিকাপ্রধান রচনার তুলনা করে নোবেল রবীন্দ্ররচিত গানটিকে হেয় করেছেন। এটি করেছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগের অপপ্রয়োগ করে। যা তিনি একজন নাগরিক কিংবা শিল্পী হিসেবে করতে পারেন না। বিশেষত, জাতির জনকের সঙ্গে একইসঙ্গে জিয়ার প্রসঙ্গ উচ্চারিত গানের সঙ্গে কখনোই রবীন্দ্ররচিত জাতীয় সংগীতের তুলনা চলতে পারে না। কী শিল্পমান নিয়ে, কী বিষয়বস্তু, কী দেশপ্রেম, কী মুক্তিযুদ্ধ, কী ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা মাতৃপ্রেম—কোনো প্রসঙ্গ তুলেই এই তুলনা চলতে পারে না।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয়ে। নোবেল বলেছেন, তিনি যা বলছেন, সেটি তার ব্যক্তিগত অভিমত। এদিকে, তার অনুসারী-ভক্তরা বলছেন, নোবেল একজন সেলিব্রেটি। তাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ব্যর্থরা নোবেলের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তার সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। এখন কথা হলো যিনি সেলিব্রেটি বনে যান, তার আচার-আচারণ-বক্তব্য পুরো সমাজ না হোক, সমাজের একটি বিশেষ অংশ অনুসরণ করে। ওই অংশটি সেই সেলিব্রেটি প্রতিটি কথায়, আচরণে প্রভাবিত হয়। তার আচরণকে আচরণীয় ভাবে। কথাকে অনেক সময় ঐশীবাণীর মতোও মনে করে। মেনেও নেয়। অর্থাৎ যিনি সেলিব্রেটি, তার বক্তব্য, একান্ত ব্যক্তিগত হলেও তার ভোক্তা যেহেতু সাধারণ মানুষ, সেহেতু সেটি আর একান্ত ব্যক্তিগত থাকতে পারে না। বিশেষত জাতীয় সংগীতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার বক্তব্যে নিছক খেয়ালের বসে বলে ফেলা মন্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তার সেই বক্তব্য আর ‘ব্যক্তিগত মন্তব্যে’ সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর পেছনে কোনো ব্যক্তি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনা থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ নোবেল যখন নিজেই বলছেন, প্রিন্স মাহমুদের রচনাটিকে জাতীয় সংগীত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি মিছিলও হয়েছিল, তখন সেটিকে আর নিছক আবেগের বশে মুখ ফসকে বলে ফেলা কথা বলে মেনে নেওয়া যায় না।

জাতীয় সংগীত বিষয়ক মন্তব্যের রেশ ধরে অনেকেই নোবেলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তার এই মন্তব্য ‘ব্যক্তিগত মত’ হলেও সেটি আপত্তিজনক। এখানে বিষয়টি নিয়ে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। যদি আপত্তিজনক হয়, কী হিসেবে? নোবেল কি বিদ্যমান জাতীয় সংগীত বাতিল করে প্রিন্স মাহমুদের রচনাটিকে প্রতিস্থাপন করার প্রস্তাব করেছেন? এর উত্তর নিশ্চয় হবে—‘না’। তবে, পাল্টা প্রসঙ্গ আসবে, তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাতের গীতটি দেশকে প্রপারলি এক্সপ্লেইন করে না। কিন্তু প্রিন্স মাহমুদের রচনাটি করে। নোবেলের এই বক্তব্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেও প্রতীয়মান হবে, তার মন্তব্য আপত্তিজনক।

বাকি থাকলো একটি প্রসঙ্গ—নিজের মন্তব্যের জন্য নোবেল অনুশোচনা প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন কি না? উত্তর আসবে এখন পর্যন্ত ‘না’। নোবেল তার বক্তব্যের জন্য অনুতপ্ত কি না, তা জানা যায়নি। নিজের মন্তব্যের জন্য এখনও তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। চাননি জাতির কাছে ক্ষমাও। এই থেকে ধরে নেওয়া যায়, তার পুরো মন্তব্য ও জাতীয় সংগীতবিষয়ক আলোচনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। কমবয়সের আবেগের কারণে তিনি খেয়ালের বশে বলে ফেলেছেন, বলে যে বক্তব্য তার কোনো কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীর দিক থেকে আসছে, তা ঠিক নয়। তিনি মোটেও খেয়ালের বশে, নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা রচনাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে এমন মন্তব্য করেননি। এটি ছিল তার সুচিন্তিত অভিমত।

এখন প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী পরিবারের সন্তান হয়েও কেন জিয়ার নাম সংবলিত রচনাকে জাতীয় সংগীত করার বিষয় টেনে আনলেন? দেশকে এক্সপ্লেইনের প্রশ্নে কেন রবীন্দ্ররচিত জাতীয় সংগীতকে প্রিন্স মাহমুদের রচনার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ নিচে মনে হলো তার? নোবেল তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারকবাহক পরিবারের সন্তান। তাহলে কি ধরে নেব, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হলেই দেশপ্রেমিক নাও হতে পারে? এই প্রসঙ্গে বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো।’ অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারে জন্ম নিলেই হবে না, কোন সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে সে বেড়ে উঠছে, সেটিই আসল বিষয়। একই সঙ্গে তার পড়াশোনা, পাঠ্যতালিকা, বন্ধুবর্গ ও সমাজের প্রভাবও তার ওপর পড়তে বাধ্য।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা স্মর্তব্য। বাঙালির ইতিহাসের একটি কালো দিক আছে। ওই পিঠের নায়ক মীর জাফর, খন্দকার মোশতাকেরা। তারা কেউ আপন যোগ্যতায় রাষ্ট্রনায়ক হতে চায়নি। চেয়েছিল সিরাজউদ্দৌলা-বঙ্গবন্ধুকে খুন করে সিংহাসনে বসতে। তারা জানতো, যতদিন সিরাজ-বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকবেন, ততদিন তাদের হীনউদ্দেশ্য সফল হবে না। সিরাজ-বঙ্গবন্ধুরা বহুকাল পর-পর, নির্দিষ্ট স্থানে আসেন, যখন আসেন তখন গণমানুষের হৃদয় জয় করে আসেন, দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেন—তাদের শৌর্যে-বীরত্বে। মীর জাফর, খন্দকার মোশতাকেরা আসে ক্ষণে ক্ষণে, ঘরে ঘরে। বাংলার মাঠে-ঘাটে, ঘরে-ঘরে, হাটে বাজারে তাদের সাক্ষাৎ মেলে। বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটে এমন নয়, সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণেও ঘটে। রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসংগীত কিংবা জাতীয় সংগীত নিয়ে এমন ঘটনার অবতারণা এই প্রথম নয়, দেশের রাজনীতি-শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ইতিহাস সাক্ষী—এই দেশে বহুবার জাতীয় সংগীত-রবীন্দ্র বিদ্বেষের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতেও ঘটবে। দুই লাইন এলিয়ট-ইয়েটস পড়ে যেখানে অনেকেই রবীন্দ্র উপযোগিতাকে খারিজ করে দেন, সেখানে ফেসবুক-ইউটিউব-টিভি সেলিব্রেটি হওয়ার সুবাদে জাতীয় সংগীতের মাহাত্ম্য-উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তো মামুলি ব্যাপার! এখানে আর অবাক হওয়ার কী আছে?

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী

সারাবাংলা/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন