বিজ্ঞাপন

গরুর চামড়ার দাম ৭ বছরে অর্ধেক, খাসির এক-তৃতীয়াংশ

August 6, 2019 | 10:55 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়েও বছর বছর কমছে পশুর চামড়ার দাম। গত বছরের দাম এ বছরেও বহাল থাকলেও এই দাম সাত বছর আগের দামের তুলনায় অনেক কম। হিসাব বলছে, গত সাত বছরে গরুর চামড়ার দাম কমে হয়েছে অর্ধেক, আর খাসির চামড়ার দাম কমে এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে নেমে এসেছে। ২০১৩ সালে যেখানে গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, সেখানে এ বছর এই চামড়ার দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এ বছরে এর দাম ঢাকার মধ্যেই নেমে এসেছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবছর সারাদেশে যে পরিমাণ পশুর চামড়া পাওয়া যায়, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে কেবল ঈদুল আজহার সময়। এ বছরও এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া যেন দেশ থেকে পাচার হয়ে না যায় এবং চামড়া সংগ্রহকারীরাও যেন প্রকৃত মূল্য পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়।

গরুর চামড়ার দাম ৭ বছরে অর্ধেক, খাসির এক-তৃতীয়াংশ

একই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) এক বৈঠকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম ও ট্যানারি ব্যবসায়ীরাসহ সংশ্লিষ্টরা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে জানানো হয়, এবারের ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া গরুর চামড়ার দাম রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে এর দাম ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া, খাসির কাঁচা চামড়ার দাম সারাদেশে প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা ও বকরির চামড়ার দাম ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে, ২০১৮ সালের ১০ আগস্ট এক বৈঠক শেষে ওই বছরের জন্য কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ বছর ওই দামই বহাল রেখেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অবশ্য আগের বছর ২০১৭ সালের তুলনায় গত বছর চামড়ার দাম গরুতে ৫ টাকা ও খাসিতে ২ টাকা কমানো হয়েছিল।

গত বছরের ওই বৈঠক শেষে ওই সময়কার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম, ট্যানারির অবস্থা ও দেশীয় মজুত বেশি থাকায় চামড়ার দাম কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগের কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকেই কমছে চামড়ার দাম। ওই বছর ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। পরের বছর ২০১৪ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা ছিল ঢাকার ভেতরে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ২০১৫ সালে আরও কমে এই দাম। ওই বছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ঢাকার ভেতরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।

গরুর চামড়ার দাম ৭ বছরে অর্ধেক, খাসির এক-তৃতীয়াংশ

চামড়ার দাম নির্ধারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক

বিজ্ঞাপন

এর পরের বছর ২০১৬ সালে অবশ্য ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম নির্ধারণ করেন। ওই বছর গরুর চামড়ার দাম নির্ধারিত হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ঢাকার ভেতরে ৫০ ঢাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা। এক বছর বিরতি দিয়ে ফের চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ঢাকার ভেতরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। এখন এই দাম ঢাকার ভেতরে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়।

খাসি ও বকরির চামড়ার দামের অবস্থা আরও বেহাল। ২০১৩ সালে সারাদেশে খাসি ও বকরির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। পরের বছর তা একধাপে নেমে যায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। ২০১৫ সালে এসে এর দাম নির্ধারণ করা হয় আরও ১৫ টাকা কমিয়ে। ওই বছর খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা। ২০১৬ সালে ব্যবসায়ীরা দাম নির্ধারণ করার সময় সারাদেশে প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম রাখেন ২০ টাকা। পরের বছর সরকার ঢাকার মধ্যে খাসির চামড়ার দাম খানিকটা বাড়ালেও কমিয়ে দেয় ঢাকার বাইরের দাম। ঢাকার ভেতরে দাম ছিল ২০ ২২ টাকা, ঢাকার বাইরে ১৫ থেকে ১৭ টাকা। এখন তা এসে ঠেকেছে ঢাকার ভেতরে ১৮ থেকে ২০ টাকায়, ঢাকার বাইরে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়ে যাওয়ার কারণেই দেশেও কমছে চামড়ার দাম। এছাড়া, ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের সময় তারা ক্রেতা হারিয়েছিলেন। সেই জের এখনো টানতে হচ্ছে দেশীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) কোষাধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, তেল বা সোনার দাম যেমন আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল, চামড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজন্য। মুডি ইনডেক্সের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ওঠানামা করে। এখন এই ইনডেক্স পড়তির দিকে। তার প্রভাব আমাদের দেশের বাজারেও পড়ছে।

মিজানুর রহমান আরও বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় আমাদের সব চামড়া কোম্পানির কাজ টানা চার মাস বন্ধ ছিল। ওই সময় আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতা হারিয়েছি। ক্রেতারা সব অন্য দেশের পণ্য উৎপাদনকারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। সেসব ক্রেতাকে আমরা এখনো ফিরে পাইনি। ফলে আমাদের যে পরিমাণ পণ্যের অর্ডার আসত, তা অনেক কমে গেছে। সেই ধাক্কাই আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ফলে চামড়া শিল্পের আগের ভালো অবস্থায় আমরা এখনো ফিরে যেতে পারিনি।

এ বছর ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ আগস্ট। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন খামারে এ বছর ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩টি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮৮ হাজার; খাসি-বকরি ও ভেড়ার সংখ্যা ৭২ লাখ এবং উট ও দুম্বার সংখ্যা ৬ হাজার ৫৬৩। এর মধ্যে এক কোটি ১০ লাখ পশু এ বছর কোরবানি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সারাবাংলা/জেআর/জিএস/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন