বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৭ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ফুলাতঙ্ক

আগস্ট ৮, ২০১৯ | ৫:২১ অপরাহ্ণ

ইকবাল খন্দকার

জগত বড় বৈচিত্র্যময়। যদি তা না হবে, তাহলে এমন উল্টাপাল্টা ঘটনা কেন ঘটবে? যে ফুল মহব্বতের প্রতীক, সৌন্দর্যের প্রতীক, আনন্দের প্রতীক, সেই ফুলেই কিনা ভয়? আতঙ্ক? ফুল দেখলে হাত বাড়িয়ে গ্রহণ না করে পায়ের পাদুকার মায়া বর্জন করে ঝেড়ে দৌড় দেওয়ার প্রস্তুতি? না না, এই অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড মানা যায় না। তবে মানা না গেলেও এটাই সত্যি যে, বখতিয়ার সাহেব ফুলকে ভয় পান। টুকটাক ভয় না কিন্তু। মাত্রাতিরিক্ত ভয়। জবরদস্ত ভয়। এমন ভয়, যে ভয়ের কারণে প্রেশার হাই হয়ে বখতিয়ার সাহেবের টাকমাথা ঘেমে টইটম্বুর হয়ে যায় যখন তখন।
নিশ্চয়ই ভাবছেন গুল মারছি। বাড়িয়ে বলছি। গুল যে মারছি না, বাড়িয়ে যে বলছি না, তার প্রমাণ দিতেই এখন কতিপয় ঘটনা পেশ করা হবে আপনাদের সমীপে। একদম জলজ্যান্ত ঘটনা। অতএব, হুজুর সমীপে আকুল আবেদন এই যে, ঘটনাগুলো মনোযোগ দিয়ে শ্রবণে আপনাদের সদয় মর্জি হয়। প্রথমেই প্রেম বিসর্জন দেওয়ার ঘটনা। বখতিয়ার তখন সদ্য প্রেমে পড়েছে। প্রথম প্রেমের ধাক্কায় তার টালমাটাল অবস্থা। ঘুমালে তো সম্পূর্ণ রঙিন স্বপ্ন দেখেই, হাঁটা অবস্থায়ও স্বপ্ন দেখতে দেখতে বাড়ি খেতে চায় রাস্তায় চলাচলরত ভ্যান, ভটভটি, ঠেলাগাড়ি ইত্যাদির সঙ্গে।

তখনও বখতিয়ারের প্রেমটা মোবাইলেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রেম সামান্য একটা যন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, তা তো হয় না। হতে দেওয়া যায় না। হতে দেওয়া উচিত না। তাই বখতিয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় তার প্রেমিকা রোখসানার সঙ্গে ‘উইথ বডি’ মানে সশরীরে দেখা করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক মিনিটের মধ্যেই ফোন। হ্যালো রোখসানা, অমুকদিন, অতটা সময়, অমুক জায়গায় চলে আসো। তোমার সঙ্গে অমুক কাজ আছে। অমুক কাজ বলতে খানাপিনা, ফুসুরফাসুর ইত্যাদি আরকি।
প্রকৃতির অমোঘ ডাক যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি বখতিয়ারের অভিসারের ডাক উপেক্ষা করতে পারল না রোখসানা। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে সে হাজির হয়ে গেল ‘উইথ ভারী মেকআপ’। বখতিয়ার তো প্রেমিকার রূপে বেসামাল। একটা মেয়ে এত সুন্দর কীভাবে হতে পারে, এই প্রশ্ন করে করে সে নিজের বিবেককে অতিষ্ঠ করে ফেলল। কিন্তু বিবেক কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। কারণ, আর কেউ না বুঝলেও বিবেক ঠিকই বুঝতে পারছিল, রোখসানাকে রূপবতী করেছে যে মেকআপ, সেটি কমপক্ষে চার স্তরের। ঘাম তো বটেই, বৃষ্টি হলেও যা ধুয়ে যাবার নয়।

বখতিয়ার ঘড়ি ধরে দশ মিনিট রোখসানার রূপের তারিফ করল। আরো কিছুক্ষণ করত, কিন্তু খাবারের গন্ধে পেটটা একটু কেমন কেমন করে উঠল বলে তারিফ রেখে গলাধকরণে মনোযোগ দিল। এছাড়া রেস্টুরেন্টের দেয়ালে লেখা এই কথাটাও তাকে তারিফ সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য করেছিল, ‘অপ্রয়োজনীয় কথা বলা নিষেধ’। বখতিয়ার-রোখসানা দুজনেই ঝাঁপিয়ে পড়ল খাবারের উপর। আর খাবারের ফাঁকে ফাঁকে চলতে লাগল রোমান্টিক আলাপন। এই আলাপনের মাধ্যমে উঠে আসছিল বিভিন্ন তথ্য। যেমন, রোখসানাদের ভাইবোনের সংখ্যা, তার প্রিয়-অপ্রিয় ইত্যাদি।
আলাপন আর খানাপিনা দুটোই যখন সমান গতিতে চলছিল, তখনই ঘটে গেল ভীতিকর অ-প্রীতিকর ঘটনা। একটা মানুষ খাবার ফেলে রেখে ম্যারাথন দৌড় মেরে বসবে ভাবা যায়? ভাবা না গেলেও এটাই ঘটেছিল। রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত ছিল, খাবারের বিল পরিশোধের কবল থেকে বাঁচতে বুঝি এই ঝাঁঝালো দৌড়। তাই তারা তাদের দুই কর্মচারীকে পাঠালো বখতিয়ারকে ধরে আনার জন্য। শুরু হলো ত্রিপাক্ষিক দৌড়। জিহ্বা বের হয়ে যাওয়া এই দৌড়ে পরাজয়বরণ করে বখতিয়ার। তাকে হাজির করা হয় রেস্টুরন্টের মালিকের সামনে।
বিল পরিশোধ না করে দৌড়ে পালানোর অপচেষ্টার হেতু জানতে চাইলে বখতিয়ার জানায়, বিল কোনো ব্যাপার না। যেহেতু সে মোবাইল-প্যান্ট পরে এসেছে আর মোবাইল-প্যান্টে যেহেতু ম্যালা পকেট থাকে, তাই তার কাছে টাকাও আছে ম্যালা। মানে পকেটে পকেটে টাকা। ‘তাইলে চুরের লাহাইন দৌড় দিলাইন ক্যারে?’ জনৈক কর্মচারীর এই জ্বালাময়ী প্রশ্নের জবাবে বখতিয়ার বলে সে দৌড় দিয়েছে ভয়ে। একটা নাম শুনে তার মধ্যে এত ভয়ের উদ্রেক হয়েছে, কখন যে দৌড় দিয়ে ফেলেছে, নিজেও বলতে পারবে না। বলা যায় দৌড়টা দিয়েছে ঘোরের মধ্যে।

এবার চারদিক থেকে প্রশ্ন আসতে লাগল ইট-পাটকেলের মতো। সবার প্রশ্নের মর্মার্থ, নাম শুনে ভয় পাওয়ার কী আছে? আর নামটা কার? বখতিয়ার এবার এক গ্লাস পানি খেয়ে সুস্থির হয়ে বলতে শুরু করল আসল ঘটনা নামটা হচ্ছে আমার শ^শুরের। আমি আমার প্রেমিকাকে এই প্রশ্ন সেই প্রশ্ন করার পর জিজ্ঞেস করেছিলাম তার বাবার নাম কী। যেই সে নামটা উচ্চারণ করল, আমি এত ভয় পেয়ে গেলাম যে, একদম দৌড়ের জোশ চলে এলো। আমি বুঝলাম না, দুনিয়ায় এত নাম থাকতে তার বাপের নাম কেন ‘ফুল মিয়া’ রাখা হলো। যে নামের মধ্যে ‘ফুল’ আছে, সেই নাম শুনলে কি ভয় লাগে না, বলেন!
বখতিয়ারের ফুলাতঙ্কবিষয়ক আরো কিছু ঘটনা শোনানো হবে। তবে তার আগে জরুরি একটা বিষয় অবগতকরণের প্রয়োজন অনুভব করছি। সেটা হচ্ছে ফুলাতঙ্কের কারণ। মানে কী কারণে বখতিয়ার ফুলকে ভয় পায়। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর নায়ক যেমন স্যাড-এক্সপ্রেশন দিয়ে বলে, আমি সন্ত্রাসী হয়ে জন্মগ্রহণ করিনি, এই সমাজ আমাকে সন্ত্রাসী বানিয়েছে; ঠিক তেমন বখতিয়ারও বলতে পারে আমি ফুলভীতু হয়ে জন্মগ্রহণ করিনি। এই সমাজ আমাকে ফুলভীতু হতে বাধ্য করেছে। তাহলে চলুন শুনি কেন, কীভাবে বখতিয়ারকে বাধ্য করা হলো।

বিজ্ঞাপন

বখতিয়ার একবার ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। তার সঙ্গে বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের কেউ ছিল না। তাই যাত্রাপথে কারো সঙ্গে খোশগল্প করতে না পেরে ক্রমশই সে তিতে হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার এই তিতে অবস্থায় রসগোল্লার রস ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসেন পাশের সিটের ভদ্রলোক। তিনি জমিয়ে গল্প শুরু করে দেন বখতিয়ারের সঙ্গে। এক পর্যায়ে ভদ্রলোক ‘খিদা লাগছে’ বলে বাটি থেকে খাবার বের করে খেতে থাকেন। আর তা দেখে বখতিয়ারের জিহ্বায় নোনাজল চলে আসে। সে ঘনঘন ঢোক গিলতে থাকে। হালকা আওয়াজও হয় সেই ঢোকের।
বখতিয়ারের ঢোক নিবারণের জন্য ভদ্রলোক তাকে তার খাবারের ভাগ দিতে চান। বলেন নিজের মনে করে খেতে। এবার সতর্ক হয়ে যায় বখতিয়ার। কারণ, অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার খেয়ে সে বিপদে পড়তে চায় না। যদি বাজে কিছু খাইয়ে অজ্ঞান করে সব লুটে নিয়ে চলে যায়। বখতিয়ার ভদ্রলোককে সবিনয়ে জানিয়ে দেয়, সে খাবে না। কারণ, তার পেটে একফোঁটাও খিদে নেই। ভদ্রলোক একাই খাবার শেষ করেন এবং আবার মনোনিবেশ করেন খোশগল্পে। আর এবারের গল্প হয়ে ওঠে আগের চেয়ে দ্বিগুণ জমজমাট।

গল্প যখন জমজমাট থেকে জমজমাটতর হচ্ছে, তখনই আবির্ভাব ঘটে এক ফুলওয়ালীর। ভদ্রলোক তার কাছ থেকে দুটো গোলাপ কেনেন। একটা নিজে রাখেন, আরেকটা দেন বখতিয়ারকে। বখতিয়ার ততক্ষণে ভদ্রলোককে বিস্তর বিশ্বাস করে ফেলেছে। তাই নাকের কাছে ফুলটা নিয়ে গন্ধ শুঁকতে বিলম্ব করে না। এরপরের ঘটনা অত্যন্ত করুণ। বখতিয়ারের আর চট্টগ্রাম যাওয়া হয়নি। তাকে পাওয়া গিয়েছিল ড্রেনের পাশে। নিঃশ্ব এবং অচেতন অবস্থায়। আর তার মুখ দিয়ে এমনভাবে ফেনা বের হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ভূতেরা ধরে জম্মের কিলানো কিলিয়েছে।
এই ঘটনার পর ফুল দেখলেই ভয় পেত বখতিয়ার। তবে ভয়টা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মাস দুয়েকের মধ্যে ফুল তার কাছে অন্যান্য স্বাভাবিক জিনিসের মতোই হয়ে গেল। কিন্তু ভয়টা আবার ফিরে এলো, যখন ইউটিউব ঘাঁটতে গিয়ে দেখল বেশ কজন নেতাকে মারা হয়েছে ফুলের তোড়ার ভেতরে বোমা ঢুকিয়ে দিয়ে। এবার ফুলের তোড়া বিক্রি করে, এমন দোকানের আশপাশে যাওয়া বন্ধ করে দিল বখতিয়ার। জানিয়ে দিল, তাকে কোনো কারণে কেউ ফুলের মালা দিতে এলে সে গ্রহণ তো করবেই না, পুলিশেও ধরিয়ে দিতে পারে।

বখতিয়ারের চূড়ান্ত ফুলাতঙ্কের কারণ উপরোক্ত ঘটনা তা বলা যাবে না। তার চূড়ান্ত ফুলাতঙ্কের কারণ মূলত গরম তেল। গরম তেলের কথা শুনে নিশ্চয়ই সবাই চোখ গরম করে প্রশ্ন করার জন্য তৈরি হয়ে গেছেন কথা হচ্ছে ফুল নিয়ে। এখানে গরম তেলের কথা আসছে কোন দুঃখে? কারণ আছে জনাব, কারণ আছে। ভেঙে বলি। ছোটবেলা থেকেই বখতিয়ারের বিশেষ একটা অভ্যাস হচ্ছে কানের চিপায় এটাওটা রাখা। যেমন ছাত্রজীবনে রাখত কলম, পেন্সিল, ছোট আকারের স্কেল ইত্যাদি। আর পরের জীবনে বিড়ি-সিগারেট।
কানের চিপায় জিনিস রাখার এই বিশেষ অভ্যাসের সূত্র ধরে বখতিয়ার একদিন রেখে ফেলে তার এক বেয়াইনের দেওয়া গোলাপ ফুল। এর কিছুক্ষণ পরই পাড়ার মুরব্বীদের পরামর্শে তার কানে গরম তেল ঢোকানোর সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ঘটনা কোনদিক থেকে কোনদিকে মোড় নিয়েছে? না বুঝলে বুঝিয়ে বলি। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়Ñ এই প্রবাদের আছর পড়েছিল বখতিয়ারের উপর। মানে যে ফুলে এত ভয়, অবচেতন মনে বেয়াইনের দেওয়া সেই ফুল কানের চিপায় রাখতে গিয়েই বিশাল দুর্ঘটনা। ফুলের ভেতরের জনৈক পোকা হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে যায় কানে। অতঃপর গরম তেল ঢুকিয়ে পোকা মহোদয়কে বাইরে আনার আয়োজন।

এই ঘটনার পর বখতিয়ারের মনে ফুলাতঙ্ক এমন স্থায়ী আসন গাড়ল যে, ধীরে ধীরে সেই আসন হয়ে গেল সিংহাসন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার সিংহাসনও একদিন নড়ে উঠেছিল, কিন্তু বখতিয়ারের মনের এই সিংহাসন অনড়, অটল, অবিচল। যে কারণে সে এখন অনেকেরই হাসির পাত্র। এলাকার বাঁদর ছেলেপুলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য মুখিয়ে থাকে। কিন্তু হাসির পরিবেশ তো আর এমনি এমনি সৃষ্টি হয় না, একটু সৃষ্টিশীলতা প্রয়োগ করে সৃষ্টি করে নিতে হয়। ছেলেপুলেরা সেই সৃষ্টিশীলতাটা প্রয়োগ করতে মোটেই কার্পণ্য করে না।
কদিন আগে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনতে গেল বখতিয়ার। কিন্তু সে জানত না অনুষ্ঠানটার আয়োজক বাঁদরগুলো। যা-ই হোক, গান শুরু হলো। বখতিয়ার গভীর মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করতে লাগল প্রত্যেকটা গান। আর এদিকে ছেলেপুলেরা মগ্ন গভীর ষড়যন্ত্রে। মানে বখতিয়ারকে নিয়ে কীভাবে এই ভরা মজলিসে খেকখেকিয়ে হাসা যায়। ষড়যন্ত্র সফল হলো। কারণ, বিশেষ একটা গানের পরিবেশনা শুরু হতেই বখতিয়ার সেদিন কানে আঙুল ঢুকিয়ে সরে পড়েছিল অনুষ্ঠান থেকে। গানটা কী ছিল জানেন? ‘ফুল নেবে না অশ্রু নেবে বন্ধু…’।

বখতিয়ারের ফুলাতঙ্কের বিষয়টা তার ছোট ভাতিজাদের জন্যও বিনোদনের কারণ। তারা তাদের কাকার আতঙ্কগ্রস্ত মুখ দেখে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের উপর পড়ে যায় ধড়াম করে। দুদিন আগের একটা ঘটনা। সারাদিন জরুরি কাজে বাইরে থাকার পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেছে বখতিয়ার। ফিরেই গায়ের জামাটা খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আর অমনি শুরু হয়ে গেলো ভাতিজাদের ত্যাদড়ামি। তাদের ত্যাদড়ামিতে অতিষ্ঠ হয়ে সে শেষ পর্যন্ত ঘর ছেড়ে পুকুরপাড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
ত্যাদড়ামির ধরনটা কেমন ছিল, একটু বলি। বখতিয়ার চোখ বন্ধ করতেই তার এক ভাতিজা বই নিয়ে হাজির। ‘কাক্কু এই লাইনডা বুঝতাছি না।’ বখতিয়ার বিশ্বাসে চোখ খোলে লাইনটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু যেই চোখ যুগল নির্দিষ্ট লাইনের উপর যায়, তার মুখের মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে থাকে। এই পরিবর্তনে ব্যাপক খুশি হয়ে হেসে ওঠে বিচ্ছু ভাতিজা। বখতিয়ার বুঝে ফেলে ভাতিজার উদ্দেশ্য পড়া বোঝা নয়, বরং চাচাকে ক্ষেপানো। তাই সে তাকে ধমকিয়ে বিদায় করে।
আবার চোখ বন্ধ করে বখতিয়ার। এবার হাজির হয় তার আরেক ভাতিজা। আগেরজনের চেয়ে সে দুই ক্লাস উপরে পরে। তারও বক্তব্য, ‘এই লাইনডা বুঝতাছি না’। বখতিয়ারের বিশ্বাস এবারও সরল। যেহেতু দুইজনের ক্লাস ভিন্ন, অতএব একই লাইন নিয়ে আসার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সে লাইনটার দিকে তাকাতেই তার মুখের মানচিত্রে আগের চেয়ে বেশি বৈ কম পরিবর্তন আসে না। সঙ্গে সঙ্গে ধুন্ধুমার ধমক। ভাতিজা বই হাতে নিয়ে দৌড়। নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে লাইনদ্বয় কী ছিল। জি, বলছি। প্রথম ভাতিজারটা ছিল, ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই’, আর দ্বিতীয়জনেরটা ছিল ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই’।

একবার বখতিয়ায় ঢাকা গেছে তার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর শুতে যাবে, হুট করে চলে গেল বিদ্যুৎ। বখতিয়ার ঘেমে একাকার। আর চিন্তায় অস্থির, সারারাত ঘুমাবে কীভাবে। না ঘুমাতে পারলে তো মাথা ফেটে যাবে ব্যথায়। বন্ধু তাকে অভয়বাণী শোনাল কোনো চিন্তাই করিস না। আমরা এখন ছাদে যাবো। ছাদে ভরপুর বাতাস। আপাতত চল গিয়ে আড্ডা দিই। এরমধ্যে যদি বিদ্যুৎ চলে আসে, ভালো। না আসলে আজকের রাত ছাদেই কাটাবো।
বখতিয়ারকে নিয়ে বন্ধু যখন ছাদে গেল, ছাদ তখন অন্ধকার। কিন্তু একটু পর বিদ্যুৎ এসে ছাদটা ফকফকা বানিয়ে দিতেই ঘটে গেল বিশাল দুর্ঘটনা। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে বখতিয়ার নাজেহাল। তার জামা-কাপড়ের বাজে হাল। নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবেন ছাদে কেউ তাকে ফুল দিতে চেয়েছিল কি না। না, দিতে চায়নি কেউ। বখতিয়ারের কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল মূলত টবে ফুটে থাকা ফুল দেখে। হোক গে কাঠ! তার যন্ত্রণায় ঢাকা শহরের মানুষ ছাদে ফুলের টবও রাখতে পারবে না নাকি!

একদিন বাজার থেকে ফিরছিল বখতিয়ার। রাস্তায় তার শিক্ষকের সঙ্গে দেখা। প্রাইমারি স্কুলজীবনের শিক্ষক। বয়স্ক মানুষ। তিনিও ফিরছিলেন বাজার থেকেই। হাতে বেশ ভারী ব্যাগ। বখতিয়ার খেয়াল করল, ব্যাগটা নিয়ে স্যারের হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই সে তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, আমার কাছে দেন স্যার। স্যার দিতে নারাজ। বখতিয়ার অনেকটা জোর করেই ব্যাগ কেড়ে নিল। স্যার তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে হাঁটতে লাগলেন পাশাপাশি। আলাপ শুরু হলো দুজনের।
কথায় কথায় বখতিয়ার জিজ্ঞেস করল স্যার, কী কিনলেন? শিক্ষক হরেক রকমের বাজার-সদাইয়ের নাম বললেন। হঠাৎ হাতের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে দিল বখতিয়ার। এতে ব্যাগের ভেতরে থাকা দুই হালি ডিম ভেঙে গুঁড়ো তো হলোই, মাছ-মাংসের অবস্থাও হয়ে গেল দফারফা। বখতিয়ারের কাণ্ড দেখে স্যার তাজ্জব। এ কী হলো! সুস্থ-স্বাভাবিক একটা মানুষ এমন পাগলের আচরণ কেন করবে? স্যার নালিশ দিলেন বখতিয়ারের বাবার কাছে। বাবা বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে গেলে বখতিয়ার নাক ফুলিয়ে বলে উঠল দুনিয়ায় আর সবজি আছিল না? ‘ফুলকপি’ কিনতে গেল ক্যান!
বখতিয়ারের ফুলাতঙ্কের বিষয়টা এখন আর সাধারণ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সীমানা ছাড়িয়ে এখন এটি পরিণত হয়েছে তার মানসিক সমস্যায়। আর এই সমস্যার কারণে আজকাল সে কীসব কা- করছে, শুনলে হাসতে হাসতে পেট ফাটিয়ে ফেলবেন। বলতে যেহেতু বসেছি, বলি। ফাটার হাত থেকে নিজ নিজ পেট রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের। বখতিয়ারকে আজকাল প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঢাকায় যেতে হয়। ঘুরতে না। জরুরি একটা কাজে। যেতে আসতেও তেমন বেগ পেতে হয় না। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা। কতটুকুই বা দূরত্ব!
বেগ পেতে না হলেও প্রতিবার ঢাকায় আসতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় বখতিয়ারকে। অথচ এইটুকু পথ দুই দুই চার ঘণ্টায়ই পাড়ি দিয়ে ফেলার কথা ছিল। তাহলে দশ বারো ঘণ্টা সময় কেন ব্যয় হয় বখতিয়ারের? উত্তর একটাই ফুলাতঙ্ক। ফুলাতঙ্কের কারণে সোজা পথ বাদ দিয়ে সে গন্তব্যে পৌঁছে বাঁকা-ত্যাড়া পথ মারফত। তার শুভাকাঙক্ষীরা যদি তাকে পরামর্শ দিতে যায় ‘এত অলিগলি না ঘুরে মতিঝিল দিয়ে গেলেই তো পারিস’; সে মুখের উপর বলে দেয় মতিঝিল দিয়া ক্যামনে যাই? মতিঝিলের মোড়ে বড় একটা ফুল খাড়ায়া রইছে দেখছস না? শাপলা ফুল।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন