সোমবার ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১১ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

হাউ কাউ ডট কম

আগস্ট ৯, ২০১৯ | ৬:৩১ অপরাহ্ণ

পলাশ মাহবুব

সুখের সাথে ভূতের একটা সম্পর্ক আছে। সে জন্যই বলা হয়- ‘সুখে থাকলে ভূতে কিলায়’। যার যত সুখ সে তত ভূতের কিল খায়।
এ থেকে আরও একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়। ভূত আরাম প্রিয় প্রাণী। যেখানে সুখ আছে সেখানে ভূত আছে। গল্পে পড়েছি সুখি মানুষের জামা থাকেনা। কিন্তু জনপ্রতি একটা করে ভূত যে থাকে এটা নিশ্চিত।
তবে এই লেখার বিষয়বস্তু ভূত না। অদ্ভুত।
মানুষ মরার পরে ভূত হয়। আর জীবিত অবস্থায় হয় অদ্ভুত। তবে সবাই না। কেউ কেউ। যেমন আমাদের বড় ভাই শফিউল হাকিম।
পড়তে পড়তে জিহ্বার তলা ক্ষয় হয়ে যায়। তারপরও মানুষ জজ-ব্যারিস্টার হতে পারেনা। অথচ আমাদের হাকিম ভাইকে সেসব কিচ্ছু করতে হয়নি। তিনি হাকিম হয়েছেন জন্মসূত্রে। আর উত্তরাধিকারের হাকিম বলে তার আইনি জানাশোনা কম। সেটাই স্বাভাবিক।
কথায় আছে- হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়েনা।
আমাদের হাকিম ভাই পুরোই উল্টো। তিনি প্রতিনিয়ত নড়েন। প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত বদলান। এবং সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই তিনি নিজের সমস্ত এনার্জি শেষ করে ফেলেন। ফলে কাজটেই শেষমেষ ঠিকঠাক হয়না।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের হাকিম ভাইয়ের খুব প্রিয়। আর প্রিয় বৈশাখ মাস।
রবীন্দ্রাথ যে প্রিয় সেটি হাকিম ভাই নিজেই জানান দিয়েছেন। নিজের লাইন আঁকাবাঁকা হলেও মুখে সব সময় রবীন্দ্রাথের লাইন ভাঁজেন। আর বৈশাখ মাসের ব্যাপারটা বের করেছে আমাদের বন্ধু ‘ক্যাশিয়ার কাদের’।

বিজ্ঞাপন

‘ক্যাশিয়ার কাদের’ আরেক গল্পের চরিত্র। তবে এটুকু বলি, আমাদের বন্ধু কাদের পড়ালেখায় খারাপ কিন্তু হিসেবে বেশ ভালো। নাইনে দুইবার ফেল করার পর বাবা তাকে আড়তের ক্যাশে বসিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে তার নাম হয়ে গেছে ক্যাশিয়ার কাদের।
কাদের ক্যাশে বসায় আমাদের বেশ সুবিধা হয়। বিকেলের আড্ডার চা-পুরির যোগান ওর ক্যাশ থেকেই আসে।
তো কাদের-ই একদিন বলল, একটা জিনিস হিসেব করে বের করলাম। খালি রবীন্দ্রনাথ না। আরও একটা জিনিস হাকিম ভাইয়ের প্রিয়। বৈশাখ মাস।
বৈশাখ মাস! ক্যামনে?
আমরা হিসাবটা ধরার চেষ্টা করি। অন্যদিকে কাদের গান ধরে-

ওই নতুনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখি ঝড় . . .
বললাম, আগে হিসেবটা বের কর।
কাদের বললো শোন, বারো মাসের মধ্যে একমাত্র বৈশাখ মাসই নতুনের পক্ষে। আর আমাদের হাকিম ভাইও সবসময় নতুনত্ব খোঁজেন। সুতরাং বৈশাখ মাস তার প্রিয়। হিসাব পরিষ্কার।
কাদেরের হিসাব আমাদের কাছে পরিষ্কার না হলেও হাকিম ভাই যে নতুনত্ব খোঁজেন সেটাতো জানা কথাই। এক কাজে কখনো স্থির থাকেন না তিনি। ব্যবসা তার পেশা। সেটাতেও স্থির থাকেন না তিনি।
মার্কেটে হাকিম ভাইয়ের একটা দোকান আছে। সেটার সাইনবোর্ড ছয় মাস পরপর চেঞ্জ হয়। আজ রড-সিমেন্টের দোকান তো কদিন পরে স্টেশনারি।
ইদানিং তার মাথায় ঢুকেছে অনলাইন ব্যবসা। ই-বিজনেস।
আমরা বললাম, ভাই, এইটা আবার কি বিজনেস?
হাকিম ভাই হাসেন।
আরে, এইটাই তো এখন চলতাছে। ক্লিকের ঝিলিক। মারবো এখানে লাশ পড়বো শশ্মানে।
ক্লিকের ঝিলিক!
হ। সব লাইনে ঢুইকা গেছে। বাজার এখন পকেটে। ঘরে বইসা অর্ডার দিবা, হাঁটি হাঁটি পা পা করে জিনিস ঘরে হাজির হয়ে যাবে। ভাবতেছি ওই ব্যবসা শুরু করবো। কেমন হবে?
বিষয়টা যে একটা বিশাল কিছু হবে এমন ভাব করে আমরা মাথা নাড়ি।
কিন্তু ভাই, অনলাইন করবেন বুঝলাম। সাপ্লাই দিবেন কি?
মাথা না নেড়ে জানতে চায় কাদের।
কেনো প্রোডাক্ট তো রেডি। গরু।
গরু!
হুম। অবাক হওয়ার কি আছে। সামনে কোরবানী। এখন তো গরুর মৌসুম। লাখ লাখ গরু বিক্রি হবে। কিন্তু হাট থেকে গরু কেনার যে ঝামেলা সেটা যারা হাটে যায় তারা জানে। আমার অনলাইন মানুষকে সেই ঝামেলার হাত থেকে মুক্তি দেবে। সাইটভর্তি গরুর ছবি থাকবে। যেই গরুতে ক্লিক করবে সেই গরু বাসায় পৌছে যাবে।
এত গরুর ছবি তুলবেন ক্যামনে?
কাদেরের প্রশ্নে বিরক্ত হন হাকিম ভাই।
শোন, ওসব নিয়ে তোদের চিন্তা করতে হবেনা। তোরা আধুনিক দেখে একটা মর্ডান নাম চিন্তা কর। নামটা খুব ইম্পর্টেন্ট বুঝতে পেরেছিস। নাম হতে হবে সহজ-সরল এবং সুন্দর। যেন সবার মুখে মুখে থাকে।
কাদের মনে হয় রেডি হয়ে ছিল।
সে বললো, ভাই, নাম দেন ‘হাঁটি হাঁটি পা পা ডটকম’।
‘হাঁটি হাঁটি পা পা ডট কম’! এইটা আবার কেমন নাম? নামের সাথে কামের মিল থাকতে হবে না? হাকিম ভাই খানিক বিরক্ত ভঙ্গিতে কাদেরকে থামাতে চান। কিন্তু কাদের থামবার পাত্র না।
মিল আছে তো ভাই। আপনিই তো বললেন, অর্ডার দিলে জিনিস হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাসায় চলে যাবে। এর চাইতে মিলের নাম আর কই পাবেন!
না না। এই নাম চলবে না। পাবলিক প্রথমেই মনে করবে পোলাপানের জিনিস বেচি। শেষে ডায়াপারের অর্ডার দেবে।  তাছাড়া হাঁটি হাঁটি পা পা-এর মধ্যে একটা স্লো ব্যাপার আছে। স্লো আইটেম পাবলিক পছন্দ করেনা।
কাদের মাথা নাড়ে। অ, তাও ঠিক। তাইলে ‘গাবতলি ডটকম’ রাখতে পারেন। গরুর সাথে গাবতলির একটা সম্পর্ক আছে।
‘গাবতলি ডটকম’ . . .
হাকিম ভাই কিছুক্ষন ভাবেন। গাল চুলকান।
নামতো খারাপ না। তবে সমস্যা হইলো গাবতলির গরুর হাট সাময়িক। কিন্তু বাসের হাঁট রেগুলার বসে। সো, পাবলিক ধইরা নিবো এইটা হইলো বাসের সাইট। কোন বাস কখন ছাড়ে কখন ভেড়ে, টিকিট-ফিটিক এইসব . . .
তাইলে . . .তাইলে . . . কি নাম হতে পারে!! আমরা ঝিম মারি।
আমাদের উজ্জিবীত করতে হাকিম ভাই ডিম চপের অর্ডার দেন।
শোন, তোরা কাছাকাছি চইলা আসছোস। নামটা এই স্টাইলেই হবে। কিন্তু সাথে লেজ হিসেবে গরুটা লাগাতে হবে। এই ধর- কেমন গরু চাই? কি গরু চাই? ষাঁড় নাকি গাই? এই টাইপ।
পাশ থেকে এইবার আমি হাত তুললাম।
ভাই, পাইছি, পাইছি। নাম দেন ‘হাউকাউ ডটকম’। সঙ্গে শ্লোগান- বিক্রি হবে কিন্তু আওয়াজ হবে না।

পলাশ মাহবুব : কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন