বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৭ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

চামড়া ফেলে চোখের পানিতে বাজার ছাড়ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

আগস্ট ১৩, ২০১৯ | ৬:২৮ অপরাহ্ণ

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা থেকে প্রায় ২০০ চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য বহদ্দারহাট এলাকায় এসেছিলেন শহীদুল ইসলাম। বিক্রি না হওয়ায় মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত চামড়াগুলো পড়েছিল বহদ্দারহাটেই। মৌসুমি ব্যবসায়ী শহীদুল পাইকারী ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও প্রতিটি চামড়ার দাম ৫০ টাকার ওপরে তুলতে পারেননি। সেই টাকায় চামড়া বিক্রি করতে হলে তার লোকসান হবে গাড়ি ভাড়া বাদে ৭০ হাজার টাকা।

হাটহাজারী থেকে ২৫০ চামড়া নিয়ে আসা মো. পারভেজ প্রতিটি গরুর চামড়া কিনেছেন ৪০০ টাকায়। নগরীর আতুরার ডিপোতে আড়তদারেরা তাকে কোনোভাবেই প্রতি চামড়ার দাম ৫০ টাকার ওপরে দাম দিতে রাজি হচ্ছেন না। রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত আড়তদার প্রতিষ্ঠানের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও পারভেজ বিক্রি করতে পারেননি চামড়া। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের সামনে চামড়া রাস্তায় ছুড়ে ফেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই মৌসুমি ব্যবসায়ী।

চট্টগ্রামের চামড়ার বাজারে চলছে এমনই অরাজকতা। অস্বাভাবিক দরপতনে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। নিকট অতীতে এমন লোকসানের মধ্যে কখনোই পড়েননি তারা। তবে এই অরাজকতার মধ্যেই অস্বাভাবিক কম দামে প্রায় ৭৫ শতাংশ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে ফেলেছেন নগরীর আতুরার ডিপোর আড়তদারেরা। বাকি চামড়া কয়েকদিনের মধ্যে আড়তে আসবে বলে তাদের ধারণা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে চামড়ার বাজারে এই অরাজকতার জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দুষছেন আড়তদারদের সিন্ডিকেটকে। আর আড়তদার দুষছেন ঢাকার ট্যানারি মালিকদের।

কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তদারেরা কারসাজি করে পাইকারী ব্যবসায়ী ও তাদের এজেন্টের মাধ্যমে শুরু থেকেই কাঁচা চামড়ার বাজারের দরপতন করে রাখে। তারা এবার এলাকায় এলাকায় গিয়ে চামড়া সংগ্রহ শুরু করে। সেখানেও কম দামে কিনতে চাওয়ায় অনেকে চামড়া দিয়ে দেয় এতিমখানায়। আবার সংগ্রহকারীদের কাছে এসেও অস্বাভাবিক কম দামে চামড়া কেনার প্রস্তাব দিলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে চামড়া বিক্রিতে আগ্রহ হারায়। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী এবার সরাসরি আড়তে চামড়া নিয়ে গেছেন। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। ৫০ টাকার ওপরে চামড়া কিনতে আগ্রহী নন কোনো আড়তদার। আবার নগদ টাকা দিতেও রাজি নন তাদের অনেকে।

আড়তদাররা বলছেন- মৌসুমি ব্যবসায়ীরা নষ্ট চামড়া নিয়ে যাওয়ায় সেগুলো তারা কিনতে পারছেন না। আর ঢাকার ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের পাওনা টাকা আটকে রাখায় তারা প্রত্যাশিত দাম মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দিতে পারছেন না।

আড়তদাররা এবার চট্টগ্রামে সাড়ে ৫ লাখ গরুর চামড়া ও ৮০ হাজার ছাগলের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তাদের ধারণা, চট্টগ্রামে এবার ৪ লাখ গরু, ১ লাখ ২০ হাজার ছাগল, ১৫ হাজারের মতো মহিষ এবং ১৫ হাজারের মতো ভেড়া কোরবানি দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার বাইরে এবার সরকার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দর ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বড় গরুর প্রতিটি চামড়া সাধারণত ১৮ থেকে ২০ বর্গফুট হয়। ছোট গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৫ বর্গফুট পর্যন্ত হয়।

মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে নগরীর আতুরার ডিপো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া নিয়ে সড়কে বসে আছেন। এতিমখানা থেকেও অনেকে কাঁচা চামড়া নিয়ে সেখানে গেছেন। আড়তদারের কাছে গিয়ে ধরনা দিচ্ছেন। আড়তদারদের কেউ কেউ ১০ থেকে ২০ টাকা, কেউ সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত দামে প্রতিটি চামড়া বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সেই দামে চামড়া বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন। আবার কেউ চামড়া রেখেই ফিরে যাচ্ছেন।

নগরীর আমবাগন থেকে ৫০টি কাঁচা চামড়া নিয়ে যাওয়া চা দোকানি কামাল উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে চামড়া কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম, চামড়া বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করব। এখন উল্টো লোকসান দিতে হচ্ছে। দেনার টাকা কিভাবে শোধ করব জানি না।’

হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা থেকে চামড়া বিক্রি করতে যাওয়া লোকমান রশীদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে সারাবাংলাকে বলেন, ‘চামড়ার টাকা মাদ্রাসার গরিব ছাত্র, এতিমের হক। এই হক কেড়ে নিয়ে আড়তদারেরা জুলুম করছেন। সরকার কী করছে, আমরা জানি না।’

মোহাম্মদ শাহীন নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, ‘৭ বছর ধরে চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করছি। এত লোকসান কখনো হয়নি। প্রতিবারই বেশি লাভ করতে না পারলেও মূলধন নিয়ে ঘরে গেছি। এবার সব টাকা বাজারেই রেখে যেতে হচ্ছে। আর কোনোদিন চামড়া কিনব না।’

আতুরার ডিপো এলাকার আড়তদার মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ‘ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা পান। ব্যাংক থেকে লোন পান। কিন্তু এরপরও তারা আমাদের পাওনা টাকা দিচ্ছেন না। হাতে টাকা না থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চামড়া নিতে পারছি না।’

আড়তদার মো. আবদুল জলিল বলেন, ‘কোরবানির দিন চামড়া বিক্রি না করে রেখে দিয়েছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। বাড়তি দামের আশায় তারা এটা করেছেন। অনেক চামড়া পঁচে গেছে। এই চামড়া নিয়ে আমরা কি করব।’

চট্টগ্রামের বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের সারাবাংলাকে জানান, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তারা প্রায় তিন লাখ চামড়া সংগ্রহ করেছেন। প্রতি পিস চামড়া সর্বোচ্চ ৫০ টাকায় সংগ্রহ করা হয়েছে। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদারদের পাওনা প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এই টাকা না দেওয়ায় সমিতির ১১২ সদস্যের মধ্যে ৮০ শতাংশ সদস্য এবার কাঁচা চামড়া কেনেননি।

এদিকে হঠাৎ করে লবণের দামও বেড়ে গেছে। আড়তদারেরা জানিয়েছেন, কোরবানির আগে প্রতি ৭৪ কেজি লবণের বস্তা তারা কিনেছেন ৩০০ টাকায়। সেই লবণ এখন ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: বাজারে ধস, মাটিতে লুটাচ্ছে চামড়া

কাঁচা চামড়া রফতানি অনুমতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার

সারাবাংলা/আরডি/ওএম/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন