মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১২ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিরূপ প্রভাব পুঁজিবাজারে 

আগস্ট ১৪, ২০১৯ | ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

গোলাম সামদানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: পুঁজিবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। টানা দরপতনের পর মাঝে মাঝে সূচক দুই একদিন ঊর্ধমুখী হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। সূচকের নিম্নমুখীর কারণে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

বিজ্ঞাপন

গত ১৩ জুন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের পর থেকে সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক হারিয়েছে ২৭৩ পয়েন্টে। একই সময়ে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নেতিবাচক প্রভার পড়েছে পুঁজিবাজারে। একইসঙ্গে টানা দরপতনের কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে নেমেছে। আর এই দরপতনের পেছনে বাজার বিশ্লেষকরা আর্থিক খাতের দূরবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে দায়ী করছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, পুঁজিবাজার কে আরো শক্তিশালী করতে হবে। আর এই শক্তিশালীকরার ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের একটা ভুমিকা রয়েছে। পুঁজিবাজারের তারল্য প্রবাহের বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ আমাদের দেশে অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে থাকেন। একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, ব্যাংকের কার্যক্রম পুঁজিবাজারকে সার্বিকভাবে প্রভাবিত করে। ফলে ব্যাংক খাতের শেয়ারে বড় রকমের ধস হলে সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারেও ধস নামবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হবে।’

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন সংকটের কারণে পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে পিপলস লিজি অবসায়নের খবরে পতনের মাত্রা আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুঁজিবাজারের একটা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন হচ্ছে।’

তিনি বলেন, তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এর ফলে ব্যাংকের সুদের হার বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অবসায়নের কারণে এই খাতের সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম পড়ে গেছে । ফলে ব্যাংক ও আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়ায় পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে।

ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা : গত ১৩ জুন ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ২ হাজার ১১৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ওই দিন ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৫ হাজর ৪৭৪ পয়েন্ট। অব্যাহত দরপতনে সর্বশেষ গত ৮ আগষ্ট ডিএসইর বাজার মুলধন ১৫ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা কমে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ২৭৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২০১ পয়েন্টে নেমে আসে।

ব্যাংক খাতের দুরবস্থা: খেলাপি ঋণের কারনে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ১০টিব্যাংক।এর মধ্যে সরকারি ও বিশেষায়িত খাতের ৬টি ব্যাংক রয়েছে। বাকি চারটি ব্যাংকের মধ্যে ৩টি বেসরকারি এবং একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। সম্মিলিতভাবে দশটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ১৮ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।ব্যাংকগুলো হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, আইসিবি ইসলামি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এবি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এটি বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। সর্বশেষ তিন মাসে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন: বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অবসায়ন হতে যাচ্ছে পিপলস লিজিং। ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর পিপলস লিজিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। যাত্রা শুরুর ২২ বছরের মাথায় গত জুলাই মাসে এটি অবসায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে আমানতকারীদের মোট ২ হাজার ৩৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আটকা পড়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাকি ৭০০ কোটি টাকা রয়েছে ৬ হাজার সাধারণ গ্রাহকদের আমানত। এছাড়াও আরো দশটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বর্তমান তারল্য সংকটের কারণে আমানতকারীদের আমানত পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে পুঁজিবাজারেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/জিএস/একে

KSRM Bangabandhu Tunnel
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন