বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

দেশের উন্নয়ন ও কুরবানী প্রসঙ্গ

আগস্ট ১৪, ২০১৯ | ৩:৩৪ অপরাহ্ণ

ওমর তাসিক

দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পদ্মাসেতুসহ, দেশব্যাপী চার লাইনের মহাসড়ক নির্মাণের বিরাট কর্মযজ্ঞ, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার আর বিশাল বিশাল অবকাঠামোর মেগা প্রকল্প চলছে, মহাশুন্যে নিজস্ব স্যাটেলাইট নিক্ষেপ , 4 জি, 5 জি নেটওয়ার্ক টেকনোলজির দ্রুত উন্নয়ন, বিশাল বিশাল বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পসহ ডিজিটাল বাংলাদেশের অগনিত প্রকল্প নিয়ে সরকার মহা ব্যস্ত আর দম্ভ নিয়ে তা ঘোষণা করতে করতে গলদঘর্ম অবস্থা সরকার দলের লোক আর এথেকে সুবিধাভোগীদের।

বিজ্ঞাপন

আমার প্রশ্ন হলো কোনো দেশকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের নিরিখেই কি উন্নত দেশ বলা যায়?
একটি দেশকে সার্বিকভাবে উন্নত দেশ বলতে গেলে অবশ্যই সেদেশের মানুষের মানবিক ও নৈতিক উন্নয়নের সূচীও মাপতে হয়। সেই আলোকে বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের চরিত্র ও আচরণগত উন্নয়ন, সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের পেশাগত শিক্ষাসহ সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম, দেশে ন্যায়নীতির চর্চা, আস্থাশীল বিচার ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দেশের সামগ্রিক নাগরিক অধিকার ও সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা, সবার জন্য সাধারণ ও উন্নত চিকিৎসা সেবা ও সকল সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধার উন্নয়নের মাপকাঠিটাই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি, যা কোনো অবস্থাতেই কাংখিত পর্যায়ের ধারে কাছেও নাই।

সত্যি কথা বলতে বাংলাদেশের এসবের কোনোটিরই কোনো উন্নয়ন তো ঘটেইনি বরং অনেকক্ষেত্রে এসবের অবনতিই ঘটেছে। অবশ্য টক শোয়ের টকবাজরা এ কথায় আমার উপর হামলে পরে বলবেন আপনি কি অন্ধ? দুর্নীতি দমনে দুদকের অসাধারণ কৃতিত্ব, নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন নির্বাচন পরিচালনা, অফিস, আদালত, আইন-শৃঙ্খলা, নিম্ন আদালতের অসাধারণ বিচার ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মদক্ষতা কি আপনার চোখে পরে না? অবশ্য এসবই কে কিভাবে দেখেন তার উপর নির্ভর করে। যে পাকা পায়খানাই দেখেনি তার কাছে কমোড না প্যান তাতে কি এসে যায়?

যা হোক এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, এবারের কুরবানি ঈদেও দেখলাম কুরবানির পশু কেনাবেচা নিয়ে এক অদ্ভুত খেলা। বছর ধরে পশু লালন পালন করে একজন কৃষক তার ন্যায্য মুল্য পেলো না আবার অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই একজন কুরবানিদাতা তার সীমিত বাজেটে সন্তুষ্টি নিয়ে কুরবানী দিতে পারলো না। এই যে প্রতি বছর ঈদ আসলেই কুরবানী নিয়ে এক বিশৃঙ্খল আর অরাজক অবস্থা সৃষ্টি হয় তার দায় কে নিবে? নিশ্চয়ই কুরবানির পশুর সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই এসবের মূল কারণ আর তার দায়ও সে হিসাবে সরকারের ঘাড়েই বর্তায়।

বিজ্ঞাপন

এসবের কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায় একশ্রেনীর রাজনৈতিক টাউট ও বিশেষ শ্রেণীর লোকদের বছরে একবার বিশাল অংকের অর্থ লুটের সুযোগ করে দিতে গিয়েই কুরবানী নিয়ে এই অরাজকতা। শহরের যত্রতত্র হাট ইজারার ব্যবসা, ক্রেতাদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক হারে পশু কেনার খাজনা নেয়ার ব্যবসা, পশু পরিবহনের সময় চাঁদাবাজি এধরণের নানান ব্যবসাই এই ব্যবস্থার শৃঙ্খলা আনার পেছনে অন্তরায়। অথচ সরকারের সদিচ্ছা থাকলে, চাইলেই এই পুরো কুরবানির এক সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।

দেশে এখন কুরবানির চাহিদা মেটানোর মত যথেষ্ট এবং খুব উন্নত জাতের পশু উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এই উৎপাদনের ধারা ধরে রাখতে হলে আর তার উন্নয়ন ঘটাতে হলে একে যথাযথভাবে টিকিয়ে রাখতে হবে।

বাংগালী জাতি এক অদ্ভুত বিপ্লবী জাতি। এরা যা ধরে তার শীর্ষে উঠে আর এর শেষ দেখে ছাড়ে। বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি, মেধা কোনো উন্নয়নে বা এর শীর্ষ অবস্থান দখলে কখনোই কোনো সরকারের অবদান ছিলো না বা নাই। বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময় শুধু শুধুই এসবের মিথ্যা কৃতিত্ব নেয়। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানোর মত পশু উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের কৃতিত্ব শুধুই ব্যক্তি উদ্যোগের। এখন সরকার তার সদিচ্ছার মধ্য দিয়ে কিছু সুরক্ষা দিতে পারলেই এই খামার শিল্প বিশ্বের সেরা শিল্পে পরিনত হতে পারে।

কুরবানী ঈদের দশদিন আগে থেকেই নানান ঝক্কি ঝামেলা পুহিয়ে খামারিরা দেশের বিভিন্ন হাটে তাদের পশু বিক্রির জন্য নিয়ে যায় আর সেখানে গিয়েই তারা ফড়িয়া ও মধ্য সত্ব ভোগীদের খপ্পরে পড়ে লোকসানে পতিত হয়, আবার এই লোকসান এড়াতে অনেক খামারি সরাসরি পশু নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাটে চলে এসেও মৌসুমী হাট ব্যবসায়ীর আর্থিক চাপে ও অতিরিক্ত পশু সরবরাহের আবর্তে পড়ে আর্থিকভাবে ব্যপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার অন্যদিকে ক্রেতারা খামারিদের সারা বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও পূঁজির লোকসানের মুখে সস্তায় কুরবানি কিনতে পেরে আনন্দের ঢেকুর তুলে। জানিনা এই কুরবানির ধর্মীয় স্বার্থকতা কতটুকু? তবে সরকার চাইলেই এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত সুন্দর সুরাহা দিতে পারে।

খামারিদের বাঁচিয়ে সারাদেশে বিভিন্ন ওজনের পশুভেদে সহনীয় পর্যায়ে এক ও অভিন্ন পশুর মুল্য নির্দ্ধারন করে একটি সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা চালু করার মধ্য দিয়ে এর সমাধান সম্ভব।

কুরবানির পশুর মাংসের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় হাজার বারোশো টাকার কম হয় না যার বেশির ভাগ অর্থই যায় মধ্যসত্বভোগীদের পেটে। যদি সরকার পশুর ওজন অনুযায়ী সেগুলোর মুল্য নির্দ্ধারন করে দেয় আর এর মাঝখানে অন্য কোনো দালাল, ফরিয়া বা মধ্যসত্বভোগীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ না দেয় তাহলে হাটগুলোতে এতো দামাদামি আর ঠকা জেতার ঝামেলা থাকবে না। এছাড়া খামারিরাও ন্যায্য মূল্য পাবে।

সারা বিশ্বে আস্ত পশুর ওজন (live weight) ও এর মাংসের ওজন (hot carcass weight) এর একটা আনুপাতিক হিসাবেই এগুলোর দাম নির্দ্ধারিত হয়। একটি আস্ত গরুর ওজন যদি ১০০ কেজি হয় তাহলে তার মাংসের ওজন হবে ৬২.৫০ কেজি আর সেই হিসাবেই আস্ত পশুর দাম নির্দ্ধারিত হয়।

সরকার যদি খামার বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় পশুর লালন পালন খরচ হিসাব করে এর সংগে মুনাফা নির্দ্ধারন করে সারা দেশে এক ও অভিন্ন মুল্য নীতি অনুসরণ করে তাহলে কুরবানির বাজারের অরাজক অবস্থা দূর হবে। উদাহরণ স্বরুপ ১০০ কেজির একটা গরুর মূল্য যদি ৫০,০০০ টাকা নির্দ্ধারন করা হয় তাহলে তার মাংস মুল্য দাঁড়াবে ৮০০ টাকা। যা ক্রেতার জন্য যেমন সহনীয় তেমনি বিক্রেতার জন্যও লাভজনক।

ওমর তাসিক : বাংলাদেশ প্রতিনিধি, আইটিভি নিউজ, যুক্তরাজ্য।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন