বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

৪ মণ ধানে ১ পোন চারা!

আগস্ট ১৯, ২০১৯ | ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ

গোপাল মোহন্ত, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

গাইবান্ধা: সাঘাটা উপজেলার তেলিয়ান সাহারভিটা গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক। ভালো ফলনের আশায় উন্নত জাতের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্ত ভালো ফলন তো দূরের কথা, বন্যায় পুরো বীজতলা ডুবে আমনের চারা পঁচে গেছে। তাই ভাল বীজ সংগ্রহের আশায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নাকাই হাটে গিয়ে তার মাথায় হাত। সেখানে এক পোন (৮০ আটি) আমনের চারা বিক্রি হচ্ছে ১২’শ থেকে দুই হাজার টাকায়।

বিজ্ঞাপন

কৃষক আব্দুর রজ্জাকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এবার আমনের বীজের যে দাম তাতে চার মণ ধান বিক্রি করে এক পোন চারা কিনতে হচ্ছে। এক মণ ধানের দাম পাঁচশ টাকা। আর দুই হাজার টাকায় ভালো জাতের এক পোন আমনের চারা নিতে গেলে চার মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

নাকাই হাট ঘুরে দেখা যায়, বন্যার কারণে বীজতলা নষ্ট হওয়ায় হাটেও আমনের চারার সংকট দেখা দিয়েছে। তারপরও কিছু কিছু চারা সাতশ থেকে হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেই চারা লাগানোর পর ভালো ফলনের সম্ভবনা কম। যে কারণে জয়পুরহাট ও দিনাজপুর থেকে কিছু চারা এনেছে ব্যবসায়ীরা। তবে এই চারাগুলো কোন জাতের তা সঠিকভাবে জানেন না বিক্রেতারাও। এগুলো জমিতে লাগানোর পর ফলন কেমন হবে সেই সংশয় নিয়েও ভালো জাতের চারা মনে করে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।

সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের বুরুঙ্গী গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ। ২০১৬ সালের ভয়াবহ বন্যায় পাঁচ বিঘা জমির পটল ও ১০ বিঘা জমির করলাসহ অন্যান্য ফসল তলিয়ে যায়। এতে তার কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়। সে বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোবিন্দগঞ্জের বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে আসেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুর্নবাসনের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু দুই বছরেও আব্দুর রশিদের কপালে জোটেনি সরকারি সহযোগিতা বা কৃষি পুনর্বাসন।

বিজ্ঞাপন

দুবছর চেষ্টার পর ২০১৯ সালে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফের বন্যার কাছে হেরে যান কৃষক আব্দুর রশিদ। তিনি জানান, এ বছর যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা খুব তাড়াতাড়িই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কয়েক একর জমিতে টানা ছয় মাসের পরিশ্রমে পটল, করলা, শশাসহ বিভিন্ন সবজি লাগিয়েছিলেন। বন্যার আগে প্রতিসপ্তাহে সবজি বেচে ১০ হাজার টাকা আয় হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্যায় তার কপাল পুড়েছে। এখন পুরো ক্ষেত বন্যায় বিধ্বস্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কৃষি কর্মকর্তা তার খোঁজ নেননি।

একই উপজেলার পুটিমারী গ্রামের সফল কৃষক আমির হোসেন। ধান চাষে নয়, সবজি চাষে মিলেছে সফলতা । একই জমিতে চারটি ফসল উৎপাদন করে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক। সবজি বেচেই তিনি শূন্য থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কিন্তু এবারের বন্যায় সেই সফল কৃষকের স্বপ্নও ভেঙে গেছে। বন্যায় তার প্রায় ২০ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। সাঘাটার সফল মালটা চাষী হিসাবে পরিচিত আমির হোসেনের মালটা বাগানও বন্যায় লণ্ডভনণ্ড হয়ে গেছে।

সরকারি কৃষি প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকলেও এখনও তা দেওয়া শুরু করেনি কৃষি বিভাগ। এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হাসান আলী জানান, সাঘাটা উপজেলায় বন্যায় ফসলি জমির ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ৬০ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্তদের কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। দু-এক সপ্তাহের মধ্যে তালিকাভুক্ত সকল কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে ১ একর ৬৫ শতাংশ জমির জন্য আমনের চারা দেওয়া হবে।

এদিকে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তর এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সুত্রে জানা যায়, এবারের বন্যায় ১৪ হাজার ২১ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে । এছাড়াও সব উপজেলায় ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নতুনভাবে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলা থেকে তালিকা আসছে। সব উপজেলার তালিকা প্রস্তুত শেষ হলে নতুন করে ক্ষতির পরিমাণ জানানো হবে।

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন