সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

কুদুম গুহার গল্প

আগস্ট ২০, ২০১৯ | ৯:০০ পূর্বাহ্ণ

মুনতাসীর উল হক

প্রায় ১০ বছর আগে একটা ছবি দেখেছিলাম কুদুম গুহার। ক্যাপশনে লেখা ছিল, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গুহা। সেই থেকে কক্সবাজারের দিকে বেড়াতে গেলে প্রতিবারই চেষ্টা করি সেই কুদুম গুহা খুঁজে বের করার। একবার বন্ধুবান্ধব মিলে রামু থেকে মাইক্রোবাস ভাড়া করে টেকনাফ গেলাম। সেখানে গিয়ে শুনি আমরা প্রায় ৪০ মিনিট আগেই গুহায় যাওয়ার রাস্তাটা ফেলে এসেছি। সেদিন হাতে আর সময় ছিল না, রাতে ঢাকার বাস ধরতে হবে! কী আর করা, গুহায়া যাবার রাস্তার খোঁজখবর নিয়ে ঢাকায় ফিরে এলাম।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়বার গিয়ে বন বিভাগের অফিসে লোকজন খুঁজে পাইনি। এদিকে পুলিশও যাওয়ার অনুমতি দিলো না। গুহার খুব কাছে গিয়েও মন খারাপ নিয়ে ফিরে আসতে হলো। দান দান-তিন দান বলে একটা কথা আছে না! এবার তাই আটঘাট বেঁধে নামলাম। সেনাবাহিনী ও পুলিশে ফোন দিয়ে অনুমতির ব্যবস্থা করে রাখলাম, এরপরও সঙ্গে স্থানীয় গাইড তো নিতেই হলো। এত সব কাহিনীর কারণ শুধু একটাই— নিরাপত্তার অভাব। দিনের বেলায় হোয়াইকং থেকে শাপলাপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার রাস্তায় পাবলিক বাসগুলো চলাচল করে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে। মাঝেমধ্যে ডাকাতি হয় এখানে। ডাকাতদের বেশিরভাগই নাকি রোহিঙ্গা। থাকে পাশের জঙ্গলেই। তাই কিছুটা সাবধান হতেই হলো।

কুদুম গুহায় যাওয়ার হাঁটা পথটা উঁচু-নিচু পাহাড় আর কাঁটাযুক্ত জংলার মধ্য দিয়ে। কিছুটা পথ আবার ঝিরির পানিতে কাদা কাদা হয়ে আছে। যাওয়ার রাস্তা এমনিতে সুন্দর, অল্প এ পথটুকুতেই বেশকিছু পাখির মিষ্টি সুরের গানও শুনলাম। তবে অস্বীকার করব না, গুহার সামনে গিয়ে প্রথম দেখায় কিছুটা হতাশই হয়েছিলাম। গুহা যতটা উঁচু ভেবেছিলাম, বাস্তবে তার চেয়ে একটু ছোটই মনে হলো। গাইড জানাল, গুহাটা আরও প্রায় ৩০-৪০ ফুট সামনে ছিল, সামনের বিশাল অংশটা ভেঙে এখন গুহার মুখটা পেছনে চলে গেছে। আমার জানামতে, এটি বাংলাদেশের একমাত্র বালু-মাটির পাহাড়ি গুহা। তাই ভেঙে যাওয়াটা অস্বাভাবিক মনে হলো না। তবে কুদুম গুহাকে নিয়ে তারপর যে গল্পটা সে শোনালো, সেটা বেশ চমকপ্রদ।

বিজ্ঞাপন

গাইডের ভাষ্য, এই গুহার মালিক ছিল এক অনিন্দ্য সুন্দরী পরী। তার ছিল অসীম ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতার উৎস ছিল তার দুই চোখে। কেউ রূপের মোহে আবার কেউ বা ক্ষমতার লোভে ঢুকত ওই কুদুম গুহায়। কিন্তু তাদের কেউ আর জীবন নিয়ে ফিরতে পারত না। এরপর কেটে যায় অনেক বছর। মগ রাজার আমলে সমুদ্রের ওপার থেকে আসেন এক আধ্যাত্মিক সাধু। তিনিই নাকি পরীকে হত্যা করে তার চোখ দুটি নিয়ে চলে যান! ঠিক যেন আরব্য রজনীর কাহিনী!

এ কাহিনীর কতটা সত্য আর কতটা কল্পনা, সে তর্ক না হয় তোলা থাক। তবে সবার কাছ থেকে যতটুকু জানা গেল, এ গুহার নামকরণ চাকমা শব্দ কুদুং অ। কুদুং অ কালক্রমে পরিণত হয়েছে কুদুম গুহায়।

ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, প্রথম দর্শনে গুহাটা ভালো না লাগলেও সময় যতই গড়াতে লাগল, গুহাটি বেশ পছন্দ হতে লাগল। গুহার ভেতরে ঢোকার পুরো পথটা পানিতে ডোবা। পানিতে পা ছোঁয়ানো মাত্রই যেন বিদ্যুতের ঝটকা লাগলো। এই ভয়ানক গরমেও হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা পানি। মনে হলো যেন সাইবেরিয়ার কোনো নদীতে নামতে যাচ্ছি! গুহার মুখেই বিশাল এক কাঁকড়া। ওটাকে মনে হলো যেন গুহার দারোয়ান, চকচকে কালো শরীর নিয়ে ভয়ংকরভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গুহার অল্প পানিতে দেখা পেলাম চিংড়ি মাছের, আরো নাকি পাওয়া যায় চ্যাং মাছ (টাকি)। গুহার ভেতরটা রূপকথার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর। ভেতরের খুব বেশি দূর পর্যন্ত আলো যায় না। দিনের বেলায়ও রহস্যময় এক অন্ধকার। আলোর ধারা ধরেই দেয়ালে দেখা মিলল ফার্ন আর ছত্রাক জাতীয় কিছু উদ্ভিদের। ফার্নের পাতাগুলোতে চমৎকার সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি উড়ে এসে বসছে, আর এক মনে জাল বুনছে এক পাহাড়ি মাকড়সা। ভেতরে আরও ছোট ছোট গুহার মতো খাঁজ, টর্চ থাকলে খুঁজে দেখা যেত কী আছে ওসবের ভেতরে।

গুহার গভীর থেকে বাদুড়ের কিচকিচ শব্দ ভেসে আসছিল। বুক পানিতে দাঁড়িয়ে টের পেলাম হিম শীতল পানি ততক্ষণে গা সওয়া হয়ে গেছে। গাইড জানাল, গুহাটার একদম শেষ মাথায় গেলে নাকি দেখা মিলবে এক অজগরের। সেই অজগর সামনের দিকে পারতপক্ষে আসে না, বাদুড় দিয়েই উদর পূর্তি করে। অজগর সাহেবের দর্শন পেতে সাঁতার কেটে গুহার শেষ মাথায় যাওয়া দরকার। কিন্তু এই অন্ধকারে আর ঝুঁকি নিলাম না। কিছুটা অপূর্ণতাই রয়ে গেল, কিছুটা অপূর্ণতা থাকা হয়তো ভালো। ওটা না হয় পরের বারের জন্য তোলা থাকুক। গাইডও প্রলোভন দেখাল পরেরবার শীতকালে আসার জন্য। তখন নাকি গুহার পেছনের তৈঙ্গা পাহাড়ের নিচে হাতি এসে বসে থাকে। টেকনাফের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় তৈঙ্গা, এখনকার গেম রিজার্ভ ফরেস্টেই অবস্থিত, যাওয়ার রাস্তাটা যদিও দুর্গম, কিন্তু প্রাপ্তি যোগটা মনভোলানোই। মনে মনে বললাম— আসছি আবার!

গেম রিজার্ভ ফরেস্ট কিন্তু বাংলাদেশে এই একটাই, এখানেরটা। গেম রিজার্ভ জঙ্গলে অন্যান্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মতোই বন্যপশু সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে, এখানে আনন্দের জন্যে পশু শিকার করা যায় (তবে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিতভাবে)।

যেভাবে যাবেন

টেকনাফ থেকে প্রথমে যেতে হবে হোয়াইকং বাজার। ২০১৫ সালের হিসাবে, বাসভাড়া ৫০ টাকা অথবা সিএনজিতে ৩৫০ টাকা। হোয়াইকং থেকে অবশ্যই স্থানীয় পুলিশের অনুমতি এবং সম্ভব হলে টহল পুলিশ সঙ্গে করে চান্দের গাড়ি বা সিএনজিতে (ভাড়া ১৫০ টাকা) শাপলাপুর যেতে হবে। সঙ্গে পুলিশ না থাকলে পথে হাঁড়িখোলা গ্রাম থেকে গাইড নিতে হবে। শহর থেকে গুহা মুখে পৌঁছাতে সব মিলিয়ে ঘণ্টাদুয়েক লাগবে।

এখানে আশেপাশে থাকার হোটেল নেই, টেকনাফে মিল্কি রিসোর্ট বা স্থল বন্দরের কাছে নেটং হোটেল থাকার জন্যে বেশ ভালো।

অনুরোধ

বেড়াতে গিয়ে হইচই পরিহার করুন। নিরিবিলিতে সৌন্দর্য উপভোগ করুন। স্থানীয় লোকজনের যেন ভ্রমণকারীদের প্রতি বিরূপ ধারণা না হয়। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন। তারা আপনাকে অনেক তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারবে।

অবশ্যই খাবার প্যাকেট বা বর্জ্য দ্রব্য যেখানে সেখানে ফেলবেন না। আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই, আমাদের অসাবধানতার জন্যে যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এসব সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত না হয়।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন