মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিল হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য’

আগস্ট ২০, ২০১৯ | ৯:১৩ অপরাহ্ণ

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তখনকার বিরোধীদল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। সারাদেশে সন্ত্রাস ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে শান্তি সমাবেশ ও মিছিল ছিল সেদিন। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে সেই সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন সেসময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাবেশে গ্রেনেড হামলার শিকার হন শেখ হাসিনা। প্রাণে বেঁচে গেলেও হামলায় তিনি মারাত্মক আহত হন। নিহত হয়েছিলেন ২৪ জন। গুরুতর আহত হয়েছিলেন অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ অন্যান্যরা। আহতরা স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা শরীরে বয়ে চলেছেন আমৃত্যু। সেদিন আরও অনেক নেতাকর্মীর মত বর্তমান কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম কামাল হোসেন আহত হয়েছিলেন। পনের বছর আগের সেই ভয়াল ঘটনার বর্ণনা, ঘটনার কারণ ও পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সারাবাংলার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সারাবাংলা ডট নেটের নিউজরুম এডিটর আতিকুল ইসলাম ইমন।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। সেদিন সেখানে আপনিও উপস্থিত ছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন। আপনি কীভাবে দেখেছিলেন ঘটনাটি? 

এস এম কামাল হোসেন: বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে শান্তি সমাবেশের আয়োজন করেছিল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। আজকের প্রধানমন্ত্রী তখনকার বিরুধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন প্রধান অতিথি। তখন সারাদেশে সন্ত্রাস ও নির্যাতনের প্রতিবাদ যে সমাবেশ হয় সেই সমাবেশই সন্ত্রাসের শিকার হয়। একেবারে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সন্ত্রাস। এমন ঘৃণ্য নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সমাবেশে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় নেতাদের সঙ্গে যোগ দেন। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে একটি ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চে তিনি প্রায় কুড়ি মিনিট বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে তিনি যখন মঞ্চ থেকে নামবেন ঠিক সে মুহূর্তে নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়, তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। তখন সময় আনুমানিক বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। গ্রেনেডের বিকট শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই পড়ে যাই। এরপর দেখি আমার সারা শরীর রক্তে ভেজা। পরপর একাধিক গ্রেনেডের শব্দ পেয়েছিলাম।

সারাবাংলা: আহত হওয়ার পর  উদ্ধার হলেন কীভাবে?

বিজ্ঞাপন

এস এম কামাল হোসেন: অস্থায়ী মঞ্চের সিঁড়ির পাশে দাঁড়ানো ছিলাম আমরা। আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাসিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামিম, পঙ্কজ দেবনাথ, ইসহাক আলী খান পান্নাসহ আমরা সেখানে ছিলাম। আপার বক্তব্য শেষ হলে আমরা উনাকে নিয়ে মিছিল সহকারে বের হবো বলে সিঁড়ির পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। গ্রেনেড নিক্ষিপ্ত হলে আমরা সকলেই আহত হই। আমাকে আপার ব্যক্তিগত ড্রাইভার আলী হোসেন এবং শাহজাহান উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান। ঢাকা মেডিকেলে আমাদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো কোনও ডাক্তার ছিল না তখন, কোনও ওষুধ ছিল না। সেখান থেকে পরে আমাকে কয়েকজন ধরে এনে ধানমন্ডির ডেল্টা ক্লিনিকে ভর্তি করেন এবং সেখানেই আমার অপারেশন করা হয়।

সারাবাংলা: সেই গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল বলে আপনি মনে করেন?

এস এম কামাল হোসেন: মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীরা সবসময়ই প্রমাণ করতে চায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে দেশের কোনও লাভ হয়নি। তাই তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ করতে চায়। দেখুন, এই গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন শেখ হাসিনা। টার্গেট আমরা কেউ ছিলাম না। দলের অন্য কেউও নন। একমাত্র শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা হয়। একটি গ্রেনেড যদি ট্রাকের ওপর পড়ত তাহলে শেখ হাসিনাসহ আমাদের দলের প্রথম সারির জাতীয় নেতৃবৃন্দ সবাই সেদিন মারা যেতেন। আল্লাহর রহমত। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সেদিন আল্লাহ নিজ হাতে রক্ষা করেছেন। আমরা মনে করি, যে শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে হত্যা করেছিল সেই শক্তির প্রতিনিধি তারেক রহমান ও তার সহযোগীদের নেতৃত্বেই পরিকল্পিতভাবে ২১ আগস্ট জাতির জনকের কন্যাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। তার প্রমাণ হলো মুফতি হান্নানের স্টেটমেন্ট। সেদিন হামলার সকল আলামত সঙ্গে সঙ্গেই মুছে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড হামলা করে আর ওদিকে পুলিশ টিয়ারশেল ছুঁড়ে। পরের দিনই সেখানে এত ধোয়ামোছা করা হয়েছিল যে এখানে যে কয়েক ঘণ্টা আগে একটা নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না।

সারাবাংলা: বারবার শেখ হাসিনা টার্গেট কেন?

এস এম কামাল হোসেন: বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশে যে অন্ধকার রাজনীতি শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষের যে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সেনা অফিসার ও জওয়ানদের হত্যা করা হয়েছিল, ৫৫১ জন সেনা অফিসারকে একদিনে হত্যা করা হয়েছিল, সাড়ে চার লাখ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অনেককে গুম, খুন করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ধারায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল, মানুষকে সকল প্রকার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। সেই অন্ধকার থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। তিনি ১৯৮১ সালে দেশে ফিরেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সকল শক্তির মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলেন। সবাই শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ও নেতৃত্বে সাহস ফিরে পায়। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেছিলেন, গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি করেছিলেন, পার্বত্য এলাকায় শান্তিচুক্তি করেছিলেন, বাংলাদেশকে দুর্ভিক্ষ থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। বাংলাদেশে বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিকাশ পুনরায় হয়েছিল তার ক্ষমতায় আসার পরপরই। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। সাম্প্রদায়িক শক্তির আবারও উত্থান ঘটে। সারাদেশ জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। শেখ হাসিনা সেই দুঃসময়ে বিএনপি, জামাত জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। তাকে থামিয়ে দিতেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটানো হয়। এর আগে বাংলাদেশকে ব্যর্থ করে দিতে বঙ্গবন্ধুকেও হত্যা করেছিল তারা।

স্বাধীনতা বিরোধীরা যদি বাংলাদেশকে তাদের একটি শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত করতে চায়, বাংলাদেশকে যদি তারা একটি সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বানাতে চায় তাহলে তাদের মূল বাঁধা কে? মূল বাধা হচ্ছেন শেখ হাসিনা। এখন এই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি তারা বুঝেছিল শেখ হাসিনা আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে দেশ আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে যাবে। তা হয়েছেও। দ্বিতীয়বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর আজকে বাংলাদেশ অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছে। আজকে পদ্মাসেতু হচ্ছে, বাংলাদেশকে পারমানবিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, সমুদ্র বিজয় করেছেন, তার আমলে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে উন্নয়ন করেছেন, মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদাশীল একটি দেশে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশকে স্বল্পন্নোত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছেন। ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়া তোলার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। আজকে প্রমাণ হয়েছে যে শেখ হাসিনা বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। শেখ হাসিনা এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এ কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা যারা বাংলাদেশকে চায় না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে দেখতে চায় না, তারাই শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য অপচেষ্টা করে। কারণ এসব উদ্দেশ্য পূরণে তাদের মূল বাধা শেখ হাসিনা। এ কারণে তারা শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যা করার চেষ্টা করেছে।

সারাবাংলা: এখন কী কোনও শারীরিক সমস্যা অনুভব করেন? 

এস এম কামাল হোসেন: বর্বরোচিত সে হামলায় আহত প্রত্যেকেই যে মানসিক আঘাত পেয়েছেন তা নিশ্চয়ই তাদের এখনও তাড়া করে। আমার শরীরে এখনও ১০ থেকে ১২টি স্প্লিন্টার রয়েছে। স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে আমৃত্যু। গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার পরের দিনই আমার অপারেশন হয়।  আমার খাদ্যনালীর নাড়ি ৯ ইঞ্চি কেটে ফেলে দেওয়া হয়। এখনও স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় কাতরাই। শান্তিতে ঘুম হয় না।

সারাবাংলা: ঘটনার ১৪ বছর পর এই হামলা মামলার বিচারের একটি রায় দিয়েছেন  আদালত....

এস এম কামাল হোসেন: যেভাবে তখনকার সরকার এই হামলার আলামত নষ্ট করেছে, তারপর জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশের ইন্ধন আছে ইত্যাদি বলে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে এরপর সুষ্ঠু বিচার সহজ ছিল না। তারপরও হয়েছে। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে চালু হয়েছিল তা থেকে দেশকে বের করে এনেছেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘদিন পরে হলেও বিচার হয়েছে, এটি স্বস্তির জায়গা। তবে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী, হাওয়া ভবনের কুশীলব তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম। তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা উচ্চ আদালত মূল পরিকল্পনাকারীকে সর্বোচ্চ সাজা দেবেন।

সারাবাংলা: সারাবাংলাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এস এম কামাল হোসেন: সারাবাংলাকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন