বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

আমি মুডি, কিন্তু অহংকারী নই: অপূর্ব

আগস্ট ২৩, ২০১৯ | ২:৩২ অপরাহ্ণ

রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ

অপূর্বর কাছে অভিনয়টা দায়িত্বশীল কাজ। তিনি জানেন, পাড়ার হাবুলকে হলদে প্যান্ট, খয়েরি জামা আর ডার্ক গ্লাস পরালে ‘গ্ল্যামারাস’ লাগবে। গ্ল্যামার বা স্টারডমের লোভ তাই তিনি সরিয়ে রাখতে জানেন। অভিনয়ের মাটি, সেই পরিবেশের গন্ধ তার প্যাশন।

বিজ্ঞাপন

নিজের অভিনয় জীবনকে অতিরঞ্জনের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলতে চান না তিনি। জানেন, দর্শকদের চাহিদায়, ভালোবাসায় তিনি তৈরি হয়েছেন। তাই দর্শকের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। তার অভিনীত নাটক নিয়ে মাঝেমধ্যে সমালোচনা হয়। একঘেয়েমিতার অভিযোগ ওঠে। যদিও তিনি এসব সমালোচনার তোয়াক্কা করেন না। সমান্তরাল এগিয়ে চলেন রেল লাইনের মতো।

সারাবাংলার সাথে মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে সোজাসাপ্টা কথা বলেছেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। সেই সাথে কথায় কথায় ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা নিয়েও মনের বাতায়ন খুলেছেন।


লোকে বলে, আপনি মুডি অভিনেতা। আসলে কি তাই?
প্রত্যেক শিল্পী কোনো না কোনো দিক থেকে মুডি হয়ে থাকেন। অভিনয় করতে গেলে মুড ক্রিয়েট করতে হয়। আর এই মুড ক্রিয়েটের সুযোগটা একজন ডিরেক্টর করে দেন। এরকমভাবে বলতে গেলে আমি মুডি। মুড শিল্পীর মধ্যে ইমোশন তৈরি করে। ইমোশন না থাকলে অভিনয় করা কঠিন হয়ে যায়।

আর হ্যাঁ, মুডি বলে এটা ভাবা যাবে না যে, আমি অহংকারী। আমি মাটিতে পা রেখে চলি। আমি জানি, আমার আজকের এই অবস্থান তৈরি হয়েছে দর্শকের জন্য।

বিজ্ঞাপন

আপনি কিছুটা এলিট শ্রেণির নাটক করেন। এমনটা বলা যেতে পারে আপনি একটি গণ্ডিতে আটকে গেছেন। কখনো কি মনে হয় এই গণ্ডি থেকে বেরোনো দরকার?
গণ্ডিতে আটকে আছি বললে ভুল বলা হবে। যারা এই প্রশ্নটা করেন তাদেরকে আমি প্রশ্ন করতে চাই, আমি ২০০৬ সাল থেকে নাটক করি। আপনারা আমার কয়টি নাটক দেখেছেন? আমি বিভিন্ন রকম চরিত্রে অভিনয় করেছি। তবে এটা সত্য, এলিট শ্রেণির নাটকে বেশি অভিনয় করেছি। তাই বলে আমি ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করিনি, তা কিন্তু নয়। আমার প্রচুর নাটক আছে যেগুলো এলিট শ্রেণির বাইরের কাজ। সেইসব কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গুড়’, ‘পুতুল মানুষ’, ‘স্বপ্নের চিতা’র মতা অনেক নাটক বা টেলিছবি আছে যেগুলো শহরের এলিট শ্রেণির চরিত্রের বাইরে গিয়ে অভিনয় করেছি। সুতরাং বলব, না জেনে এধরনের প্রশ্ন করাটা বোকামি। আমি আশা করব এই সাক্ষাৎকারের পর মানুষ আমাকে বলবে না, আমি এলিট শ্রেণির গণ্ডিতে আটকে আছি।

এবার ঈদের বিশের অধিক নাটকে অভিনয় করেছেন। দর্শক হিসেবে এই নাটকগুলো কতটা মানসম্পন্ন ছিল বলে মনে করেন?
আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রত্যেকটি নাটক মানসম্পন্ন। মানসম্পন্ন নাটক না হলে আমি কাজ করতাম না। এরমধ্যে কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কাজও ছিল। আগে অভিনয় করা হয়নি, এমন চরিত্রে অভিনয় করেছি। ‘জীবনমুখী’ নাটক যেমন ছিল, তেমন ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ঘরানার গল্পও ছিল। প্রতিবারই এরকম নাটকে অভিনয় করে থাকি। এবারও সেই একই ধারায় অভিনয় করা হয়েছে।

সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে ভালোবাসেন অপূর্ব। ছবি: সংগৃহীত


গত কয়েক বছর ধরে কেবল একটা কথাই শোনা যায়, মান থাকছে না ঈদের নাটকের। এই যে মানের কথা বলা হচ্ছে, এই মান পরিমাপের নিক্তি আসলে কী?
যারা বলছে যে, নাটকের মান থাকছে না তারাই এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবে। আমার কাছে তো মনে হয়, প্রচুর মানসম্পন্ন নাটক নির্মিত হচ্ছে আজকাল। অনেক এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হচ্ছে। নাটকের গল্পের ভিন্নতা আসছে। যদিও সেসব নাটক নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক- দুরকম সমালোচনা হচ্ছে।

ভালো-মন্দ সবখানে আছে। পরিচালকদের মধ্যেও আছেন। ভালো কাজগুলো গ্রহণ করলে তো হয়ে যায়। খারাপ কাজগুলো না দেখলে পরিচালকরা খারাপ নাটক বানাবেন না। কিন্তু তা না করে ‘নাটকের মান নেই’ বলে জিকির করা হয়। আর যদি দেখা যায় যে ভালো কাজগুলো নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে না—তাহলে বুঝতে হবে এর পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য আছে।

অভিযোগ আছে, একই অভিনয়শিল্পীকে ঘুরে ফিরে নাটকে হাজির করা হচ্ছে। সেই অভিনয়শল্পীদের মধ্যে আপনিও একজন। ঘুরে ফিরে একই অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে অভিনয় করানো সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাই।
আপনার কি মনে হয়? কয়টা নাটকে অভিনয় করা সম্ভব বলে মনে হয় আপনার কাছে? এক ঈদে নাটক নির্মিত হয় প্রায় ছয় শ’র মতো। এরমধ্যে সব নাটকে নিশ্চয়ই আমাদের (যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ) অভিনয় করা সম্ভব না। এরকম অভিযোগ সত্যিই ভিত্তিহীন। আমি, নিশো, মেহজাবিন, তানজিন তিশা, সজলসহ যারা আছেন তাদের সবার নাটক একসাথে করলে ছয় শ’ নাটক হবে না। আমরা ছাড়াও অনেক শিল্পী নাটকে অভিনয় করছেন।

মিডিয়া একটি ওপেন প্ল্যাটফর্ম। এখানে নিজের ইচ্ছা মতো নাটক দেখার সুযোগ আছে সবার। আমরা কাউকে জোর করি না যে, আমাদের নাটক দেখুন।

টিভি চ্যানেল কতৃপক্ষকেও আমাদের দিয়ে নাটক করাতে জোর করি না। মানুষ আমাদের বেশি ভালোবাসেন বলেই আমাদের চাহিদা আছে। তাই টিভি চ্যানেল আমাদের দিয়ে নাটক করাচ্ছে, মানুষও দেখছে। সুতরাং একই মুখ বারবার ঘুরেফিরে আসছে—এই কথাটি বলার কোনো মানে হয় না।

অপূর্ব অভিনীত প্রথম ছবি ‘গ্যাংস্টার’ ছবির পোস্টার। ছবি: ফেসবুক


এখন নাটকের সিক্যুয়াল হচ্ছে। এটা কতটা যৌক্তিক?
পাবলিক ডিমান্ডের কারণে সিক্যুয়াল নির্মিত হয়। পরিচালকের ইচ্ছাতেও সিক্যুয়াল নির্মিত হচ্ছে। কোনো কোনো সিক্যুয়াল হয়ত ভালো হয়, আবার কোনোটা ভালো হয় না। তাছাড়া সিক্যুয়াল খুব বেশি নির্মিত হয় না। একজন পরিচালক নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করতেই পারেন। সিনেমায় সিক্যুয়াল কথাটি বেশি প্রচলিত বলে নাটকে বিষয়টি কিছুটা বেমানান লাগে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি বিষয়টির যৌক্তিকতা দেখি।

অপূর্ব কী ইউটিউব ভিউয়ে বিশ্বাসী?
অবশ্যই বিশ্বাসী। কারণ, ভিউ মানে দর্শক। তবে ভিউ যে নাটকের মান নির্ধারন করে, এটায় বিশ্বাসী না। এখন যারা অনলাইনে নাটক দেখে তারা অধিকাংশই টিনএজার। তারা মজার নাটক দেখতে চায়। জীবনমুখী সিরিয়াস নাটক দেখতে চায় না। প্রত্যেকটা গল্প বোঝার জন্য একটা নির্দিষ্ট বয়সের প্রয়োজন হয়।

এর বাইরে কিছু দর্শক আছে যারা জীবনমুখী গল্পের নাটক পছন্দ করে। কিন্তু তাদের অনলাইনের প্রতি আগ্রহ কম। দেখা যায়, জীবনমুখী গল্পের ভালো নাটক অনলাইনে প্রকাশিত হলে সেগুলোর ভিউ কম হয়।

ঢাকাই ছবির শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের সাথে অপূর্ব। ছবি: সংগৃহীত


তার মানে নাটকের টার্গেট অডিয়েন্স টিনএনজাররা?
হ্যাঁ। এখন টিনএজ দর্শকের কথা মাথায় রেখে নাটক নির্মাণ করা হয়। যেখানে যেটার ডিমান্ড বেশি সেখানে সেটা করা হয়। কোনো এলাকায় যদি ভেজিটেরিয়ান মানুষ বসবাস করে, সেখানে মাংসের দোকান খুলে বসে থাকলে তো হবে না। যেহেতু নাটকের টিএনএজ দর্শক বেশি, সেহেতু তাদের টার্গেট করে নাটক নির্মিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু যারা পারিবারিক সিরিয়াস নাটক পছন্দ করেন তারা দেশি নাটক বিমুখ হয়ে পড়ছেন বলে মনে হয় না?
আমার কাছে তা মনে হয় না। পারিবারিক নাটক অনেক নির্মিত হচ্ছে। ভারতীয় সিরিয়ালের চেয়ে এখনো আমাদের নাটকের প্রতি আগ্রহ বেশি দর্শকের। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে, আমাদের দর্শক ভারতীয় সিরিয়ালের প্রতি বেশি ঝুঁকেছে। হয়ত, ভারতীয় সিরিয়াল দেখছে মানুষ। তাই বলে, আমাদের নাটক কম দেখছে তা নয়। বরং অনেক ভারতীয় দর্শকও আমাদের নাটকের ভক্ত। ইউটিউবে অনেক ভারতীয় দর্শক কমেন্ট করে। আমাদের দেশের অনেক সেলিব্রেটির ফ্যান পেজও চালায় ভারতীয় অনুরাগীরা।

আপনার অভিনীত ‘বড় ছেলে’ নাটকের পর মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন নিয়ে নাটক নির্মাণের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আপনারও কী তাই মনে হয়?
সব ধরনের গল্পের নাটক সবসময় নির্মিত হচ্ছে। হোক সেটা মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট, কমেডি, ফ্যান্টাসি বা ট্র্যাজেডি। কিছু সময় আসে যখন একটি নির্দিষ্ট ঘরানার নাটকের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। এটা ঘূর্ণায়মান। আপনার সবসময় একই নাটক ভালো লাগবে না। যেদিন আপনি সিরিয়াস মুডে থাকবেন না, সেদিন আপনার কাছে সিরিয়াস নাটক ভালো লাগবে না। আবার যখন আপনি সিরিয়াস মুডে থাকবেন তখন ফান নাটক ভালো লাগবে না।

এখন মধ্যবিত্ত পরিবার কেন্দ্রিক নাটক নির্মিত হচ্ছে বলে এটাকে ট্রেন্ড ধরা যাবে না। সব নাটক কিন্তু এক ঘরানার নির্মিত হচ্ছে না। ব্যতিক্রম আছে। যদি গড়ে সব নাটক একই ঘরানার নির্মিত হতো তাহলে এটা নিয়ে কিছু বলার থাকত। এখনো ইন্ডাস্ট্রিতে মিশ্র গল্পের নাটক নির্মিত হচ্ছে।

অপূর্ব ও মেহজাবিন অভিনীত ‘বড় ছেলে’ নাটকটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল দেশব্যাপী। ছবি: সংগৃহীত


আচ্ছা, ওয়েব কী টেলিভিশনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
একেক সময় একেক প্ল্যাটফর্ম আসে। যখন রেডিও ছিল তখন রেডিওতে মানুষ নাটক শুনত। তারপর টেলিভিশন আসার পর রেডিওর জনপ্রিয়তা কমে গেলো। এখন ওয়েব প্ল্যাটফর্ম এসেছে। সময়ের সাথে সাথে মানুষ নতুন প্রযুক্তির কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। তাল মেলায়। সামনের দিকে আগায়।

তবে ওয়েব যদি টেলিভিশনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সেটা কাটিয়ে উঠতে হবে। কেননা, সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে আসছে। আর যদি টেলিভিশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ ধরে রাখতে হয়, তাহলে এমন কিছু ব্র্যান্ডিং অনুষ্ঠান করতে হবে যেগুলো দেখতে হলে টেলিভিশন খুলতে হবে।

একটি মাত্র সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এরপর আর সিনেমায় দেখা যায়নি। কারণ?
বেশকিছু সিনেমার প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু সেসব ছবির গল্প ভালো লাগেনি বলে অভিনয় করা হয়নি। ভালো গল্প পেলে অবশ্যই সিনেমায় অভিনয় করব।

বিভিন্ন মুডে ফটোশুটে অপূর্ব। ছবি: সংগৃহীত


সাম্প্রতিক সময়ে এফডিসিতে সুপারস্টার শাকিব খানের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল। তখন কী কথা হয়েছিল আপনাদের মধ্যে?
বলার মতো তেমন কোনো কথা হয়নি। এমনি কুশল বিনিময় হয়েছে। সিরিয়াস কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। জাস্ট আড্ডা বলতে পারেন।

যদি কখনো শাকিব খানের সঙ্গে ছবির প্রস্তাব পান। করবেন?
হোয়াই নট? যদি ব্যাটে বলে সবকিছু মিলে যায় তাহলে একসঙ্গে অভিনয় করতে আপত্তি নেই। সেজন্য যে পর্দায় উপস্থিতি সমান সমান থাকতে হবে এমন না। চরিত্র যদি গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে হবে। অভিনয়ের সুযোগ থাকতে হবে।

ইন্ডাস্ট্রিতে অপূর্ব কাউকে প্রতিযোগী মনে করেন?
অপূর্ব কাউকে প্রতিযোগী মনে করেন না। তিনি সবাইকে সহশিল্পী হিসেবে ট্রিট করেন। আমার কাছে মনে হয় সব শিল্পীর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। আর এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শিল্পীদের নিয়েই ইন্ডাস্ট্রি। একেক জন শিল্পী একেক রকম চরিত্রে ভালো অভিনয় করেন। সবাই সব চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতা রাখেন না। এটা সম্ভবও না। সব ধরনের চরিত্রাভিনেতার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল।

সারাবাংলা/আরএসও/পিএ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন