বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ইয়াসমিন পেরেছিল, তনু-নুসরাতরা পারছে?

আগস্ট ২৪, ২০১৯ | ২:০৮ অপরাহ্ণ

জিমি আমির

১৪ বছরের ইয়াসমিন আক্তার ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। ঢাকা থেকে ফিরছিল দিনাজপুরের দশমাইলে, নিজ বাড়িতে। ফেরার পথে কয়েকজন পুলিশ তাদের ভ্যানে করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপর তিন পুলিশ সদস্য তাকে গণধর্ষণ করে রাস্তায় ফেলে যায়। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্টের সে ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে দিনাজপুরবাসী।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর দিন (১৯৯৫ সালের ২৫ আগস্ট) স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল দৈনিক উত্তরবাংলা পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানকে জানান, পুলিশ সদস্যরা একটি মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। পরে ২৬ আগস্ট তিনি মেয়েটির পরিচয় জানতে পারেন। তিনি এ বিষয়ে পত্রিকায় লিখতে চাইলেও পুলিশ তাকে নিষেধ করে। সেদিন রাতে পুলিশ মতিউর রহমানের পত্রিকার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মতিউর রহমান তখন তার প্রতিবেশীর বাসা থেকে বিদ্যুৎ ধার করে সংবাদটি প্রকাশ করেন। সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। বিক্ষুদ্ধ জনতা স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে, লুটপাট করে। এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়। কারফিউ ভেঙে এলাকাবাসী রাস্তায় নামলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, সেখানেই প্রাণ হারান ১৭ জন, আরও প্রায় ১০০ জন আহত হন। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে দু’জনকে ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার করা হয়। তারা বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০০৪ সালে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। অমৃত লাল নামক আরেক অভিযুক্ত মামলার রায় প্রকাশের বহুদিন পর গ্রেফতার হন।

জানা গেছে, ইয়াসমিন হত্যার বিচার প্রক্রিয়াটিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রথমদিকে এই মামলা নিতে রীতিমতো অস্বীকৃতি জানিয়েছিল পুলিশ। সমাজের নানা মহলের চাপে সরকার দোষীদের বিচারের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সেই থেকে ২৪ আগস্ট বাংলাদেশে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বলা হয়ে থাকে, এটিই একমাত্র ঘটনা যেখানে মানুষ সত্যিকার বিচার পেয়েছে বলে মনে করেন সাধারণ থেকে শুরু করে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষ। এ ঘটনায় রাস্তায় নেমেছিল মানুষ। সুষ্ঠু বিচারে অনেকটা বাধ্য করেছিল সরকারকে। কিন্তু পরের ঘটনাগুলো অন্যরকম। মানুষ এখন প্রতিবাদ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কখনো কখনো মানববন্ধন হয়। এসব প্রতিবাদে পুলিশ মামলা নিলেও শেষ পর্যন্ত এসব মামলার নিষ্পত্তির হার খুবই কম। আবার নিম্ন আদালতে রায় পাওয়ার পরও উচ্চ আদালতে সেগুলো ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।

বিজ্ঞাপন

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। পরে রাতে বাসার কাছে সেনানিবাসের ভেতর একটি জঙ্গলে তার মরদেহ খুঁজে পায় স্বজনরা।

পরদিন তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ ও ডিবির পর ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। তনুর দুই দফা ময়নাতদন্তে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি। শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ডিএনএ পরীক্ষা ও ম্যাচিং করার বিষয়টি এখনো আটকে আছে। হত্যা মামলার ৩৯ মাসেও সিআইডি পরীক্ষা ও ম্যাচিং শেষ করতে পারেনি। এছাড়া দীর্ঘ সময়েও শনাক্ত হয়নি হত্যাকারীরা, নেই মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে কলেজছাত্রী রুপা খাতুনকে চলন্ত বাসে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্ষণ করে। পরে তাকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ ওই রাতেই তার লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চার আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

৬ এপ্রিল ২০১৯ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। যৌন হেনস্তার অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার নামে করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয় তাকে। তা না শোনায় উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের আলিম পরীক্ষার দিন মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করেছে— এমন খবরে নুসরাত ওই ভবনের তিন তলায় চলে যান। নুসরাতের ভাষ্য মতে, সেখানে হাত মোজা, পা মোজাসহ বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। সে অস্বীকৃতি জানালে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত।

দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে এ ঘটনায়। প্রথমে পুলিশ মামলা নিতে না চাইলেও পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে মামলা নেওয়া হয়। নুসরাতের অভিযোগের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অনেক নাটকীয়তার পরে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনার দুই মাস পর নানা মহলের চাপের কাছে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

গত ২ আগস্ট ২০১৯ খুলনার রেলওয়ে (জিআরপি) থানায় গৃহবধূকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেন, খুলনার রেলওয়ে (জিআরপি) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওসমান গনি পাঠানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য তাকে ধর্ষণ করেছেন। পরে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ওই নারীকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি নিজেই পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের অভিযোগ করেন। তবে পুলিশ জানান, আগেই ওই নারীকে পাঁচ বোতল ফেনসিডিলসহ আটক করা হয়।

গত ১৩ এপ্রিল ময়মনসিংহে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবাকে গ্রেফতার করা হয়। আলাল হুদা নামের ওই ব্যক্তি তার ষষ্ঠ শ্রেণণি পড়ুয়া মেয়েকে ৭ মাস ধরে ধর্ষণ করে। লোকলজ্জার ভয়ে দীর্ঘদিন ঘটনাটি চাপিয়ে রাখলেও অবশেষে স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় পুলিশ আলাল হুদাকে গ্রেফতার করে।

প্রতিদিন এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। কোনোটা গণমাধ্যমে আসছে, কোনোটা আসছে না। কোনোটা জানা হয়, কোনোটা জানা হয় না। কেউ আত্মহত্যা করছেন, কেউ বিচার চেয়ে বিচারের নামে হেনস্থার শিকার হয়ে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের দাবি, ৯৯ শতাংশ ঘটনারই কোনো বিচার নেই। কেউ কেউ তো মনে করেন যাও বা বিচার হয়, তা পুরোটাই লোক দেখানো।

গত এপ্রিলে মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘অধিকার’ ধর্ষণের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩ হাজার ৬৩৮টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ছিল ২ হাজার ৫২৯টি। ধর্ষকদের কুদৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শিশু, প্রতিবন্ধী থেকে ষাটোর্ধ্ব নারী কেউই। এই সময়ে ৬ হাজার ৯২৭ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ১ হাজার ৪৬৭ জনকে। ধর্ষণের ‘গ্লানি’ থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যা করেন ১৫৪ জন।

‘অধিকার’ তাদের পরিসংখ্যানে ধর্ষণের যে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে তাতে কেবল পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরেও আছে বড় একটি সংখ্যা, যেখানে নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশই করে না।

এ ঘটনা যে তৃতীয় বিশ্বের ঘটনা তা কিন্তু নয়, উন্নত বিশ্বেও লোকলজ্জার ভয়ে যৌন নির্যাতনের কথা গোপন করার পরিসংখ্যানও ভয়াবহ। কানাডায় এক হাজার যৌন নির্যাতনের ঘটনার মাত্র ৩৩টি পুলিশকে জানানো হয়, আমেরিকায় ৬৮ শতাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনায় নির্যাতিতরা পুলিশকে কিছুই জানায় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষিতারা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতনকে গোপন করছেন, আর আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যায় ধর্ষকেরাও। এই সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষকামীদের ধর্ষণ করার সাহস জোগায়। তাছাড়া, এসব ঘটনার যে প্রতিবাদ হয় তা সরকার নিজেদের কাঁধে নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেয়, যা ধর্ষকদের ভয় কমিয়ে দেয় নির্যাতিতাদের যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-মাদরাসার শিক্ষক, নিম্নবিত্ত বাসের ড্রাইভার-হেলপার ধর্ষণ করছে ভয়হীনভাবে। তারা বলছেন, বিচারহীনতা বা লোক দেখানো বিচারের কোনো সমাপ্তি না থাকাই এসবের মূল কারণ।

বলিউডের ‘পিংক’ মুভিটা অনেকেই দেখে থাকবেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বন্ধুর সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্কে যখন একজন নারী ‘না’ বলেন, তখন সেই ‘না’ কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা আদালতকে বলেন আইনজীবী। অর্থাৎ কেউ যখন ‘না’ বলেন তখন তার অর্থ হচ্ছে ‘না’। কিন্তু এই সমাজে ‘না’-এর গুরুত্ব অনেকটা বিলীন হয়ে যাওয়া শব্দের মতো। নির্যাতিতাই এখানে পুরোপুরি অস্পৃশ্য, অছ্যুত।

২৪ বছর আগে আকাশ সংস্কৃতি তেমন প্রভাব ফেলেনি মানুষের জীবনে। তাই ইয়াসমিনের ঘটনা রাস্তায় নেমে বিচার করতে বাধ্য করেছিল সাধারণ মানুষ। সেদিন ইয়াসমিন পেরেছিল। কিন্তু আজ আর পারছে না তনু বা নুসরাতরা। আজ আকাশ সংস্কৃতির কারণে পৃথিবী হাতের মুঠোয়। কিন্তু সামাজিক বোধ, মানবিকতা, দায়বদ্ধতা, কর্তব্যবোধ চলে গেছে হাতের নাগাল থেকে যোজন যোজন দূরে।

বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য অবাধ যৌনতা, পর্নোগ্রাফি, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, আবেদনময়ী ফ্যাশনের মতো হাজার হাজার কারণ থাকতে পারে। তবে এ বিপথগামীতা থেকে বাঁচতে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধই পারে সমাজ বা রাষ্ট্রের বিচারহীনতা বা লোক দেখানো বিচারের সংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরতে।

লেখক: জয়েন্ট নিউজ এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট

আরও পড়ুন: ইয়াসমিন হত্যার দুই যুগ

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন