বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রক্তস্নাত মা আমার!

আগস্ট ২৪, ২০১৯ | ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

নাজমুল হাসান পাপন, বিসিবি সভাপতি

যন্ত্রণাটা কোথায়, কিসের কষ্ট— এগুলো কাউকে বোঝানোর মতো নয়। হারিয়েছি আমার মাকে। আমার বুকভরা হাহাকার কারও কাছে পৌঁছাবে না। নিঃশব্দে বুকের ভার নিজেকেই বইতে হবে। ২১ আগস্টের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্তই আমার নিদারুণ কষ্টের। সময়মতো সবকিছু পেলে হয়তো আম্মাকে বাঁচাতে পারতাম— এমন একটা আফসোস যে একেবারে নেই, তা নয়। তবে কাউকে দোষারোপ নয়, কেবল মা হারা এক সন্তান হিসেবে কষ্টের কিছু কথা বলব। প্রতি অক্ষরে অক্ষরে যা সত্যি এবং বেদনাদায়ক। ওই সময় কারও কারও কাছ থেকে আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছি, সেজন্য প্রথমেই তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।

বিজ্ঞাপন

ঘটনা কোনটার গুরুত্ব বেশি বা কোনটার গুরুত্ব কম, তা হয়তো অন্যের চিন্তার বিষয় হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি ঘটনাই অসীম যন্ত্রণার। তাই আলাদা করে কোনো ঘটনার গুরুত্ব না দিয়ে মোটামুটি পর পর ঘটনাগুলো সাজানোর একটা চেষ্টা করলাম। আমার মানসিক বিক্ষেপ নিয়ে লিখতে গেলে সেটা আলাদা করে লেখা দরকার। কিন্তু আমার মায়ের মৃত্যু নিয়ে সবার মধ্যে যে বিভ্রান্তি, তা দূর করার জন্য আমার উপস্থিতির ঘটনাবলিই কেবল তুলে ধরলাম।

আমরা সাধারণত প্রত্যেক শুক্রবার আব্বা-আম্মার বাসায় খাওয়া-দাওয়া করতাম। আমার যেসব খাবার পছন্দ, ওই দিন আম্মা সেগুলো রান্না করত। অফিস থেকে ধানমন্ডিতে ভাড়া করা একটি বাসায় আমি থাকতাম। আমার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েসহ সবাই একসঙ্গে আম্মার রান্না খেতে যেতাম। ১৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার আম্মার সাথে টেলিফোনে কথা হয়। আম্মা বলল, ‘পাপন, কাল না, তুমি পরশু এসো।’ তখন বন্যার ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে আম্মা প্রত্যেক দিন বেরিয়ে যেত। বলল, ‘ত্রাণের একটা গ্রুপ যাচ্ছে, ওদের সাথে আমি যাব।’ এই ঘটনার কিছুদিন আগে ভয়াবহ বন্যা প্রায় সারাদেশ গ্রাস করে। ত্রাণ বিতরণের জন্য এবং দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নিজেই যাবে সব জায়গায়। মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হতো যে কোথাও গিয়ে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সমস্যা দেখে আমাকে ফোন করে ওষুধ পাঠাতে বলত। একবার আমি ইসলামাবাদে, হঠাৎ আম্মা ফোন করে বলল, ‘একটা বাচ্চার খুব জ্বর, এক মহিলার প্রচণ্ড হাইপ্রেশার। নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। চারিদিকে পানি, এই মুহূর্তে কোনো ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি বলো কী ওষুধ দেবো?’ এমনই রোগী না দেখে অনেক সময় আমাকে ওষুধ দিতে হতো।

সেবারের বন্যায় ত্রাণের কাজে মা খুবই ইনভলভড ছিল। তাকে এতটা ইনভলভড হতে আমি কখনও দেখিনি। প্রত্যেকদিন চলে যেত। রাতেও একটু রেস্ট নেই। বন্যার্তদের খাওয়ার জন্য রাতে যেখানে রুটি বানাচ্ছে, প্যাকেট বানাচ্ছে, সারাদিন ঘোরাঘুরি করে এসে আম্মা ওদের মধ্যে বসে পড়ত। আমি লোকের কাছে শুনতাম, রাত ২/৩টার দিকে উঠে এসে আবার এখানে বসত। ১৯৭৭ সালের দিকে এক দুর্ঘটনায় মায়ের পায়ের আঙুলের হাড় ভেঙে যায়। হাঁটতে খুব অসুবিধা হতো, বেশি দূর একটানা হাঁটতে পারত না বলে মিছিল একটু কম করত। পায়ের সমস্যার কথা বললে আম্মা বলত, হোক সমস্যা, তুমি আমাকে ওষুধ দাও।’ আমি বিদেশ থেকে প্লাস্টার এনে দিতাম। ত্রাণের কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য আম্মা যেন একেবারে অস্থির হয়ে উঠত।

শনিবার ২১ আগস্ট, দুপুরে আমরা আম্মার বাসায় যাওয়ার জন্য রেডি হব। এমন সময় ১১টার দিকে আম্মা আবার ফোন করে বলল, ‘পাপন, ভাবছিলাম পায়ের ব্যাথার জন্য আওয়ামী লীগের জনসভায় যাব না। এখন ভাবছি যাব। আমি জনসভা শেষ করে তাড়াতাড়ি এসে পড়ব। তোমরা বিকেলে চলে এসো। আজ তোমরা রাতে খাবে। তুমি তো লাঞ্চ করেই চলে যাও। রাতে খেলে আমরা বেশি সময় পাব। তুমি ৫টার দিকে চলে এসো।’ বললাম, বিকেলে না, গেলে রাতে যাব। জনসভা থেকে ফিরে আমাকে ফোন কোরো, তারপর ঠিক করা যাবে। না হয় পরের শুক্রবার যাব।

বিজ্ঞাপন

আম্মা বাচ্চাদের খুবই ভালোবাসত, তাই ওদের দেখার জন্য আম্মার মনটা ছটফট করছিল। বুঝলাম আমার কথা শুনে আম্মার মন খারাপ হলো। বললাম, তুমি মন খারাপ কোরো না, আমিই তোমাকে পরে ফোন করব। আম্মা বলল, অন্য কোথাও যেও না, রাতে এখানেই খাবে। ওই দিন দুপুরে একটু বাইরে গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরে ভাবছি কিছুক্ষণ রেস্ট নেব। ঘুমাইনি, তবে শুয়ে ছিলাম। সাড়ে ৫টার দিকে আমার এক বন্ধু ফোন করে বললো, ‘আওয়ামী লীগের মিটিংয়ে বোমা হামলার খবর পেয়েছেন? অনেক লোক মারা গেছে, তাড়াতাড়ি আপনার আম্মা-আব্বার খোঁজ নিন।’

সেই ছোটবেলা থেকে আমরা ক’ভাই-বোন শুনে আসছি মিটিংয়ে বোমাবাজি হয়েছে। এমন তো কতই শুনেছি। তাই এ খবর শুনে খুব একটা খারাপ লাগার কথা ছিল না। কিন্তু সেদিন এই কথাটা শোনার পর কেন জানি না আমি হঠাৎ করে আমার স্ত্রীকে বললাম, আম্মা বোধ হয় মারা গেছে। ওই বন্ধু আম্মা-আব্বার কোনো দুর্ঘটনা বা এমন কিছু বলেনি, কেন যে আমার এই কথা মনে হলো, তা আমি নিজেও জানি না। এ কথা শুনে আমার স্ত্রী বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘কী বলছো তুমি?’ আমি বললাম, ‘না, মিটিংয়ে অনেক লোক মারা গেছে শুনে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আম্মা মারা গেছে।’ এরপর আমার দুই বোন তানিয়া ও ময়নাকে ফোন করলাম। ওদের শুধু বললাম, শুনেছি মিটিংয়ে অনেক লোক মারা গেছে। তোমরা ফোন করে আব্বা-আম্মা কেমন আছে খোঁজ নাও। আমিও ফোন করছি। এ কথা বলতে বলতে আমি জামা-কাপড় পরতে শুরু করলাম। তখন আবার একটা ফোন এলো।

আমার এক চাচা ফোন করে বলল, ‘পাপন, আওয়ামী লীগের মিটিংয়ের ওখানে গণ্ডগোল হচ্ছে। শুনলাম ভাবী নাকি ইনজুরড। ভাবী নাকি ব্যাথা পেয়েছে। আমি যাচ্ছি, তুমি এসো।’ সঙ্গে সঙ্গে আমি জামা-কাপড় পরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে আমার স্ত্রী। এর মধ্যে আরেক বন্ধুর ফোন এলো। আমি ঠিক শুনলাম, ‘বোমা হামলায় আপনার আব্বা মারা গেছেন।’ আমি বললাম, ‘আমি তো শুনলাম আম্মা ইনজুরড।’ এর মিনিট খানিকের মাথায় বন্ধুটা ফোন করে জানাল, আব্বার খবরটা ঠিক ছিল না। গাড়ি এলিফ্যান্ট রোডে ঢোকার মুহূর্তে লিটন ( আব্বা আম্মার সঙ্গে সঙ্গে থাকে) ফোনে আমাকে চিৎকার করে বলল, ‘জলদি আসেন, ভাবীর অবস্থা খারাপ।’ বলতে বলতে ফোনটা কেটে গেল।

গাড়ি নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারছি না যেখানে জনসভা সেখানে যাব, নাকি ওরা আম্মাকে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে। সেসময় আমার দুই বোন, চাচা কাউকেই ফোনে পাচ্ছি না। এরপর লিটনের ফোন নাম্বার ফোন থেকে খুঁজে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, আম্মা এখন কোথায়? লিটন বলল, ‘আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।’ গাড়িতে যেতে যেতে আমার অফিসে ফোন করে বললাম, অ্যাকসিডেন্টাল যত ধরনের ওষুধ আছে, কী কী লাগতে পারে, আগাম চিন্তা করে সব নিয়ে আপনারা জলদি মেডিকেল কলেজে চলে আসুন। একটা অ্যাম্বুলেন্স ও সঙ্গে নিয়ে আসতে বললাম।

এদিকে, পুলিশ ওই এলাকার অনেক রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো কোনো জায়গা একবারে খালি, আবার কোনো জায়গা দিয়ে মিছিল আসছে। চারিদিকে বেশ উত্তেজনা। কোনো রাস্তা দিয়ে মেডিকেলে ঢুকতে পারছি না। ড্রাইভার মেডিকেল কলেজের পেছনের একটি গেট দিয়ে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল। মিটিংয়ে বোমা তো একটা দু’টো পড়ে। বোমা পড়লে একজন-দু’জন আহত হয়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে যে কী হতে পারে, সে বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। এতক্ষণ শুধু ফোনে ইনফরমেশন পাচ্ছিলাম। মেডিকেল কলেজে যখন ঢুকলাম, আমার পুরো ধারণা পালটে গেল। এ কী অবস্থা! পুরো করিডোর, প্রত্যেকটা ওয়ার্ড— যখন যেখান দিয়ে যাচ্ছি, মানুষে মানুষে একাকার হয়ে গেছে! মানুষ মরে পড়ে আছে। একেকজনের হাত নেই, পা নেই, ছিন্ন ভিন্ন দেহ— রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে মানুষ! এদের ভেতর থেকে মারা যাওয়া অনেকের ছবি পরে সংবাদপত্র, টিভিতে দেখেছি। আমি প্রায়ই ঢাকা মেডিকেল কলেজে যাই। কিন্তু এমন বীভৎস নারকীয় দৃশ্য আমি চিন্তাই করতে পারিনি। বুকটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। ভাবছি এখানে যারা পড়ে আছে, তারা কারও বাবা, কারও মা, কারও সন্তান। আমি যেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে আমার আম্মাকে খুঁজছি, অন্যরাও তেমনি তাদের নিকট আত্মীয়দের খুঁজছে। কোথায় আম্মা! কোথায় আম্মা! ব্যকুল হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছি। আম্মাকে যে কোথায় রেখেছে, তা তো জানি না।! কোথায় যাব? শত শত আহত লোকের মাঝে কোথায় পাব আমার আম্মাকে?

মেডিকেল কলেজের বেশিরভাগ ডাক্তারের সাথে আমার মোটামুটি পরিচয় আছে। সেদিন কোনো নামকরা ডাক্তারদের দেখছি না। ওখানে কোনো পরিচিত ডাক্তার পাচ্ছি না। বলতে গেলে প্রায় সব ডাক্তারকে আমি চিনি। কিন্তু এমন সময়ে কারও দেখা মিলছে না। খুঁজে বের করারও উপায় নেই। এত মানুষ! মিনিট তিনেক চেষ্টা করেও কোনোভাবেই ভেতরে ঢুকতে পারলাম না। একটু পরপর, বলতে গেলে সেকেন্ডে সেকেন্ডে নিয়ে আসছে একজন আহত রোগী। আট-দশ জন মিলে ধরে ধরে মানুষ নিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকানোর চেষ্টা করছে। কী যে করছে, তা অবর্ণনীয়। করিডোরে জায়গা নেই, মাটিতে জায়গা নেই, একটা অস্বস্তিকর অবস্থা। একজনকে জিজ্ঞাসা করতে সে বলল, আম্মা সেখানে নেই। তখন আমার এতটা হতাশ আর পুরো পরিবেশটা এত খারাপ লাগছিলো যে আমি আমার স্ত্রী কে বললাম, আমি মনে হয় আর সামনে যেতে পারব না। আমার শরীরটা কেমন খারাপ লাগতে শুরু করে। একসময় জালাল ভাই, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, আমাকে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। জালাল ভাইয়ের কান্না দেখে ভাবলাম, সত্যি সত্যিই আম্মা বুঝি আর নেই। তখন বুঝলাম অবস্থা সিরিয়াস। এটা বোমার আঘাতে সামান্য ব্যথা পাওয়ার ঘটনা নয়।

আম্মাকে দেখতে না পেয়ে বুকের ভেতর সব নিঃশ্বাস যেন এক নিমিষে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। বললাম, জালাল ভাই, আম্মা কোথায়? জালাল ভাই আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কত রোগী যে পাড়িয়ে যাচ্ছি, তার ইয়াত্তা নেই! কত মানুষ শোয়া, কতজন কাতরাচ্ছে, তা বলার নয়। আহত সবার ইনজুরি থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আর একটা সমস্যা হলো ব্যান্ডেজ নিয়ে। একটা রোগীর জন্য ব্যান্ডেজ দিচ্ছে, ১০-১১ জন গিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করেছে। স্যালাইন দিতে পারছে না। একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা। এর ভেতর দিয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, জানি না কোথায় যাচ্ছি।

একেবারে কোনায় চিকিৎসকের চেম্বারে আমাকে বসিয়ে কলাপসিবল গেট লাগিয়ে দিল। এরপর পাশের রুমে নিয়ে ঢোকাল। আমি পর্দা সরিয়ে ঢুকতে যাচ্ছি, ডাক্তাররা চেচিয়ে বলল, ‘কেউ আসবেন না, কেউ আসবেন না।’ ওই রুমের ভেতর তাকিয়ে দেখি, আহত নারীরা সবাই শোয়া। অনেক নারী রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। কী যে দৃশ্য, তা বর্ণনা করা যায় না। একটা ট্রলির ওপর আম্মা শুয়ে আছেন। কাপড় দিয়ে আম্মার কোমর পর্যন্ত ঢাকা। আম্মার কাছে যেতে হলে মহিলাদের ওপর দিয়ে যেতে হবে। কারণ সবাই তো মেঝেতে শোয়া, পা রাখার মতো একচুল জায়গা নেই। আম্মার কাছে পৌঁছানোর মতো কোনো জায়গা বা উপায় পাচ্ছি না। আমার মনে হলো— ওই ডাক্তাররা তখন আম্মাকে অ্যাটেন্ড করতে যাচ্ছে। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিল না। আমি দরজার ওখান থেকেই জোরে বলে উঠলাম, আম্মা তুমি চিন্তা করো না, আমি এসে গেছি। যেহেতু মেডিকেল লাইনে আছি, তাই মেডিকেল লাইনের সব ব্যাপারে আম্মা আমার ওপর খুব নির্ভর করত। কথাটা বলার পর দেখলাম আম্মা ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে। কথাটা শুনে আম্মা মনে হয় আমাকে দেখার চেষ্টা করছিল আমি কোথায়। আমার মনে হয়েছিল, আমার কথাটা শুনতে পেলে আম্মা সাহস পাবে।

তবে আম্মার তাকানো দেখে মনে হলো, আম্মা মনে হয় এক ঘোরের মধ্যে রয়েছে। আমার দিকে তাকিয়েছে কিন্তু চোখটা স্থির হয়নি। হয়তো আমাকে চিনতেও পারেনি। আমি ডাকার পর থেকে চারদিকে চোখ ঘুরাচ্ছে। এরপর জালাল ভাই আমাকে টেনে নিয়ে অন্য ঘরে বসাল। আমার স্ত্রী রোকসানা আমাকে আম্মার অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করায় আমি বললাম, শুয়ে আছে। আম্মাকে ট্রলির ওপরে স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকতে দেখে আমি ভাবলাম, আম্মার সিরিয়াস কিছু হয়নি। এটা ভাবার দু’টো কারণ ছিল। এক, কোমর পর্যন্ত ঢাকা ছিল, তাই পা দু’টো দেখতে পারিনি। দুই, সবাই কাতরাচ্ছে, কিন্তু আম্মার মুখে কোনো আওয়াজ নেই। তাই দেখে ভাবলাম তেমন সিরিয়াস কিছু হয়নি। কিছুক্ষণ পর জালাল ভাই চিৎকার করে বলছে, ডাক্তাররা সব কোথায়? এখনই অপারেশন করতে হবে, এটা লাগবে, ওটা লাগবে।

একজনকে জিজ্ঞাস করতে সে বলল, ‘ডাক্তার নেই, সার্জন নেই। আইভি রহমানকে ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। কোনো সার্জন পাচ্ছি না।’ উনি জানে না যে আমি আইভি রহমানের ছেলে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন এরকম হলো? যেহেতু এত বেশি লোক আহত যে কয়েকজন ডাক্তারের পক্ষে সবকিছু করা অসম্ভব। একজনের কিছু হলে খামাখা ডাক্তারের ওপর চড়াও হতে পারে। সেজন্য ডাক্তাররা আসতে সাহস পাচ্ছে না। আমি তখন সাথে সাথে ঢাকা মেডিকেলের সার্জন ডা. মাহাবুব সাহেবকে ফোন করে বললাম, আমার আম্মার এই অবস্থা, ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, প্লিজ আপনি তাড়াতাড়ি মেডিকেলে চলে আসুন। উনি বললেন, ‘নাজমুল ভাই, আমি তো ঢাকার বাইরে। তবে আপনার আম্মার অপরেশনের জন্য এখুনি লোক পাঠাচ্ছি।’ কথা শেষ হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে ডাক্তার চলে আসল। ডাক্তার এসেই বলল, রক্ত লাগবে। আম্মার রক্তের গ্রুপ ‘ও পজিটিভ’। আমার অফিসের লোকেরা রক্ত দেওয়ার জন্য ৬/৭ জনকে অলরেডি নিয়ে গেছে। কিন্তু রক্ত দেবে কোথায়, সব নাকি বন্ধ। কার কাছে দেবে, কে টেস্ট করবে, কে ম্যাচিং করবে— এ নিয়ে এক হুলুস্থুল ব্যাপার। নার্স বলছে ওষুধ লাগবে। ততক্ষণে আমার অফিস থেকে বিশাল কয়েক কার্টন ওষুধ নিয়ে গেছে। রোগীরা তখন চিৎকার করছে, তাদেরও ওষুধ লাগবে, স্যালাইন লাগবে। আমি বললাম, সবাইকে কিছু কিছু দেন। যা ওষুধ আছে ২৪/২৫ জনকে কমপক্ষে ৩/৪ দিন ফুল চিকিৎসা দেওয়া যাবে। তবে ইমার্জেন্সিতে ১০০ জনের  চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। শুনলাম এইসময় মেডিক্যাল কলেজের ফার্মেসি বন্ধ। মনে হয় ভয়ে পালিয়েছে। আমি ঠিক জানি না এটা ইচ্ছকৃত কি না।

আমার লোকদের আরও ওষুধ আনতে বলি। ভাবছিলাম, তারা যদি ওষুধ না আনত, তাহলে কী হতো! এরই মধ্যে রক্ত দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ, যুবলীগ ছাড়াও নন-পলিটিক্যাল ৪০ থেকে ৪৫ জন জোগাড় হয়ে গেল। ব্লাড দিতে গেছে, তারপর ম্যাচিং করতে হবে। এদিকে সার্জন এসে নাকি অপারেশন শুরু করে দিয়েছেন। অপারেশন শুরু করেই বলছে, ‘এক্ষণই রক্ত লাগবে।’ রক্ত দিতে লোক বসে আছে। কিন্তু কে নেবে, কী করবে— ওরা কিছুই বুঝতে পারছে না। ডাক্তারকে বললাম, আমারও সেম ব্লাড গ্রুপ। আপনি ডিরেক্ট ইনফিউজ করতে পারেন। নার্সের মতো একজন আমাকে নিয়ে আম্মা আগে যে রুমে ছিল তার পাশে ছোট্ট রুমে ঢোকাল। সেই রুমের মধ্যে তারা আম্মার অপারেশন করে। এটাকে অপারেশন বলব কি না জানি না, তবে যে দৃশ্য দেখলাম, তা কল্পনাতীত। আম্মার মুখের দিকে তাকাইনি, শুধু দেখলাম, আম্মার পা দু’টো নেই। একজন একবারে খালি হাত দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করছে। আমার জীবনে এরকম অপারেশন থিয়েটার দেখিনি। ওরা রক্ত থামানোর জন্য কেউ হাত দিয়ে চাপছে, কেউ তুলো দিয়ে মুছে দিচ্ছে; কিন্তু আম্মার পা নেই...।

যে নার্স আমাকে নিয়ে এসেছিল তাকে ডাক্তাররা বকছে আর বলছে, ‘এক্ষুণি নিয়ে যাও, এক্ষুণি নিয়ে যাও।’ নার্স আমাকে পাশের ঘরে বসাল। ততক্ষণে প্রায় ৩০ ব্যাগ রক্ত চলে এলো। রুমটার পরিবেশ দেখে বুঝলাম, এটা কোনো অপারেশন থিয়েটার নয়। আমার স্ত্রীকে বললাম, আম্মার দু’টো পা-ই কেটে ফেলেছে। আম্মার অবস্থা আসলে কেমন, তা আমি জানি না। আমার মনে হলো, আম্মাকে যেখানে অপারেশন করছে, সেখানে সাকসেসফুল অপারেশন করলেও বাঁচানো যাবে না। যেভাবে খালি হাত দিয়ে কাটা জায়গা পরিষ্কার করছে, তাতে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। আম্মাকে এখানে রাখা একেবারে অসম্ভব। ঠিক করলাম, এখনই বিদেশে নিয়ে যেতে হবে। অন দ্য স্পট, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদে ফোন করলাম। ওরা জানাল, তিন ঘণ্টার নোটিশে এয়ার এম্বুলেন্স এসে আম্মাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু জালাল ভাইদের এ কথা বললে ওরা বলল, ইমপসিবল। ওনাকে এখন মুভ করার অবস্থাই নেই।

এদিকে, আব্বার খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম। কেউ বলে ওনার কিছু হয়নি, আবার কেউ বলে ইনজুরড। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা/৭টার দিকে বাসায় খোঁজ নিয়ে শুনলাম, আব্বা ফিরেছে। একটা গাড়ি আব্বাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেছে। আমাদের বাসার পাশের দোকানের কর্মচারী হতবিহম্বল আব্বাকে ধরে বিল্ডিংয়ের একতলায় আমার ছোটবোন ময়নার বাসায় নিয়ে যায়। আব্বার সারা শরীর রক্তে ভেজা। সকলেই আব্বাকে দেখে আঁতকে উঠে। জামা খুলে পরীক্ষা করতে থাকে কোথাও আঘাতের চিহ্ন আছে কি না! যা হোক, আল্লাহর রহমতে আব্বার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কিন্তু আব্বার শরীরটা খুব খারাপ। ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকেই নাকি বমি করেছে। আব্বা একবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে । কথা বলছে না। বললেও শোনে না।

আম্মার পা অপারেশন করার কিছুক্ষণ পর ওই সার্জন আমার কাছে একটা কাগজ দিয়ে বলল, ‘ওনার পা অপারেশন হয়েছে। এখানে একটা সই করুন।’ আমি সই করলাম। ডাক্তার বলল, ‘আরও একটা অপারেশন করতে হবে। ওনার হাত কেটে ফেলতে হতে পারে।' এরপরই ঠিক করলাম, আম্মাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাব এবং তা এক্ষুণি। এ কথা শুনে জালাল ভাই বললেন, ‘সে তো ভালো কথা। তুমি কোথায় নিতে চাও?' আমি বললাম, আপনি বলুন বাংলাদেশের বেস্ট কোথায়? উনি বললেন, বেস্ট হলো বঙ্গবন্ধুতে নিয়ে যাওয়া। তখন আমার অফিসে ফোন করে বললাম, এখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির আইসিইউতে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধু হাসপাতাল থেকে সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) হলে ভালো হয়। প্রাথমিকভাবে বঙ্গবন্ধু ও সিএমএইচ— এ দু’টো নামই মনে আসে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজও ভালো। কিন্তু সেদিনের যে অবস্থা!

এর ৪৫/৫০ মিনিট পর আমার অফিসের লোকেরা জানাল, অনেক ঝামেলার পর আইসিইউতে একজনকে সরিয়ে আম্মার জন্য একটা ব্যবস্থা করা গেছে। জালাল ভাইকে বললাম, আমার সাথে অ্যাম্বুলেন্স আছে, আমি আম্মাকে নিয়ে যাচ্ছি। উনি বললেন, ‘এটাই মনে হয় ভালো হলো। চলো তোমার সাথে আমিও যাব।' আমি আর আমার স্ত্রী জিপে বসে আছি। ওদিকে, অ্যাম্বুলেন্স রেডি করা হচ্ছে আম্মাকে ঢোকানোর জন্য। আমার অফিসের মিস্টার জাকারিয়া, নুরুল হক ও তাদের পুরো টিম, মার্কেটিংয়ের ড. মল্লিকসহ প্রায় শখানেক লোক ওখানে উপস্থিত হয়ে গেছে। তখন সময় সাড়ে ৭টার মতো হবে। বঙ্গবন্ধুতে আম্মাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমার অফিসের লোকজন অ্যাম্বুলেন্সে গিয়ে বসেছে। বসে আছি, তখন দেখলাম পুলিশের বেশ কয়েকটা গাড়ি এলো। আমার কাছে ৪/৫ জন পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা এসে বলল, ‘আপনি ওনার ছেলে?' আমি হ্যাঁ বলতে ওরা বলল, ‘আমরা চাই উনি সিএমএইচে যান। উনার জন্য সেখানে ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন আপনার ইচ্ছা।' আমি হঠাৎ করে বলে ফেললাম সিএমএইচ তো ভালো। আমার এ কথা বলার পেছনে কারণ হলো— এখানে যে অবস্থা সেটা তো ওখানেও (বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল) হতে পারে। আম্মাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে এলে আমি জালাল ভাইকে বললাম, আম্মাকে সিএমএইচে নিয়ে যাচ্ছি। উনি বললেন, ‘পাপন, তোমার ইচ্ছা। তবে, নেত্রী জানেন তোমার আম্মাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। তা আমি একটু নেত্রীকে বলি, বঙ্গবন্ধু না সিএমএইচে নিয়ে যাচ্ছি।' আমি বললাম, আপনি হাসিনা আপাকে বলেন, আমি সিএমএইচে নিয়ে যাচ্ছি। কারণ আমি আর কোনোমতেই দেরি করতে চাচ্ছিলাম না। উনি বললেন, ‘আচ্ছা, নেত্রীকে আমি বলব। তুমি নিয়ে যাও।' পুলিশদের বললাম, আসার সময় মেডিকেলে ঢুকতে পারছিলাম না, আপনারা রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যান কিভাবে যাব। তখন অ্যাম্বুলেন্সের সামনে-পেছনে পুলিশের গাড়ি। রাস্তার গাড়ি-ঘোড়া সব থামিয়ে রং সাইড-টাইড কিছুই না মেনে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। মানে একটা ফুল সাপোর্ট।

গিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর ঢুকলাম। চেকপোস্টে আমাদের অ্যাম্বুলেন্স আর গাড়ি থামাল। তাকিয়ে দেখি আম্মার পা দিয়ে সমানে ব্লিডিং হচ্ছে। চেকপোস্টের সিকিউরিটিরা বলছে, ‘দাঁড়ান, রোগী কে নিয়ে এসেছে?' বললাম, পুলিশ নিয়ে এসেছে। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে তখন ওখানে আর একজন পুলিশও দেখতে পেলাম না। আমরা গাড়ি থেকে নামতে নামতেই সব পুলিশ উধাও। একজন পুলিশও নেই সেখানে। ওরা আমাদের নামিয়ে দিয়েই চোখের নিমিষে সব চলে গেছে। গেটে আধাঘণ্টার মতো দাঁড় করিয়ে রেখে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে তারপর সিকিউরিটি লোকেরা বললো, কেবল এম্বুলেন্স যাবে। আমাদের পেছনে তিন-চারটা গাড়ি। বললাম, আমি উনার ছেলে, আমরা যাব না? তখন ওরা বললো, অতগুলো গাড়ি নিয়ে ভেতরে যাওয়া যাবে না। সব বাদ, খালি আপনার গাড়ি যেতে পারবে। এরপর আম্মাকে নিয়ে সিএমএইচে নামার পর ওরা পারমিশন চাইল। বললাম, ‘আমার কোনো পারমিশন নেই। পুলিশ বললো, সরকার থেকে নাকি সিএমএইচে অ্যারেঞ্জ করেছে। সেজন্য আমি সিএমএইচে নিয়ে এলাম। এখন বলুন, কার কাছ থেকে পারমিশন নিতে হবে, আমি নিচ্ছি।’ ওরা বলল, ‘আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো ইনফরমেশন নেই। আপনি কিভাবে ভর্তি করবেন?'

পারমিশন নেওয়ার জন্য আমি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করতে লাগলাম। এদিকে আম্মা তো করিডোরে পড়ে আছে। আম্মার পা দিয়ে সমানে রক্তক্ষরণ চলছে। ওদের বললাম, ‘প্লিজ, পেশেন্টকে নিয়ে আপনারা ট্রিটমেন্ট দেওয়া শুরু করুন। যা পারমিশন লাগে, আমি দেখছি।’ বুঝতে পারছিলাম, ওনারাও সাপোর্ট করতে চাইছেন। কিন্তু আইনের প্যাঁচে পেশেন্ট অ্যাটেন্ড করতে পারছেন না। তখন মনে হতে লাগল, হয়তো ভুলই করলাম। এখানে না এনে বঙ্গবন্ধুতে নিয়ে গেলে এতক্ষণে প্রায় একঘণ্টা ধরে চিকিৎসা চলত। এখানো তো কোনো চিকিৎসাই হচ্ছে না। পরিস্থিতি একের পর এক অবনতির দিকেই যাচ্ছে। এ কী অবস্থা!

কিছুক্ষণ বাদে ওনারা বলল, ‘পারমিশন এসেছে। আপনি এই ফর্মটা পূরণ করুন। আর এখানে একজন আর্মি অফিসারের নাম দিতে হবে।' তখন আমি যে নামই বলি, ওরা বলে, তারা রিটায়ার করেছেন। তখন আমি বললাম, এখন আমার আর কোনো নাম মনে পড়ছে না। ওরা বলল, ‘নাম ছাড়া তো অ্যাডমিট করতে পারছি না।' দেখি একটা লোক, সিভিল ড্রেসে হাতে একটা ওয়্যারলেস, আমি ঠিক চিনি না, তবে মনে হলো কোনো পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হবেন বোধ হয়। উনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবেন, আমাকে কোনো প্রশ্ন করবেন না। আপনি কিছু কাগজে সই করবেন না, কিছু করবেন না। বলবেন, আপনাদের যা জানা দরকার সরকারের কাছ থেকে জেনে নেবেন। এছাড়া আপনার আর কিছু বলার দরকার নেই, কিছু করারও দরকার নেই।' উনি বলার সঙ্গে সঙ্গে ওনারা পেশেন্ট ভেতরে ঢোকালো। ওখানেও আবার আধঘণ্টা না হোক, ১৫-২০ মিনিট সময় নষ্ট হলো। ক্যান্টনমেন্টে ঢোকার পর থেকে সবমিলিয়ে প্রায় একঘণ্টার মতো সময় নষ্ট হলো। আম্মাকে ভেতরে নেওয়ার পর ওদের দেখে মনে হলো ওরা যেন একটু টেনশনে আছে। কারণ, পলিটিক্যাল একজন এসেছে, কোনো গণ্ডগোল হয় কি না, হয়তো সেই ভয়ই করছিল। দেখলাম এ নিয়ে ওরা বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ল। এদিকে, আমার দু‘বোন তানিয়া আর ময়নাকে ওরা সিএমএইচে ঢুকতে দিচ্ছে না। প্রায় দু'ঘণ্টা ওদের গেটে আটকে রেখেছে। এ বিষয়টি আমাকে আরও বিচলিত করে তুলল।

অবশেষে, জেনারেল তারেকের স্ত্রী গিয়ে বহু কষ্টে তাদের ভেতরে নিয়ে এলো। রাত তখন সাড়ে ৯টা কি ১০টা হবে। ওরা বলল, ‘অপারেশন করতে হলে সই লাগবে।’ সই করলাম। সারারাত একটু পর পর দেখি গাড়ি আসছে আর ডাক্তার নামছে। কত ডাক্তার যে আসছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) ঢোকার পর খালি আপারেশনই করছে। ভোর সাড়ে ৪টা-৫টার দিকে ডাক্তার ওটি থেকে বের হলো। ডাক্তাররা বলল, ‘অপারেশন হয়েছে। ওনার পায়ের রক্ত বন্ধ করা গেছে। আর হাতের অপারেশন ঠিক হলো কি না, এখনও জানি না। অপারেশন ঠিক হলে হাত কাটার দরকার হবে না। তবে ওনার সব থেকে ক্রিটিক্যাল হলো অ্যাবডোমেন। এই ধরনের কেসে সাথে সাথে অ্যাবডোমেনটা ওপেন করার দরকার ছিল। কেননা সব স্প্লিন্টার ওনার পেটের ভেতরে। ঘটনা ঘটেছে সাড়ে ৫টার দিকে; যদি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে স্প্লিন্টারগুলো শরীর থেকে বের করা যেত, তবে ক্ষতি হতো না। ওনার কিডনি-লিভার সিভিয়াসলি ড্যামেজড। এরই মধ্যে ম্যালফাংশনিক শুরু করে দিয়েছে। তবে যতটা সম্ভব, আমরা পরিষ্কার করেছি। এখন দেখা যাক কী হয়।’

এদিকে, আব্বাকে কিছু বলা যাচ্ছে না। এমনিতেই মানুষটা একটু নরম প্রকৃতির। এসব সহ্য করতে পারবে না। আব্বাকে বললাম, আম্মা পায়ে ব্যথা পেয়েছে, চিকিৎসা হচ্ছে। আব্বা বলল, আমি যাব। বললাম, রাতে গিয়ে কী করবে? কালকে যেও।

পরের দিন, অর্থাৎ ২২ আগস্ট সকাল ৭টায় আমি ও আমার স্ত্রী কিছুক্ষণের জন্য বাসায় ফিরি। বাসায় তিনটা বাচ্চা রয়েছে। গতকাল থেকে প্রচণ্ড মানসিক টেনশন আর একটানা ছোটাছুটি। ভাবলাম আপারেশনের পর আম্মার সেন্স ফিরতে বেশ কিছুক্ষণ লাগবে। তাছাড়া আমার দু’বোন সিএমএইচে পড়ে রয়েছে। তাই চিন্তা করলাম, বাসায় কিছুক্ষণ থাকব, রেস্ট নেব।

সকাল ৯টা-সাড়ে ৯টার দিকে সিএমইএচ থেকে আমাকে ফোন করে জানাল, ওখানকার এক কর্তাব্যক্তি, ডাইরেক্টর বা ডেপুটি ডাইরেক্টর, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তাড়াহুড়ো করে সিএমএইচে গেলাম। অপেরেশনের সব ডিটেইলস জানিয়ে উনি বললেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।’ আমি বললাম, হ্যাঁ, দেখছি আপনারা চেষ্টা করছেন। আপনারা যা করছেন সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। এ ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট। তবে আমার একটা কথা হলো, যে মুহূর্তে আপনাদের মনে হবে এ রোগীকে ট্রান্সফার করা সম্ভব, আমাকে বলবেন। সাথে সাথে আম্মাকে আমি বিদেশে নিয়ে যাব।’ উনি বললেন, ‘এখন তো অবস্থা খুবই খারাপ। কোনোভাবেই বিদেশে নেওয়া সম্ভব নয়। ঠিক আছে, যদি অবস্থার সে রকম উন্নতি হয়, তাহলে আপনাকে অবশ্যই জানাব। আর একটা কথা, ক্যান্টনমেন্টে এত লোকজন তো অ্যালাউ করতে পারব না।’ যেদিন রাতে আম্মাকে অপারেশন করে, সেদিন প্রচুর রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। আমরা অলরেডি ৬৩ ব্যাগ রক্ত দিলাম। সমস্যা হলো রক্ত দিতে হলে তো ভেতরে ঢুকে কাউকে দিতে হবে। কিন্তু ওরা কাউকে গেট থেকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। কেউ আসতে চাইলে প্রতিবারই এখান থেকে একটা স্লিপ নিয়ে গেটে ওদের কাছে লোক পাঠাতে হচ্ছে। এত রক্ত দেওয়া থাকলেও ওরা বরাবর বলছে, রক্ত দাও। হয়ত কমিউনিকেশনের কোনো একটা সমস্যা হয়ে থাকতে পারে।

২২ তারিখ সারাদিন সারারাত ওইভাবে কেটে গেল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আমরা ভেতরে যাচ্ছি। একটু পর পর আম্মাকে দেখে আসছি। বিভিন্ন লোকজন দেখতে আসছে। আম্মার পাশে বেডে ছিলেন জেনারেল তারেক। উনিও ওই মিটিংয়ে ইনজুরড। হাত দিয়ে দেখলাম, আম্মার শরীর ভীষণ ঠাণ্ডা। যে হাতটা অপারেশন হয়নি, সেই হাতটা একেবারে নীল হয়ে যাচ্ছে। বলল, ‘ওনার কানের কাছে গিয়ে কথা বলুন, উনি শুনতে পাবেন, বুঝতেও পারবেন।’ তখন আমি, আমার বোনেরা, আমার স্ত্রী সবাই গিয়ে আম্মার কানের কাছে কথা বলতে শুরু করি।

আব্বাকে তখনো সিএমএইসচে নেওয়া হয়নি। যদিও আম্মার পা আগেই কাটা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আব্বাকে সে কথা লুকিয়ে গিয়েছিলাম। আব্বাকে শুধু বললাম— আব্বা, এমন হতে পারে, আম্মার পা কেটে ফেলতে হতে পারে। মিটিংয়ে বোমা হামলা সম্পর্কে আব্বার প্রতিক্রিয়া এটিএন বাংলায় প্রচারিত হওয়ার সময়ই আব্বা জেনে যায় যে আম্মার পা কেটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমার ধারণা ছিল, আব্বা এ খবর জানে না। আমার কাছে এ কথা শুনে আব্বা একেবারে আন-কন্ট্রোল্ড অবস্থায় চলে গেল। হয়তো আব্বা ভাবছিল, কোথায় ছেলেকে আমি সান্ত্বনা দেবো, উল্টো ছেলেই আমাকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আব্বাকে সাহস দেওয়ার জন্য বললাম, তুমি চিন্তা করো না, পা আবার লাগানো যাবে। দিনে ১০/১৫ মিনিটের জন্য আব্বার ওখানে গিয়ে আবার হাসপাতালে চলে আসতাম। আমার বোনেরা, আমার স্ত্রী ছাড়াও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন কেউ না কেউ প্রায় সারাক্ষণই ওখানে থাকত।

২৩ তারিখের সকালে আমার অফিসের লোকেরা ফোন করে বলল, ‘আপনার আম্মার শরীরের পরিস্থিতি একটু ভালো মনে হচ্ছে। ওরা বলছে বিদেশে নেওয়া যেতে পারে।’ এ কথা শুনে আমি আব্বার সঙ্গে কথা বলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ছুটে গেলাম। আমার চিন্তা ছিল প্রেশারটা একটু ইম্প্রুভ করলে আম্মাকে নিয়ে যেতে পারব। আমি যেতে ডাক্তাররা আমাকে বলল, ‘দেখুন, একটু ইম্প্রুভ করেছিল, কিন্তু এখন আবার ফল করছে। ইন ফ্যাক্ট, ওনার প্রেশারটা তো নেমে গেছেই, ওনার কিডনিও কোনো কাজ করছে না। ফলে ওনার পুরো শরীরে টক্সিসিটি বেড়ে যাচ্ছে। লিভার-কিডনি কোনো কাজ করছে না। অবস্থা একটু ভালো দেখে ভেবেছিলাম বিদেশে পাঠানো যাবে। তাই আপনাকে ডেকেছিলাম। কিন্তু এখন তো তা সম্ভব নয়। দেখুন, আরও একটা বিষয়— সিএমএইচে আমরা এটা অ্যালাউ করি না, তবুও বলছি, আপনি বাইরে থেকে যেকোনো ডাক্তার আনতে চাইলে আপনাকে অনুমতি দেওয়া হবে।’ আমি ভাবছি কাকে ডাকা যায়। ওনাদের বললাম, ঠিক আছে। আপনারা সবাই একটু গিয়ে দেখছেন। এমন তো নয় যে আন-অ্যাটেন্ডেড। দুপুর সাড়ে ১১টা-১২টার দিকে আমার মনে হলো আম্মার আবস্থা খুব খারাপ। এখন আব্বাকে লুকিয়ে লাভ নেই। আব্বাকে এখন না নিয়ে এলে আর হয়তো আম্মাকে দেখতে পারবে না। আমি আব্বাকে আনতে যাব, এর মধ্যে শুনি প্রধানমন্ত্রী আম্মাকে দেখতে আসবেন। এসময় একজন এসে আমাকে খবর দিল, আম্মা বেডে নেই। আম্মাকে সবসময় দরজা থেকে ভেতরে আমরা দেখতে পেতাম। কিন্তু দেখলাম, আম্মা নেই; সে বেড খালি। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম কোনার একটা বেডে আম্মাকে নিয়ে গেছে। এত উৎকণ্ঠার মাঝেও আম্মাকে দেখে যেন একটু স্বস্তি পেলাম। ডাক্তারদের কাছে জানতে চাইলাম, এ অবস্থায় আম্মাকে তার বেড থেকে সরানো হলো কেন? আগে আমরা দেখতে পেতাম, এখন আর দেখতে পাই না। এ কথা বলায় ওরা বলল, ‘পিএম আসবেন। তাই সিকিউরিটির জন্য ওনাকে একটু আলাদা করা হয়েছে। জেনারেল তারেকের পাশে কর্নারে নেওয়া হয়েছে।’ দেখলাম ঘরে অন্য রোগী নেই।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ২৩ তারিখ প্রাইম মিনিস্টার আম্মাকে দেখে যাওয়ার পর হাসিনা আপা আমাকে ফোন করে বললেন, ‘পাপন, খবর কী?’ আমি বললাম, ‘হাসিনা আপা, আগের মতোই রয়েছে।’ হাসিনা আপা বললেন, ‘কী বলিস?’ বললাম, ‘আগের মতোই আছে, কোনো ইম্প্রুভমেন্ট নেই।’ হাসিনা আপা বললেন, ‘মিটিংয়ে বোমা হামলার পর থেকে আমি কানে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছি না। তুই আবার ভালো করে বল।’ আমি আম্মাকে যে অবস্থায় দেখে এসেছিলাম, সে কথা বললাম আপাকে। হাসিনা আপা বললেন, ‘তুই কখন দেখেছিস?’ বললাম, ‘এই তো, একটু আগে দেখে এসেছি।’ হাসিনা আপা আর অন্য কথা না বলে বললেন, ‘দেখ, আমার কাছে তো খবর এসেছে উনি মারা গেছেন। চাচী মারা গেছেন শুনে রেহানা ভীষণ কান্নাকাটি করছে। তুই রেহানার সাথে কথা বলে ওকে থামা।’ আমি রেহানা আপাকে বললাম, আমি একটু আগে দেখে এসেছি। তবে তেমন কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে আমি জানতে পারতাম। আমার লোকজন ২৪ ঘণ্টা ওখানে রয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে রেহানা আপা বলল, ‘তুই চাচীকে জলদি দেশের বাইরে নিয়ে যা।’ ওই সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে আম্মার খবর জানতে চেয়ে প্রচুর ফোন আসতে থাকে। বুঝতে পারি, ওরা আম্মার মারা যাওয়ার কথা মুখে না বললেও ওই খবর শুনেই ফোন করেছে।

আম্মার বিষয়ে আশার খবর কেউ আমাকে শোনাচ্ছে না। কিন্তু আব্বা-বোন এদের সবাইকে আশার খবর শোনাতে হচ্ছে আমাকেই। সন্তান হিসাবে এটা যে কত বড় কষ্টের, কত বড় মর্মান্তিক, তা বলে বোঝাবার নয়। আব্বাকে আনার জন্য বাসায় গিয়ে দেখি বিভিন্ন মিডিয়ার ক্যামেরাম্যান, সাংবাদিক দিয়ে বাসা একেবারে ভর্তি। আব্বাকে বললাম, আম্মার অবস্থা খুব খারাপ। তোমাকে বলিনি। তুমি চলো। আব্বা প্রথম বলল, এখন যেতে পারব না, পারলে বিকালে যাব। তার মানে আম্মার খবর শোনার পর আব্বার শরীর একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। বললাম, ঠিক আছে, এখন বাসায় থাক। তোমার যখন ভালো লাগবে, তুমি এসো। এর আট-দশ মিনিটের মধ্যে বলল, ‘না! আমি যাব, আমাকে নিয়ে চল!’ তখন দু'টা-আড়াইটার মতো হবে। আব্বা আর আমার দুই চাচাকে নিয়ে রওনা দিলাম। ক্যান্টনমেন্টের গেট থেকে আর আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। ওখানে প্রায় ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি। কেবল আমাকে ঢুকতে দেবে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক লোকজনকে ঢুকতে দেবে না। পরে কেবল একটা গাড়ি ঢুকতে দিল। তখন আব্বাকে নিয়ে আমরা তিন জন একটা গাড়ি নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। গিয়ে দেখি, আম্মার পাশে জেনারেল তারেক নেই। আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, আম্মার চোখ দু’টো ব্যান্ডেজ করে রেখেছে। চোখ তো আগে ভালোই ছিল। চোখ ব্যান্ডেজের কথা জিজ্ঞাসা করায় ডাক্তার বলল, ‘উনি একভাবে তাকিয়ে থাকছেন তো, তাই ওনার চোখ দু’টো ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। যদি বন্ধ করে না রাখি, তবে চোখের ক্ষতি হবে।’

আব্বাকে নিয়ে রুমের ভিতরে ঢুকলাম। আব্বা খুব কান্নাকাটি করছিল। আম্মার গায়ে হাত দিয়ে একটা জিনিস ভালো লাগল, এই প্রথম দেখলাম আম্মার শরীরটা বেশ গরম। মনে হলো প্রচণ্ড জ্বর আসছে। আব্বাকে বললাম, আব্বা, এটা তো একটা ভালো লক্ষণ। এ ক'দিন আম্মার শরীর একেবারে ঠাণ্ডা ছিল। ডাক্তারদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ওরা বলল, ‘অবস্থা এখন একটু ইম্প্রুভ করেছে। আপনারা বাইরে থেকে ডাক্তার আনতে চাইলে আনতে পারেন।’ চিন্তা করলাম, ডাক্তার যদি আনতেই হয় তবে কিডনি স্পেশালিস্ট আনা ভালো। উপস্থিত সবাই বলল ডা. হারুনুর রশিদ বেস্ট। ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। আমার অফিসের লোকেরা গিয়ে উনাকে নিয়ে এলো। উনি এসে ভেতরে ঢুকলেন। আমরা সবাই বাইরে অপেক্ষা করছি। আম্মাকে দেখে রুম থেকে বেরিয়ে উনি সোজা হেঁটে গাড়িতে চলে যাচ্ছেন। ওনার চেহারা দেখে মনে হলো, সামথিং ইজ ভেরি সিরিয়াস। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন দেখলেন? উনি বললেন, ‘এ অবস্থা থেকে রিগেইন করা মিরাকুলাস।’ তখনই আমি বুঝে নিলাম অবস্থা খুব খারাপ। এরপর সন্ধ্যার দিকে শুনলাম প্রেসিডেন্ট আসবে। তাই ঘণ্টাদুয়েক আমরা আম্মাকে দেখতে যেতে পারিনি। তারপর আব্বা আবার গিয়ে দেখে এলো। আমরা সবাই দেখে এলাম। তখন রাত সাড়ে ৮টা। আমার অফিসের লোকদের বললাম, এভাবে সবাই থেকে লাভ নেই। আপনারা পালা করে থাকার ব্যবস্থা করুন। ওরা ভাবছে, বের হলে যদি আর ঢুকতে না দেয়! এমনি করে পালা করে সবাই থাকতে শুরু করল। এর মধ্যে সিএমএইচের ওরা বুঝতে পারল যে আমরা ঝামেলা করার লোক না। ওরা যেটা ভালো মনে করছে, আমরা সেটাই মেনে নিচ্ছি। আমাদের আলাদা করে কোনো ডিমান্ড নেই। রাত ১১টার দিকে গিয়ে দেখলাম প্রেশার আবার ফল করেছে। ভাবছি প্রেশার এত ফ্লাকচুয়েট করছে কেন? ওরা বলল, ‘চিন্তা করবেন না, আপনি বাসায় যান।’ পরের দিন, অর্থাৎ ২৪ তারিখ থেকে আবার লাগাতার ৪৮ ঘণ্টার হরতাল। ২৪-২৫ দু'দিন। আমি চিন্তা করছি হরতালে কিভাবে আসব? ওখানের সবাই বলল, হরতালের এফেক্ট সাধারণত শুরু হয় ৭টার পর থেকে, ৬টার মধ্যে চলে আসা যাবে। এরপর আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় গেলাম। আমার অফিসের লোকজন ওখানে সারাক্ষণ, মানে ২৪টি ঘণ্টা থেকেছে। তারা যে কতটা সহযোগিতা করেছে, সে কথা বলে শেষ করা যাবে না।

বাসায় গিয়ে কি আর স্বস্তি পাওয়া যায়? রাত সাড়ে ১২টা-১টা বেজে গেছে, তবুও ঘুমাতে পারছি না। এ ক’দিন কিন্তু চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। রাত ২টার দিকে একটু তন্দ্রামতো এসেছে, তখনই আমার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। এত রাতে ফোনের আওয়াজ শুনে অজানা আশঙ্কায় আমার বুকটা কেঁপে উঠল। এত রাতে কে ফোন করল? মোবাইল নম্বরটা দেখে বুঝলাম, আম্মা রিলেটেড কোনো খবর দিতে চাচ্ছে। আমি আস্তে আস্তে করে মোবাইল নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। যিনি ফোন করেছিলেন, উনি বললেন, খবর পেয়েছেন? উনি মারা গেছেন। আমি বললাম, কখন মারা গেল? আমি তো ১১টার দিকে দেখে এসেছি। বলল, রাত ১২টার পরে মারা গেছে। এ কথা শোনার পর আমি ফোনটা কেটে দেই। এর দু’মিনিটের মাথায় সিএমএইচ থেকে এক ডাক্তার ফোন করে বলল, ‘কী করব, ওনার রেস্পিরেটরি সিস্টেম খুলে দেবো?’ আমি তাৎক্ষণিকভাবে বললাম, না, হরতালের দু’দিন ওভাবে থাকবে। হরতাল শেষ হলে আমি আম্মার লাশ নিয়ে যাব। ঠিক ওই মুহূর্তে আমার যা মনে হয়েছিল, আমি তাই বলেছি। ভাবছি কাল থেকে হরতাল। এখন বাজে রাত দু’টো। যদি আমি ৪/৫টার সময় লাশ নেই, আমি কোথায় রাখব, কোথায় দাফন করব? আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করব। বোনদের সাথে কথা বলতে হবে। আব্বাকে কিভাবে বলব, আমি এর কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমার মাথা তখন কাজ করছে না। ‘যেরকম আছে, সেরকমভাবে এখন রেখে দেন’ বলে ফোন রেখে দিলাম। তখন আমার স্ত্রী উঠে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে? খবর শুনে তো তখন কান্নাকাটি।

আমি সাথে সাথে আমার এক খালু আলম সাহেবকে ফোন করলাম। খালুকে বললাম, আম্মা মারা গেছে, এখন আমি কী করব? সব শুনে খালু বললেন, ‘তুই যেটা করেছিস, সেটাই ঠিক। এই হরতালের মধ্যে তুই কী করবি? লাশ নিয় যদি দাফনও করে দিস, পরে সবাই তোকে বলবে এটা কী করলি? আমাদের না জানিয়ে এটা করলি কেন? আত্মীয়-স্বজন, বাড়ি থেকে লোকজন আসবে না? দেখবে না?’ এর একটু পরেই সিএমএইচ থেকে আবার ফোন করল। বলল, ভাই, আমরা এখন আর রেস্পিরেটরে রাখতে পারব না। আমরা গোসল করিয়ে লাশ মর্গে পাঠিয়ে দিচ্ছি। লাশ মর্গে থাকবে; সকালে মর্গ থেকে আপনি লাশ নিয়ে যাবেন। অলটারনেটিভলি বলল, ‘আপনি চাইলে আমরা ক্যান্টনমেন্টে দাফন করে দিতে পারি।’ ওদের কথা শুনে আমার কাছে মনে হলো, হাবভাব ভালো না; আসলেই ওরা লাশ দাফন করে দিতে পারে। তখন ওদের বললাম, সকালে লাশ নিয়ে যাব। ওই মুহূর্তে আমি কারও সাথে না পারছি যোগাযোগ করতে, না পারছি কোনো পরামর্শ করতে। একটু আগে খালুকে বললাম এক কথা, আর ওদের এখন জানালাম আরেক কথা। আমার ইমিডিয়েট ছোট বোন তানিয়াকে পরিস্থিতিটা জানালাম। তানিয়া বলল, ‘তুমি ময়নার (আমাদের সবচেয়ে ছোট বোন) বাসায় চলে এসো; আব্বাকে তো বলতে হবে। আব্বা ঘুমাচ্ছে।’ ময়নার বাসায় যেতে যেতে ময়না আমাদের আত্নীয়-স্বজনদের খবর জানিয়ে দিয়েছে। গুলশান এরিয়ার যারা আছে, তারা মোটামুটি চলে এসেছে। যে খালুকে বলেছিলাম, ওই খালুরাও চলে এসেছে। সবাই কোরআন শরিফ পড়ছে, আমরাও পড়ছি। কান্নাকাটি চলছে। বললাম, আব্বা ঘুমাচ্ছে যখন একটু ঘুমাক। ঘুম থেকে উঠলে আব্বাকে বলব। সকাল সোয়া ৬টার দিকে আব্বা উঠে চা খাচ্ছে। তখন আমি ওপরে গিয়ে খবরটা বললাম। বলার পর দেখলাম আব্বার শরীরটা হঠাৎ করে  খুব খারাপ হয়ে গেল। দেখলাম আব্বা কেমন যেন করছে। দু’জন ডাক্তার আব্বাকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাবে। অফিসের ওদের বললাম, কাগজপত্র রেডি করুন আমি আসছি।

আমি গিয়ে দেখি ওরা লাশ পায়নি। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসিকে ওরা ফোন করেছে যে আমরা লাশ নিয়ে যাব। যেহেতু আন-ন্যাচারাল ডেথ, তাই ওসি’র সই লাগবে। ওসি বলল ৯টায় আসবে। কিন্তু কর্নেল, মেজরদের ফোন করা সত্ত্বেও আসছি আসছি করতে করতে বিকাল ৩টা বেজে গেল, ওসি তবু এল না। ওসি না এলে লাশ পাওয়া যাবে না। আব্বাকে কিছু বলতে পারছি না। বাসায় আওয়ামী লীগের সব লোক বোঝাই। এদের সামনেও বলার উপায় নেই।  জলিল সাহেব (ওই সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিল), তোফায়েল সাহেব (আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ), সাবের হোসেন চৌধুরী (সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী)— সবাই তখন ওখানে। টিভিতে এরই মধ্যে এনাউন্স করে দিয়েছে, লাশ নিয়ে প্রথম যাবে আওয়ামী লীগ অফিসে, তারপর ওখান থেকে নিয়ে যাবে মহিলা সমিতি; কোথায় কোথায় মিছিল হবে। লাশের কোনো খবর নেই, এ কথা কাউকে বলতে পারছি না। এটা বললে যদি ওনারা সবাই ক্যান্টনমেন্ট যেতে চান, এটা নিয়ে যদি একটা গণ্ডগোল হয়— সেই আশঙ্কা করছিলাম। মনটা কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না, আম্মার লাশ নিয়ে কোনো গণ্ডগোল হোক। আমার মনে হচ্ছিল, তাড়াতাড়ি আম্মাকে এনে শান্তিপূর্ণভাবে কোথাও দাফন করতে পারলে ভালো হয়। সব সিদ্ধান্ত একরকম আমাকেই নিতে হচ্ছে। ভাবলাম বনানী গোরস্থান বাসার কাছে। জানাজা পড়াব গুলশান মসজিদে, এরপর বনানী কবরস্থানে নিয়ে যাব।

২৪ তারিখ বিকাল হয়ে গেল, তবুও লাশ পাইনি। সরকারি বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করলাম। ওরা বলল, ‘কাল সকালে লাশ পাবেন। ওসি আসতে পারেনি। আগামীকাল সকালে আসবে।’ আমার অফিসের লোক দেখে এসে বলল, মর্গে বসে অপরিচিত দুই মহিলা কোরআন শরীফ পড়ছে, দোয়া পড়ছে। সম্ভবত পলিটিক্যাল কেউ হবেন। বাসা থেকে সবাই বলছে লাশ কই। বললাম, লাশ কালকে নেব। সন্ধ্যায় লাশ নিয়ে কবর দেবো কিভাবে? লোক আসবে কী করে, আর জানাজা হবেই বা কী করে? কারণ কালও সারাদিন হরতাল। উপস্থিত সবাই মিলে জলিল সাহেবকে বললাম, হরতাল হাফবেলা তুলে নেওয়া যায় কি না? উনি হাসিনা আপার সঙ্গে কথা বলার সাথে সাথে হাসিনা আপা ওকে করে দিলেন। বললেন, ‘যেহেতু ওনার জানাজা হবে, আমরা ১২টার পর থেকে হরতাল তুলে নিচ্ছি যাতে লোকজন আসতে পারে।’ আমি গুলশানে জানাজা করতে চাই। কিন্তু পলিটিক্যাল বিভিন্ন প্রোগ্রাম হচ্ছে। ওরা চাইছে বায়তুল মোকাররমে প্রথম জানাজা করতে। আমার মনে হচ্ছিল ওখানে গেলে গণ্ডগোল হতে পারে। তাই আমার ইচ্ছা ছিল না। কারণ গণ্ডগোল ছাড়াও লাশ পেতে অনেক দেরি হবে বলে আমার ধারণা হলো। বিভিন্ন সংগঠনের সবাই চাইছে একবার করে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আমি কারও সাথে কোনো কথা না বলে হাসিনা আপাকে ফোন করে জানালাম, এমনিতে যে ইনজুরি, তার ওপর আবার ওরা পোস্টমর্টেম করছে। এতদিনের ধকল গেছে আর এমন অবস্থা, আমার চিন্তা হচ্ছিল আম্মাকে এদিক ওদিক নেওয়ার সময় মাংস খুলে খুলে না পড়ে। পচন অলরেডি শুরু হয়ে গেছে বোধ হয়। দরকার ছিল গতকালই দাফন করা। আমার চিন্তা, কিভাবে তাড়াতাড়ি দাফন করতে পারি। আমি হাসিনা আপাকে বললাম, আপা, আমি চাচ্ছি না মিটিং করে এই অবস্থায় কোনো দেরি হোক। আমি গুলশান মসজিদে জানাজা পড়িয়ে সোজা বনানী কবরস্থানে কবর দিতে চাই। হাসিনা আপা বললেন, ‘তুই যেটা বলবি, তাই হবে।’ হাসিনা আপা জলিল সাহেবকে ফোন দিতে বললেন। জলিল সাহেবকে হাসিনা আপা কিছু একটা বলার পর উনি বললেন, ‘পাপন যেটা বলবে তাই হবে।’

আব্বাকে বললাম, কোথায় কবর দেওয়া হবে কিছু তো ঠিক করিনি। উপস্থিত সবাই বলছে লাশ ভৈরবে নিয়ে যাবে। এদিকে ভৈরবে প্রচণ্ড টেনশন কাজ করছে। ভৈরবের অবস্থা খুব উত্তপ্ত। শুনলাম লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য সাবের হোসেন সাহেব একটা হেলিকপ্টার রেডি করে ফেলেছেন। বিভিন্ন জায়গায় জানাজা পড়িয়ে লাশ নিয়ে যাবে ভৈরবে। আমি ভাবলাম লাশ নিয়ে ভৈরব গেলে গণ্ডগোল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাছাড়া ভৈরবে গেলে লাশ যদি আর ঢাকায় আনতে না পারি? এসব ঘটনার আগে আব্বা বলতেন, আমাকে ভৈরবে কবর দিও। কিন্তু আম্মা বলতেন, ছেলে-মেয়ে সব ঢাকায়, ঢাকাতেই তো ভালো হয়। তাই আমার ধারণা ছিল আম্মা ভৈরব পছন্দ করে না। কিন্তু পরে আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছিলাম, ২১ আগস্টের ঘটনার ১০/১১ দিন আগে আম্মা আমার স্ত্রীকে ভৈরবে আব্বার দেখানো জায়গার পাশে জায়গা দেখিয়ে বলেছিলেন, আমাকে এখানে কবর দিও। এ কথা আগে জানলে হয়তো সিদ্ধান্ত অন্য রকম হতো। তখন এ কথা আমাকে কেউ বলেনি। তাই আমার ধারণা ছিল, ভৈরবে না, ঢাকাতেই হোক—আম্মা এমনটা চেয়েছিলেন। আর আমি চিন্তা করলাম, কবরস্থানে যদি ছেলেমেয়েরা নিয়মিত না যায়, জিয়ারত না করতে পারে, দূরে থাকলে লাভ কী? কেউ কেউ বলল, ‘বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাও।’ কিন্তু আমার ইচ্ছা এবং অন্যান্য সবকিছু মিলিয়ে ঠিক হলো, বনানী কবরস্থানেই কবর দেওয়া হবে। এখানে আমার এক বন্ধু আছে। ওর সাথে সিটি করপোরেশনের লোকের ভালো সম্পর্ক। বন্ধুটি বলল, ‘এটা তো পলিটিক্যাল ইস্যু, দেখি কী হয়।’ খোঁজ নিয়ে কিছুক্ষণ পর সে জানাল, কবর পাওয়া গেছে। একটা রেডি আছে। ওখান থেকে এনে সোজা কবর দেওয়া যাবে। বুঝলাম সরকার চাচ্ছে না লাশ নিয়ে দূরে কোথাও যাওয়া হোক।

সালমান সাহেব, আমাদের বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান, ঘটনার পর থেকে সারাক্ষণ আমাকে আর আমার ডিসিশনকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ ২৫ তারিখ রাতে আমাদের বাসায় এসে বললেন, ‘নাজমুল, আপনি জানেন আপনার আম্মার জানাজায় অনেক লোক আসতে চায়?’ আমি বললাম, হ্যাঁ। সালমান সাহেব বললেন, ‘এটা তো ডিপ্লোম্যাটিক জোন। এখানে অত লোক ঢুকতে দেবে না।’ এর মধ্যে খবর এলো, আমার ছোট বোনের শ্বশুর-শাশুড়িকে আমাদের বাসায় ঢুকতে দিচ্ছে না। সালমান সাহেব বললেন, ‘যেটা করছে, ওরা কিন্তু জানজায় লোক আসতে দেবে না। এখানে যদি মিছিল-টিছিল হয়, ভাঙচুর হয়, তাতে গণ্ডগোল আরও বাড়তে পারে। আমার ধারণা, আপনার আম্মার জানাজায় সাধারণ মানুষও যাবে। ওনার জানাজায় ১০ হাজারের বেশি লোক হবে বলে আমার ধারণা।’ আমি বললাম, ‘আমারও তাই ধারণা।’ উনি বললেন, ‘শি ডিজার্ভস ইট। হোয়াই উইল ইউ নট অ্যালাউ? এখানে তো এক-দুই হাজার লোকও ঢুকতে পারবে না। আমার মনে হয় নাজমুল, আপনি একটু চিন্তা করুন। প্রথম জানাজা বায়তুল মোকাররমেই করা উচিত।’ ওনার কথায় আমি রাজি হলাম। এদিকে মিডিয়া জানাতে শুরু করল, বুধবার বাদ আসর বায়তুল মোকাররমে জানাজা হবে।

২৫ তারিখ একটা সময় আমার মনে হয়েছিল, বায়তুল মোকাররমে জানাজা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গভর্নমেন্ট বোধহয় একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। কারণ ওরা বলছিল, লাশ নিয়ে প্রথমে আমাদের বাসায়, বাসা থেকে গুলশান মসজিদ আর সেখান থেকে বনানী গোরস্থান নিয়ে যাবে। বায়তুল মোকাররমেই প্রথম জানাজা হবে— এ কথা শোনার পর ওরা বারবার সিকিউরিটির প্রশ্ন তুলতে থাকে।

২৫ তারিখ সকালে আমি নিজে গিয়ে দেখে এলাম কবরটা। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে বললাম ওদের। সকালে আবার ওসি আসতে গড়িমসি করতে থাকে। বেলা বাড়ছে। সাড়ে ১১টার দিকে আমাকে ফোন করে বলল, এখন লাশ দেবে। ওসি এসেছে, আপনি আসুন। আমি আর আমার স্ত্রী তখন আম্মাকে আনতে গেলাম সিএমএইচে। মর্গে ঢুকে আম্মাকে দেখে আমার বুকটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে উঠতে লাগল। আমার স্নেহময়ী আম্মা এখানে লাশ হয়ে শুয়ে আছে। স্নেহের পরশ বুলিয়ে আর কাছে ডেকে নেবে না। কোনোকিছুর বিনিময়ে আমার এই শূন্যতা আর পূরণ হবে না।

আম্মাকে গোসল করানো হলো। ওখানে বিভিন্ন ফরমালিটিজ সারতে আধাঘণ্টার মতো লাগল। এরপর এম্বুলেন্সে করে আম্মাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম দুপুর সোয়া ১২টার দিকে। আম্মাকে নিয়ে গিয়ে দেখি বাসার ভেতরে-বাইরে কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই। আত্মীয়-অনাত্মীয়, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক লোক মিলিয়ে যেন একেবারে লোকে লোকারণ্য অবস্থা। লোকে আম্মাকে কতটা ভালোবাসত, সে ধারণা আমার আগে ছিল না। এত লোকের কান্না-হাহাকার, যেন তাদের আপনজনকে হারিয়েছে, এসব দেখে আমি যেন এত দুঃখের মধ্যেও একটু স্বান্ত্বনা খুঁজে পেলাম। হাসিনা আপা, রেহানা আপারা এলো। আম্মা নিজে হজ থেকে কাফনের যে কাপড় এনেছিল, সেটা দেওয়া হলো। আমি আব্বাকে আম্মার মুখ দেখাতে চাইছিলাম না। ভাবছিলাম, হাসিনা আপা/রেহানা আপা এলে তখন দেখাব। হাসিনা আপারা থাকলে আব্বা একটু কন্ট্রোলে থাকবে। বিশেষ করে রেহানা আপাকে আব্বা যে আদর করে, তা কল্পনার বাইরে। আর আমার মনে হয়, আম্মা আমাদের কয় ভাই বোনের থেকেও রেহানা আপাকে বেশি আদর করত। রেহানা আপাকে দেখে আব্বা খানিকটা কান্নাকাটি করল। আমার মনে হলো এখন আব্বার মনটা একটু হালকা হয়েছে। এরপর আমেরিকা রাষ্ট্রদূতসহ একে একে গণ্যমান্য অনেকেই এলেন।

তখন বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি। তাই আম্মাকে ট্রাকে না তুলে এম্বুলেন্সে ওঠানো হলো। পেছনের গাড়িতে আব্বাকে নিয়ে আমি উঠেছি। বাসা থেকে বের হতে একটি অদ্ভূত ঘটনা ঘটল— আমাদের গাড়ি কোনোটাই আমাদের কন্ট্রোলে নেই। আমাদের চতুর্দিক দিয়ে ঘেরা। সামনে পেছনে দুই সাইডে পুলিশ-এসবি— এদের গাড়ি, মোটরসাইকেল— এসব এস্কর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। আমাদের যে দিক দিয়ে যাওয়ার কথা, সেদিক দিয়ে যাচ্ছি না। দেখছি খালি অন্য রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। যাওয়ার সময় দেখলাম, যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে তার দুই সাইডে বাসার ছাদে প্রত্যেক জায়গায় পুলিশ বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে ছিল। আবার এও দেখলাম, সাধারণ মানুষও বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে ছাদে, রাস্তার ধারে, ঘরের জানালায় রয়েছে আম্মাকে কেবল এক নজর দেখার জন্য। আম্মাকে যে সবাই কত ভালোবাসে, তা দেখে আমি একেবারে অভিভূত হয়ে গেলাম। বায়তুল মোকাররমে গিয়ে দেখলাম কল্পনাতীত লোক জড়ো হয়েছে। এছাড়াও অনেকে ফোন করে বলছে আমরা যাব কিভাবে, গাড়ি নিয়ে যেতে দিচ্ছে না। ওখানে জানাজা পড়ার আগমুহূর্তে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়ল। এরপর আব্বা একটু সুস্থ বোধ করলে জানাজা পড়ানো হলো। আমরা জানাজা শেষে লাশ ওখান থেকে আর আনতে পারছি না। বিভিন্ন সংগঠন ফুল দিচ্ছে। এরপর লাশ নিয়ে ওরা ট্রাকে তুলল। ট্রাকের পিছনে লোকের বিশাল মিছিল আর আমরা মিছিলের পিছনে গাড়িতে। শুনলাম ঘোষণা করছে লাশ নিয়ে কোথায় কোথায় যাওয়া হবে সেসব জায়গার নাম। আমি ভাবছি লাশ পাব কখন! রাত না হয়ে যায়। কবরে পানি না জমে যায় আবার।

হঠাৎ আমার সন্দেহ লাগল। আম্মার লাশের সঙ্গে যারা ছিল ওদের ফোন করলাম। ট্রাকে একটা পরিচিত ছেলেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ওকে ফোন করে আম্মার লাশের কথা জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, লাশ এখানে নেই। আসলে বৃষ্টির জন্য লাশ ট্রাকে তুলে আবার এম্বুলেন্সে তুলে নেয়। সবাইকে বুঝাল, ট্রাকে লাশ আছে। কিন্তু আসলে এম্বুলেন্সে করে অন্যদিক দিয়ে লাশ নিয়ে চলে গেছে। আমার অফিসের তিন জনের সারাক্ষণ আম্মার সঙ্গে থাকার কথা।  ওদের দু’জনকে ফোন করলে ওরা বলল জানে না। তৃতীয় জন বলল, ‘আমি সঙ্গে আছি। আমরা যে পথে এসে এসেছি। বনানীর দিকে যাচ্ছে বোধ হয়।’ আমি সাথে সাথে বললাম, আমি আর আব্বা ছাড়া কবরস্থানে গিয়ে কী করবে ওরা। আমাদের বড়জোর ২০ মিনিট লাগবে আসতে। এরপর বহু কষ্টে আমাদের দু’টো গাড়ি মিছিল থেকে বের হলো। আমাদের গাড়ি আর সালমান সাহেবের গাড়ি। আমরা একটু আলাদা হতেই দেখলাম কোথা থেকে যেন পুলিশ এসে আমাদের গাড়ি দু’টো এস্কর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে। মহাখালীতে এসে এম্বুলেন্সটা দেখতে পেলাম। সাড়ে পাঁচটা ছয়টার দিকে আম্মাকে নামানোর পর ওরা গার্ড অব অনার দিল কবরস্থানের সামনে। তারপর আম্মাকে কবর দিলাম।

এখানে দেওয়াতে একটা ভালো দিক এই যে গুলশান মসজিদে নামাজ পড়ে প্রতি শুক্রবার আব্বা যাচ্ছে, আর আমরা সবাই নিয়মিত যাচ্ছি। যদিও ভৈরবের যারা আম্মাকে খুব ভালোবাসে তারা মনে খুব কষ্ট পেয়েছে, এটা অস্বীকার করব না।

আম্মা সম্পর্কে কোনো কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবে পলিটিক্সের কথা এসে পড়ে। তবে পলিটিক্যাল কথা আমি কি বলব। আমার থেকে আপনারাই বেশি জানেন। তবে যারা রাজনীতি করত না, এমন অনেকেই আম্মাকে ভালোবাসত। ২১শে আগস্টের পর থেকে আমার কাছে বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন মিলে প্রায় দুই-তিনশ’র মতো ফোন এসেছে। এছাড়া আরও প্রায় দু’শর মতো ফোন এসেছে একদম অপরিচিত লোকদের কাছ থেকে এবং এরা কেউ পলিটিক্যাল নয়। কোথায় নম্বর পেয়েছে জানি না। বিদেশ থেকেও বহু ফোন এসেছে। এর ভেতর উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো— দেশের বাইরে থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি ফোন করে আমাকে বললেন, ‘আমি এখানকার প্রবাসী বিএনপি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট। আজ আমাদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ। ওনার মৃত্যুতে আমাদের পরিবারের একজনকে হারালাম বলে মনে হচ্ছে।’ এছাড়া সবাই বলছে, কি অবস্থা, কখন জানাজা, কোনো হেল্প লাগলে বলবেন। এদের কাউকে চিনি না। ওরা বলছেন, ‘আমরা কোনো পার্টি করি না। উনি আমাদের চেনেন না। কিন্তু আইভি রহমানকে আমরা চিনি।’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত তো সেই আগে থেকেই। ছাত্র রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিল। এছাড়া অন্যান্য মহিলা সংগঠনগুলোতে রয়েছে; বাদ নেই একটাও। রেগুলার মিটিং করা, যাওয়া বসা। সম্মানও যথেষ্ট পেয়েছে; অ্যাসোসিয়েটেড কান্ট্রি’স উইমেন অব দ্য ইয়ারের এরিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো। তারপর আমেরিকা থেকে শ্রেষ্ঠ উইমেন অব দ্য ইয়ারের অ্যাওয়ার্ড দিল। আম্মা রাজনীতিও করেছে আবার সংসারও করেছে। আমাদের সবার পড়াশুনা করিয়েছে। আমাদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য নিজের হাতে রান্না করত। আমরা বড় হয়ে কর্মক্ষেত্রের জন্য আলাদা বাসা নিলেও সপ্তাহে একদিন নিজের হাতের রান্না করে আমাদের খাওয়াত। এরপর আত্মীয়-স্বজন তো আছেই। কারও কোনো অসুখ বা অসুবিধা হলে সাথে সাথে দৌড়ে চলে যেত। অপরিচিত লোকদের জন্যও যা যা করত তা বিশ্বাস করা কঠিন। বিশেষ করে মহিলা হলে তো কথাই নেই।

আম্মার বিয়ে হয় খুব ছোট বয়সে, ক্লাস এইটে পড়ার সময়। এরপর আম্মা নিজের চেষ্টায় সংসার করে বিএ পাস করেন। আমি তখন ছোট। আমাকে নিয়ে যেত ইডেন কলেজে ক্লাস করতে। পড়ালেখা করেছে, রাজনীতিও করেছে। সব করেছে। দেখা যায় রাজনীতি করতে গেলে আবার অনেকের সংসারটা দেখা হয় না। আম্মার বেলায় এটা কখনো হয়নি। ১৯৭৫ সালে আব্বা জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের তিন ভাইবোনকে ঠিকমতো দেখাশুনা করা, পড়াশুনা করানো সবই করেছে। এটা তো সহজ ব্যাপার ছিল না। এই একটা জিনিস— আম্মা সহজে ঘাবড়াত না। আম্মার সহ্যক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। কোনো কষ্ট সহজে প্রকাশ করত না। তাই কি আমার আম্মা বোমার আঘাতে দুঃসহ যন্ত্রণার কথা কাউকে না জানিয়েই পৃথিবী থেকে চলে গেল?

  • একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন আইভি রহমান। তার একমাত্র ছেলে বর্তমান সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। মা’কে নিয়ে তার স্মৃতিচারণটি ২০০৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি প্রকাশিত ‘আইভি রহমান স্মারক গ্রন্থ’ থেকে সংকলিত ।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন