মঙ্গলবার ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৯ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এনআরবি ব্যাংক

আগস্ট ২৫, ২০১৯ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ

বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানো ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এনআরবি ব্যাংক লিমিটেড। এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ধারার একটি ব্যাংক। বিদেশিদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে এবং বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য পথ তৈরি করে দিতে কাজ করছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্পায়নের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যেও ব্যাংকটি কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকটি এরই মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংসহ, অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম, এটিএম ও ডেবিট কার্ড চালু করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বিভিন্ন দিক নিয়ে সারাবাংলাডটনেটের সঙ্গে কথা বলেছেন এনআরবি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. খোরশেদ আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সারাবাংলার স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট টুটুল রহমান। তাদের কথোপকথনের গুরত্বপূর্ণ অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: এনআরবি ব্যাংক ৬ বছর পেরিয়ে ৭ বছরে পা দিল। কেমন ছিল পথচলা?

মো. খোরশেদ আলম: বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। তাই চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে এনআরবি ব্যাংকের চ্যালেঞ্জও কম নয়। যেহেতু ব্যাংকের সংখ্যা বেশি, সেহেতু প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতেই হচ্ছে। জনগণের মাঝে আস্থা তৈরি করা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং সুনাম প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে প্রথম দিকের চ্যালেঞ্জ।

সারাবাংলা: গ্রাহক আস্থা তৈরি করতে আপনারা কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?

বিজ্ঞাপন

মো. খোরশেদ আলম: মূলত ফারমার্স ব্যাংকের স্ক্যাম আমাদের আস্থা তৈরির পথকে আরও দুর্গম করে তোলে। এত চ্যালেঞ্জের মাঝেও আমরা আমাদের অবস্থানটা সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছি এবং তা সুনামের সাথেই। পরিচালকদের সুচিন্তিত পরামর্শ ও ব্যাংকের সুদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমের ফলে এনআরবি ব্যাংক একটা মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম তিন বছর গতি একটু শ্লথ থাকলেও পরবর্তী তিন বছরে ভালো একটা অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। এনআরবি ব্যাংক স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সারাবাংলা: সেই প্রবৃদ্ধিটা আসলে কি রকম?

মো. খোরশেদ আলম: টেকসই প্রবৃদ্ধি আসলে ঋণ ও ডিপোজিটের ভালো একটা অবস্থান। সেইসঙ্গে ফি ও কমিশনভিত্তিক ব্যবসার প্রসার। ব্যালেন্স শিট প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ভালো ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি ও গ্রাহকদের মাঝে আস্থা স্থাপন করাই হলো মূল লক্ষ্য।

সারাবাংলা: আপনারা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোন কোন খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন?

মো. খোরশেদ আলম: উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পায়নের দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। এনআরবি ব্যাংকও সরকারের অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে শিল্পখাত ও এসএমই খাতকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই গতিধারাকে ত্বরান্বিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এসএমই সেক্টরকে বেগবান করতে আমরা এসএমই কাস্টমার এবং নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছি। এই খাতে জামানতবিহীন এবং অপেক্ষাকৃত কম সুদে ঋণ বিতরণ করছি। শিল্পখাতে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানে অবদান রাখছি। ফলে দেশে বেকারত্ব কমিয়ে আনা সহজ হচ্ছে। সেই সাথে অবকাঠামো নির্মাণ এবং সার্ভিস সেক্টরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি কৃষিখাতেও আমাদের অবদান রয়েছে।

সারাবাংলা: নতুন প্রজন্মের ৯টি ব্যাংক রয়েছে। অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে এনআরবি ব্যাংকের সেবার পার্থক্য কি?

মো. খোরশেদ আলম: এনআরবি ব্যাংকের ট্যাগলাইন হচ্ছে ‘নট জাস্ট অ্যানাদার ব্যাংক।’ পণ্য ও সেবার ডাইভারসিফিকেশন এবং স্পেশাল সার্ভিসের মাধ্যমে আমরা অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের ক্রেডিট কার্ডের একটা ইউনিক ফিচার রয়েছে। এই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের যেকোনো এটিএম মেশিন থেকে টাকা উত্তোলন সম্ভব। এছাড়া এনআরবি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের রয়েছে আলাদা ইউনিক কোড। ফলে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা সরাসরি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছে। আমাদের সুদক্ষ রিলেশনশিপ ম্যানেজারদের মাধ্যমে খুব স্বল্প সময়ে এসএমই ঋণ সেবা দেওয়া হয়। আমাদের ২৪ ঘণ্টা কল সেন্টার খোলা থাকে, যার মাধ্যমে গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা হয়। এভাবে এনআরবি ব্যাংক অন্যদের থেকে নিজেকে একটা প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড হিসেবে আলাদা করতে সমর্থ হয়েছে। এর পাশাপাশি আমাদের পরিচালকদের বিশ্বব্যাপী সুনাম ও পরিচিতি রয়েছে। এই পরিচিতিও গ্রাহকদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সহায়তা করেছে।

সারাবাংলা: এনআরবি ব্যাংককে গ্রামমুখী করতে আপনাদের কি উদ্যোগ রয়েছে?

মো. খোরশেদ আলম: এনআরবি ব্যাংকের প্রাথমিক লক্ষ্যই হচ্ছে গ্রাম-গঞ্জের প্রবাসী পরিবারকে সেবা দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী আমরা শহরেরর শাখাগুলোর সমপরিমাণ শাখা গ্রামের কাছাকাছি স্থাপন করেছি। এর পাশাপাশি এনআরবি ব্যাংক গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। বর্তমানে সারাদেশে আমাদের ১৬৫টি এজেন্ট রয়েছে, যা এবছর শেষে ৩০০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আমরা খুব শিগগিরই মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করতে যাচ্ছি। গ্রাম-গঞ্জের এসএমই উদ্যোক্তা এবং কৃষিখাতে ঋণ বিতরনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছি।

সারাবাংলা: তাদের জন্য বিশেষ প্রকল্প বা প্রোডাক্ট কি কি?

মো. খোরশেদ আলম: এনআরবি ব্যাংকের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রবাসীদের সহযোগিতা করা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এনআরবি ব্যাংক বিভিন্ন সেবা চালু করেছে। তাদের জন্য বিশেষ ডিপোজিট স্কিম এবং সেইসঙ্গে বিশেষধরনের ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে তারা বৈধভাবে ‘ট্যাক্স ফ্রি’ ইনভেস্টমেন্ট করতে পারে। আমরা ডিপোজিট স্কিমের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকি। তারা যাতে স্বল্প সময়ে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিশ্বব্যাপী এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সাথে চুক্তি করেছি।

সারাবাংলা: এনআরবি ব্যাংকের প্রযুক্তির দিক নিয়ে কিছু বলুন?

মো. খোরশেদ আলম: আমরা বিশ্বমানের ব্যাংকিং সফটওয়্যারের ব্যবহার করছি। আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে। যার মাধ্যমে প্রবাসীরা বিদেশে বসেই হিসাবের তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। শিগগিরই আমরা ট্যাব-বেইজ ব্যাংকিং সেবা চালু করতে যাচ্ছি, যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ঋণ বিতরণ সম্ভব হবে। এছাড়া আমাদের ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট এবং পে-রোল ব্যাংকিং সেবাও চালু রয়েছে। সাইবার অ্যাটাক প্রতিরোধের জন্য আমাদের সুরক্ষিত ফায়ার ওয়াল তৈরি করা আছে। প্রতিনিয়ত সিস্টেম আপডেটের মাধ্যমে আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারে ঝুঁকি এড়িয়ে চলছি।

সারাবাংলা: বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে কোনো স্থবিরতা আছে কি?

মো. খোরশেদ আলম: ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকট থাকলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। গত বছর থেকেই ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সংকট চলছে। তারল্য নীতি এবং বাজেট ঘাটতির যোগান দিতে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে। আর এই ঋণে সুদের হার বেশি বলে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে। ব্যাংকে টাকা রাখার পরিবর্তে গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া বর্তমানে খেলাপি এবং রাইট অফ স্থিতি প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। খেলাপিঋণ ঠিকমত আদায় হচ্ছে না বলেও ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারল্য সংকট প্রকট হচ্ছে। খেলাপিঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের আস্থাহীনতাও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের আরেকটি প্রতিবন্ধকতা। ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করতে আসলে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ আদায়কল্পে প্রচলিত আইনের সংশোধন এবং সুচিন্তিত ব্যাংকিং রিফর্ম কার্যক্রমের মাধ্যমে এই ডিফল্ট কালচার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এটা সম্ভব হলেই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটা ডিসিপ্লিন পরিবেশ তৈরি হবে এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম টেকসই হবে।

সারাবাংলা: খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে আপনারা পরামর্শ কি?

মো. খোরশেদ আলম: খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য দরকার ভালো গ্রাহক নির্বাচন করে বিনিয়োগ করা। তারপর স্ট্রং মনিটরিংয়ের মাধ্যমে যাতে টাকা ফেরত আসে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। রিলেশনশিপ মডেল ঠিকমত কার্যকর থাকলে ফান্ড ডাইভারশনের সুযোগ থাকবে না এবং ঋণখেলাপির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে জামানত বন্ধক রাখা গেলে খেলাপি ঋণ আদায় সহজ হয়। সবশেষে সুদক্ষ রিকভারি টিমের মাধ্যমে খেলাপিঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

সারাবাংলা: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মো. খোরশেদ আলম: সারাবাংলাকেও ধন্যবাদ।

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন