বিজ্ঞাপন

আফগানদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন মোস্তাফিজ

August 29, 2019 | 6:01 pm

মহিবুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

‘আফগানিস্তনের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট সিরিজটিতে আমরা ঘাসের উইকেট করতে চাচ্ছি।’ সেদিন আকরাম খানের মুখে কথাটি শোনার পর থেকে মাথায় একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘বাংলাদেশ সব শেষ কবে দেশের মাটিতে ট্রু সিমিং কন্ডিশনে খেলেছিল?’ মনে পড়ছিল না। পরিসংখ্যান বই খুলেও হদিস মিলল না। অগত্যা শরণাপন্ন হতে হলো লাল সবুজের ক্রিকেটের দুই দিকপাল মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও হাবিবুল বাশার সুমনের।

বিজ্ঞাপন

যেহেতু এদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অভ্যুদয়ের প্রতক্ষ্যদর্শী তারা দুজনই। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, দুজনের কেউই মনে করতে পারলেন না। দুজনই বলে বসলেন- ‘কখনই না।’ তাহলে তো হিসেব মিলেই গেল। সবকিছু ঠিক থাকলে আসন্ন আফগান সিরিজেই প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে সিমিং কন্ডিশনে খেলবে লাল সবুজের দল। অনেকে ২০১৫ সালে পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বাংলাদেশ সফরে পেসারদের দাপট দেখে ভাবতে পারেন ওটাই ছিল প্রথম সিমিং কন্ডিশন। আসলে তা নয়। বাস্তবতা হলো, দুটি সিরিজেই স্পোর্টিং উইকেট দেওয়া হয়েছিল। যেখানে দাপিয়ে বেড়িয়েছিল পেসাররা।

যা হোক, আসন্ন সিরিজটি সত্যিই যদি ট্রু সিমিং কন্ডিশনে হয় তার আগে মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা অবশ্য করণীয়। কেননা দেশের পেস কান্ডারি হওয়ায় পেস বোলিং আক্রমণভাগের মূল দায়িত্বটা তার কাঁধেই বর্তাবে। যদি সিমিং কন্ডিশন নাও হয় তথাপিও স্বাগতিকদের পেস বোলিং আক্রমণে পাদ-প্রদীপের আলোয় থাকবেন তিনিই। সপ্তাহ বাদে সাগরিকায় গড়ানো সিরিজটিতে টাইগার পেস বোলিং বিভাগের প্রস্তুতি ও খুঁটিনাটি জানতে তার বিকল্প শুধুই তিনি।

যেই ভাবা সেই কাজ। আফগান বধে টাইগার পেসারদের প্রস্তুতি ও করণীয় জানতে শের-ই-বাংলার হোম অব ক্রিকেটে ছুটে গিয়ে তার সঙ্গে লম্বা আড্ডা দিল সারাবাংলা.নেট। সেখানে আত্মবিশ্বাসে ভরা কণ্ঠে সদ্যই লর্ডসের অনার্স বোর্ডে জায়গা করে নেওয়া এই টাইগার পেসার জানালেন, তিনি আফগানদের ধৈর্য্য নিয়ে খেলবেন!

বিজ্ঞাপন

আফগানরা পেস বল ভালো খেলে, এটা সর্বজনবিদীত। কিন্তু তাতে কী? ফিজ বল করবেন টানা একই লেংথে। কখনো গুড লেংথ কখনো বা ফুলার লেংথে। সম্ভব হলে দুর্ভোগ্য কাটারও ছুঁড়বেন। শিকায় তুলে রাখবেন না স্লোয়ার ও বাউন্সার বিষও। ঠিক যেমনটি করেছিলেন ২০১৫ সালে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে। সম্ভব হলে তার চাইতেও ক্ষুরধার হয়ে উঠবেন। মোটা দাগে বলতে গেলে টেস্ট ক্রিকেটে নবাগতদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন কাটার মাস্টার।

আড্ডায় এছাড়াও অনেক বিষয়েই কথা বলেছেন ফিজ। তার অভিষেক ওয়ানডে বিশ্বকাপ, জীবনের নতুন অধ্যায়, নতুন কোচের সঙ্গে বোঝাপড়া, লর্ডসের অনার্স বোর্ডে জায়গা করে নেওয়ার গৌরবান্বিত অনুভূতি, বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেটের শিহরণ, আসন্ন আফগানিস্তান সিরিজসহ আরো কত কী?

সারাবাংলার পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো:

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: বলা হচ্ছে আফগানিস্তানের সঙ্গে টেস্ট সিরিজে পেস উইকেট হবে। আপনি এই মুহূর্তে দলের সেরা বোলার। অতএব মূল দায়িত্বটা বর্তাচ্ছে আপনার ওপর। সেজন্য আপনি কতটা প্রস্তুত?
মোস্তাফিজ: দেখেন উইকেট এখনো প্রস্তুত হয়নি। আপনারা হয়তো শুনেছেন। তবে উইকেট তেমন হলে আমি আমার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করবো। আর এমন উইকেট হলে আমাদের জন্যও ভালো। ভালো করি আর খারাপ করি আমাদের এমন উইকেটে অভ্যাস কম ছিল। অভিজ্ঞতা কম। যখন থেকে আমাদের দেশের উইকেটে বোলিং করা শুরু করেছি এমন উইকেট পাইনি। এখানে যে ধরণের উইকেট হয় বল ওরকম জোরে যায় না। হলে অবশ্যই ভালো। ভালো করি, খারাপ করি সেটা পরের বিষয়। এরকম উইকেটে দেশে খেলতে পারলে বাইরে সফল হওয়ার সুযোগ থাকবে।

সারাবাংলা: যদি হয় তাহলে আপনারা যারা পেস বোলিং ইউনিটে আছেন তারা এই সুবিধা কতখানি আদায় করে নিতে পারবেন বলে আপনি বিশ্বাস করেন?
মোস্তাফিজ: আমাদের পেসারদের ভেতরে রাহি (আবু যায়েদ চৌধুরী) সবচেয়ে ভালো। ও দুই দিকেই বল সুইং করাতে পারে। তাসকিনের সুইং নেই। আমারও ওরকম নেই। আমার বোলিং ভেরিয়েশন আছে। আমরা এরকমই।

সারাবাংলা: অনেকেই বলে থাকে মোস্তাফিজ কাটার ছাড়া অন্য কোনো ডেলিভারি দিতে পারে না। আপনি কতটুকু একমত?
মোস্তাফিজ: একমত নই। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন বিশ্বকাপে আমি কাটারে কম উইকেট পেয়েছি। আমার স্লোয়ার ও বাউন্সারটাই ভালো কাজে দিয়েছে। একেকটা ডেলিভারি একেক সময় কাজে লাগাই। যেসময় যেটা প্রয়োজন সেসময় সেটা ব্যবহার করি। আমার কাটারটা আরো কাজ করা উচিত। ইনজুরির আগে বল যেমন ভালো জায়গায় পড়তো চেষ্টা করবো ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে সেই কাটারটি ভালো জায়গায় করতে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: নতুন বলে আপনারা কেন ভালো করতে পারেন না? সমস্যাটা কোথায়?
মোস্তাফিজ: এটা তেমন বিষয় না। বেশি বেশি অনুশীলন করতে হবে আর অ্যাকুরেসি বাড়াতে হবে।

সারাবাংলা: লঙ্কান গ্রেট চামিন্দা ভাস বলেছেন মোস্তাফিজকে বল ভেতরে ঢুকাতে হবে। এটা নিয়ে আপনার ভাবনাটা কী?
মোস্তাফিজ: চেষ্টা করি। ফুল রান আপ হলে আগের রিদমে যেত। আমাদের বড় কোনো ছুটি নেই যে আমি এটা নিয়ে কাজ করব। তার মানে এই না করব না। অবশ্যই এটা নিয়ে কাজ করব। এভাবে তো আর চলা যাবে না। বলে বৈচিত্র্য থাকলে আমার জন্যই ভালো।

সারাবাংলা: নতুন পেস বোলিং কোচ শার্ল ল্যাঙ্গ্যাভেল্ট বলেছেন, এদেশের পেসাররা যদি ভালো করতে চায় তাদের অনুশীলনের বাইরেও অনুশীলন করতে হবে। প্রতিদিন ২০টি করে বল বেশি করতে হবে। এটা আপনাদের উন্নয়নে কতটুকু কার্যকর বলে আপনি মনে করেন?
মোস্তাফিজ: আমিও একমত। প্রথম কথা হলো কিছু শিখতে হলে তার পেছনে সময় দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভালো পেস বোলার হিসেবে গড়ে উঠতে কী ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হয়, উইকেট নাকি এদশের সিস্টেম?
মোস্তাফিজ: ভালো পেসার তৈরি করতে গেলে আমাদের প্রথমশ্রেণির ক্রিকেটে দুই ধরণের উইকেট হলে ভালো হয়। পেস বোলাররা একটি ম্যাচে বেশি বোলিং করল, স্পিনাররাও একটি ম্যাচে বেশি বোলিং করল।

সারাবাংলা: মনে করেন, আপনি ভালো বল করছেন কিন্তু আপনার পার্টনার ওই জায়গায় বল করছে না। নিশ্চয়ই এটা আপনার জন্য বিব্রতকর। তো বল করতে গিয়ে ভালো পার্টনার পাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মোস্তাফিজ: দেখেন সবার সব দিন ভালো যায় না। দেখা যাচ্ছে একদিন আমার ভালো যাচ্ছে, আরেক দিন আরেকজনের ভালো যাচ্ছে। এমনও হয়েছে দুজনেরই ভালো গিয়েছে আবার দুজনেরই খারাপ গিয়েছে। ভালো পার্টনার পাব না কেন? পেয়েছি।

সারাবাংলা: আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানেরা পেস বল বেশ স্বাছন্দেই খেলে। এক্ষেত্রে আপনার কৌশলটা কী হবে, ওদের ধৈর্য্য নিয়ে খেলা নাকি অন্য কিছু?
মোস্তাফিজ: টেস্টে ক্রিকেটে সময় নিয়ে মাথা খাটিয়ে বোলিং করা উচিত। চেষ্টা করব মাথা খাটিয়ে বোলিং করার। আমি টানা লেংথে বল করে যাব, এরপর দেখা যাবে।

সারাবাংলা: নতুন পেস বোলিং কোচ তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই আপনাকে নিয়ে কথা বলেছেন। অথচ তিনি আপনাকে ভালো করে দেখেননি। কোচ এসেই আপনাকে নিয়ে কথা বলল। এটা আপনার জন্য কতটা প্রেরণার?
মোস্তাফিজ: দূর থেকে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছেন তাই আমার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমার কাছে অনেক কিছু আশা করেন, তাই বলেছেন। হয়তো অনেককে নিয়েও আশা করেন।

সারাবাংলা: নতুন কোচের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাজ করলেন। কী মনে হয়, আপনাদের উন্নতি হবে?
মোস্তাফিজ: অবশ্যই। আমি দেখেছি ওনার শেখানোর মন মানসিকতা আছে। ওনার কাজ আমার ভালো লেগেছে।

সারাবাংলা: বিশ্বকাপ কেমন গেল? ওয়ানডে ফরম্যাটে এটিই ছিল আপনার প্রথম বিশ্বকাপ।
মোস্তাফিজ: ভালো কেটেছে। এর আগে ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছিল আমার প্রথম কোনো বিশ্বকাপ। সেখানে এক ম্যাচে ৫ উইকেট পেয়েছিলাম, এখানে দুই ম্যাচে। অবশ্যই ভালো ছিল।

সারাবাংলা: বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে ২০ উইকেট। বেশি না কম?
মোস্তাফিজ: (হাসি) তবে আরো ভালো হতে পারত।

সারাবাংলা: কেন হয়নি?
মোস্তাফিজ: ঠিক বলতে পারব না (হাসি)…

সারাবাংলা: ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে আপনিই প্রথম যে কী না লর্ডসের অনার্স বোর্ডে জায়গা পেয়েছেন। এটা আপনার জন্য কতটা গর্বের?
মোস্তাফিজ: অবশ্যই এটা গর্বের।

সারাবাংলা: বিশ্বকাপে আপনি ভারত, পাকিস্তান দুই দলের বিপক্ষেই পাঁচ উইকেট পেয়েছেন। কোনটি বেশি বেশি আনন্দ দিয়েছে?
মোস্তাফিজ: সবই আনন্দের। পাঁচ উইকেট না, বিশ্বকাপে এক উইকেটও আনন্দের। দুটোই বড় দল। তবে হ্যাঁ, পাঁচ উইকেট সবসময়ই স্পেশাল।

সারাবাংলা: নতুন বল মিস করেন?
মোস্তাফিজ: না। অভ্যাস হয়ে গেছে। দেখেন মিস করার কিছু নেই। আমাকে যেখানে দেবে আমি সেখানেই বল করব।

সারাবাংলা: মোস্তাফিজ আবার ছন্দে ফিরেছে। আপনি কতটুকু একমত?
মোস্তাফিজ: দেখেন, ভালোর শেষ নেই। বিশ্বকাপে ভালো করেছি মানে এই না পুরো বছরই আমার এমন যাবে। কীভাবে আরো ভালো করা যায় সেটাই এখন ভাবছি। ওখানে ভালো করে হাল ছেড়ে দিলে তো হবে না।

সারাবাংলা: জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। সেটি মোস্তাফিজকে কতখানি বদলেছে? আপনার স্ত্রী আপনার কাজে কতখানি উৎসাহ করেন?
মোস্তাফিজ: না, বদলাইনি। আমি আগের মতোই আছি। আহামরি কোনো পরিবর্তন নেই। আপনারা দেখেছেন না? পেশাগত জীবনকে আমি ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মেলাই না। সব সময়ই আমার বাবা, মা প্রথমে। এরপরে আমার স্ত্রী।

সারাবাংলা: আপনি টানা ইনজুরির মধ্যে ছিলেন। এখন কী মনে হয় সব ধরণের ইনজুরি থেকে সেরে উঠেছেন? এখন বল করতে গেলে ব্যাক অব দ্য মাইন্ডে কোনো ভয় থাকে?
মোস্তাফিজ: না। এখন পুরোপুরি ভালো আছি।

সারাবাংলা: আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজটা কেমন হবে বলে মনে করছেন?
মোস্তাফিজ: প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। টাইট সিরিজ যাকে বলে। বিষয়টা এমন না আমরা সহজেই জিতে যাব। ওদের সাথে কষ্ট করে জিততে হবে।

সারাবাংলা: শেষ প্রশ্ন। মাশরাফি ক্রিকেটকে বিদায় বলতে যাচ্ছেন। ম্যাচে আমরা দেখেছি তিনি আপনাকে সেট করে দেন। তাকে কতটা মিস করবেন?
মোস্তাফিজ: দেখেন একটি ম্যাচে আমার নিজেরও একটি পরিকল্পনা থাকে। শুধু ম্যাশ (মাশরাফি) না। মিডঅফ, মিডঅনে যে থাকে পরামর্শ নিতে আমি যাকে ভালো ফিল করি তাকেই ডেকে নেই। তবে মাশরাফি ভাইকে আমি অনেক মিস করব। বলার ভাষা নেই। ম্যাশ ম্যাশই। এটা বলে লাভ নেই।

সারাবাংলা/এমআরএফ/এমআরপি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন