রবিবার ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৭ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ভালোবেসে শাড়ি পরি, কারও মনোরঞ্জনের জন্য নয়

আগস্ট ৩১, ২০১৯ | ৮:৪০ অপরাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা

শিক্ষক বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শাড়ি বিষয়ক একটি লেখা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই লেখায় বাঙালি মেয়েদের পোশাক হিসেবে শাড়িকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

শাড়ি পরার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে নারীর শরীর নিয়ে নানাবিধ উপমা ব্যবহার করেছন, যা নারীকে হেয় করেছে বলেই মনে করছেন অনেকে। লেখাটিতে তিনি বাঙালি নারীর সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে তাদের উচ্চতা, চেহারা ও শারীরিক আকৃতি নিয়েও কটাক্ষ করেছেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবু সায়ীদ একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। যুগের পর যুগ ধরে দেশের আনাচে-কানাচে বই পড়া আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি আলোকিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ও সম্মানিত। এমন একজন মানুষের লেখায় নারী শরীরের আকৃতি, মানুষের চেহারা ও পোশাকের রুচি নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য অনেকেই আশা করেননি।

শাড়ি

আবহমানকাল জুড়েই বাঙালি নারী শাড়িতে অভ্যস্ত। দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রীসভার নারী সদস্য, বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ প্রথিতযশা প্রায় সব বাঙালি নারীকেই দেখা যায় দেশে-বিদেশে শাড়ি পরতে। সময়ের সঙ্গে অন্যান্য অনেক পোশাক পরলেও এখনো শাড়িই বাংলাদেশের জাতীয় পোশাক।

বিজ্ঞাপন

সবার প্রিয় সেই পোশাক নিয়ে আবু সায়ীদের বিতর্কিত মন্তব্য বিষয়ে সারাবাংলার পক্ষ থেকে মতামত জানতে চাওয়া হয় কয়েকজন বিশিষ্ট নারীর কাছে।

সাদেকা হালিম

ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সাদেকা হালিম বলেন, ‘আমি বাঙালি, তাই শাড়ি পরি। বাসায় অনেকসময় সালোয়ার কামিজ পরলেও বাইরে কোথাও গেলে শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাকের কথা ভাবতেও পারি না। এভাবেই শাড়ির সঙ্গে আমার আমিত্ব মিশে গেছে। যেকোন পরিস্থিতিতে শাড়ি পরতে কোনো অসুবিধা হয় না। শাড়ি পরে সাইকেলও চালাতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, একজন ব্যক্তির জতীয়তাবোধ প্রকাশের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো তার পোশাক। দেশীয় পোশাক হিসেবে তাই দেশে-বিদেশে সব জায়গায় আমি শাড়ি পরি।’

যুগ যুগ ধরে মা, খালা, চাচি, ফুপু, দাদি, নানি কিংবা তারও আগের প্রজন্মের নারীরা শাড়িই পরতেন। সাদেকা হালিম এ বিষয়ে বলেন, ‘পরিবারের বিভিন্ন বয়সী নারীকে শাড়ি পরতে দেখেছি তাই আমিও শাড়িই পরি। এটাই আমার পোশাক।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যাস করলে দ্রুত শাড়ি পরা কোনো জটিল বিষয় না। অন্তত ৫০ ভাবে শাড়ি পরা যায়। তাই যার যেমন সুবিধা সেভাবে শাড়ি পরলেই হয়।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মন্তব্য বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উনার মতো একজন ব্যক্তির কাছ থেকে শাড়ি বিষয়ক এমন মন্তব্য প্রত্যাশিত না। তিনি নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখে পণ্য হিসেবে দেখেছেন।’

এই বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নারী কিংবা পুরুষ কারোরই পোশাক নির্ধারণ করে দেওয়া অনুচিত।’

সাদিয়া নাসরিন

নারীবাদী লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট

নিয়মিত শাড়ি পরেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শাড়ি পরে করি না এমন কোনো কাজ নেই।’ গাড়ি চালানো, অফিস করা, ব্যাকপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে বাইরের কাজ করা, ঘরের কাজ সবই করেন বলে জানান তিনি। সাদিয়া বলেন, ‘এটাই আমার পোশাক। এতেই আমি আরাম পাই।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মতো আলোকিত একজন মানুষের কাছ থেকে শাড়ি বিষয়ক এমন মন্তব্য আশা করেননি বলে জানান তিনি। সাদিয়া নাসরিন বলেন, ‘বই পড়ার সুযোগ করে দিয়ে কয়েক প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব গড়েছেন যিনি, শাড়ি নিয়ে তার লেখাটিও আমি বুঝিনি। সেটা কি আসলে সাহিত্য নাকি মুক্ত গদ্য তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়।’

সাদিয়া বলেন, ‘আবু সায়ীদ আমাদের কাছে একজন আইকনিক ব্যক্তিত্ব। অথচ শাড়ি বিষয়ে তিনি যেভাবে নারীর চেহারা, উচ্চতা, শারীরিক আকৃতি এবং যৌনতার উল্লেখ করেছেন তাতে এই লেখাটিকে সেক্সিস্ট (যৌন বৈষম্যমূলক) ও রেসিস্ট (বর্ণবাদী) বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।’

সাদিয়া নাসরিন আরও বলেন, ‘তিনি শাড়িকে উত্তেজক পোশাক হিসেবে লিখে মূলত নারীকেই পণ্যায়ন করেছেন। যেখানে আমরা সবাই মিলে ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়ার আন্দোলন করছি, সেখানে ওনার এই ধরনের অবিবেচক মন্তব্য সমাজের ধর্ষকামী আচরণকে আরও উসকে দিতে পারে বলে মনে করি আমি।’

সাদিয়া বলেন, ‘একই লেখায় তিনি বলেছেন বাঙালি নারী-পুরুষ তার নিজস্ব সৌন্দর্যের মাপকাঠি অনুযায়ী যথেষ্ট সুন্দর না। গড়পড়তা বাঙালি চেহারা নিয়ে এমন অনভিপ্রেত মন্তব্য মোটেই তার কাছ থেকে কাম্য না।’

‘তিনি শুধু নারীর পণ্যায়ন করেই থেমে থাকেননি, মেয়েদের ঘরের বাইরে কাজ করা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন বলেই মনে হল’—বলেন সাদিয়া নাসরিন।

এমনকি নারী কী পরবে না পরবে, সেটারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার এমন মন্তব্য ধর্ষকামীদের পাশাপাশি মৌলবাদীদেরও উসকে দিতে পারে সেই আশঙ্কাও জানান এই লেখিকা।

মাসুদা ভাট্টি

সাংবাদিক

এই প্রসঙ্গে মাসুদা ভাট্টি বলেন, শাড়ি নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখাটা ভালো হলেও বিষয়বস্তু ভালো লাগেনি তার। লেখাটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বাঙালি নারীরা খুঁত ঢাকার জন্য শাড়ি পরে।

শাড়ি তার কাছে একটি আরামদায়ক পোশাক। এই পোশাক নিয়ে তিনি বলেন, ‘শাড়ি একটা পোশাক যা মেয়েরা ভালোবেসেই পরে। আমি নিজেও শাড়ি পরি। অনেকেই আছে কাজের সুবিধার জন্য শাড়ি পরেন কম। অন্যান্য পোশাক পরেন। কে কী পরবেন সেটা নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা খুবই কুৎসিত চিন্তার প্রকাশ।’

‘আবু সায়ীদের পর্যায়ের একজন বুদ্ধিজীবীর মুখে এমন সেক্সিস্ট আর রেসিস্ট কথা মানায় না। যেখানে উনার মতো মানুষের লেখায় আরও দশটা মানুষের আলোকিত হওয়ার কথা। অথচ এই লেখা পড়ে মনে হল কোনো বুদ্ধিজীবীর নয়, একজন পুরুষতান্ত্রিক পুরুষের লেখা পড়ছি’—বলেন মাসুদা ভাট্টি।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘যে বাতিঘর থেকে আলো বের হওয়ার কথা ছিল সেখানে থেকে বের হলো ভয়াবহ অন্ধকার। সেই বাতিঘর এখন বল্লরী, রমণী, বাঁক, খাঁজ, উঁচু-নিচু নিয়ে ভাবিত তা সত্যিই বিস্ময়ের! বেচারি নিরীহ শাড়ির কথা বলতে গিয়ে আমরা শুনে ফেলেছি শাড়ির আবরণে লুকোনো কুৎসিৎ পুরুষ-চিন্তা! পৃথিবী কত এগোলো বাতিঘরের আলোর অপেক্ষা না করেই—এটাই আজকের দিনের আনন্দবার্তা।’

কাবেরী গায়েন

চেয়ারপার্সন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শাড়ির কথা লিখতে গিয়ে যেভাবে বাংলাদেশি নারীর চেহারা, উচ্চতা, শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করেছেন তা রীতিমতো বডি শেমিং (শরীরের গঠন নিয়ে লজ্জা দেওয়া)’— বলেন কাবেরী গায়েন।

এছাড়া আবু সায়ীদের এই লেখার জন্য তার এখন নিশঃর্তভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক আবু সায়ীদের লেখার প্রসঙ্গ টেনে কাবেরী গায়েন বলেন, ‘তিনি বলেছেন, বাঙালি নারীকে শাড়ি ছাড়া আর কোনো পোশাকে সুন্দর লাগে না। বাঙালি নারীর চেহারা নিয়ে এমন কটাক্ষ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক।’

কাবেরী গায়েন বলেন, ‘শাড়ি মেয়েরা ভালবেসে পরে, পুরুষের মনোরঞ্জন বা অন্যের চোখে আকর্ষণীয় দেখাতে পরে না। এটি একটি পোশাক, উত্তেজক পোশাক নয়। একজন নারী কিংবা একজন পুরুষ কী পোশাক পরবেন তা কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারেন না। উনার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কাছ থেকে এমন মন্তব্য ও ভাষা তাই মেনে নেওয়া যায় না।’

সারাবাংলা/আরএফ/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন