সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

শাড়ির আড়ালে নারীকে অসম্মান!

সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯ | ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিক্ষক-সুশীলদের ভাষাশৈলী ও জীবনযাপনের ‍দিকে তাকালেই একটি সমাজের রুচির অনেকটা চিত্র চেনা যায়। বিশেষত, সুশীলদের কথ্য-লেখ্য ভাষার শব্দনির্বাচন-প্রয়োগ ও গঠনশৈলী পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। সাধারণত অপেক্ষাকৃত অগ্রজদের রুচিবোধই তরুণদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এর কারণ হয়তো এই—মানুষ স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়; অনুসরণপ্রিয়ও। এ কারণেই শব্দপ্রয়োগের সময় অগ্রজদের থাকতে হয় সতর্ক-রুচিশীল-সংযমী। কিন্তু অগ্রজদের ভাষা ব্যবহার ও আচরণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে সেখানে রুচির বিকার ঘটে। তখন সমাজে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। সেই ঝাঁকুনিতে তরুণদের চিন্তায়-কল্পনায়-রুচিতে বিপত্তি ঘটতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বর্তমানে অগ্রজদের ভেতর চিন্তা কিংবা সুরুচির চর্চা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। তাদের কেউ কেউ লেখায় কিংবা আড্ডায় বাক-চাতুর্যের আশ্রয় নেন। সেখানে চাতুর্যের আড়ালে রুচিবোধ কিংবা শালীনতার সীমারেখা রক্ষা করা হয় না। তারা সস্তা জনপ্রিয়তা ও নগদ হাততালির মোহে প্রায় লাগামহীন মন্তব্য করে বসেন। সেই মন্তব্যে কারও মানহানি ঘটলো কি না, কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগলো কি না, তারা সেই বিবেচনায় যান না। তারা কেবল উপস্থিত শ্রোতার মনোরঞ্জনেই নিজের মেধা-সময় ক্ষয় করেন। তাদের বক্তব্যে যেখানে মনীষার কান্তি ঠিকরে বের হওয়ার কথা, সেখানে প্রকাশিত হয়ে পড়ে ভাঁড়ামিসর্বস্ব মুখোশ। তখন চিন্তাশীল ও রুচিবান ব্যক্তিরা তাদের মধ্যে কোনো চিন্তক-বুদ্ধিজীবী-সুশীলকে দেখেন না, দেখেনে কেবল মুখোশের আড়ালে থাকা ভাঁড়ের মুখ।

একথা সত্য যে—ভাঁড় ও সঙরা মঞ্চেই সুন্দর। তাদের দূর থেকেই দেখতে হয়। তারা যখন লোক হাসায়, তখন সেখানে বিনোদনের উপকরণই খুঁজতে হয়। তাদের কাছ থেকে সমাজকল্যাণের কোনো পরামর্শ কিংবা দিক-নির্দেশনা আশা করা ভুল। কারণ ভাঁড়-সঙদের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে হাস্যরসাত্মক বাক্‌বিভূতি ও পোশাকেই। তাদের কাছ থেকে বিচিত্র পোশাক কিংবা হাস্যরসাত্মক বাক্‌ভঙ্গি কেড়ে নিলে তারা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। জ্ঞান কিংবা রুচিচর্চার আশা তাদের কাছে করা অরণ্যে রোদনের সমান। কথাগুলো মনে এলো বিশিষ্ট সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখা ‘শাড়ি’ নিবন্ধটি পাঠের পর। নিবন্ধটি গত ৩০ আগস্ট (শুক্রবার) দৈনিক প্রথম আলোর অন্যআলো’য় প্রকাশিত হয়েছে।

নিবন্ধটিতে লেখক নারীর সৌন্দর্য-অসৌন্দর্য সম্পর্কে নিজস্ব মত প্রকাশ করেছেন। নারীদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সরস বর্ণনার পাশাপাশি তার দৈহিক আকৃতি, গড়ন, রঙ-বর্ণ-রূপ-জাতীয়তার প্রসঙ্গও তুলে আপত্তিও করেছেন। বাদ দেননি বাঙালি নারীর রুচি-অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও। করেছেন বিদ্রূপাত্মক সমালোচনা। তার এই রচনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রতিবাদকারীরা অধ্যাপক আবদুল্লা আবু সায়ীদের নিবন্ধটির কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি তার রুচিবোধ ও প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, নারীরা শাড়ি পরেন নিজেদের রুচিবোধ ও প্রয়োজনের তাগিদে। শাড়ি ছাড়া অন্য যেসব পোশাক পরেন, তাও প্রয়োজনের তাগিদে। তাদের প্রয়োজনই ঠিক করে দেয়, কখন কোন পোশাক পরতে হবে। তাদের রুচি-অভ্যাসকে কটাক্ষ করার অধিকার অন্য কারও নেই। তাদের অভিযোগ—নারীর শাড়ি পরা-না পরা, দৈহিক গড়ন, সৌন্দর্য প্রসঙ্গে লেখক যেসব বক্তব্য রেখেছেন, তাতে শাড়ির মাহাত্ম্য বাড়লেও নারীকে চরম অপমান করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এবার আসা যাক অধ্যাক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ নিবন্ধটির বিষয়বস্তু ও প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে। উভয় পক্ষের বক্তব্য-যুক্তি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রশ্নগুলো হলো—

১। নিবন্ধের ভাষা রুচির সীমা অতিক্রম করেছে কি না?
২। লেখক শাড়ির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে নারীর রুচি-অভ্যাসকে কটাক্ষ করেছেন কি না?
৩। নারীর দৈহিক আকৃতি-গড়ন-বর্ণ-রূপকে নিজের মর্জিমাফিক যৌন আবেদনময়তার মানদণ্ডে বিচার করেছেন কি না? এর মাধ্যমে তিনি নারীকে কেবল ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন কি না?

‘শাড়ি’ নিবন্ধের শুরুতেই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক।’ এই বাক্যের মধ্যে তিনি দুটি তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একটি হলো—শাড়িতেই নারীকে যৌনাবেদনপূর্ণ মনে হয়। অন্যটি—এটিই শালীন পোশাক। আরও একটু অগ্রসর হয়ে তিনি বলেছেন, ‘আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল।’ তার এই বক্তব্যের বিপক্ষে প্রতিবাদকারীদের প্রশ্ন হলো, নারীর পোশাককে কেন যৌনাবেদনপূর্ণ হতে হবে? আর এই পোশাকটিই একমাত্র শালীন পোশাক? নারীরা অন্য যেসব পোশাক পরেন সেগুলো অশালীন? এছাড়া তিনি ‘নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো’ দেখতে এতটা লালায়িত কেন? আর এই ‘উঁচু-নিচু ঢেউগুলো’র মাধ্যমে তিনি যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেই ইঙ্গিতের সঙ্গে ‘চটি’র ভাষার কোনো পার্থক্য নেই বলেও কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন।

নিবন্ধের একজায়গায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘‘কোনো এক কবিতায় কবি ওমর আলী লিখেছিলেন, ‘এ দেশের শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি।’কেন এই শ্যামল নারীদের রূপের এত সুনাম? এর কারণ তিনি ব্যাখ্যা করে বলেননি, কিন্তু তাই বলে গড়পড়তা বাঙালি নারী রূপের দিক থেকে পৃথিবীর সেরা সুন্দরীদের মধ্যে পড়ে এ বললেও যেন কিছুটা বেশি শোনাবে।’’ এই বক্তব্যে একটি দায়সারা ভাব আছে। দায়সারা ভাবটি হলো—কবি ওমর আলীর কবিতার নাম উল্লেখ না করে ‘কোনো এক কবিতায়’ বলে চালিয়ে দেওয়া। আর আছে প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মতো সৌন্দর্য সম্পর্কে নিজস্ব অভিমত। তার অভিমতটি হলো—ফর্সা মানেই সুন্দর, শ্যামলা বা কালো অসুন্দর।

অথচ বাংলা কবিতার নিবিড় পাঠক মাত্রই জানেন, ওমর আলীর কবিতাটির নাম, ‘এ দেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’। আর এই কবিতাটির শিরোনামেই তার কাব্যগ্রন্থটিরও নামকরণ করা হয়। এছাড়া, ওমর আলীকে কেউ আর কোনো কারণে মনে না রাখলেও কেবল এই একটি কবিতাটির জন্যই হৃদয়বান-সৌন্দর্যপিপাসু পাঠক আরও অন্তত কয়েক যুগ মনে রাখবে। এছাড়া, এই কাব্যগ্রন্থটির জন্য ওমর আলী ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছেন। অথচ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কবিতার নাম এড়িয়ে গেলেন। শুধু যে কবিতাটির শিরোনাম এড়িয়ে গেছেন, তা নয়, একইসঙ্গে বলেছেন, ‘কেন এই শ্যামল নারীদের রূপের এত সুনাম? এর কারণ তিনি ব্যাখ্যা করে বলেননি।’ অথচ ওমর আলী ঠিকই এই রূপের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। বলেছেন:

এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি
আইভি লতার মতো সে নাকি সরল, হাসিমাখা;
সে নাকি স্নানের পরে ভিজে চুল শুকায় রোদ্দুরে
রূপ তার এদেশের মাটি দিয়ে যেন পটে আঁকা।

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো
মায়াবী উচ্ছল দুটি চোখে, তার সমস্ত শরীরে
এদেশেরই কোন এক নদীর জোয়ার বাঁধভাঙা
হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে।

কবিতাটির এই পর্যন্ত পাঠ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শোনার প্রকৃত কারণ। এছাড়া, এমন রূপের প্রশংসার পেছনে শাড়ির ভূমিকার কথাও রয়েছে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ চাইলে এই কবিতার ‘হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে’ শীর্ষক পঙ্‌ক্তিটি উল্লেখ করে শাড়ির পক্ষেই আরও দুই স্তবক বেশি সাফাই গাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ছাড়া তো কবিতার শিরোনাম কিংবা ওমর আলী সম্পর্কে হয় না জানার ভান করেছেন, না হয় কখনোই এই কবির কোনও কবিতা তিনি পাঠ করেননি। কেবল এই নিবন্ধে পঙ্‌ক্তিটির উল্লেখ করেছেন, ‘শ্যামল রঙ রমণী’দের অসুন্দরী হিসেবে আখ্যায়িত করার উদ্দেশ্যেই। কারণ তিনিও বহুজাতিক কোম্পানির মতো সুন্দরী বলতে রঙফর্সা নারীকেই বোঝেন। আর কালো-শ্যামলা কিংবা তামাটে বা রঙের নারীদের তিনি কুৎসিত হিসেবেই গণ্য করেন। যদি তিনি এমন মনোভাব পোষণ করেন, তাহলে তাকে বর্ণবাদী হিসেবে শনাক্ত করা মোটেও অন্যায্য-অযৌক্তিক হবে না। এছাড়া, তিনি পঙ্‌ক্তিটির বিকৃতরূপ উদ্ধৃত করেছেন। পঙ্‌ক্তির শুদ্ধরূপ হলো, ‘এ দেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি।’ অর্থাৎ পঙ্‌ক্তিটি ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে রচিত। তাই প্রথম পর্ব গবে, ‘এদেশে শ্যামল রঙ’। কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন, ‘এদেশের শ্যামল রং’। এখানেও অযত্ন ও অহেলার ছাপ পরিষ্কার।

সুন্দরের রূপ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক আরও ভয়াবহ মত প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘাঙ্গী নারীদের সুন্দরী আখ্যায়িত করে খাটো বাঙালি নারীদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘...এই উচ্চতা নিয়ে ললিত–মধুর ও দীর্ঘাঙ্গী নারীর কমনীয় শরীর নিয়ে ফুটে ওঠা কঠিন, যা দেখা যায় এই উপমহাদেশের উত্তর দিকের নারীর উন্নত দেহসৌষ্ঠবে।’ লেখকের এই বক্তব্যে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার চোখে সুন্দরের রূপ যেমন ফর্সা রঙ, তেমনি দীর্ঘ দেহও। এজন্য তিনি ফর্সার অভাব পূরণে মেকাপ হিসেবে শাড়ি ও উচ্চতার ঘাটি পূরণে হাইহিল পরার পরামর্শ দিয়েছেন। আর যেসব নারী শাড়ির পরিবর্তে ‘সালোয়ার–কামিজ’, পাশ্চাত্য ফ্যাশনের কাপড়’ পরেন, তাতের রুচিকে ‘কিছুটা হাস্যকর’ হিসেবেই তিনি মনে করেন। এছাড়া, ‘শাড়ির মধ্যে’ তিনি যেমন ‘সৌন্দর্যের লালসাকে’ দেখেন, তেমনি অন্য পোশাকে দেখেন ‘রমণীয় গুদামঘর’ কিংবা ‘প্রায় বিবসনা করে রগরগে যৌনতার মৌতাত’ হিসেবেই। তার এই অভিমতের সঙ্গে অধিকাংশ সচেতন ব্যক্তি একমত পোষণ করছেন না। পরন্তু তারা লেখকের এমন বর্ণনাকে রুচিহীন বলে যেমন অভিযোগ করছে, তেমনি উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

লেখকের এমন রগড় বর্ণনাসর্বস্ব নিবন্ধ ও প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য তুলনা-প্রতিতুলনা করলে সমস্ত তথ্য-যুক্তি-প্রমাণ তার বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ তার বক্তব্যের ভেতর যেমন শিল্পিত রুচির অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে নারীর রুচি-অভ্যাসের প্রতি তার তাচ্ছিল্যভাবও।

লেখক তার পুরো নিবন্ধে বাঙালি নারীর জন্য শাড়ি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। আর এই বোঝানোর চেষ্টার সময় প্রায় অলঙ্কারশূন্য ভাষায় নারীর দৈহিক গড়ন, বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যক্ষ ও উচ্চতা অনুযায়ী কেন শাড়িই একমাত্র পরিধেয় বস্ত্র হওয়া উচিত, তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। একইসঙ্গে শাড়িভিন্ন অন্যপোশাকে নারীকে কতটা কুৎসিত মনে হয় কিংবা তার রূপের হানি কতটা ঘটে, তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেসব নারী শাড়ি না পরে অন্যান্য পোশাক পরেন, তাদের রুচি-অভ্যাসকে রীতিমতো কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি।

‘শাড়ি’ নিবন্ধে যারা নারীকে অপমান-অসম্মানের প্রমাণ খুঁজছেন, তাদের বক্তব্য ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যাখ্যা-মন্তব্য পাশাপাশি রেখে বিচার করলে, যে সত্য বেরিয়ে আসে, সেটি মোটেও লেখকের জন্য সুখকর নয়।

নিবন্ধটির শুরু থেকে শেষপর্যন্ত সৌন্দর্যের শর্ত হিসেবে নারীদের দৈহিক আকৃতি-গড়ন-বর্ণ-রূপকে নিজের মর্জিমাফিক দেখতে চেয়েছেন। বিচারও করেছেন সেভাবে। একইসঙ্গে নারীর সৌন্দর্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ‘যৌনাবেদনময়তা’কেই বিবেচেনা করেছেন। তার এমন বিবেচনাবোধকে সচেতন ব্যক্তিরা দেখছেন বর্ণবাদী-ভোগবাদী হিসেবে। তাদের মতে, লেখক নারীকে কেবল ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, তাই সৌন্দর্য বলতে গায়ের রঙ ফর্সাকে বুঝেছেন। আর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হিল্লোলের ভেতর নিজের লালসা চরিতার্থ করতে চেয়েছেন। এই প্রসঙ্গে লেখকের নিবন্ধ ও সমালোচকদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিবেচনা করলে, যে সত্য ফুটে ওঠে, সেটিও তার বিরুদ্ধে যায়।

‘শাড়ি’ নিবন্ধটি নিবিড়ভাবে পাঠ করলে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে ধরা দেয়, সেটি হলো—লেখক যেভাবে বাঙালি নারীর জন্য শাড়ি পরার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তাতে শাড়ির মাহাত্ম্য কিঞ্চিৎ বাড়লেও নারীকে করা হয়েছে ষোলো আনাই অপমান-অসম্মান। আসলে তিনি ‘ধান ভানতে গিয়ে’ আগে শিবের গীত ধরেছেন। কিন্তু সেই গীত এতটাই দীর্ঘ হয়ে গেছে যে, শেষপর্যন্ত আর ধান ভানতে পারেননি। অর্থাৎ শাড়ির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ধর্মান্ধদের মতো নারীকে জ্ঞান দিতে দিতেই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সেই ক্লান্তি এতটই ভয়াবহ ছিল যে, তিনি নারীর নিন্দাচর্চা থেকে বেরিয়ে এসে শাড়িবিষয়ক একটি নিটোল গদ্য রচনা করতে ব্যর্থ হলেন। আর এই ব্যর্থতা নিয়েই ফতোয়াবাজদের মতো ‘মাত্রাজ্ঞানহীন’ আচরণ করে বসলেন। এই আচরণের জন্য হয়তো একদিক তাকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে। খোয়াতে হবে এতদিন ধরে তিলে তিলে অর্জন করা যশ-খ্যাতি; সম্মানও। আজ যেসব ‘নারীবিদ্বেষী’ তার কাঁধে বন্দুক রেখে বাঘ শিকারে নেমেছেন, সেদিন খড়ের গাদার ভেতর থেকে সুই খুঁজে বের করা সম্ভব হলেও এই শিকারিদের তিনি আর নিজের পাশে পাবেন না। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়।

মোহাম্মদ নূরুল হক, সংবাদকর্মী ও লেখক
[লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া]

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন