রবিবার ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৭ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের শাড়িতত্ত্ব: ‘আলোকিত’ অন্ধকার

সেপ্টেম্বর ২, ২০১৯ | ৮:২২ অপরাহ্ণ

পোশাকের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রধানত ভৌগলিক। ভৌগলিক সীমারেখা টানা হলে তারপরে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক, সামাজিক, লৈঙ্গিক ও ব্যক্তিগত। ইতিহাস বলে, পোশাকের প্রয়োজন মূলত শীত নিবারণের চেষ্টা থেকে উদ্ভুত। ক্রমেই তা লজ্জা নিবারণ থেকে বিবৃত হতে হতে শ্রেণীগত অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিকভাবেই নগ্ন শরীরকে বাইরের জগৎ থেকে বাঁচাতে গাছের বাকল, পশুর লোম-চামড়া দিয়ে শরীর ঢাকার প্রক্রিয়াকে নিশ্চয়ই লজ্জা নিবারণ বলা চলে না। যেখানে শরীর লজ্জার অংশই ছিল না বা শরীরকে খুব স্বাভাবিকভাবেই শরীর হিসেবেই দেখা হত বা শরীরকে যৌনতার চারণভূমি বিবেচনা করা হত না। সেখানে পোশাক যে যৌন আবেদনের সাথে সম্পৃক্ত নয় এটা সাবলীল বোঝা পড়া।
পরবর্তীতে নারীর প্রকৃতিগত শারিরীক বৈশিষ্ট্যকে ভাঙিয়ে তাকে অধ:স্তন বানানোর সঙ্গে সঙ্গেই পোশাকের প্রয়োজনীয়তার ধরণও বদলে যায়। যেহেতু পুরুষ কেবল পুরুষ, সে নগ্ন-প্রায় থাকলেও অসুবিধা নাই কিন্তু নারীকে আগাগোড়া-মোড়া না থাকলে মানুষ তথা দ্বিতীয় শ্রেনীর মানুষ হিসেবেও মেনে নেওয়া যায় না।

নাঙ্গেলির কথা মনে আছে আপনাদের? ১৮০০ সালের দিকে কেরালার ত্রিভাঙ্কুর রাজ্যে স্তনের মাপে কর দিতে অস্বীকৃতি জানানো নিম্নবর্ণের নাঙ্গেলির কথা? সমাজের অন্যান্যদের মতো সম্মানজনক ভাবে থাকতে চাইলে স্তনের মাপে ‘স্তনশুল্ক’র বিনিময়ে স্তন ঢাকতে পারার নিয়মের জালে আটকা পড়ে, কাটা দুটি স্তনই কর হিসেবে করগ্রাহকদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। পণ্য হতে অস্বীকার করার দাম মিটিয়ে ছিলেন জীবন দিয়ে।

নারীদেহকে পণ্য ভাবার, ভোগের সামগ্রী চিন্তা করার যে মনস্তাত্ত্বিক একটা শ্রেণী গড়ে উঠেছিল এখনো বিভিন্ন সামাজিক পরিচয়ের ভেতরে এই শ্রেণীর মানুষের দাপট লক্ষ্যণীয়। স্যার আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদও তার ব্যতিক্রম নন। শুক্রবার দেশের প্রথম সারির প্রথম স্থানে থাকা একটি জাতীয় দৈনিকের পাতায় তিনি ‘শাড়ি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। যার প্রথম লাইন ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক’। ঠিক কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে একটি পোশাককে শালীন বলা যায়? এবং ঠিক কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে একটি পরিধেয় স্বয়ং নিজেই যৌনাবেদনপূর্ণ হয়ে যায়। এবং একটি পোশাক ‘যৌনাবেদনপূর্ণ’ হয়েও কী করেইবা ‘শালীন’ হয়? এমন একটি সেল্ফ কন্ট্রাডিক্টরি লাইন উৎপাদন করার জন্য স্যারের ঠিক কতখানি নারীর শরীরকে নিয়ে ভাবতে হয়েছে সেটিও ভাববার বিষয়।

ঠিক পরের লাইনেই তিনি বলেছেন, ‘আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ’। কোন নারী বা তার পোশাককে এত স্থূলভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে এবং তা যদি হয় একজন সম্মানিত ব্যক্তির কলমনি:সৃত তো এর চেয়ে দু:খজনক কোন ঘটনা আর হতে পারে না। এ তো গেল কেবল বর্ণনার বর্ণনা। যদি আলাপ হয় ভাষার ব্যবহার, ভাষার রাজনীতি নিয়ে তাহলে পৃথিবীর সমস্ত নারী বা বাঙালী নারী বা শাড়ি পরা নারীকে ‘রমণীয়’ তিনি কোন যুক্তিতেই সংবাদপত্রের মতো পাবলিক প্ল্যাটফর্মে বলতে পারেন না।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ স্যারের গুণমুগ্ধ পাঠক হলে বা শাড়ী নিয়ে প্রচণ্ড যৌনবাদী লেখাপত্রকে সমস্যা মনে না করলেও অবাক হওয়ার কারণ নাই। এ আবার নতুন কী! কাম-বিকারগ্রস্ত ‘বাঙালী পুরুষ’র সংখ্যা তো কিছু কম নয়। কিন্তু তার পরের অনুচ্ছেদেই স্যার তার আলোকিত কলমের নিচের ছায়াঢাকা অন্ধকারটুকু উগরে দিলেন।

রবীন্দ্রনাথের লেখা লাইন ‘এখানে রাস্তায় বেরোনোর বড় সুবিধা যে থেকে থেকেই সুন্দর মুখ দেখতে পাওয়া যায়’ উদ্ধৃত করে লিখলেন ‘বাঙালি জাতির বেলায় কথাটা হয়তো ওভাবে খাটবে না। তবে মাঝে মাঝে এ দেশেও যে এক–আধজন সুন্দর মুখের দেখা পাওয়া যায় না, তা–ও নয়। তবে একটিমাত্র কারণেই কেবল তা হতে পারে; যদি তারা তাদের কমনীয় শাড়িগুলোকে নান্দনিক বা সুরুচিসম্মতভাবে পরতে পারে’।

পাঠক, এই লাইন কয়টি থেকে লেখকের সহজাত সৌন্দর্যের ধারণা অনায়াসে পেয়ে যাবার কথা। ইউরোপে থেকে থেকে যে সুন্দর মুখগুলো দেখতে পাওয়া যায় সে মুখগুলো ঠিক কেন সুন্দর যা এই দেশে এক্কেবারে দেখতে পাওয়া যায় না যদি না শাড়ি পরা হয়? এখানে তাহলে সৌন্দর্যের মাপকাঠি গায়ের রং? উচ্চতা?

পরের অনুচ্ছেদেই সেই দ্বিধা কেটে যাবে ‘বাঙালি সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: আমার ধারণা ‘উচ্চতা’ লাইনে চোখ পড়লে। তিনি এখানেই থেমে যেতে পারতেন কিন্তু হলেন আরো ব্যাপৃত। লিখলেন ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির কম উচ্চতা হলে নারীর শরীরে ‘নারীজনিত গীতিময়তা’ ফুটে ওঠে না। বাংলা সাহিত্যে নারীর উপস্থাপন বহুবার নারীসত্ত্বাকে অবমাননা করেছে, সংকুচিত করেছে, ঘেন্নাবোধ তৈরি করেছে কিন্তু সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষের নারীকে এত খোলসা করে পণ্য ভাবার ব্যাপারটা রীতিমতো বিবমিষা জাগানিয়া।

লেখাটা যতবার পড়েছি, ততবার নিজের শরীর নিয়ে নিজেকে কারওয়ান বাজারের রুই মাছ, আলু পটল বা চিচিঙ্গা মনে হয়েছে। যেন নারীজন্ম পুরোটাই শুধু দর্শক পুরুষের চোখে নারীকে কমনীয়, রমনীয়, আকর্ষণীয় দেখার কাজে ব্যয়িত হওয়া ভিন্ন আর কোন উদ্দেশ্যই নাই।

লেখার এই পর্যায়ে তিনি উপমহাদেশের নারী বিশেষত দক্ষিনাংশের নারীদের বডি শেমিংয়ের চূড়ান্ত রূপ দিলেন ‘যেকোনো অসমতাকে আড়ালে রেখে মানসম্মত দেহসৌষ্ঠব নিয়ে দাঁড়ানোর পথ একটাই—ইংরেজিতে যাকে বলে মেকআপ—যার গভীরতর মানে মেকআপ দ্য লস। শারীরিক অসমতার এত ঘাটতি থাকার পরও অন্যান্য মেকআপের মতো রূপকে নিটোলতা দেওয়ার মতো এক অনন্য সাধারণ মেকআপ রয়েছে বাঙালি মেয়েদের ভাঁড়ারে। আমার মতে, এর নাম ‘শাড়ি’’ এবং শাড়ি পরার পর এই নারীরা নিজেদের পাশ্চাত্যের নারীদের সমকক্ষ ভেবে ‘হাস্যকর আত্মতৃপ্তি’ পাচ্ছে বলার মধ্য দিয়ে।

যে মানুষটা একইসঙ্গে যৌনবাদী, বর্ণবাদী; তিনি মৌলবাদী না হয়ে পারবেন কী করে তাই শেষাংশে বলেই বসলেন, সালোয়ার-কামিজ, টাইট জিনস, মিনি স্কার্ট তো প্রায় পোশাক না থাকারই শামিল। নারীর পোশাক সম্পর্কে এমন মন্তব্য করতে দেখা যায় দেশের কট্টর রক্ষণশীল ও মৌলবাদী সমাজকে।

কিন্তু ওই যে, সব রসুনের গোড়া এক! বাঙালী পুরুষ, সে হোক বাতিওয়ালা কি রিকশাওয়ালা, শিক্ষক কি ডাক্তার; কী এসে যায়! নারী, নারী-শরীর, নারীর পোশাক, নারীর সিদ্ধান্ত ইত্যাদি নিয়ে না ভাবলে পুরুষের স্বস্তি হয় না। এখন যেমন স্যার নারী কি পরছে না পরছে তা নিয়ে বয়:সন্ধিকালের অনুসন্ধিৎসু বালকের চোখে দেখতে থাকা নারীকে প্রৌঢ়ত্বের অধিকার নিয়ে সমস্ত নোংরা-ক্লেদাক্ত দৃশ্যের বর্ণনা করে ‘পরিশীলন’র দীক্ষাগৃহ খুলে ফেললেন।

নারীর লাইফস্টাইল, নারীর পেশা, নারীর আরাম যেমনই হোক, যাতেই হোক এমন ‘অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি নারী সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি’ মর্মে নিজেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কর্তৃত্বপরায়ন মনস্তত্ত্বের স্পষ্ট চিত্র জাতিকে উপহার দিলেন।

সেই সাথে আরো বুঝিয়ে দিলেন- কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যাই হোক পুরুষ শুধু পুরুষ আর নারী কেবলমাত্র একটা শরীর।

bithysoptorshi@gmail.com

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন