বৃহস্পতিবার ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

মুখোমুখি রওশন-জি এম কাদের: ভাঙন ঠেকবে জাপা’র?

সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ | ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

তরিকুর রহমান সজীব, জয়েন্ট নিউজ এডিটর

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রয়াণের দুই মাসও অতিক্রান্ত হয়নি। এরইমধ্যে জাতীয় পার্টিতে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ চরমে ঠেকেছে। এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ আর ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরকে ঘিরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব পুরনো, এরশাদ জীবিত থাকাকালে সে দ্বন্দ্ব ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। এরশাদের মৃত্যুর পর তা নানা ইস্যুতে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

বিজ্ঞাপন

জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন রওশন। সর্বশেষ নিজেকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে সেই দ্বন্দ্বকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এলেন তিনি। স্পষ্টতই দুই অংশে বিভক্ত জাতীয় পার্টিকে ঘিরে তাই প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় পার্টির ভাঙন ঠেকবে এবার?

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জাপা’র নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয় সংকট। দশম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল ছিল জাপা। সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন রওশন এরশাদ। ওই সময় এরশাদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ওই দশম সংসদ নির্বাচনের আগেই আড়াই শতাধিক প্রার্থীকে নিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিলেন এরশাদ। তবে রওশন সে পথে হাঁটেননি। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি একক না আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করবে— তা নিয়ে রওশনের সঙ্গে মতানৈক্য ছিল এরশাদের। এ দফায় শেষ পর্যন্ত এরশাদের নেতৃত্ব মেনেই নির্বাচন করেন রওশন। তবে এরশাদের শারীরিক অবস্থায় নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করে আসছিলেন, এরশাদের অবর্তমানে একক নেতৃত্ব বাছাই নিয়ে জাতীয় পার্টিকে ‍ভুগতে হবে।

আরও পড়ুন- দেবর-ভাবির ঠাণ্ডা লড়াই প্রকাশ্যে, ফের ভাঙনের মুখে জাপা

বিজ্ঞাপন

জাতীয় পার্টিতে এরশাদের অনুসারীরা তার অবর্তমানে তারই ছোট ভাই জি এম কাদেরকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। এরশাদ নিজেও তার মৃত্যুর আগে ছোট ভাইকেই দলের নেতৃত্বে রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ঘোষণা অনুযায়ীই ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ। তবে এ ঘোষণাকে স্বাভাবিকভাবে নেননি রওশন এরশাদ। তার দাবি, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে পার্টির চেয়ারম্যান নির্ধারণ করতে হবে। সেই দাবিকে অবশ্য পাত্তা দেননি জি এম কাদেরের অনুসারীরা। তারা বলছেন, জীবিত অবস্থায় চেয়ারম্যান এরশাদ যে ঘোষণা দিয়ে গিয়েছেন, সেটিই জাতীয় পার্টির জন্য শেষ কথা।

রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বিষয়টি আরেকটু প্রকট হয় এরশাদের শূন্য আসন রংপুর ৩-এ উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, রওশনের ইচ্ছা, এই আসনে লড়বেন এরশাদপুত্র সাদ এরশাদ। তবে কাদেরপন্থিরা মনে করেন, রাজনীতিতে যুক্ত না থাকা সাদ এরশাদ প্রার্থী হলে এরশাদের আসন হিসেবে পরিচিত আসনটিতে ভরাডুবি ঘটতে পারে। ফলে তারা পরিবারের মধ্যেকার দুয়েকজন সদস্য না হলেও বিকল্প হিসেবে জাপা’র স্থানীয় কোনো নেতাকে প্রার্থী করতে চান।

ওই উপনির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের জন্য স্বাভাবিক নিয়মেই গঠন করা হয় পার্লামেন্টারি বোর্ড। জি এম কাদেরের নেতৃত্বে ওই পার্লামেন্টারি বোর্ডে স্থান পাননি রওশন এরশাদ। এ প্রসঙ্গে রওশন এরশাদ সারাবাংলাকেই বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে কোথাও রাখে না। কেন রাখে না, তা জানি না।

জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা গত ২১ আগস্ট গুলশান ২ নম্বরে রওশন এরশাদের বাসভবনে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেদিনের আলোচনায় রওশন এরশাদের রাগ ও মান-অভিমান ভাঙাতে পারেননি জাপার শীর্ষ দুই নেতা। তাদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও রওশন এরশাদ তার অবস্থানে ছিলেন অনড়।

আরও পড়ুন- নেতাভিত্তিক থেকে কর্মীভিত্তিক দলে পরিণত হবে জাপা: জি এম কাদের

তবে রওশনপন্থি বেশ কয়েকজন নেতাই গণমাধ্যমে বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত জি এম কাদেরকে জাপা চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নিতে রাজি হতে পারেন রওশন এরশাদ, যদি তাকে বিরোধী দলীয় নেতার মর্যাদা দেওয়া হয়। পাশাপাশি রংপুর-৩ উপনির্বাচনে দল থেকে সাদ এরশাদের মনোনয়ন নিশ্চিত হলে জি এম কাদেরকে রওশন মেনেই নেবেন। শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টারি বোর্ডে রওশনের স্থান না হওয়ায় দলের পক্ষ থেকে সাদ এরশাদের মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আর দুইপক্ষের মধ্যে ‘সমঝোতা’র সম্ভাবনায় শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন জি এম কাদের, স্পিকার বরাবর নিজেকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার চিঠি পাঠিয়ে।

৩ সেপ্টেম্বর এক প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠান জি এম কাদের। তাতে বলা হয়, তিনিই হবেন সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর জি এম কাদেরের সেই চিঠি আমলে না নিতে রওশন এরশাদ চিঠি পাঠান স্পিকারকে। সেদিনই গুঞ্জন ওঠে, রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করবে জাতীয় পার্টির একাংশ।

সেই গুঞ্জনের সত্যতা প্রমাণিত হয় পরদিনই। আজ বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রওশন এরশাদের গুলশানের বাসায় ডাকা সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ঘোষণা দেন, রওশন এরশাদই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। আর জি এম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ার‌ম্যান হিসেবে থাকার অনুরোধ করা হয়। তবে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান ঘোষণার সময়ও যেমন দলের মহাসচিব রাখা হয় মশিউর রহমান রাঙ্গাঁকে, তেমনি রওশন এরশাদও জাপার মহাসচিব হিসেবে রাঙ্গাঁর নামই ঘোষণা করেন। তবে প্রকৃতপক্ষে রাঙ্গাঁ কোন অংশে থাকবেন, সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। এখনো পর্যন্ত গণমাধ্যমগুলো রাঙ্গাঁর কোনো প্রতিক্রিয়াও পায়নি।

পরে দুপুরেই এক সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদের রওশনের এ ঘোষণার কঠোর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, কেউ ঘোষণা দিলেই রাজা হয়ে যায় না। এ সময় তিনি দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।

জি এম কাদেরের হুঁশিয়ারিকে অবশ্য পাত্তা দেননি রওশন এরশাদের অনুসারীরা। সকালে চেয়ারম্যান ঘোষণা করার পর বিকেলে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলের নতুন পার্লামেন্টারি বোর্ডও ঘোষণা করা হয়। তাতে কো-চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে জি এম কাদেরকেও রাখা হয়।

এ পরিস্থিতিতে দলটির অনেক নেতাকর্মীই বলছেন, রওশন এরশাদ আর জি এম কাদেরকে ঘিরে দলের নেতৃত্বের এই দ্বন্দ্ব জাতীয় পার্টিকে আরও একবার ভাঙনের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাদের সেই আশঙ্কা সত্য হলে নির্বাচন কমিশনকে হয়তো পঞ্চম কোনো জাতীয় পার্টিকে নিবন্ধন দিতে হতে পারে। সেক্ষেত্রেও প্রশ্ন থাকবে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতীক হিসেবে বয়ে বেড়ানো লাঙ্গল থাকবে কোন অংশের দখলে।

জাপার ভাঙনের ইতিহাস

জানা যায়, ১৯৮১ সালে সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিতে শুরু করেন এইচ এম এরশাদ। ১৯৮৪ সালে ‘জনদল’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের গোড়াপত্তনও ঘটান তিনি। আশির দশকের মাঝামাঝি তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে নিজের বলয়ে ভিড়িয়ে মন্ত্রিত্ব দেন। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা কোরবান আলী ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুল হালিম চৌধুরী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। পরে তখনকার ১৫ দলীয় জোটের শরিক দল মিজানুর রহমান চৌধুরী, পাঁচদলীয় জোটের শরিক ইউপিপি’র কাজী জাফর আহমদ, গণতন্ত্রী দলের সিরাজুল হোসেন খানের মতো কয়েকজন ‘প্রভাবশালী’ রাজনীতিবিদও হাত মেলান এরশাদের সঙ্গে। এছাড়া শামসুল হুদা চৌধুরী, ড. এম এ মতিন, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতো রাজনীতিবিদ এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো ব্যক্তিত্বরাও এরশাদের সঙ্গে ভিড়লে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা পায় জাতীয় পার্টি। প্রতিষ্ঠার সময় চেয়ারম্যান হন এরশাদ, মহাসচিব ছিলেন ড. এম এ মতিন।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে তো বটেই, এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় থাকা পর্যন্তও বহাল তবিয়তেই ছিল জাতীয় পার্টি। দলের মধ্যে কিছু বিভক্তি থাকলেও ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দলটি তেমন ভাঙনের মুখে পড়েনি। ওই বছরই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো ভাঙন ধরে জাতীয় পার্টিতে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ওই বছর জাতীয় পার্টি (জেপি) নামে আলাদা হয়ে যান। এখনো মঞ্জুর এই জেপি আলাদা দল হিসেবেই বহাল তবিয়তে রয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে।

২০০১ সালে পরের জাতীয় নির্বাচনের আগে ফের ভাঙনের শিকার হয় দলটি। নাজিউর রহমান মঞ্জু সেবার বেরিয়ে যান বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে একটি দল গঠন করে। এই অংশটির নেতৃত্বে এখন রয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। অবশ্য এই বিজেপিই আবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এম এ মতিন গঠন করেন আলাদা জাতীয় পার্টি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক ডা. এম এ মুকিত চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দলটি।

সবশেষ এরশাদের পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মী কাজী জাফর আহমেদ দলটিতে ভাঙন ধরান। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কাজী জাফর আলাদা জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন। দলের বিশেষ কাউন্সিল থেকে তিনি এরশাদকে বহিষ্কারের ঘোষণাও দেন। কাজী জাফরের এই জাতীয় পার্টি অবশ্য এখনো নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নয়।

বারবার ভাঙনের ফলে শেষ পর্যন্ত এখন কাজী জাফরের জাতীয় পার্টি ছাড়াই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত জাতীয় পার্টির সংখ্যা চারটি। লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টি টেনে বেড়াচ্ছিলেন এরশাদ। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি চলছে বাইসাইকেলে। আন্দালিভ পার্থের জাতীয় পার্টির বাহন গরুর গাড়ি। আর এম এ মুকিতের নেতৃত্বে থাকা এম এ মতিনের জাতীয় পার্টি আছে কাঁঠাল নিয়ে। শেষ পর্যন্ত রওশন এরশাদ আর জি এম কাদেরের মধ্যেকার বিরোধ নিষ্পত্তি না করা হলে নির্বাচন কমিশনকে আরও এক জাতীয় পার্টির নিবন্ধন দিতে হবে। সেক্ষেত্রে লাঙ্গল প্রতীক পেতে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের কেউ কাউকে ছাড় দেবেন না, তা বলাই বাহুল্য।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিআর/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন