সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ছিনতাইয়ের পর আরএফএল কর্মকর্তাকে হত্যা যেভাবে (ভিডিও)

সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৯ | ৬:৫৮ অপরাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: গাজীপুরের টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় ভোরে ছিনতাইকারী চক্রের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন আরএফএল কোম্পানির কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম (৩৫)। ঘটনাস্থলের দুইটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ফুটেজে দেখা যায়, ছিনতাইকারীরা কামরুলের কাছ থেকে সবকিছু ছিনতাই করে নেওয়ার পর তাকে ছুরিকাঘাত করেন। ওই ফুটেজের সূত্র ধরেই ছিনতাইকারী চক্রটির তিন জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)-১। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ছুরিকাঘাতে ব্যবহৃত ‘সুইস গিয়ার’ চাকু।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১-এর সিও (কমান্ডিং অফিসার) লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম এসব তথ্য জানান। এসময় জানো হয়, গ্রেফতার তিন জন হলেন— ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা আব্দুল হক রনি ওরফে বাবু (১৯) এবং তার দুই সহযোগী সুজন ওরফে শাহজালাল (২১) ও আউয়াল হাওলাদার (২৬)।

র‌্যাব জানায়, ৭ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টঙ্গী পূর্ব থানার কলেজ গেট এলাকার মূল সড়ক থেকে কামরুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ নেওয়া হয় শহীদ তাজউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তার ডান পায়ের উড়ুতে গুরুতর জখম ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় কামরুলের ছোট ভাই আবুল কালাম ওরফে মতিউর রহমান (২২) বাদী হয়ে টঙ্গী পূর্ব থানায় অজ্ঞাতনামা তিন-চার জনকে আসামি করে ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা করেন।

কামরুলের পরিবারের বরাত দিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, কামরুল ইসলামের বাড়ি নাটোর সদরের শ্রীকৃঞ্চপুর গ্রামে। তার বাবা মৃত আবুল কাসেম। তিনি সিলেট জেলায় আরএফএলের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) তিনি সাপ্তাহিক ছুটিতে নাটোরে যান। কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে এক মিটিংয়ে যোগ দেওয়ার জন্য পরদিন তিনি রওনা দেন বাড়ি থেকে। ৭ সেপ্টেম্বর ভোরে তার আগের কর্মস্থলের সহকর্মীদের সঙ্গে দত্তপাড়ায় থাকার জন্য নামেন কলেজ গেট এলাকায়। সেখানেই ছিনতাইয়ের শিকার হন তিনি।

সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, কামরুল কলেজ গেট এলাকায় নামতেই তিন-চার জন ছিনতাইকারী ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তার মোবাইল, মানিব্যাগ, ল্যাপটপ ও নগদ ৩৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। এসময় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উড়ুতে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। পরে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে টঙ্গী পূর্ব থানায় খবর দেয়। পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দিন হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যায়।

র‌্যাব সিও বলেন, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দেখি, কোনো ক্লু নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও নেই। পরে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে র‌্যাবের গোয়েন্দারা মাঠে নামে। ৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে টঙ্গীর এরশাদ নগর এলাকা থেকে মূল হোতা আব্দুল হক রনি ওরফে বাবু, মো. সুজন ওরফে শাহজালাল ও মো. আউয়াল হাওলাদারকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত সুইস গিয়ার চাকু, অটোরিকশা ও কামরুলের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামীরা হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

ব্রিফিং করছেন র‌্যাব সিও সারওয়ার-বিন-কাশেম

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য এবং প্রত্যেকেই পেশাদার ছিনতাইকারী। এছাড়াও তারা প্রত্যেকে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত। আসামি বাবু বাসের চালক, আউয়াল অটোরিকশা চালক ও সুজন বাসের কন্ডাক্টর। এদের মধ্যে বাবু ও সুজন বাসের যাত্রীদের গতিবিধি অনুসরণ করে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের বেতন কবে দেওয়া হয়, সেসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখে। বাসের যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার সময় তার কাছে থাকা টাকা বা মূল্যবান সামগ্রীর পরিমাণও অনুমান করার চেষ্টা করেন সুজন। পরে কাউকে ছিনতাইয়ের সম্ভাব্য টার্গেট মনে হলে তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য, তার বাস থেকে নামার স্থান জানিয়ে দেওয়া হয় চক্রের অন্য সদস্যদের। তারা সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে, সুবিধামতো নির্জন স্থানে গেলেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

চক্রের সদস্যদের যারা অটোরিকশাচালক, তাদের কাছেও তথ্য দেওয়া হয় যেন টার্গেট যাত্রী বাস থেকে নামলেই তারা ওই যাত্রীকে নিজেদের অটোরিকশায় তুলে নিতে পারে। যাত্রীকে অটোরিকশায় তুলতে পারলে সে মোবাইলে কথা বলার কৌশলে তার গন্তব্য ও যাওয়ার পথের বিবরণ চক্রের অন্য সদস্যদের জানিয়ে দেয়। তারা সেই অনুযায়ী ওঁৎ পেতে থাকে এবং টার্গেট যাত্রীর সর্বস্ব কেড়ে নেয়।

জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল হক রনি (বাবু) জানান, তিনি সাত বছর ধরে আব্দুল্লাহপুর-বাড্ডা রুটের বাস চালাচ্ছেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি মাদকাসক্ত। টঙ্গী থানায় তার নামে একাধিক ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে। ঘটনার রাতে তিনিই দলের সবাইকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশে একত্রিত করেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ীই দলের সবাই আসামি আউয়ালের অটোরিকশায় বেরিয়ে পড়েন। পথে কামরুল ইসলামকে একাকী পেয়ে তারা আক্রমণ করেন। এসময় আসামি সুজন ও আউয়াল অটোরিকশা নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কামরুলের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তির একপর্যায়ে আসামি রনি তার কাছে থাকা সুইস গিয়ার চাকু দিয়ে কামরুলের ডান উরুতে আঘাত করে এবং পালিয়ে যায়।

আসামি সুজন জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, বাবু যে বাসের চালক, সেই একই বাসের কন্ডাক্টর সুজন। কাজের সুবিধার জন্যই তারা একই গাড়িতে কাজ করেন। বাবুর মতোই সুজনও সাত-আট বছর ধরে পরিবহন খাতে কাজ করছেন, জড়িত ছিনতাইকারী চক্রের সঙ্গেও। ছিনতাইকারী চক্রের অন্যতম পরিকল্পনাকারী তিনি।

আসামি আউয়াল হাওলাদার জানায়, একসময় পোশাক কারখানায় কাজ করলেও ছিনতাইকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পর পেশা পরিবর্তন করেন তিনি। দিনে মাঝে মধ্যে দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও রাতে অটোরিকশা চালার তিনি। কামরুলকে ছিনতাইয়ের সময়ও তার অটোরিকশাই ব্যবহার করে ওই চক্র। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক ছিনতাই মামলা।

র‌্যাবের সিও সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, কামরুলকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট পাঁচ জন অংশ নেয়। তিন জন কামরুলকে ছুরিকাঘাত, মারধর ও জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার কাজ করে। বাকি দু’জনের একজন রিকশাচালক, অন্যজন রিকশায় বসে ছিল। এদের মধ্যে ছিনতাইয়ে অংশ নেওয়া তিন জনের একজনকে (রনি) গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি দু’জনকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন