বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রাখাইনে বসতি নিশ্চিহ্ন, কোথায় ফিরতে বলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের?

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | ৩:১৭ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে রাখাইনের যে গ্রামগুলো থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন, সেই গ্রামগুলোতে এখন তাদের বসবাসের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই। তার বদলে সেখানে গড়ে উঠেছে পুলিশের ব্যারাক, সরকারি ভবন, উদ্বাস্তুদের স্থানান্তর ক্যাম্প। মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে কড়া বিধিনিষেধের মধ্যে সেসব এলাকা ঘুরে এসে বিবিসির একটি দল তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

বিবিসির ওই প্রতিনিধি দলের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি এই সফরে রাখাইন রাজ্যের যে চারটি স্থানে নিরাপত্তা আয়োজন দেখানোর জন্য দলটিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তার সবগুলোতেই রোহিঙ্গা বসতি ছিল। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু এখন সেখানে সরকারি স্থাপনা ছাড়া আর কিছুই নেই। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেসব এলাকায় রোহিঙ্গা বসতি থাকার তথ্য অস্বীকার করে বলছে, রাখাইন রাজ্যে কোনো রোহিঙ্গা গ্রাম বিনষ্ট করে সরকারি স্থাপনা তৈরি করা হয়নি।

এর আগে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়েছিল, তখনও অভিযোগ উঠেছিল, রোহিঙ্গাদের বসতি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে সে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিল মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। পরে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ঠিকই সেই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছিল।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রায় দুই বছর হয়ে গেলেও কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য দুইবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ উদ্যোগে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য তিন হাজার ৪৫০ জনের তালিকায় থাকা কোনো রোহিঙ্গাই নিজ দেশে ফেরত যেতে রাজি হননি। তাদের অভিযোগ, রাখাইনে তাদের থাকার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি। ২০১৭ সালে যে পরিস্থিতির মুখে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি এখনো বদলায়নি। মিয়ানমারে ফেরত গিয়ে তারা স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারটুকুও হারাবেন বলে অনেক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন।

এদিকে, প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশকেই দোষারোপ করেছে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ। তাদের দিক থেকে যে আন্তরিকতার কোনো ধরনের কমতি নেই, তা প্রমাণ করতেই সংবাদকর্মীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখাইন রাজ্যের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ঘুরিয়ে দেখিয়েছে তারা।

রাখাইন সফরে বিবিসি’র সাংবাদিকরা

বিবিসির খবরে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। সরকারি একটি গাড়ি বহরে করে সংবাদকর্মীদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তাদের কেউই পুলিশের অনুপস্থিতিতে কোনো ভিডিও ধারণ বা সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে পারেননি। তবে সবাই খালি চোখেই দেখতে পারছিলেন কিভাবে রোহিঙ্গা বসতিগুলো থেকে তাদের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে।

কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে অস্ট্রেলিয়ার স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের ৪০ শতাংশ গ্রামের এখন কোনো অস্তিত্বই নেই। সেখানে নতুন স্থাপনা তৈরি করে ২০১৭ সালের সেনাবাহিনীর আক্রমণের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে।

কী দেখলেন সাংবাদিকরা

মিয়ানমারের সরকারি কর্তৃপক্ষ হ্লা পো কং নামের একটি ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যায় সংবাদকর্মীদের। সেখানে ২৫ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। নিজ এলাকায় ফেরত যাওয়ার আগে দুই মাস এখানে কাটাতে হবে রোহিঙ্গাদের। এক বছর আগে বানানো এই ক্যাম্পটির অবস্থা এখনই শোচনীয়। কমিউনিটি টয়লেটগুলো এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে। হো রি তু লার এবং থার জায় কোন নামের দুইটি রোহিঙ্গা গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এই ক্যাম্পটি তৈরি করা হয়েছে।

বিবিসির পক্ষ থেকে ওই ক্যাম্পের প্রশাসকের কাছে গ্রামগুলো ধ্বংসের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, কোনো গ্রাম ধ্বংস করা হয়নি। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি দেখানোর পর তিনি বলেন, এই চাকরিতে তিনি নতুন। তাই সব তথ্য তিনি জানেন না।

এরপর সংবাদকর্মীদের নিয়ে যাওয়া হয় কেইন চং নামের একটি স্থানান্তর ক্যাম্পে। যেখানে জাপান ও ভারত সরকারের অর্থায়নে ফেরত আসা রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী আবাসন তৈরি করা হয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ম্যার জিন নামের একটি রোহিঙ্গা গ্রাম সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়ে স্থানান্তর ক্যাম্পটি তৈরি করা হয়েছে। এই গ্রামটি মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের একটি ব্যারাকের খুব কাছাকাছি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পুলিশ ম্যার জিন গ্রামটি ধ্বংসের কথা স্বীকার করেছেন।

মং ডু শহরের খুব কাছেই ম্যেও থু জি নামের অন্য একটি গ্রামে প্রায় ৮ হাজার রোহিঙ্গা বসতি ছিল। ২০১৭ সালে গ্রামটিতে ব্যাপকভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি। আবার রাখাইনের গ্রামগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই গাছের প্রাচুর্য থাকে। এবার ম্যেও থু জি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় কোনো গাছের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। সেখানে দেখা গেল পুলিশ আর সরকারি বিশাল কমপ্লেক্স।

এরপর ইন ডিন গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় সংবাদকর্মীদের। এই গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গাকে নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করেছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গ্রামটির এক-চতুর্থাংশ অধিবাসী রোহিঙ্গা মুসলমান এবং বাকিরা ছিল বৌদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাননি সাংবাদিকরা। রোহিঙ্গাদের বাড়ির আশেপাশে যে জায়গাগুলোতে আগে গাছ ছিল, সেখানে এখন নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দেখা গেছে। স্থানীয় বৌদ্ধরা জানিয়েছেন, তারা কোনোভাবেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের আশেপাশে বসবাস করতে দেবেন না।

রোহিঙ্গাদের জন্য কী বার্তা

বিবিসির সাংবাদিকরা সরেজমিনে ঘুরে এসে বলছেন, রোহিঙ্গাদের আগের আবাসভূমিতে স্থানান্তর ক্যাম্প, সরকারি ভবন, পুলিশের ব্যারাক বানানো হয়েছে। তাই এখন বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত গেলেও খুব কমসংখ্যক রোহিঙ্গাই তাদের আগের জায়গাজমিতে ফেরত যেতে পারবেন। মিয়ানমারে গিয়েও তাদের বাস করতে হবে নিজেদের গ্রামের ধ্বংসাবশেষের ওপর বানানো হ্লা পো কং বা কিয়েন চংয়ের মতো স্থানান্তর ক্যাম্পগুলোতে। কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে তাদের জীবন হবে আরও সংকীর্ণ।

২০১২ সালে বাস্তুচ্যুত একজন রোহিঙ্গার সঙ্গে সাংবাদিকদের দেখা হয় ইয়াংগুনে ফেরত আসার পথে। তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জ্ঞাতার্থে জানালেন, মিয়ানমারে ফেরত আসার সিদ্ধান্ত হবে বোকামি। রাখাইনে ফিরলে তাদের জীবন শরণার্থী ক্যাম্পের জীবনের চেয়েও হবে ভয়াবহ।

মিয়ানমার কী বলছে

রাখাইন সফরের পর সংবাদকর্মীরা চেষ্টা করেছিলেন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার, রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মনে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার। কিন্তু কথা বলার জন্য কোনো সরকারি প্রতিনিধিকে খুঁজে পায়নি দলটি।

বরং বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে মিয়ানমারে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে মন্ত্রী পর্যায়ে কাজ করলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এখনো রোহিঙ্গাদেরকে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করছে। মিয়ানমারের দৃষ্টিতে তারা গত ৭০ বছর ধরে অবৈধভাবে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ করে বসবাস করছে।

এছাড়া, মিয়ানমার সরকারে পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের আবেদন নাকচ করা হয়েছে, এমনকি তাদের মুক্ত চলাচলের ব্যাপারেও নিশ্চয়তা দিতে পারেনি মিয়ানমার। সরকার কেবল তাদেরকে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড দিতে আগ্রহী। কিন্তু রোহিঙ্গারা এই কার্ড নিতে ইচ্ছুক নন। কারণ এই কার্ড তাদেরকে আরও জোরালোভাবে বাঙালি হিসেবে প্রমাণ করবে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৯৪২ সালের অসমাপ্ত কাজ তারা এখন সমাপ্ত করতে চায়। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের যেভাবে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে সরকার কোনো তদন্ত করতে চায় না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারেও তারা উদ্যোগ নিতে চায় না। এমনকি বৌদ্ধ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগও নিতে আগ্রহী নয় মিয়ানমার সরকার।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/একেএম/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন