সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | ৮:১৫ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রথম শিল্প বিপ্লব হয় আঠারোশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। নতুন উদ্ভাবন ওই শিল্প বিপ্লবকে পরিচালনা করেছে, যেমন বাষ্প ইঞ্জিন। প্রথম শিল্প বিপ্লব ছিলো সারা বিশ্বে ব্রিটেনের দ্বারা পরিচালিত পুঁজিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথম প্রস্তাবনা। এর মাধ্যমে শুরু হয় যন্ত্র যুগের।

বিজ্ঞাপন

এর এক শতক পর উনিশ শতকে ঘটে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব। যার মাধ্যমে শুরু হয় বৈদ্যুতিক যুগের। সেসময় পুরাতন কয়েকটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদি রাষ্ট্রে উন্নীত হয়। এই যুগেই দেখা যায় ব্রিটেনের পতন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান।

তৃতীয় শিল্প বিপ্লব শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এই বিপ্লবের ফলে মানব সমাজ তথ্যের যুগে ঢুকে পড়ে। কম্পিউটিং টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি এবং ইনফরমেশন টেকনোলজি এই যুগকে নেতৃত্ব দেয়। এই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে বিশ্বে একক শক্তিতে পরিণত হয়।

এই শিল্প বিপ্লবগুলো বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃশের আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে উৎপাদন ক্ষমতা ও উৎপাদনের সম্পর্ক তৈরি করে। কেউ এই উৎপাদন সম্পর্কের থেকে দূরে চলে যায় আবার কেউ একে অন্যের অনেক কাছে চলে আসে যা বেশ কয়েকটি শীতল এবং গরম যুদ্ধের কারণও হয়ে ওঠে। এই শিল্প বিপ্লবগুলো বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বুঝার ধরণ, জীবনযাপনের ধরন এবং কাজে পরিবর্তন নিয়ে আসে।

বিজ্ঞাপন

এখন আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সূচনা দেখছি। উচ্চ গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট ডিভাইসের উপর ভিত্তি করে ভার্চুয়াল প্রযুক্তির উদ্ভাবনী সমন্বয়, কোয়ান্টাম টেকনোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধির প্রযুক্তি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উদ্ভাবন। এগুলো আরও একবার বিশ্ব জগত সম্পর্কে আমাদের বুঝার ধরণকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে যাচ্ছে।

যাইহোক, এবার বিশ্ব রাজনীতির দিকে নজর দেওয়া যাক। সেখানে আমরা দেখছি বেশ কালো মেঘ জমছে। বিশেষ করে বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈরিতা বাড়ছে। ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ চীনের একটি কৌশলগত শিল্প পরিকল্পনা যা তারা ২০১৫ সালে ঘোষণা করেছিলো। এটাকেই বলা যায় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান দ্বন্দের প্রধান কারণ। চীনের এই কৌশলগত পরিকল্পনাই যুক্তরাষ্ট্রকে বাণিজ্য যুদ্ধ করতে তাঁতিয়ে দিয়েছে।

চীন এই পরিকল্পনাটি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে মাথায় রেখেই গ্রহণ করেছিলো। এই পরিকল্পনা তৈরিতে তারা তাদের অতীতের সাফল্যগুলোকে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে। অতীতের সাফল্যগুলো কী? চীন একটি সম্পুর্ণ শিল্প এবং যোগান ব্যবস্থা সারা বিশ্ব ছড়িয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে এগিয়ে। দেশটি উৎপাদনের পরিমাণ ও আকারের দিক দিয়ে পৃথিবীতে এক নম্বর স্থান দখল করেছে। এছাড়া চীন তাদের সারা দেশে অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বের নেতৃত্ব স্থান দখল করেছে। টেলি-কমিউনিকেশনের মাধ্যমে ইন্টার-কানেকটিভিটির দিক দিয়ে তারা এক নম্বর। এগুলোই মূলত চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এগুলোর পাশাপাশি চীনের রাজনৈতিক ও নীতিগত সমন্বয় এবং ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো নির্মাণে দক্ষতা ও ক্ষমতা এবং দেশটির বিশাল ভোক্তা বাজার এ সবই শিল্প বিপ্লবে অন্যান্য বড় বড় প্রতিদ্বন্দিদের চেয়ে বেইজিংকে এগিয়ে রেখেছে। তবুও চীনের উল্টোদিকও আছে। এত উন্নতির পরও তারা উন্নত রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক দূরে। শিল্প কাঠামো, কর্মদক্ষতা এবং বিশেষত মৌলিক প্রযুক্তি এবং মৌলিক প্রযুক্তির উপাদানগুলির নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে চীন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

চীনের এই পরিস্থিতিই মূলত আংশিকভাবে হলেও বাণিজ্য যুদ্ধে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু কেনো চীনের হাইটেক শিল্প এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। বস্তুত চীন বিগত দশকগুলোতে তার বিশাল শিল্প উত্থানের মধ্যে হাইটেক শিল্পেও বিস্ময়কর উন্নতিসাধন করেছে। যেমন হুয়াইয়ের প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং চীনের অন্যান্য হাইটেক কোম্পানিগুলোর উত্থান এর প্রমাণ। এটা কৌশলগত ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার কারণ। যদি চীন তাদের প্রযুক্তিগত উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখে তাহলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নেতা হবে কোন দেশ ? এই প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনার কারণ। যেখানে একটি শিল্প বিপ্লব আসলে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ভিত্তিই পরিবর্তন করে দেয় সেখানে শিল্প বিপ্লবের নেতা হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন চীনের জন্যও আছে। যদি চীন শিল্প বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয় তাহলে তারা কীভাবে বিশ্বকে দেখতে চাইবে?

চীনের নেওয়া 'সাধারণ নিয়তি' (Common Destiny) তত্ত্ব চীনের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে। চীন তাদের কূটনৈতিক ‘সাধারণ নিয়তি’ তত্ত্বে প্রচার করে যে, তারা বিশ্বব্যাপী ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করবে। বিশ্বকে একটি অন্তঃযোগাযোগ নির্ভর এবং উন্মুক্ত হিসেবে দেখতে চাইবে। তবে চীনের জন্য দুঃখের ব্যাপার হলো, বর্তমানের বাস্তববাদী বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের শিল্প উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি এবং তাদের বিশ্বদর্শন স্থায়ী এবং ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতেই থাকবে।

চীনের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ যতই বাড়ছে ততই বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট একের পর এক মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলছে। বাণিজ্য যুদ্ধ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন থেকেই যায়,  যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হতে চলেছে?

লেখক: জিন কাই

সহযোগী অধ্যাপক

ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, গুয়াংডং অ্যাকাডেমি  অব সোশ্যাল সাইন্স, চীন।

দ্য ডিপ্লমেট থেকে বাংলায় অনূদিত 

ভাষান্তর: আতিকুল ইসলাম ইমন

আরও পড়ুন- বাণিজ্য যুদ্ধে জয়ী কে?

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের মামলা

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন