মঙ্গলবার ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৯ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘আমার ছোটন হত্যার বিচার চাই, এজন্য মরতেও রাজি আছি’

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | ৮:৩১ অপরাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘আমি খুব দ্রুত আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। নিজে ছেলে হারাইছি, আর কেউ যেন  সন্তান না হারায়। আমার ছোটন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার চাইতে যদি পঙ্গু হয়েও পড়ে থাকত, আমি তো তাকে দেখতে পারতাম। তার শরীর ছুঁয়ে দেখতে পারতাম। শেষ মুহূর্তে আমার ছোটন আমাকে একটা বার বাবা বলেও ডাকতে পারে নাই। তার মারে দেখতে পারে নাই। অ্যাকসিডেন্টের পরে ছোটন তার মারে খুঁজছিল। আশেপাশের মানুষকে বলেছিল তার মা যাতে দেখা করে। পানি খাইতে চাইছিল। তাও খাইতে পারে নাই।’

বিজ্ঞাপন

 

মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে একনাগাড়ে তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের কথা বলছিলেন উত্তরায় বাসচাপায় নিহত মেহেদী হাসানের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। কখনও  ক্ষোভ, কখনও চেপে রাখা কষ্টে ঝড়ে পড়ে শোকাছন্ন এই বাবার মুখে। আদরের ছোট সন্তানের কথা বলেন আর কাঁদেন ইউসুফ।

ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, তুরাগ থানার ওসি বলছিল আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের তিন দফা দাবি পূরণ করবে। আমার ছোটন হত্যার বিচারের জন্য  যা করা দরকার তাই চেষ্টা করবো। এজন্য আমি মরতেও রাজি আছি।’

বিজ্ঞাপন

ইউসুফ বলেন, আমার ছেলে বুকে খুব ব্যাথা পেয়েছিল। তার চারপাশটাই ভেঙে গেছে এমন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে দেখেছিলাম আমি। আমার বাবা (মেহেদী) ছোটবেলা থেকেই যখনএকটু ব্যথা পেতো তখন আমাকে বলতো- বাবা আমারে ভালো কোনো হাসপাতালে নাও। আর সেই আমার ছোটন সেদিন হাসপাতালে একটা বারও আমাকে বাবা বলে ডাকতে পারেনি। সে পানি খেতে চেয়েছিল কিন্তু আমার ছোটনকে আমি এক ফোঁটা পানিও খাওয়াতে পারিনি।’

এসময় তার পাশে বসা  মেহেদীর মা ও  বড় ভাই পারভেজও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

মেহেদীর স্মৃতি হাতড়ে  বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। পারভেজ ও মেহেদী। আদর করে পারভেজকে আমি ডাকি বড় বাবু আর মেহেদীকে ডাকতাম ছোটবাবু। এলাকার সবাই ওকে ছোটন বলে ডাকতো। এলাকার কারো বিপদ বা দরকারে মেহেদী সবার আগে ছুটে যেত। চোখের জল মুছতে মুছতে ‘তিন-চার মাস আগে ছোটন পড়ালেখা সে ছেড়ে দেয়। টঙ্গী ভার্সিটিতে ভর্তি হতে  কথাও জানিয়েছিল।

আরও পড়ুন: বাসচাপায় মৃত্যু, বিচার দাবিতে ধউরে সড়ক অবরোধ

ছেলের ছবি বুকেে আঁকড়ে ধরে তিনি বলেন,ঘটনা যখন ঘটে তখন আমি ছিলাম কামাড়পাড়া। বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার ছোটনের জন্য। ভাবলাম ওর আম্মু অসুস্থ তাই ঘুমিয়ে পড়বে।ছেলেকে নিয়েই ঘরে যাই। একটু পরেই দেখি আমার বড় ছেলে ও তার মা বাসার বাইরের দিকে আসছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? ছোটনের বড় ভাই বললো, ‘আব্বু ছোটনের নাকি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।

, পরে স্লুইচ গেট ১০ নম্বরেগিয়ে যখন ফোন দেই তখন জানতে পারি আমার ছোটনকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখি আমার ছোটনকে ডাক্তারের রুমের থেকে বের করা হয়েছে।  ডাক্তার বললেন ছোটনকে আইসিইউতে নিতে হবে।  ছোটন আমার দিকে তাকিয়ে ছিল,পুরো শরীরে রক্ত। আমার বড় ছেলে নাকে হাত দিয়ে দেখে, আমি বুকে হাত দিয়ে আমার ছেলেরে ধইরা দেখি। আমার ছেলেরে আর জীবিত অবস্থায় আমি ধরতে পারি নাই।’

সেই রাতে ভোগান্তির অভিযোগও করেন তিনি। বলেন ‘হাসপাতাল থেকে বের হয়ে পুলিশের কাছে মামলার জন্য এই কাগজ, সেই কাগজের হিসেবেই সেখানে ব্যস্ত ছিলাম। ওইখান থেকে আমার ছোটনকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। সেখানে লাশ ছুটাইতেও সময় লাগছে অনেক। ডেথ সার্টিফিকেট দিছে বেলা ২টার দিকে। আমার ছেলেরে মাইরা ফেলা হইছে। তারে আমি আর পামু না জাইনাও এসব হয়রানি আমার সইতে হয়েছে।’

তুরাগ এলাকায় মোটরগাড়ির যন্ত্রপাতির ব্যবসায়ী ইউসুফ আলীর অভিযোগের যেন শেষ নেই । বলেন, ‘যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে সেখানে কী পুলিশ-সার্জেন্ট কেউই ছিল না? তারা দেখে নাই? ঘটনা ঘটলে ট্রাফিক সার্জেন্ট জনগণকে সরায়ে দেয়। কেনো? আমি জানি না তারা কিছু লুকানোর জন্য করে কিনা?’

কান্নায় কণ্ঠ বুজে আসা ইউসুফ বলেন, ‘আমি আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। ড্রাইভার-হেলপারের ফাঁসি চাই। এই ভিক্টর ক্লাসিক গাড়ি শুধু এই রোডে না বরং চাই পুরো দেশে বন্ধ করা হোক। যোগাযোগ মন্ত্রী বলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো করছে। কিন্তু এইভাবে মানুষ মরলে সেটা ভালো কেমনে হয়? তারা বলে বিচার হইতেছে। আসলে কি বিচার হইতেছে?

মেহেদীর মা পারভীন আক্তার বলেন,  ‘আমি বিচার চাই। এমন বিচার দেখতে চাই যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। আমার ছোটন আমাকে খুব ভালোবাসতো। আমাকে একা করে চলে গেছে আমার আদরের বাচ্চাটা। আর কোনো মা যেনো এভাবে একা না হয়। আমি গাড়ির মালিক, ড্রাইভার ও স্টাফের বিচার চাই।’

গত ৭ সেপ্টেম্বর উত্তরায় ভিক্টর পরিবহণের একটি বাসচাপায় মারা যায় মেহেদী হাসান। এসময় আহত হয় তার বন্ধু আলভী। এই ঘটনার ঠিক তিন দিন আগেই এই একই পরিবহণের বাসচাপায় মারা যান আলভীর বাবা সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রব।

সারাবাংলা/এসবি/জেডএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন