মঙ্গলবার ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৯ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘বিরোধিতার’ মধ্যেই খুলল সুইমিং পুলের দুয়ার

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | ৮:৪২ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একাংশের বিরোধিতার মধ্যেই প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুইমিং পুলের উদ্বোধন হয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা ‘আলোচিত’ এই সুইমিং পুল নির্মাণ করেছে। খেলার মাঠে সুইমিং পুল নির্মাণ নিয়ে বিরোধিতা করতে গিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল সুইমিং পুলের উদ্বোধন করেন। এরপর সাঁতারুদের জন্য পুলটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, ‘আমাদের শহুরে জীবনে ছেলেমেয়েরা সাঁতার কি জিনিস সেটিই জানে না অথবা ভুলতে বসেছে। একসময় আমরা গ্রামে প্রচুর পুকুর-বিল দেখতাম। এখন সচরাচর সেগুলো চোখে পড়ে না, অনেক কমে গেছে। তখন আমাদের সাঁতার কাটার সুযোগ ছিল, কিন্তু এখনকার শিশুদের সেই সুযোগ নেই। অথচ সাঁতার শুধু একটি খেলা নয়, এটি প্রত্যেকের জীবনের নিরাপত্তারও বিষয়।’

প্রতিমন্ত্রী রাসেল আরও বলেন, ‘সাঁতার এমন এক খেলা, যা করলে অতিরিক্ত কোনো ব্যায়ামের প্রয়োজন হয় না। সাঁতারের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই আমরা জেলায় জেলায় সুইমিং পুল করছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, পুলগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কোনো খবর নেই। আমি সুইমিং পুল রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে ক্রীড়াক্ষেত্রে যাতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়, সেজন্য সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘সুইমিংপুল করতে গিয়ে অনেকের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। কেন বিরোধিতা করেছিলেন, সেটি আমার কাছে বোধগম্য নয়। অথচ এই সুইমিং পুল থেকে লাভবান হবে চট্টগ্রামের মানুষ। এরই মধ্যে সুইমিংপুলে সাঁতার শিখতে এক হাজারেরও বেশি আবেদন করেছে। ১১টি সেশনে দিনে ১১ ঘণ্টা ২১ জন প্রশিক্ষক তাদের সাঁতার শেখাবেন। ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষক রয়েছে। এখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য ফ্রি সাঁতার শেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া সীমিত আয়ের মানুষের জন্যও ফ্রিতে সাঁতার শেখানো হবে। সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে আমাদের এ উদ্যোগ।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মো. ইলিয়াস হোসেনের সভাপতিত্বে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সুইমিং পুলটি ৫০ মিটার দীর্ঘ, ২২ মিটার প্রস্থ এবং ১ দশমিক ৮ মিটার গভীর। ৮ লাইনের সুইমিং পুলের সঙ্গে রয়েছে ড্রেসিং রুম, প্লেয়ার লাউঞ্জ, দুইপাশের গ্যালারিতে দেড় হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, পিউরিফিকেশন প্ল্যান্ট, ডিপ টিউবওয়েল, গাড়ি পার্কিং এবং অফিস।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিং পুলের নির্মাণ কাজ শুরু করে জেলা ক্রীড়া সংস্থা, যার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

সুইমিং পুল নির্মাণ শুরুর পর এর বিরোধিতা করেছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি (বতর্মানে প্রয়াত) এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই নেতার অনুসারী হিসেবে ইমরান আহমেদ ইমু ও নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বাধীন মহানগর ছাত্রলীগ সুইমিং পুল নির্মাণের বিরুদ্ধে কর্মসূচি দিয়েছিল। সেসময় ছাত্রলীগের এই কর্মসূচিকে মেয়রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীরা।

২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল লালদীঘি মাঠে এক সমাবেশ থেকে সুইমিং পুল নির্মাণ বন্ধ করতে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু এর সপ্তাহখানেক আগে আউটার স্টেডিয়াম টিন দিয়ে ঘিরে প্রকল্পের কাজ শুরু করে দেয় সিজেএকএস।

এরপর নগর ছাত্রলীগের মহিউদ্দিনের অনুসারী নেতারা চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। সেখানে সুইমিং পুলের কাজ বন্ধ করে সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে ওই বছরের ১৭ এপ্রিল বিকেলে প্রকল্প এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশের পর সেখানে ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় ১৪ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন এবং বেশি কিছু গাড়ি ও দোকান ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ শটগানের গুলি ও টিয়ার শেল ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সুইমিংপুল প্রকল্প এলাকা থেকে নির্মাণ সামগ্রী চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম স্বপন একটি এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মহিউদ্দিন রতন বাদী হয়ে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। দুই মামলায় ৫৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও সাড়ে চার থেকে পাঁচশ জনকে আসামি করা হয়। একটি মামলা থেকে এরই মধ্যে অব্যাহতি পেয়েছেন আসামিরা।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর মারা যান এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর থেকে দৃশ্যত ‘খেলার মাঠে সুইমিং পুল’ নির্মাণ নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে আর কোনো বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি।

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন