রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

চাষিদের নামে করপোরেশনের ঋণ, কিস্তি টানছে কেরু

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | ১০:১০ অপরাহ্ণ

রিফাত রহমান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

চুয়াডাঙ্গা: বাংলাদেশের প্রাচীন চিনিকলগুলোর মধ্যে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি অন্যতম। কিন্তু দেশের অন্যান্য চিনিকলের মতোই কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বেশ কয়েকবছর ধরেই লাভের মুখ দেখছে না। তার ওপর চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন আখ চাষিদের সহযোগিতার জন্য চিনিকলটিকে বন্ধক রেখে জনতা ব্যাংক থেকে ১৯১ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার টাকা ঋণ নেয়। সেই ঋণ এখন সুদাসলে প্রায় দুইশ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর এ জন্য প্রতিবছর কেরুকে আসলের কিস্তির পাশাপাশি সুদ টানতে হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, আখ চাষিদের সহযোগিতায় দেওয়া ঋণের টাকা চিনিকলে আখ সরবরাহের পর সেই দামের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা। এভাবেই বছর বছর সমন্বয় করে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন তারা। কিন্তু কেরু এ্যান্ড কোম্পানির ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। এমনকি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ করপোরেশন কোন কাজে ব্যবহার করেছে তাও অস্পষ্ট। আসলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তা চিনিকলের কোনো কাজে আসেনি। উপরন্তু এই ঋণ এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেরু এ্যান্ড কোম্পানি চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আলী আনছারী সারাবাংলাকে জানান, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন চিনিকলটি জনতা ব্যাংকের দর্শনা শাখায় বন্ধক রেখে ২৮ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার ঋণ নেয়। এরপর ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ ৯১ হাজার, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ৭ লাখ ৯ হাজার এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। তবে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি। কিন্তু চার অর্থবছরে নেওয়া ১৯১ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার টাকার ঋণ এখন সুদাসলে ১৯৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ টাকা চিনিকলের কোনো না লাগলেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিবছর আসলের সঙ্গে ১৭ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, চিনিকল কর্তৃপক্ষ ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ঋণের ২৮ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ২৬ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৬৩ কোটি ১৫ লাখ ৬৪ হাজার, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ১ কোটি এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৬০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।

বিজ্ঞাপন

জাহেদ আলী আনছারী বলেন, ‘ঋণের এই টাকা জনতা ব্যাংক লিমিটেড দর্শনা শাখা থেকে ছাড় করে করপোরেশনের অনুকূলে পাঠানো হতো। করপোরেশন ওই টাকা তাদের মতো করে ব্যয় করতো। যেখানে চিনিকল কর্তৃপক্ষের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। ওই টাকা কীভাবে কোন কাজে ব্যয় হয়েছে তা করপোরেশনই বলতে পারবে।’

কেরু এন্ড কোম্পানির নামে প্রায় দুইশ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ইচ্ছা মতো কাজে লাগানোর বিষয়টি চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ভুল সিদ্ধান্ত বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ব্যাংক ঋণ একটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার শামিল। এ যেন ‘উদর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে’। কোন স্বার্থে, কাদের জন্য এ ঋণ নেওয়া হয়েছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ ঋণটি নেওয়া হয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেনের পরামর্শে। অথচ এখন সম্পূর্ণ দায়ভার বহন করছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ।’

দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বিষয়টি শিল্পমন্ত্রী, শিল্পসচিব এবং বর্তমান চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি দেখবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন।’

এদিকে ঋণের ব্যাপারে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও একই করপোরেশনের পরিচালক (বাণিজ্যিক) এ কে এম দেলোয়ার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা করা হয়েছে চিনিকল টিকিয়ে রাখা স্বার্থে। দেশের ১১টি চিনিকল তাদের এলাকার সোনালী ব্যাংক এবং ৪টি চিনিকল জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। ওই ঋণের টাকা আখ চাষীদের সহযোগিতার জন্যই নেওয়া হয়েছে।’

‘ওই ঋণের টাকা আসলে কোন কাজে ব্যয় হয়েছে?’ এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ ব্যাপারে পরে কথা হবে। ’পরে তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল ধরেননি।

কেরু এ্যান্ড কোম্পানির ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অজিত কুমার পাল বলেন, ‘ঋণ কেন ও কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে এবং ওই টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে তার অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানের পর ‘ঋণ’ অপকর্মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিনিকলগুলোর বেশিরভাগ মানুষ দুর্নীতি প্রবণ হওয়ায় ভালো কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতিমুক্ত করতেই সরকার কাজ করছে। এ কাজে যারা বাধা দেবে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চিনিকল বাঁচাতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ’

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন