শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৩ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ক্ষমতায় বিদেশিদের ‘পাপেট’ সরকার: মির্জা ফখরুল

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯ | ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশিদের ‘পাপেট’ সরকার হিসেবে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রহীনতা— এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সামগ্রিকভাবে গোটা বিশ্বে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো ঘটছে, বাংলাদেশও তার মধ্যে পড়ে গেছে। আজকের সরকার ওই আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজস করে বাংলাদেশের জনগণের অধিকারকে হরণ করে দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তারা সম্পূর্ণভাবে পাপেট সরকারে পরিণত হয়েছে।

সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর তোপখানা রোডে শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ‘বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস ও আমরা’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্য।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যারা আজ বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, যারা আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের ক্রীড়ানক হয়ে এই সরকার ক্ষমতায় আছে। যে কারণে আমরা দেখি যখন রোহিঙ্গা সমস্যা দেখা দেয়, সেই সমস্যার সমাধান বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক ম্যানুভারিং করে করতে পারে না। আমরা দেখি যখন আসামে প্রায় ১৯ লাখ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করা হয়, তাদের  বলা হয় তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছে, তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে— তখনো এই নতজানু সরকারকে কোনো প্রতিবাদ করতে আমরা দেখি না। এটাই বাস্তবতা।

বিজ্ঞাপন

মির্জা ফখরুল বলেন, আজকের বড় বাস্তবতা হচ্ছে এই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না। জোনায়েদ সাকি (গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক) ভালো কথা বলেছেন— মাঠে যে আন্দোলন, মাঠে যে কাজ, তার মধ্য দিয়ে ঐক্য তৈরি হবে। আমি তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত।

‘মাঠের মধ্য দিয়ে আমরা যখন রাজপথে আসতে পারব, রাজপথে আমাদের আন্দোলন শুরু করতে পারব, সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঐক্য তৈরি হবে। এটাই সত্য,’— বলেন মির্জা ফখরুল।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সক্রিয় আছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখানে বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টকে সক্রিয় দেখতে পারছেন না। কোন দিক দিয়ে ঐক্যফ্রন্ট সক্রিয় নেই? আমরা আমাদের কাজগুলো করছি। দল ও সংগঠনকে সংগঠিত করে আমরা যেন স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে নেমে আসতে পারি, তার জন্য কাজ করছি। আমি জানি, অন্যান্য দলগুলো প্রত্যেকে তাদের নিজেদের কাজগুলো করছেন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করছেন। নির্বাচনের আগে আমরা যে জোট তৈরি করেছিলাম, সেই ঐক্য এখনো অটুট আছে। সেখানে কোনো ভাঙন ধরেনি।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তাকে যদি মুক্ত করতে হয়, সুচিকিৎসার জন্য যদি বাইরে আনতে হয়, তাহলেও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বের করে নিয়ে আসতে হবে। সবকিছুরই সময় আছে, ধাপ আছে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জনগণ কোনোদিনই এরকম ফ্যাসিস্ট সরকারকে মেনে নেয়নি, স্বৈরতন্ত্রকে মেনে নেয়নি। আমি বিশ্বাস করি, জনগণ ঐক্যবদ্ধ হবে এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মধ্যে মতের ছোট-খাটো যেসব পার্থক্য রয়েছে, সেগুলোকে পাশে রেখে গণতন্ত্রের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব।

ঐক্যফ্রন্টের আরেক শরিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, স্বাধীনতার তিন বছরের মধ্যে গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল করা হয়েছিল। কয়েকটি মিনিটের মধ্যে পার্লামেন্টে বিল পাস করতে হয়েছে, এজন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগেনি। বাকশাল বাংলাদেশে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের সহযোগিতা করেছে। এখন আবার অঘোষিত বাকশাল অলমোস্ট কায়েম হয়ে গেছে।

‘আমি বলতে চাই, এসব করে কোনো লাভ হবে না। এই স্বৈরাচার দিয়ে গণমানুষের উন্নয়ন হবে না। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করে এই স্বৈরাচার হটানো যাবে না। পুরো জাতির গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, বামপন্থি শক্তি সবাই মিলে জাতীয় বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে এদের বিদায় করতে হবে, সবাইকে এক হয়ে রাজপথে নামতে হবে,‘ — বলেন জেএসডি সভাপতি।

সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। আর ক্ষমতাসীনরা মনে করেন, এর চেয়ে সুন্দর গণতন্ত্র হতে পারে না। এজন্য স্পষ্ট করে বলা দরকার— ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা মিথ্যুক, তারা প্রতারক, তারা ভণ্ড এবং তারা কাপুরুষ। আমরাই সাহসী, আমরা ১০ বছর লড়ছি। আমরা আছি, শেষ পর্যন্ত আমরা লড়ব। কোনো বিভ্রান্তিতে আমাদের পড়া ঠিক হবে না।

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে ডাকসুর সাবেক ভিপি মান্না বলেন, গতকাল (রোববার) একটি টকশো’তে গেছি। এই যে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে সরিয়ে দেওয়া হলো, এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যে জিরো টলারেন্স দেখিয়েছেন, এটাই আমাকে দিয়ে বলানোর চেষ্টা করা হলো। তারা বলছেন, ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকে দায়িত্ব থেকে বের করে দিয়েছেন— এটাকে ভালো বলবেন না?

‘আরে এটা যদি ভালোই হতো, এটা যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে বার্তাই হতো, তাহলে হলমার্কের কেলেঙ্কারীর পর আপনার উপদেষ্টার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? আপনি যদি সত্যিই জনগণকে বার্তা দিতে চান যে আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই শুরু করতে চান, তাহলে বাংলাদেশের সব কয়টা ব্যাংক যে একের পর এক খালি হয়ে যাচ্ছে— এই ব্যাংকের পতনের জন্যে যারা যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কিছু করেছেন আজ পর্যন্ত? কিছুই করেনি!’— বলেন মান্না।

তিনি বলেন, আপনার আগের অর্থমন্ত্রী (আবুল মাল আবদুল মুহিত) বলেছেন, সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা— ওটা তো বাদামের খোসার মতো। ওই বাদামের খোসার অর্ধেক জায়গার জন্যে বেগম খালেদা জিয়াকে ১০ বছর সাজা দিয়েছেন। উনি(খালেদা জিয়া) টাকাটা চুরি করেছেন? ওই টাকা এক ব্যাংকে রাখার কথা, সেটা আরেক ব্যাংকে আছে। বলতে পারেন— উনি একটি ইরেগুলারিটি করেছেন। সেই ২ কোটি টাকা ফুলে-ফেঁপে ৮ কোটি টাকা হয়েছে। এর জন্য উনার যদি ১০ বছরের সাজা হয়, তাহলে ৮৬ কোটি টাকা চাওয়ার জন্যে কয় বছর সাজা হবে? সেই সাজার ব্যবস্থা করেননি আপনি (প্রধানমন্ত্রী)।

‘জোর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে ঘুষ চাওয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা ছিল না? কোনো মামলার ধারে-কাছেই যাচ্ছেন না। ওদেরকে দল থেকে বের করে দিয়েছেন? ওরা তো ছাত্রলীগের নেতা আছে, ডাকসুরও নেতা আছে। ওটা কী ছেড়েছে তারা? হাই কমান্ড ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন— বাবা তুমি ছাত্রলীগের পদ ছাড়ো, ডাকুস ছাড়া যাবে না, ডাকুস ধরে রাখো— ওটা বড় কষ্টে অর্জন করেছি,’— বলেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক।

প্রেসিডিয়াম সদস্য শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিচালনায় আলোচনা সভায় গণস্বাস্থ্য সংস্থার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জনসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণফোরামের জগলুল হায়দার আফ্রিক, নাগরিক ঐক্যের এস এম আকরাম, মোমিনুল ইসলাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বক্তব্য রাখেন।

ফাইল ছবি

সারাবাংলা/এজেড/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন