বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি, গলদ নির্বাচন কমিশনেই

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৮:০৯ অপরাহ্ণ

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল গলদ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভেতরেই পাচ্ছেন খোদ তাদের কর্মকর্তারাই। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদান কার্যক্রমের শুরু থেকে কেন্দ্রীয় সার্ভার অরক্ষিত থাকা, নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ ও সার্ভারে পাঠানোর পদ্ধতিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সম্পৃক্ত করা, খোয়া যাওয়া লাইসেন্সকৃত ল্যাপটপ উদ্ধারকে বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণ উঠে আসছে তদন্তে।

এর ফলে নির্বাচন কার্যালয়ের একশ্রেণির কর্মচারীর যোগসাজশে গড়ে ওঠা চক্র রোহিঙ্গাদের কাছে অবাধে সরবরাহ করেছে এনআইডি। রোহিঙ্গাদের কাছে ৫০-৬০ হাজার টাকা এনআইডি বিক্রির তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদিনসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা। জয়নালকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং নির্বাচন কমিশনের গঠিত বিশেষ টিমের তদন্তে উঠে এসেছে নানা তথ্য।

যেভাবে ধরা পড়ে রোহিঙ্গাদের এনআইডি প্রদানকারী ইসি কর্মী

বিজ্ঞাপন

গত ১৮ আগস্ট লাকী আক্তার নামে এক রোহিঙ্গা নারী স্মার্টকার্ড নিতে গিয়ে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে আটক হয়। এরপর ইসির গঠিত তদন্ত কমিটি চট্টগ্রামে ৪৬ জন রোহিঙ্গা নাগরিকের সন্ধান পায়। এরা এনআইডি কার্ড পেয়েছে ও তাদের সব তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত আছে। এরপর তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করে ইসি, যার দায়িত্বে আছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি উইং) উপ-পরিচালক ইকবাল হোসেন। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে এই টিম কক্সবাজারে কাজ শুরু করে। প্রথমে দুজন রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করা হয়, যাদের এনআইডি কার্ড আছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুজন রোহিঙ্গা দালালসহ আরও পাঁচজনকে আটক করা হয়।

ইকবাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এনআইডি কার্ড বানানোর টোপ দিয়ে রোহিঙ্গা দালালদের আটক করা হয়। তারা জানায়, কক্সবাজার থেকে তারা কোনো এনআইডি কার্ড পাচ্ছে না। চট্টগ্রাম থেকেই তারা এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করছে। তখন আমাদের দৃষ্টি আসে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের দিকে। তারা জানায়, এনআইডি কার্ড পেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লায় আসেন। সেখান থেকে একটি পার্টিকে বুঝিয়ে দিয়ে দালালরা চলে যায়। এ তথ্য পাওয়ার পর আমরা গত রোববার চট্টগ্রামে এসে ৪৬ জন রোহিঙ্গার ফরম চেক করি। কিছু তথ্য নিয়ে আমরা ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসে কর্মরত পাঁচজনের মোবাইল জব্দ করি। সেখানে শুধু জয়নাল আবেদিনের মোবাইলে এ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট পেয়ে আমরা তাকে আটক করি। পরে ইসির লাইসেন্স করা ল্যাপটপ ফেরত দিতে এসে আরও দুজন আটক হয়।’

যেভাবে রোহিঙ্গাদের হাতে যেত এনআইডি কার্ড

আটক তিনজনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মামলা করেন ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা। মামলায় আটক জয়নাল আবেদিন ও তার ল্যাপটপ হেফাজতে রাখা বিজয় দাশ এবং সুমি দাশ ওরফে সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে আরও দুজনকে আসামি করা হয়। এরা হলেন- সাগর (৩৭) ও সত্যসুন্দর দে (৩৮)।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন সারাবাংলাকে জানান, জয়নালকে জিজ্ঞাসাবাদে সাগর ও সত্যসুন্দরের তথ্য পাওয়া গেছে। দুজনই ২০০৮ সালে এনআইডি শাখায় কর্মরত ছিল। সাগর এনআইডি সার্ভারে আপলোড করত। তার কাছে দেশের সব উপজেলার এনআইডি আপলোডের পাসওয়ার্ড আছে। বর্তমানে সে বিআরটিএতে কর্মরত আছে।

সত্যসুন্দর ডাটা এন্ট্রি এক্সপার্ট। এনআইডি সার্ভারে অনুপ্রবেশের দায়ে তাকে ইসি থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তবে এরপরও টাকার বিনিময়ে সে বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে এনআইডির জন্য ডাটা এন্ট্রির কাজ করত। বর্তমানে সে ঢাকার মিরপুর এলাকায় কাজ করছে।

জয়নাল আবেদিন ২০০৪ সালে নির্বাচন কমিশনে চাকরিতে যোগদান করে। বিভিন্ন অভিযোগে তাকে ১০বার বদলি করা হয়। ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগে সর্বশেষ তার বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘জয়নাল প্রথমে এনআইডিতে ভুল সংশোধন করে দিত। এ জন্য সে লোকজনের কাছ থেকে ৮-১০ হাজার থেকে ৫০-৬০ হাজার পর্যন্ত নিয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছে। তার সঙ্গে সাগর ও সত্যসুন্দরের যোগাযোগ আছে। জয়নালের কাছে যে ল্যাপটপ পাওয়া গেছে সেটি ১০ হাজার টাকায় সে সাগরের কাছ থেকে কিনেছিল।’

‘সাপ্তাহিক বন্ধের আগের দিন সে অফিস থেকে ওয়েবক্যাম, ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়ার যন্ত্র, স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড বাসায় নিয়ে যেত। রোহিঙ্গাদের এনআইডির জন্য ছবি, আঙুলের ছাপসহ আনুষঙ্গিক সব তথ্য নিয়ে ঢাকায় সাগরের কাছে পাঠাত। সাগর উপজেলার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এনআইডি তৈরি করত এবং সেন্ট্রাল সার্ভারে ইনপুট দিত। পরে সেই এনআইডি এস এ পরিবহনের মাধ্যমে জয়নালের কাছে পাঠাত। সত্যসুন্দরও একই প্রক্রিয়ায় সার্ভারে ঢুকে এনআইডি তৈরি করে জয়নালকে সরবরাহ করত।’

ওসি মোহাম্মদ মহসীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য পেয়েছি, এটা একটা অর্গানাইজড ক্রাইম। বড় চক্র জড়িত বলে আমাদের ধারণা। মামলাটি কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট তদন্ত করছে। আশা করি, সব তথ্য উদঘাটন হবে।’

জব্দ ল্যাপটপে আরও ৫১ রোহিঙ্গার তথ্য

সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে জয়নাল আবেদিনের কাছ থেকে যে ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে আরও ৫১ জন রোহিঙ্গার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ইসির গঠিত বিশেষ তদন্ত টিমের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০০৭-০৮ সালে ইসি যখন প্রথম এনআইডি তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়, তখন মাঠপর্যায়ে যেসব ল্যাপটপ পাঠানো হয়েছিল, ২০১৪ সালে তার থেকে ২টি ল্যাপটপ হারিয়ে যায়। আমাদের ধারণা, জয়নালের কাছে যে ল্যাপটপটি পাওয়া গেছে সেটি ওই হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপের একটি। আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন জয়নাল ল্যাপটপ থেকে অনেক তথ্য সরিয়ে ফেলেছে। তবে ৫১ জনের তথ্য আমরা পেয়েছি, যাদের সবাই রোহিঙ্গা। কিন্তু তারা এনআইডি পেয়েছে কি না সেটা আমরা এখনও জানি না। সেটার তদন্ত করছি।’

অরক্ষিত সার্ভারেই গলদ

নির্বাচন কমিশনের গঠিত বিশেষ তদন্ত টিমের সদস্য এবং চট্টগ্রামের নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এগুলো হচ্ছে- লাইসেন্স করা ল্যাপটপগুলো সুরক্ষিত রাখা এবং যে কোনো পর্যায়ের ইসি কর্মীর সার্ভারে প্রবেশকে নিয়ন্ত্রণে আনা। এই দুটি কাজ শুরু থেকেই কঠোরভাবে মনিটরিং করা গেলে রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়া ঠেকানো যেত বলে মনে করছেন তারা।

ইসির প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান, ইসির নিবন্ধিত ল্যাপটপগুলো সফটওয়্যারভুক্ত। লাইসেন্স করা সফটওয়্যার সেখানে আছে। এটা অফলাইন সিস্টেমে কাজ করে না। মূল সার্ভারের সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই। তবে উপজেলা পর্যায়ে ল্যাপটপগুলোতে কাজ করা হয় ইন্টারনেট মডেম দিয়ে। সেই মডেম সংযুক্ত করলে সার্ভার সচল হয়। তখন সরাসরি ইনফরমেশন ইনপুট দেওয়া যায়।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাবার জন্য তথ্যও এই প্রক্রিয়ায় সার্ভারে ইনপুট দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা শাহাবুদ্দিনের।

খোয়া যাওয়া ল্যাপটপগুলোর সফটওয়্যার অকার্যকর করা হয়নি কেন, জানতে চাইলে এনআইডি উইংয়ের উপ-পরিচালক ইকবাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘একেবারে অফিসের লোকজন জড়িত হয়ে পড়ায় বিষয়টি নজরে আসেনি। আর একটা বড় ঘটনা না ঘটলে তো আমরা কেউই বিষয়টি জানতে পারতাম না।’

তবে শাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের এনআইডি প্রাপ্তির ঘটনা জানার পর বাংলাদেশে এই মুহুর্তে এনআইডির কাছে নিবন্ধিত ইসির সব ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ও আইপি পরিবর্তন করা হয়েছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ল্যাপটপগুলো অথেনটিকেট করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ছাড়া কেউ এখন সেসব ল্যাপটপ খুলে সার্ভারে প্রবেশ করতে পারবে না। এছাড়া খোয়া যাওয়া ল্যাপটপ কারও কাছে থাকলেও সেটা দিয়ে আর সার্ভারে ইনফরমেশন ইনপুট দেওয়া সম্ভব হবে না।

২০০৭ সালে এনআইডির কাজ শুরুর সময় এই সুরক্ষা নেওয়া হয়নি কেন, জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘একযোগে সারাদেশে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। অনেক কাজ ছিল। অনেক মাঠকর্মীর কাছে ল্যাপটপ ছিল, যারা ইসিতে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ছিল না। এতবড় কাজ করতে গিয়ে হয়ত সুরক্ষার বিষয়টা সেভাবে নজরে আসেনি।’

তবে একজন কর্মীকে আটকের ঘটনাকে ভিত্তি ধরে তদন্ত চালিয়ে জড়িত চক্রকে শনাক্ত করা যাবে বলে আশাবাদী ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। এর সঙ্গে আরও যাদের সংশ্লিষ্টতা আছে সবাইকে খুঁজে বের করা হবে। আর সার্ভারকে আরও কিভাবে সুরক্ষিত করা যায়, সেটাও দেখবে আমাদের উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল টিম।’

আরও পড়ুন
রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি, ইসি কর্মচারীসহ আটক ৩
রোহিঙ্গাদের এনআইডি: ইসি কর্মীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা
রোহিঙ্গারা কিভাবে এনআইডি-পাসপোর্ট পাচ্ছে, অনুসন্ধানে দুদক
রোহিঙ্গাদের এনআইডি ‘প্রাপ্তিতে’ ইসির কেউ জড়িত নয়, দাবি কমিশনারের

সারাবাংলা/আরডি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন