রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে দাপট’ খালেদের, পালাতে চেয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ | ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ফকিরাপুলে অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) হাতে আটক হয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তবে একাধিক পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ দাপট তৈরি করে চলা খালেদ দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সিঙ্গাপুরে গিয়ে গা ঢাকা দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আটক হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি বিমানবন্দর থেকে ফিরে এসেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় র‌্যাবের হাতে আটক হন খালেদ। এর আগে তার পরিচালিত ফকিরাপুলের ইয়ং মেনস ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১৪২ জনকে আটক করেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, জব্দ করা হয় বিপুল পরিমাণ মদসহ নেশাজাতীয় দ্রব্য, জুয়া খেলায় ব্যবহৃত প্রায় ২৫ লাখ টাকা। গোয়েন্দা সূত্রগুলো সারাবাংলাকে জানিয়েছে, এদিন সকালেই সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা ছিল তার।

আরও পড়ুন- যুবলীগ নেতা খালেদ র‌্যাবের হাতে আটক

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ পাঁচ জন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সকালের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। ভোরে তারা সে উদ্দেশ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও যান। তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে তাদের সন্দেহ হয়, তারা বিমানবন্দরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়তে পারেন। এ আতঙ্ক থেকে তারা বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসেন।

বিজ্ঞাপন

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও জানান, বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে সম্রাট-খালেদসহ পাঁচ জন একসঙ্গেই ছিলেন। পরে দুপুরের দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গিয়ে যে যার মতো আলাদা হয়ে যান। সেখান থেকে খালেদ বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে ফিরে যান তার বাসায়। সেখান থেকে দ্রুতই তার বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু র‌্যাব তার বাসায় ঢুকে পড়ায় তিনি আর বাসা থেকে বের হতে পারেননি।

একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, খালেদ এরই মধ্যে র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছেন। তার সঙ্গে আরও যারা ছিলেন, তাদের ধরতেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব।

আন্ডারওয়ার্ল্ডে সঙ্গে সম্পর্ক খালেদের

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতে পলাতক বিএনপিপন্থী পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার। সেই সম্পর্কে ভাঙন ধরার পর তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুবাইয়ে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে। তার সহযোগিতা নিয়ে টেন্ডারবাজিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন খালেদ। সেই টাকার ভাগ নিয়মিত পৌঁছে যেত জিসানের কাছে। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ খালেদের অবস্থান প্রমাণে সিঙ্গাপুরের অভিজাত হোটেল মেরিনা বে’র সুইমিংপুলে জিসান ও খালেদের সাঁতার কাটার ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টারে ছেয়ে যায় নগরী।

আরও পড়ুন- খালেদের ক্যাসিনো থেকে আটক ১৪২, জব্দ ২৪ লাখ টাকা

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, একসময় টেন্ডারবাজির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে জিসানের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হয় তার। এসময় সম্রাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার শুরু খালেদের। জিসানের কাছ থেকেও তিনি দূরে সরে আসেন। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জিসানের বেশকিছু ক্যাডার ধরিয়ে দেন তিনি, বেশ কয়েকজন ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। এরপর মুখোমুখি হয়ে পড়েন জিসান ও খালেদ। তখন থেকেই ‘নিরাপত্তা’র খাতিরে অস্ত্র উঁচিয়ে চলতে থাকেন খালেদ ও তার ক্যাডাররা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে খালেদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে দু’জনের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে। থাইল্যান্ডে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবীর সঙ্গেও রয়েছে খালেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও খালেদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, থাইল্যান্ডে পলাতক মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবী খালেদের ব্যবসায়িক অংশীদার। ব্যাংককে একটি টু-স্টার মানের হোটেল ও পাতায়াতে ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে খালেদের। এসব দেখভাল করেন নবী। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অভিজাত সুপারমল প্যাভেলিয়নের উপরে ১১ কোটি টাকায় সম্পতি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন খালেদ। সেখানে গড়েছেন সেকেন্ড হোম। স্কটল্যান্ডেও কিনেছেন বাড়ি। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পরিবার নিয়ে ঘনঘন যাতায়াত করেন। সেখানে বিনিয়োগ ভিসায় স্থায়ীভাবে পরিবার নিয়ে থাকার প্রস্তুতিও চলছে তার।

যোগাযোগের চেষ্টা করেও এসব বিষয়ে খালেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, চাঁদাবাজিসহ যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব অনৈতিক কাজের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিচার হবে যুবলীগের নিজস্ব ট্রাইব্যুনালে। বিচার প্রক্রিয়া শুরুর জন্য এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাটের দাবি, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেগুলার প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আর খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচিয়ে চলার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ক্যাসিনো ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ প্রসঙ্গে সম্রাট বলেন, এগুলো কারা করে, তা তার জানা নেই।

সারাবাংলা/ইউজে/জেএন/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন