বিজ্ঞাপন

জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াই যার একমাত্র লক্ষ্য

September 28, 2019 | 1:33 am

নৃপেন রায়, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ৭৩ বছর বয়সের জীবনের ৬১ বছরই দেশের রাজনীতির সঙ্গে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত তিনি। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে উন্নত-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণে নিরলস প্রচেষ্টায় যেন এক অক্লান্ত-নির্ভীক সৈনিক। একদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি হয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রাণের দলকে শত বাধার মুখেও অটুট রেখেছেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বের দরবারে। সেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ৭৩তম জন্মদিন আজ শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর)।

বিজ্ঞাপন

এ বছরও জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। ১৬ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতির পিতার ৪৪তম শাহাদাৎবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘আজকের দিনে পিতা তোমাকে কথা দিলাম, তোমার স্বপের সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব— এটাই আমাদের অঙ্গীকার।’

সেদিন শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) ৭ মার্চের ভাষণে শেষ কথা বলেছেন, প্রয়োজনে বুকের রক্ত দেবো। সেই রক্তই তিনি দিয়ে গেছেন। আমাদের সেই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ হবে।’

বিজ্ঞাপন

কেবল শোক দিবসের আলোচনা নয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই বঙ্গবন্ধুকন্যা এই স্বপ্নের কথা বলে থাকেন। এ বছর গণভবনে আয়োজিত ইফতার পার্টিতেও যেমন তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশের। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ যেন বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। আপনারা সবাই দোয়া করবেন বাংলাদেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য। আমরা যেন জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি, বাংলাদেশকে যেন সেই সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যেতে পারি।

বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার অর্জনের পাল্লা কম ভারি নয়। বিশ্বনেতা হিসেবেও তাকে অভিহিত করে থাকেন অনেকেই। কিন্তু নিজের কোনো অর্জনকেই তিনি বড় করে দেখতে রাজি নন।

গত ১১ সেপ্টেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বের হোসেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবেও ঠিক সে কথাই বলেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নিজের জন্য আমার কোনো অনুভূতি নেই। বিশ্বনেতা জাতির পিতাই, আমি নই— এটুকু বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই। এখানে আমি কী পেলাম, না পেলাম বা আমি কী হলাম, না হলাম— এগুলো নিয়ে আমি কখনো চিন্তাও করি না। এগুলো নিয়ে আমার ভাবনার সময়ও নেই। আমার সময় দেশকে ঘিরে, দেশের মানুষকে ঘিরে, দেশের কল্যাণে।’

রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন শেখ হাসিনা। গত এপ্রিলে সরকারি বাসভবন গণভবনে ব্রুনেইয়ে সরকারি সফর শেষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে সে বিষয়টিই তুলে ধরেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ৭২ বছর বয়সের জীবনে ৬০ বছরই দেশের রাজনীতি চোখে দেখছি। অনেকে বলে থাকেন, রান্নাঘর থেকে রাজনীতিতে এসেছি। নো, আমি স্কুল জীবন থেকে রাস্তায় মিছিল করে তারপর কিন্তু রাজনীতিতে এসেছি।

সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা আরও বলেন, আমাকে ফাঁকা কথা বললে আর অপবাদ দিলে তো মেনে নেব না। কারণ আমার দল সম্পর্কে, আমার দলের মানুষ সম্পর্কে আমার একটা বিবেচনা আছে। আমি তো নতুন না। আমি স্কুলজীবন থেকে রাজনীতিতে যুক্ত— এটা ভুললে চলবে না।

রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার পর আওয়ামী রাজনীতিতে আসার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনো ছিল না— এমন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কখনো বড় পদ চাইনি। বড় পদ নেইনি, নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। সেদিকে আমাদের দৃষ্টিও ছিল না। এখন যারা আছে তাদের বাবাকেও চিনতাম, কারও দাদাকেও চিনতাম। আমাদের কিন্তু জেনারেশনের পর জেনারেশন পার্টি করে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই কিন্তু ত্যাগের ইতিহাস আছে, এর মধ্যে ব্যতিক্রম নাই, তা না। ব্যতিক্রম তো থাকবেই, খন্দকার মোশতাকও ছিল, এরকম তো কিছু থাকেই। আবার ডিগবাজি খাওয়াও ছিল। বেশ কয়েকজনই ডিগবাজি পার্টি আছে। তুখোড় ছাত্রনেতা, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কিছু বললেই হাত দু’টো উঠত। কিন্তু বিএনপিতে গিয়ে আবার জিয়াউর রহমানের নামে স্লোগান দেয়। আমার চোখে কিন্তু অনেক দেখা। আমি সবথেকে প্রবীণ এখন বলতে গেলে রাজনীতিতে, এটাও ভুলে যাইয়েন না। ৭২ বছর বয়সে আমি বলতে পারি, ৬০ বছরই রাজনীতি অন্তত চোখে দেখছি।

প্রতিবারে মতো এবারও শেখ হাসিনার জন্মদিনটি উৎসবমুখর পরিবেশে নানা কর্মসূচিতে পালন করবে তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আর তিনি জন্মদিনটিতে সূদুর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইর্য়কে জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভাষণ দেবেন।

শেখ হাসিনার সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদী বিধৌত গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব দম্পতির প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা। টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালাতেই শুরু তার শিক্ষাজীবন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হওয়ার পর পরিবারকে ঢাকা নিয়ে আসেন। ঢাকায় প্রথমে টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন শেখ হাসিনা। পরে তিনি ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ঢাকার বকশী বাজারের ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে। একই বছর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন শেখ হাসিনা। কলেজে ছাত্র সংসদের সহ-সভানেত্রী (ভিপি) পদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত ছয় দফা দাবির আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। পরে ১১-দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও তিনি ছিলেন সরব।

ছাত্রজীবনেই এম ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় শেখ হাসিনার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে বঙ্গবন্ধুকে যখন পাকহানাদার বাহিনী গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচিতে নিয়ে যায়, তখন বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারকে ঢাকায় ভিন্ন একটি বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ওই সময় ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তিনি মুক্ত হন। ১৯৭২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি জন্ম দেন কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে। ১৯৭৩ সালে শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এসময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সবাইকে হারিয়ে শুরু হয় তাদের প্রবাস জীবন। কয়েকবছর পর ১৯৮১ সালে তার অনুপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। শুরু করেন সামরিক জান্তা, স্বৈরশাসন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলন।

দিকহারা আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয় এনে দেন শেখ হাসিনা। নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী। পরের জাতীয় নির্বাচনে আর ক্ষমতায় আসতে পারেননি তিনি। তবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও পরে ওয়ান-ইলেভেনের অনির্বাচিত সরকারের নানা অত্যাচার-নিপীড়ন সত্ত্বেও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ফের আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনেন তিনি। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা অব্যাহত রাখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। টানা তৃতীয় ও মোট চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এক বর্ণাঢ্য সংগ্রামমুখর জীবন শেখ হাসিনার। সাফল্যে গাঁথা এই কর্মময় জীবন কুসমাস্তীর্ণ ছিল না, ছিল কণ্টকাপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ছিলেন গৃহবন্দি। স্বৈরশাসনামলেও বেশ কয়েকবার তাকে কারানির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে, থাকতে হয়েছে গৃহবন্দি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে। অন্তত ২০ বার তাকে হত্যার অপচেষ্টা করা হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি অসীম সাহসে লক্ষ্য অর্জনে থেকেছেন অবিচল। আর তাই একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার অবদান আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

সারাবাংলা/এনআর/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন